আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮
প্রবন্ধ
নারীর ইচ্ছা, পঞ্চ সতী ও আজকের আফগানিস্তান
মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
নারীর ইচ্ছা
নারী নিজের ইচ্ছাতেই ধর্ম তথা সমাজের কঠিন অনুশাসন মেনে চলে। এই কথা শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও বিশ্বাস করেন। অন্তত অনেকে সেদিন অবধি এই দেশেও বিশ্বাস করতেন। তবে যদি কোনো নারী সেই ধর্মীয় তথা সামাজিক অনুশাসন মানতে না চায়, তখন নেমে আসে সামাজিক দণ্ড।এই সমাজ পিতৃতন্ত্রের ধারক। তাই যে নারী চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বিধান মানে না, উপদেশ শোনে না সে হয় অবিদ্যা, পতিতা। সমাজ থেকে পতিত, অর্থাৎ সোজা ভাষায় বেশ্যা। পতিতা হবার ভয়ে যুগে যুগে, দেশে দেশে অধিকাংশ নারী নিরুপায়ে নিরুচ্চারে অনুশাসন মেনে চলে ‘সতী’ নারী হবার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। হতে পারে তা মহাভারতের যুগে ভারতবর্ষে, অথবা মধ্যযুগের ইউরোপে, অষ্টাদশ শতকের বাংলায় অথবা আজকের আফগানিস্তানে।
যখন কিশোরী কুন্তী পদ্মের ডালিতে সাজিয়ে সূর্যের মতো উজ্জ্বল প্রথম সন্তানকে জলে ভাসিয়ে দেন, তিনি নিজ ইচ্ছাতেই সেই কাজ করেন। মহাকাব্যে সদ্যোজাত সন্তানকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া গর্হিত অন্যায় নয়। কারণ সেই সন্তান বিবাহ বন্ধনের বাইরে জাত। শিশু হত্যার থেকেও অনেক বড় অপরাধ সামাজিক অনুশাসন ভেঙে অবিবাহিতার সন্তান জন্ম দেওয়া। অনাঘ্রাতা হিসাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নারীর প্রাথমিক কর্তব্য। কুন্তী সামাজিক অনুশাসন মেনে নিয়েছেন। তাই তিনি পঞ্চ সতীর এক সতী।
যখন যৌবনবতী মাদ্রী দুই শিশুর মুখের গন্ধ ভুলে মৃত স্বামীর সাথে সহমরণে যান তখনও তিনি নিজের ইচ্ছাতেই সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। মৃত স্বামীর সাথে একই চিতায় স্বেচ্ছায় জীবন্ত পুড়ে মরে যে নারী সে হল সতী। যখন দ্রৌপদী পঞ্চস্বামীর সাথে ঘর করেন, তিনি নিজের ইচ্ছাতেই বহুবল্লভা হন। পুরুষতান্ত্রিকতায় স্বামীর অনুরোধ স্ত্রীর কাছে আদেশসম। দ্রৌপদীও তাই ভারতীয় সতী। অহল্যা, তারা বা মন্দোদরী এর ব্যতিক্রম নয়। সতীর নিজের ইচ্ছা নেই, অন্তত তার ইচ্ছা কেউ জানে না। তার ইচ্ছা আসলে সমাজের ইচ্ছা, পিতৃতন্ত্রের ইচ্ছা।
রবীন্দ্রনাথের গল্প 'মধ্যবর্তিনী'
স্বামীকে খুশি করতে, সমাজের মনমতো হতে কত নারী এই সেদিনও স্বামীকে হাসিমুখে দ্বিতীয় বিবাহ করতে অনুরোধ করেছেন। 'বাঁজা' হবার অপরাধবোধে তাড়িত হয়ে, স্বপ্নহীন পৃথিবীতে স্ত্রীরা স্বামীকে দ্বিতীয় বিবাহ করতে বলেন। নারী জানে যে, সে বাঁজা! পুরুষ তো বাঁজা হতে পারে না। নারীর জন্য বংশ রক্ষা হবে না, একি হয়! আজও, এই বিজ্ঞানের যুগেও সন্তান না হবার দায়িত্ব বর্তায় নারীর উপরে। কন্যাসন্তান জন্মানোর দায়ও তার। ঊনবিংশ শতকের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের গল্প 'মধ্যবর্তিনী' থেকে একটা অংশ তুলে ধরি। “হরসুন্দরী কিছুদিন হইতে এই কথা ভাবিতেছিল। মনে যখন একটা প্রবল আনন্দ একটা বৃহৎ প্রেমের সঞ্চার হয় তখন মানুষ মনে করে, ‘আমি সব করিতে পারি।’ তখন হঠাৎ একটা আত্মবিসর্জনের ইচ্ছা বলবতী হইয়া উঠে। …সেইরূপ অবস্থায় অত্যন্ত পুলকিত চিত্তে একদিন হরসুন্দরী স্থির করিল, ‘আমার স্বামীর জন্য আমি খুব বড় একটা কিছু করিব। কিন্তু হায়, যতখানি সাধ ততখানি সাধ্য কাহার আছে। হাতের কাছে কী আছে, কী দেওয়া যায়। ঐশ্বর্য নাই, বুদ্ধি নাই, ক্ষমতা নাই, শুধু একটা প্রাণ আছে, সেটাও যদি কোথাও দিবার থাকে এখনই দিয়া ফেলি, কিন্তু তাহারই বা মূল্য কী।
আর, স্বামীকে যদি দুগ্ধফেনের মতো শুভ্র, নবনীর মতো কোমল, শিশু কন্দর্পের মতো সুন্দর একটি স্নেহের পুত্তলি সন্তান দিতে পারিতাম। কিন্তু প্রাণপণে ইচ্ছা করিয়া মরিয়া গেলেও তো সে হইবে না।’ তখন মনে হইল, স্বামীর একটি বিবাহ দিতে হইবে। ভাবিল, স্ত্রীরা ইহাতে এত কাতর হয় কেন, এ কাজ তো কিছুই কঠিন নহে। স্বামীকে যে ভালোবাসে সপত্নীকে ভালোবাসা তাহার পক্ষে কী এমন অসাধ্য। মনে করিয়া বক্ষ স্ফীত হইয়া উঠিল।”
বাংলার সধবারা স্বামীকে ‘ভালোবেসে’ দ্বিতীয় বিয়ে করতে অনুরোধ করেছেন, বাংলার বিধবারা স্বামীকে ‘ভালোবেসে’ নিজের ইচ্ছায় ইলিশ মাছ খাওয়া ছেড়ে, ধুতি পড়ে, ধূসর মৃত্যুর অপেক্ষায় জীবন কাটিয়েছেন। এই কয়েক'শ বছর আগেও বর্ধমান জেলায় কত বধূ স্ব-ইচ্ছায় স্বামীর সাথে আগুনে বসেছেন, পৃথিবীর কঠিনতম মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন। কত শঙ্খমালা চিতায় জ্বলে ছাই হয়ে গেছে। সব নিজের ইচ্ছাতে হয়েছে। হ্যাঁ, ওদের জিজ্ঞেস করলে ওরাও ব্যথিত দুই চোখ তুলে বলতেন, নিজের ইচ্ছাতেই তো করেছি।
তবে, সেই সব ইচ্ছা এখন আর হয় না। ইচ্ছাগুলো হারিয়ে গেছে, নতুন ইচ্ছা জেগেছে যে। এখন তার ইচ্ছা হয় সকলের সাথে সমভাবে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করার। আনন্দ পাবার। আনন্দ দেবার।
জর্ডন এয়ারপোর্টে
একটা ইচ্ছার কথা ভুলতে পারি না। পরের প্লেন লেট। জর্ডন এয়ারপোর্টে বসে আছি। আমার একদিকে বসে আছে স্বামী। শেখ সাহেব মজাসে ফুর্তি মারছেন সুন্দরী স্কার্ট পড়া ক্যাবিন ললনাদের সাথে। বাঁ দিকে বসে স্ত্রী, আপাদমস্তক আবৃতা। শুধু চোখ দুটি দেখা যাচ্ছে। ডানদিকের নির্লজ্জতায় বিরক্ত আমি বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি উনি আমাকেই দেখছেন। সে কি দৃষ্টি! যেন অন্ধকারে দীর্ঘ শীত-রাত্রির মধ্যে ঢুকে গেলাম। মধ্যরাতে ঘুমের ঘোরে, কাক-চিল শূন্য দুপুরে মধ্যবয়সী, সামান্য স্থুলা সেই নারীর চাউনি বুঝি কতবার স্বপ্নে হানা দিয়েছে! সেই মুহূর্তে আমরা দুজনেই জানি, ভিন্ন ধর্মী, ভিন্ন ভাষী, ভিন্ন দেশি আমি ওর সবচাইতে কাছের জন।
ইরানের সাদা বুধবার
আফগানিস্তানের তালিবানি ক্ষমতায়নের পরে একটা যুক্তি খুব চলছে - ওরা নিজেরাই চেয়েছে ওই শাসন। ওদের মেয়েরা হিজাব পরতে চায়। ওরা যদি উচ্চশিক্ষা না চায় আপনার কী বলার আছে?
প্রতিপ্রশ্ন রাখি। কী করে জানলেন ওরা পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে উচ্চশিক্ষা চায় না? সকলের মধ্যে সেরা হতে চায় না? পুরুষের কাঁধে কাঁধ দিয়ে ব্যবসা করতে, চাকরি করতে, শাসক হতে চায় না? শেষ দুই বছরে ওই দেশে মেয়েরাই কিন্তু কলেজের জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন। পুরুষ ও নারী, সকলের মধ্যে।
ইরানের কিছু নারী সমস্ত বুধবারগুলিতে সাদা জামা, মাথা ঢাকার সাদা স্কার্ফ পরছেন দেশের জবরদস্তি হিজাব পরার আইনের প্রতিবাদে। অথচ ১৯৭৯-এর আগে এরকম অবস্থা ওখানে ছিল না, তখন অন্তত যারা চাইতেন না তাদের স্কার্ফ পরা বাধ্যতামূলক ছিল না। আয়াতোল্লা খোমেইনীর আগমনের পরে ইরানের নয় বছরের বড় শিশু, কিশোরী, মহিলাদের আবশ্যিকভাবে মাথা ঢেকে রাখতে হয়। এর প্রতিবাদে হাজার হাজার নারী-পুরুষ একত্রিতভাবে মিছিল করছেন, প্রকাশ্যে হিজাব খুলে দিয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে আন্দোলনকারীদের আশংকা থাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে আটকে রাখবে, বিচারের নাম হবে প্রহসন। আইন অমান্য করার জন্য হতে পারে জেল, অথবা চাবকানি অথবা দুটোই। ওখানে সম্প্রতি কুড়ি বছর বয়সী মেয়েকে পঁচিশ বছরের জন্য জেলে যেতে হয়েছে জনসমক্ষে হিজাব খুলবার জন্য। এই আন্দোলনকারী নারীরা বাড়িতে অধিকাংশ সময়েই সাহায্য পায় না, চাকরি খোয়াতে হয়, বেত্রাঘাত খেতে হয়। তবু এরা বছর ধরে এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
আর সাম্প্রতিক তালিবানি শাসনের আগে এই নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অন্তহীন অত্যাচারের শিকার আফগান নারীরা। ওরাও অনেকে ইরানের নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বসমক্ষে মাথার কাপড় খুলেছেন।
আফগানিস্তানের লড়াকু নারীরা
তালিবানদের কাবুল দখলের আগেই লড়াই ছেড়ে দেশের প্রধান পালিয়ে গেছেন। সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করেছে। আর কিছু নারী এখনও জীবন বাজি রেখে সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওরা নিজেদের অধিকার রক্ষার চেষ্টা করে চলেছেন। হয়তো তা ক্ষণস্থায়ী। তবু ওরা আশা দেখাচ্ছেন। সালিমা মাজারি, জারিফ ঘাফরি এবং ফৌজিয়া কুফী - এই তিন সরকারি কর্মকর্তা এখনও দেশ ছেড়ে চলে যাননি। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে নারীর অধিকার রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের জেলা তালিবানদের হাত থেকে রক্ষা করবার সময়ে চল্লিশ বছর বয়সী জেলাশাসক সালিমা মাজারি ধরা পড়েছেন ওদের হাতে। তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে পারতেন, আর সেটাই হত কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কাজ। তিনি তা করেননি। তিনি বলেছেন, “যদি আমরা এখন চরমপন্থী মতাদর্শর বিরুদ্ধে এবং যে গোষ্ঠীগুলো আমাদের উপর জোর করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করি, তাহলে আমরা তাদের পরাজিত করার সুযোগ হারাব। তারা সফল হবে। তারা তাদের এজেণ্ডা গ্রহণ করে সমাজের মগজ ধোলাই করবে।”
মগজ ধোলাই। সমাজের মগজ ধোলাই করা হয়। আর তার ফলেই সমাজ মেনে নেয়, গ্রহণযোগ্য মনে করে পুরুষের নিচে নারীর স্থান।
পৃথিবীর সমস্ত মানুষের শিক্ষা ও কাজের সমানাধিকার আছে - এ হল মানুষের মৌলিক অধিকার। দেশের আইন সময়ের সাথে পালটায়, পালটাবে। তবে মানুষের অধিকার পালটায় না। আর নারীরাও মানুষ।
ইচ্ছাগুলো উধাও হয়
একসময়ে এই দেশে নারীরা সতী হয়েছেন, বিধবা হবার পরে নিজের প্রিয় পূর্ব জীবন ছেড়ে দিয়েছেন। তবে আজ আর নারী তা করার প্রয়োজন বোধ করেন না। পরাধীনতার ইচ্ছা আর তার আসে না। অধিকাংশ ইচ্ছে কোনো স্বাধীন অভিব্যক্তি নয়। ইচ্ছা আসলে সামগ্রিক সমাজের ইচ্ছা, ইচ্ছা এক কঠিন অনুভব। সমূহের বোধ ব্যক্তির ইচ্ছা হয়ে গোপনে চারিয়ে যায় মানুষ থেকে মানুষে। সমাজ নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় মানুষের উপরে, আর মানুষ তাকে নিজের ইচ্ছা বলেই ধরে নেয়। শুধু নারী নয়, পুরুষও ভাবে, এটাই সঠিক, এই আমার ইচ্ছা।
শিকারী চিলেদের থেকে বাঁচতে, সমাজের কঠোর অনধিকার চর্চা থেকে রেহাই পেতে নারীকে অনেক সময়ে মন থেকে মেনে নেবার মুখোশ পড়তেও হয়। যথাযথ শিক্ষা পেলে, আর্থিকভাবে সাবলম্বী হলে, স্বাধীন পরিবেশে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ পেলে আজকের আফগান নারীদের বাড়িতে থাকবার ইচ্ছা, হিজাব পরবার ইচ্ছে আর থাকবে কিনা কে জানে!
ইচ্ছাপ্রকাশ এক বিজ্ঞাপন। অনেক সময়েই নারীর স্বাধীন ইচ্ছা হল পিতৃতন্ত্রের মনভোলানো বিজ্ঞাপন।