আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮

প্রবন্ধ

‘আমরা ভীত নই, আমরা ঐক্যবদ্ধ’

মালবী গুপ্ত


এবং ভয় পাচ্ছেন না বলেই, মৃত্যুর হুমকিকেও যে তুড়ি মেরে রাস্তায় নামা যায়, আফগানিস্তানের মেয়েরা তা গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তাই বোধহয় কেউ বলতে পারেন, ‘আমার কথায় যে শক্তি আছে, কোনও বন্দুকেরই সেই শক্তি নেই’। প্রবল আত্মবিশ্বাসে যিনি একথা বলেছেন, মাত্র ২৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালে কাবুলের দক্ষিণ পূর্বের ‘গোঁড়া’ ময়দান শারের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর যাঁকে বেশ কয়েক বারই হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।আফগানিস্তানের কনিষ্ঠতমসেই মহিলা মেয়রপ্রতিবারইযে চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন, তিনি জারিফা গাফারি। নারী অধিকারের অন্যতম বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর।কোনো পরিস্থিতিতেই দেশ ছাড়তে না চাইলেও মধ্য অগস্টে কাবুল পতনের পর তাঁকেও দেশ ছেড়ে পালাতে হয়।

কারণ আফগান সেনা বাহিনীর প্রবীণ সদস্য, তাঁর বাবা গত বছরই জঙ্গিদের হাতে যেভাবে নিহত হন, জারিফা চাননি সেই একই পরিণতি তাঁর পরিবারের অন্য সাতজনেরও হোক। তালিবানের আফগানিস্তান পুনর্দখলের সময় তাঁর প্রতি দেশ ছাড়ার পরামর্শ থাকলেও অকুতোভয় জারিফা তা চাইছিলেন না। তবে কাবুলের পতনের পরপরই জারিফা বুঝে গিয়েছিলেন, তালিবানরা তাঁর পরাক্রমী কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতে আর বেশি সময় নেবে না।তাইগত ১৮ অগস্ট লুকিয়ে মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয় তাঁকে। যার যন্ত্রণা তাঁর ‘পিতৃশোকের বেদনাকেও ছাপিয়ে যায়’ ।তবে আপাতত তাঁকে পালাতে হলেও, দ্রুতই যে তিনি ফিরে আসবেন, সেই ব্যাপারে আশাবাদী আন্তর্জাতিক নারী সাহসিকতা পুরস্কার প্রাপ্ত জারিফা । তিনি বিশ্বাস করেন, ‘মহিলাদের অংশগ্রহণ ছাড়া তালিবানরা কখনও দেশ শাসন করতে পারবে না।কারণ দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা মহিলা’।

বস্তুত,জারিফার মতো অসংখ্য সরকারি, বেসরকারি সংস্থার মহিলা কর্মী, শিক্ষিকা, ডাক্তার, মহিলা সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, এমনকি মহিলা বিচারককেও দেশ ছাড়তে হয়েছে।আসলে গত কয়েক দশক ধরে আফগানিস্তানের নারীরা যে অধিকার অর্জনের চেষ্টা করেছেন, যতটুকু পেয়েছেন, আশঙ্কা, তালিবানরা পুনরায় তাঁদের কাছ থেকে তা কেড়ে নেবে। আশঙ্কা, জীবন যাপনে যে স্বাধীনতা তাঁরা পেয়েছিলেন, ছিনিয়ে নেওয়া হবে তাও। এবং তালিবানি নির্দেশিত ধর্মীয় অনুশাসন অমান্য করলেঅতীতের মতোই তাঁদের ওপর নেমে আসতে পারে পীড়ন ও প্রাণদন্ডের নির্মম খাঁড়া। সেই আশঙ্কায় তাঁদের ঘোর অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ানো।

অথচ আমেরিকানদের থেকেও আগে ভোটাধিকার পাওয়া আফগান নারীদের গত কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে, মন্ত্রিসভায় ছিল উল্লেখযোগ্য উপস্তিতি। বহু দেশের তুলনায় এ'ব্যাপারে তাঁরা এগিয়ে। তবু সারা বিশ্বে আফগানিস্তানেই নারীদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। আসলে বহু যুগ ধরে যে আফগানিস্তান বারম্বার দেশি বিদেশি আগ্রাসনের শিকার হয়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে। ধ্বংস হওয়া ঘর-বাড়ি ছেড়ে, জীবিকাহীন নাগরিককে যেভাবে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছে। তার নির্মম অভিঘাত তো সব থেকে বেশি এসে লেগেছে সেই নারী ও শিশুর জীবনেই, পৃথিবীর অন্যান্য সংঘাতদীর্ণ সমাজের মতোই।

তাই বর্তমান আফগানিস্তানে তালিবান শাসকদের তরফে, সেখানে শরিয়ত আইন মেনে, শিক্ষা বা কাজকর্মে মেয়েদের অংশগ্রহণের অধিকারও নারীর অধিকার বজায় রাখবার যতই আশ্বাসবাণী উচ্চারিত হোক না কেন, আফগান নারীর কাছে তা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না। কারণ পূর্ববর্তী তালিবানি জমানাতেই তাঁদের প্রতি নিষ্ঠুরতম অত্যাচার, তাঁদের সমস্ত মানবাধিকার কেড়ে নেওয়ার বীভৎস অতীত অভিজ্ঞতা সেই বিশ্বাস স্থাপনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে এই ক্রান্তিকালে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলেও তাঁদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন।ফেরেস্তা তাহেরি, মারিয়াম এব্রাম, বাসিরা তাহেরির মতো আফগান নারীরা, আজ মৃত্যুভয় ঝেড়ে ফেলে প্ল্যাকার্ড হাতে পথে নেমে আসছেন।সংবাদ মাধ্যমে দেখা গেছে গত ২ সেপ্টেম্বর ইরানের সীমান্ত সংলগ্ন ‘গোঁড়া মনোভাবাপন্ন জন অধ্যুষিত হেরাট’ শহরের রাস্তায় ওই অসীম সাহসিনীরা অধিকারের দাবিতে তালিবানদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।তালিবানি শাসনের প্রতি যেন তাঁরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন, “আমরা ভীত নই।আমরা ঐক্যবদ্ধ”।

সদ্য তালিবান অধিকৃত কাবুলের রাজপথেও মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে লিখিত দাবি হাতে মহিলারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। যেন লক্ষ লক্ষ আফগান নারীর প্রতিভূ হয়েই ফারাৎ পোপালজাই, মারিয়ম নাইবি, নার্দিস সাদ্দাত’র মতো শিক্ষার্থী, সমাজকর্মীরা, ‘নারী পুরুষের সমান অধিকার, শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার’র দাবি জানাচ্ছেন। এমনকি অন্যান্য অধিকারের পাশাপাশি তালিবানি প্রশাসনে, রাজনীতিতে অংশ গ্রহণের দাবি নিয়েও তালিবানদের মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁরা।

সন্দেহ নেই, তালিবানি রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জীবনের এই মৌলিক অধিকারগুলির দাবি নিয়ে মহিলা সমাজকর্মীদের এই বিক্ষোভ প্রদর্শন অসংখ্য আফগান নারীকে উদ্বুদ্ধ করবে। অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পথে নামার শক্তি জোগাবে। আসলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে, কাজটা কঠিন জেনেও ঝাঁপ দিতেই হয়। ভয় জয় করে আফগান নারীরাও সেই কঠিন কাজেই আজ ঝাঁপ দিচ্ছেন।কিন্তু এমনও নয় যে, কেবল কয়েক দশক ধরে তাঁদের প্রতি শুধু তালিবানি সহিংসতার বিরুদ্ধেই আফগান নারীরা সরব হয়েছেন, স্বাধিকার অর্জনের চেষ্টা করে গেছেন। বরং ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায় আফগানিস্তানে তালিবানি উত্থানের অনেক আগে থেকেই সেই ঊনবিংশ শতকের শেষাশেষি আমির আব্দুর রহমানের রাজত্বেই নারী অধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত।

নৃশংস একনায়ক হিসেবে পরিচিত হলেওযিনি মেয়েদের বিয়ের বয়েস বাড়ানো, তাদের সম্পত্তির অধিকার, এমনকি স্বামীকে ডিভোর্স করার অধিকার দিয়ে আফগান সমাজে নারীর অবস্থানের উন্নতি ঘটিয়েছিলেন।তাঁর ছেলে আমির হাবিবুল্লার সময়ও আফগান সমাজে মেয়েরা আরও একটু এগনোর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে নানা যুদ্ধপ্রিয় জনজাতি অধ্যুষিত আফগানিস্তানের গ্রাম ও শহর এবং নোনা গোষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব বা সংঘাতে সমাজের মেয়েরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সব থেকে বেশি।শাসকরা কখনও আফগান মেয়েদের বোরখা পরিয়ে ঘর বন্দি করেছে। কখনও বোরখা খুলিয়ে তাদের স্কুল কলেজে পাঠিয়েছে। আর দেশি, বিদেশি শাসকের মাঝখানে পড়ে মেয়েদের জীবন কেবলই অতলান্তিক দুর্দশায় ডুবে গেছে।

সদ্য দখল হওয়া তালিবান রাজত্বে কী হতে চলেছে কেউ জানে না। তবে তালিবানদের কিছু আশ্বাস সত্ত্বেও সেখানকার নারীর অধিকার যে প্রায় সব কেড়ে নেওয়া হবে - সে বিষয়ে গোটা বিশ্বই যেন প্রায় একমত। পাশাপশি বর্তমান আফগানিস্তানে তালিবানি কার্যকলাপ নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবেই বহু গুজব ও ছবিসহ মিথ্যে খবরের জাল বিস্তারও হচ্ছে কিছু গণমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে।

তিন মহিলাকে পায়ে শেকল বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে,কোথাও প্রকাশ্যে কোতল করা, পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা,প্লেন থেকে মানুষ ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া ইত্যাদি নানা অত্যাচারের ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। যার স্থান, কাল, পাত্রসবই মিথ্যে বলে প্রমাণিতও হচ্ছে। এমনকি থিয়েটারে অভিনিত অত্যাচারের দৃশ্যকেও বর্তমানের সত্য ঘটনা বলে চালানো হচ্ছে।মনে হচ্ছে যেন, গোটা আফগানিস্তান জুড়ে কেবল তালিবানের জহ্লাদবাহিনী খড়গ হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর পথে ঘাটে নারী দেখলেই কোতল করছে।

একথা সত্য যে, আফিগানিস্তানে বিশেষ করে মেয়েদের ভবিষ্যৎ এখন খুবই অনিশ্চিত। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে সেখানকার যে লক্ষ লক্ষ নারী শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, বিভিন্ন কাজে, প্রশাসনে, মন্ত্রণালয়ে যে স্বাধীন ভাবে গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষা যেভাবে প্রজ্জ্বলিত হয়েছে তাকে অবদমিত করে রাখা তালিবানদের পক্ষেও তত সহজ হবে না। কারণ সময় থেমে নেই ।চেষ্টা করলেও তাকে পিছিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি না বাইরে থেকে কোনো অপরা শক্তি তাদের ধুনো দেয়।

তাই বোধহয় আফগানিস্তানের বিশিষ্ট নারী অধিকার কর্মী প্রবীণ মেহবুবা সেরাজ সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে সমস্ত বিশ্বের প্রতি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির প্রতি আজ আঙুল তুলেছেন। যারা কোনো না কোনো ছুতোয় আফগানিস্তানে নাক গলিয়েছে। তিনি পাকিস্তান, রাশিয়া, চিন, আমেরিকা, ইরানও ভারতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, আফগানদের ভাল করার মহতি উদ্দেশ্য থেকে যেন এবার তারা বিরত থাকে। তাঁদের নিয়ে কেউ যেন আর মাথা না ঘামায়।কারণ ‘আমরা কাউকেই চাই না। আমাদের একলা থাকতে দিন’।


ঋণ স্বীকারঃ

● https://www.bbc.com/news/world-asia-58343250
● https://origins.osu.edu/article/long-long-struggle-women-s-rights-afghanistan/page/0/1
● https://www.cbsnews.com/news/afghanistan-news-women-protest-taliban-demand-rights-education/