আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮

প্রবন্ধ

জিডিপি-র বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকোচনঃ এ কোন্ ভারতের ছবি?

জয়ন্ত আচার্য


সম্প্রতি ভারত সরকারের পরিসংখ্যান দপ্তর দেশের গ্রস্ ডোমেস্টিক প্রডাক্ট (জিডিপি) সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে। দেখানো হয়েছে যে চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে (অর্থাৎ এপ্রিল ’২১ থেকে জুন ’২১) আমাদের দেশের জিডিপি ২০.১ % বৃদ্ধি পেয়েছে। জিডিপি বলতে বোঝায় একটি দেশে নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বছরে) দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্য ও সেবাসামগ্রীর মোট পরিমাণ বা মূল্য। একথা ঠিক যে অর্থনীতির নানা আলোচনায় বা আর্থিক নীতির মূল্যায়নের কাজে জিডিপি - ধারণার উপযোগিতা আছে এবং জিডিপি সংক্রান্ত তথ্যের ব্যবহারও করা হয়। কিন্তু জিডিপি-র বৃদ্ধিকেই দেশের উন্নয়নের সূচক মনে করা এক ভুল প্রবণতা। অনেক অর্থনীতিবিদও এই ভুল করে থাকেন। অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক নেতা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাও এই বিভ্রমের শিকার। তাঁদের বিশ্বাস, জিডিপি-র বৃদ্ধিই হলো উন্নয়নের সার কথা। আমাদের দেশের বর্তমান সরকার ও তদনুসারী রাজনৈতিক দলের তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টারাও অনেকেই জিডিপি বৃদ্ধির মোহে আবিষ্ট। একটি দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন বা সমৃদ্ধির সূচক কী এবং সেই সে দেশের মানুষ কতটা উন্নত জীবন যাপন করছেন তা পরিমাপ করার অনেক যুক্তিযুক্ত উপায় ও সূচক ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। তবে অর্থনেতিক উন্নয়নের মর্মবস্তুটি যে জিডিপির ঊর্ধ্বগতির মধ্যে নিহিত থাকে না একথা বহুদিন হলো একটি মীমাংসিত সত্য । সেইসব আলোচনায় বা বিতর্কে এখানে প্রবেশ করা হচ্ছে না। আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে ভারত সরকার প্রকাশিত জিডিপি বৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্যরাশি, এবং তার ভিত্তিতে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর যে সোচ্চার দাবি করা হয়েছে তার সত্যতা অনুসন্ধান করা।

জিডিপি সংক্রান্ত তথ্য

এই তথ্য রাশি থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ২০২১-২২ আর্থিক বছরের প্রথম তিনমাসেই জিডিপি বেড়েছে ২০.১%! কোন সময়ের তুলনায় এই বৃদ্ধি? গত আর্থিক বছরের অর্থাৎ ২০২০-২১ আর্থিক বছরের প্রথম তিনমাসের ( এপ্রিল ’২০ থেকে জুন ’২০) তুলনায়। মনে রাখতে হবে, এদেশে কোভিভের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল এবং তা ঠেকাতে দেশজুড়ে সম্পূর্ণ লকডাউন বলবৎ করা হয়েছিল ২০২০-র মার্চ মাসের প্রায় শেষ থেকে। মহামারীর সংক্রমণ প্রতিহত করতে পৃথিবীর সবদেশেই লকডাউনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় ঠিকই। কিন্তু সারা ভারত জুড়ে যে লকডাউন জারী হতে আমরা দেখলাম তা ছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম অচলাবস্থা। ভারতে লকডাউন পর্ব শুরু হওয়ার অব্যবহিত পর যে আর্থিক বছর শুরু হয়, অর্থাৎ ২০২০-২১ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে, এপ্রিল ২০২০ থেকে জুন ২০২০ এই সময়ে এবং তার পরেও দেশব্যাপী অর্থনৈতিক কাজকর্ম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে উক্ত ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়া দূরের কথা, হ্রাস পেয়েছিল ২৪.৪%। গত বছরের প্রথম তিনমাসের অধোগতির অর্থাৎ ‘নেগেটিভ গ্রোথ’ এর সঙ্গে সরকার তুলনা করে দেখাচ্ছে চলতি বছরের প্রথম তিনমাসের ঊর্ধ্বগতির। এধরনের তুলনা সঙ্গত ও বৈধ কিনা এ প্রশ্ন তো উঠছেই। কারণ এই তুলনা করা হচ্ছে এমন একটি সময়ের সঙ্গে যখন অর্থনীতির অবস্থা একেবারেই স্বাভাবিক ছিল না। আরও একটি যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন অনিবার্য ভাবেই হাজির হয় । তা হলো, আমরা যদি কোভিড সৃষ্ট সংকটের সূচনা পর্বের তুলনায় এ বছরের শুরুতে ২০.১% বাড়তি জিডিপি লাভ করে থাকি, তাহলে কি আমাদের দেশ ও আমরা কোভিড- পূর্ব অবস্থায় ফিরে গেলাম? জিডিপি-র বৃদ্ধি যদি দেশের মানুষের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য সমৃদ্ধির সুবাতাস বয়ে আনে, দেশের সরকার ও তার অনুগামী বিশেষজ্ঞরা যেমনটি বিশ্বাস করেন , তাহলে কী শতকরা কুড়ি ভাগ বর্ধিত জিডিপি নিয়ে আমরা প্রাক্-কোভিড সচ্ছলতা ও ভালো থাকার স্তরে পৌঁছে যাবো? এখানেও দেখি এক মস্ত ফাঁক। কারণ, প্রাক্-কোভিড বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে, ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের এপ্রিল-জুনে ভারতের জিডিপি ছিল ৩৫ লক্ষ ৬৬ হাজার কোটি টাকার। পক্ষান্তরে বর্তমান বছরে শতকরা ২০.১ ভাগ বৃদ্ধি পাওয়ার পরেও যার পরিমাণ হলো ৩২ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সমমূল্যের। এর মর্মার্থ হলো জাতীয় উৎপাদনের বৃদ্ধি তো হয়ই নি, এমন কী তা আগের স্তরেও পৌঁছতে পারে নি। বরং অঙ্কের হিসেবে শতকরা ৯.২ ভাগ কমে গেছে। এই কালান্তক মহামারী আমাদের দেশের পরপর দুটি বছরের উৎপাদন, আয় এবং সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান অপহরণ করে নিল।

কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য

পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে

জিডিপি-র উত্থান পতনের সঙ্গে দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের যে একটি অনিবার্য সম্পর্ক আছে একথা অর্থনীতির তত্ত্ব না জানলেও বোঝা যায়। দেশে যেখানে যত দ্রব্য ও সেবার উৎপাদন হচ্ছে, শ্রম বা শ্রমিকই হচ্ছে তার স্রষ্টা। তাই জিডিপি বৃদ্ধি নিয়ে এত যে হৈ চৈ চলছে, তখন দেশের কর্মসংস্থানের হাল কী দেখে নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে শ্রমের বাজারের গতিপ্রকৃতি, কর্মে নিযুক্ত অথবা কর্মহীন মানুষের সংখ্যা কত এসব তথ্য আমরা পেয়ে থাকি ভারত সরকারের পরিসংখ্যান মন্ত্রকের অধীন এনএসও দপ্তর দ্বারা পরিচালিত ও প্রকাশিত পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (পিএলএফএস) রিপোর্ট থেকে। ২০১৭-১৮ থেকে এই সার্ভে চালু হয়। তার পর থেকে এনএসও-র উদ্যোগে ত্রৈমাসিক নমুনা সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দেশব্যাপী কর্মসংস্থানের যে চিত্র উপস্থিত করা হয়ে আসছে তার সর্বশেষ সার্ভে-টি সম্পন্ন হয়েছে ২০২০-র এপ্রিল থেকে জুন - ত্রৈমাসিকের জন্য। অর্থাৎ এটা সেই ভয়াবহ ত্রৈমাসিক, যে তিনমাসে দেশের জিডিপি কমে গিয়েছিল শতকরা ২৪ ভাগেরও বেশি। কর্মসংস্থানের কী ছবি পাওয়া গেল এই ত্রৈমাসিকের “পিরিওডিক সার্ভে” থেকে ? দেখা যাচ্ছে যে, এই ত্রৈমাসিকে বেকারত্বের হার ঊর্ধগামী হয়ে দাঁড়াল শতকরা ২০.৮ ভাগ। ঠিক আগের ত্রৈমাসিকে যা ছিল শতকরা ৯.১। প্রকৃত পক্ষে পুরো ২০১৯ সাল জুড়েই দেশে বেকারত্বের হার ছিল শতকরা ৮ ভাগ বা তার বেশি। যে নগ্ন সত্যটি কিছুতেই আড়াল করা যাচ্ছে না তা হলো কোভিড লকডাউন ইত্যাদির প্রভাব পড়বার আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি গভীর মন্দার কবলে পড়েছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুনে - এই তিন মাসে জিডিপি-র ২৪.৪% হ্রাস এবং বেকারত্বের হারে ২০.৮% বৃদ্ধি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অধোগতির স্মারক হয়ে দেখা দিল মাত্র।

সিএমআইই সমীক্ষা ও তথ্য

দেশের শ্রমের বাজারের অনুপুঙ্খ তথ্য পাওয়ার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই) । এই সংস্থা একটি অসরকারি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ভারতের অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে ও বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠান অবিরাম তথ্য সংগ্রহ, সংকলন ও বিশ্লেষণের কাজ ১৯৭৬ সাল থেকে অবিরাম করে যাচ্ছে । ২০২০-র মার্চের শেষ থেকে ভারতের অর্থনীতিতে কার্যত যে অবরোধ ও অচলাবস্থা সৃষ্টি হলো, গত আঠারো মাসে কর্মসংস্থানের উপর তার কী প্রভাব পড়ল সি এম আই ই সংগৃহীত তথ্যের সাহায্যে আমরা তা বিশ্লেষণ করতে পারি।

সিএমআইই-র তথ্য স্পষ্টই দেখাচ্ছে যে, ২০২০ সালে লকডাউনে অচল দেশে বেকারত্বের হার উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল তো নিশ্চয়ই। যেমন ছিল কোভিড ও লকডাউনের দ্বৈত আক্রমণের মাসগুলিতে। ২০২০ সালের এপ্রিল ও মে - পরপর দু মাসেই বেকার মানুষের অনুপাত ছাড়িয়ে গেল শতকরা ২০ ভাগেরও বেশি - যথাক্রমে ২৩.৫ ও ২১.৭ - যা ভারতের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। ইওরোপ আমেরিকার মহামন্দার ইতিহাসেও এর নজির নেই। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় ২০২১ সালের মধ্যভাগে যখন মহামারীর প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউ প্রায় অবসিত এবং লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা অনেকটাই শিথিল, তখনও বেকারত্ব ভয়াবহ আকারে ও তীব্রতায় অব্যাহত। ২০২১ সালের এপ্রিল, মে এবং জুন মাসে বেকারত্বের হার, সিএমআইই সমীক্ষা অনুসারে, যথাক্রমে শতকরা ৮.৭ , ১১.৮৪, ও ৯.১৭ শতাংশ। শহরের বেকার-হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল মে মাসে শতকরা ১৪.৭৩ শতাংশ। ২০২১ এর মে মাস নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রম বাহিনীতে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকের সংখ্যা আগের মাসের মত একই থাকলেও বেকারত্বের হার গেল বেড়ে, তার সঙ্গে কর্মে নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা কমে গেল। প্রায় ১.৫ কোটি লোক কাজ হারালেন শুধু মে মাসেই। জানুয়ারি ২০২১ থেকে ধরলে দেখা যাচ্ছে মে মাসের মধ্যেই চার মাসে কাজ হারিয়েছেন ২.৫ কোটি মানুষ। লকডাউন জমানা শুরু হওয়ার মাসগুলিতে কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছিলেন প্রায় সাড়ে এগারো কোটি মানুষ। কাজে নিযুক্ত অথচ কর্মচ্যুত হয়ে গেলেন, কাজ করতে সক্ষম ও ইচ্ছুক অথচ কাজ পাচ্ছেন না, এই দুঃসহ ট্রাজেডি কোন অঙ্কে গিয়ে শেষ হবে বলা যায় না। তবে জিডিপি বৃদ্ধির অসার অলীক গল্প কথা প্রচার করলেই দেশের অর্থনীতির দুর্দশার বিষণ্ণ ছবিটা আড়াল করা যাবে না।