আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮
প্রবন্ধ
জন্মদিনের উৎসব ও বিনি পয়সার ভোজ
গৌতম হোড়
বিজেপি-তে নেতাদের প্রকাশ্যে জন্মদিন পালন শুরু হয়েছিল অটল বিহারী বাজপেয়ীর সময় থেকে। প্রমোদ মহাজন, বিজয় গোয়েল এবং উত্তরপ্রদেশের কিছু বিজেপি নেতার উদ্যোগে বাজপেয়ীর জন্মদিন উপলক্ষে কখনো কবি সম্মেলন, কখনো গরিবদের কম্বল দেওয়ার (বাজপেয়ীর জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর, তখন দিল্লিতে ঘোর শীত) মতো কর্মসূচি নেওয়া হত। প্রমোদ মহাজন তো ‘আউট অফ দ্য বক্স’ ভাবতেন। মজার মজার সব আইডিয়া খেলত তাঁর মাথায়। একবার তিনি হিসাব কষে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন, বাজপেয়ীর এক হাজার চন্দ্রদর্শন। মানে বাজপেয়ী এক হাজার বার পূর্ণিমা দেখেছেন। সফদরজঙ্গ লেনের বাড়িতে হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান।
বাজপেয়ীর আগে ধুমধাম করে জন্মদিন পালনের ঘটনা কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতাদের মধ্যে খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। তবে এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন পালন করা হয়। বিজেপি তার নাম দিয়েছে 'সেবা দিবস'। এবার মোদীর জন্মদিন একটু বিশেষভাবে পালন করছে বিজেপি। তার কারণ, মোদী প্রথমে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ও পরে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে টানা ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন। এই টানা ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার ঘটনাটা জন্মদিনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে জন্মদিন পালনের উৎসব।
কীভাবে পালন করা হবে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন? দেশজুড়ে ১৪ কোটি গরিবকে দেওয়া হবে রেশন ব্যাগ। ব্যাগে মোদীর ছবি থাকবে। পাঁচ কোটি ‘ধন্যবাদ মোদীজি‘ পোস্টকার্ড পোস্ট করা হবে বুথ পর্যায় থেকে। দেশের বিভিন্ন নদীর ৭১টি দূষিত জায়গা পরিষ্কার করা হবে। কারণ, এবার মোদীর ৭১তম জন্মদিন। যুব বিজেপি-র কর্মীরা রক্তদান করবেন। গরিবদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। মহিলা বিজেপি-র কর্মীরা সেবা কর্মসূচি নেবেন। সেমিনার, মিটিং হবে। আর তিন সপ্তাহ ধরে চলবে এই জন্মদিনের উৎসব পালন।
জন্মদিনের উৎসব এবং
কোনো সন্দেহ নেই, এতদিন পর্যন্ত এত বড় আকারে কোনো বিজেপি নেতার জন্মদিন পালন করা হয়নি। বাজপেয়ীরও নয়। আর এই জন্মদিন পালনের ধরনটাও অভিনব। বাজপেয়ীর জন্মদিনে হাসপাতালে রোগীদের এবং কিছু জায়গায় গরিবদের খাবার, ফল, কম্বল, শাড়ি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত বড় আকারে কখনো তা হয়নি। একটা নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়নি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তো মানুষ বদলায়। তার চিন্তাধারার পরিবর্তন হয়। একটা সময় ছিল, যখন নরেন্দ্র মোদী সরকারি অর্থ খরচ করে বিনা পয়সায় মানুষকে জিনিস দেওয়ার কট্টর বিরোধী ছিলেন। তার মত ছিল, গরিবদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে সরকার, তাদের আর্থিক দিক থেকে উপরে উঠে আসার ভরপুর সাহায্য করা হবে, কিন্তু বিনি পয়সার ভোজ দেয়া হবে না। ভোটের দায় বড় দায়। তাই মোদীর চিন্তাভাবনার আমূল পরিবর্তন হয়েছে।
বিনি পয়সায় গরিবদের জিনিস বিলি করার সংস্কৃতি চালু হয়েছিল দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে, বিশেষ করে তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, তেলেঙ্গানায়। তামিলনাড়ুতে তো রঙিন টিভি পর্যন্ত বিলি করা হয়েছে। তার থেকে আইডিয়া নিয়ে অখিলেশ ছাত্রছাত্রীদের ল্যাপটপ বিলি করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ট্যাব দিচ্ছেন। লক্ষীর ভান্ডার খুলে দিয়েছেন। এবং মোদীও ভোটে জিততে কৃষকদের বছরে ছয় হাজার টাকা অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দিচ্ছেন। দেশজুড়ে গরিবদের বিনা পয়সায় রেশন দিচ্ছেন। বিজেপি নেতারা সগর্বে বলছেন, মোদীকে ২০২৪ সালে কেউ হারাতে পারবেন না। কারণ, যে গরিবরা রেশন পাচ্ছেন, বিনা পয়সায় করোনার টিকা পাচ্ছেন, তারা মোদীকেই ভোট দেবেন।
কৃষকদের রেশন দেওয়া নিয়ে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচার চলছে। লখনউ থেকে অযোধ্যার দিকে যাচ্ছি। কিছুটা এগিয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে নেমে পড়লাম গ্রামের দিকের রাস্তায়। সোজা গ্রামের ভিতরে। কৃষকদের জিজ্ঞাসা করলাম, কাকে ভোট দেবেন? সোজাসাপটা জবাব, বিজেপি-কে। কেন? জবাব, অ্যাকাউন্টে চার হাজার টাকা দিয়েছে বলে। বছরে মোট ছয় হাজার দেবে। আবার প্রশ্ন করি, কংগ্রেস তো বারো হাজার টাকা দেবে বলছে। তাহলে? জবাব এল, ওটা তো প্রতিশ্রুতি। আর এখানে তো টাকাটা অ্যাকাউন্টে ঢুকে গেছে। বোঝা গেল, বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে রাহুল ধারে কাছে আসতে পারছেন না মোদীর। অ্যাকাউন্টে পয়সা পেয়ে রাগ জল হয়ে গেছিল কৃষকদের। পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি সফল হয় এভাবেই।
মোদীর জন্মদিনে আরো ১৪ কোটি গরিব পরিবারকে রেশন ব্যাগ পৌঁছে দিচ্ছে বিজেপি। একটা পরিবারে চারজন সদস্য ধরলে সরাসরি ৫৬ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে এই ব্যাগ। তারা কৃতজ্ঞচিত্তে মোদীর ছবি দেওয়া রেশনের ব্যাগ গ্রহণ করবেন। তার প্রভাব ভোটে পড়তে পারে বই কি। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গোয়ার মতো রাজ্যগুলিতে, যেখানে ভোট আসন্ন। মধ্যপ্রদেশে তো এক হাজার ৭০টি 'নমো পার্ক' গড়ে তোলা হবে। বিহারে মোদীর জন্মদিনে করোনার টিকা দেওয়ার সংখ্যা অনেকটা বাড়ানো হবে। এককথায় তিন সপ্তাহ ধরে মোদী-ঝড় তুলবে বিজেপি।
একটা ভোট শেষ হলেই
বিজেপি-তে একটা চালু কথা আছে, একটা ভোট শেষ হলে মোদী-শাহ পরের ভোটের প্রস্তুতি শুরু করে দেন। শুধু কি তাই, পরের পাঁচ বছর কী কী করবেন সেটাও ছকা থাকে। পরিস্থিতি-ভেদে তাতে কিছুটা পরিবর্তন হয় মাত্র। বিজেপি নেতারা তো হামেশাই বলেন, ২০২৪ কী বলছেন, ২০২৮ সালের ভোটের পরিকল্পনাও করা আছে।
আর এই যে দেওয়া হচ্ছে, সেটার প্রচার করার ক্ষেত্রেও বিজেপি-র ধারে-কাছে, সামনে-পিছনে কেউ নেই। তিন সপ্তাহ ধরে যে জন্মদিনের উৎসব পালন করা হবে, তার ভরপুর প্রচার হবে সামাজিক মাধ্যমে। সেই প্রচারের জোরে প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে অনেকটা এগিয়ে যাবে বিজেপি।
পশ্চিমবঙ্গে হার নিয়ে বিজেপি-র মূল্যায়ণের একটা বিন্দু হলো, মমতাও এই পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে এগিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে বিনা পয়সায় সব মানুষকে বিমা থেকে শুরু করে কন্যাশ্রী, পেনশন, খাবার বিতরণ, কৃষকদের সাহায্য সব দিক থেকেই। তাই গরিবদের ভোট, মেয়েদের ভোট বেশি পেয়েছেন তৃণমূল নেত্রী।
পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি
সাহিত্যিক ও অবসরপ্রাপ্ত আমলা ভগীরথ মিশ্রর ‘আমলাগাছি’ বলে একটা বই আছে। যারা পড়েননি, তাঁরা দয়া করে পড়ে নেবেন। চোখ খুলে দেওয়ার মতো বই। আমলাতন্ত্র কী করে চলে, বিনি পয়সার রাজনীতির ফায়দা তুলতে সাধারণ মানুষের মনোভাব, কীভাবে গরিবদের জন্য বিনা পয়সায় বাড়ি বানিয়ে দিয়েও সেই প্রকল্প ব্যর্থ হয়, সেসব কথা অতি নিপুণতায় ফুটিয়ে তুলেছেন ভগীরথ মিশ্র।
কোনো সন্দেহ নেই, গরিবদের সাহায্য করতেই হবে সরকারকে। তবে তার মডেল কী হবে, রাজকোষের অর্থ খালি করে দিয়ে এই সাহায্য দিয়ে কতটা লাভ হয়, না কি, সেই অর্থ দিয়ে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য খরচ করা উচিত, সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার। একশো দিনের কাজের প্রকল্প যখন ইউপিএ নিয়ে এল, তখন সমালোচনা কম হয়নি। এ তো মানুষকে মাটি কাটার জন্য টাকা দেয়া হচ্ছে। সেখানে তাও তো পরিশ্রম করে টাকা পাচ্ছেন তারা। কোনো কাজ না করে, মাথার ঘাম পায়ে না ফেলে বাড়িতে বসে অ্যাকাউন্টে টাকা পেয়ে যাওয়ার এই সংস্কৃতি কি ভাল? অর্থনীতিবিদরা বলতে পারবেন। সমাজতাত্ত্বিকরা বলতে পারবেন। একটা মত হলো - টাকা রোজগার করা উচিত। সেই রোজগার কীভাবে হবে তা সরকার ঠিক করুক। বয়স্করা পেনশন পাবেন, এটা ঠিক আছে। কিন্তু গড়পড়তা সকলের জন্য এই 'পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি' আমাদের কোথাও নিয়ে যাবে না। অখিলেশের দেওয়া ল্যাপটপ কত জন ছাত্রছাত্রীর কাছে আছে, আর কতটা বাজারে চলে এসেছে সেই সমীক্ষা হলে আসল সত্যটা বেরিয়ে যেত। করোনাকালে নিঃসন্দেহে গরিবদের খাবার দিতে হবে। বিনা পয়সায়। কারণ, সেটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। কিন্তু করোনার পর যখন সব খুলে যাচ্ছে, তখন কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প অনেক বেশি সম্মানের। অনেক বেশি শ্রেয়। আর এই যে দুই হেক্টর পর্যন্ত যাদের জমি আছে, এমন সব কৃষককে টাকা দেয়া হচ্ছে। কৃষকদের ভোটটা তো পেতে হবে।
আর এ হলো বাঘের পিঠে চড়ার মতো। একবার চড়লে আর নামা যায় না। তখন দিতেই হয়। নিত্যনতুন উপহার। শুধু রাজকোষ খালি হতে থাকে। তখন পেট্রো পদার্থের দাম কমলেও সরকারি কর ও মাসুলের ধাক্কায় তার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছয় না। ভোটে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। সেই খরচ তুলতে গিয়ে জিনিসের দাম বাড়ে। এ এক অদ্ভূত চক্র। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অঙ্গ। এই চক্রের হাত থেকে কোনোভাবেই নিস্তার নেই।