আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮
সমসাময়িক
কৃষকের আদালতে
বাজারে যান, জিনিসপত্রের দাম দেখে মনে হবে, চাষিরা কত সুখে আছে। এত্তো দাম? শাক সবজি সরষের তেল চাল ডাল আটা ময়দা বেসন - সব কিছুর দাম আকাশছোঁয়া। ৩০-৪০ টাকার নীচে কোনো সব্জি নেই। এ-নিয়ে প্রচার মাধ্যমে কোনো হা-হুতাশ নেই। কিন্তু আন্তর্জালে হঠাৎ পেয়ে যেতে পারেন আপনি ৫০ টাকা কিলো টমেটো কিনলেও টমেটোর দাম মাত্র দু'টাকা পাওয়ায় চাষিরা রাস্তায় ঢেলে দিচ্ছেন টমেটো। ছয় মাসের বেশি সময় রাস্তায় বসে আছেন চাষিরা - খবর অনুপস্থিত। কার বাচ্চা হল, কার প্রেম ভাঙল, কার আঙুলে ব্যথা - খুব চিন্তিত সবাই।
হরিয়ানার কার্নালে ২৮ আগস্ট ২০২১ এক আইএএস অফিসারের নির্দেশে গুলি চালিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে সুশীল কাজল নামে এক আন্দোলনকারী কৃষককে। কোনো হেলদোল নেই, না প্রচার মাধ্যমের না দেশবাসীর, না বিভিন্ন রাজনৈতিক গণসংগঠনের। এর প্রতিবাদে ১৩ দিন কার্নালে সরকারি দপ্তর ঘেরাও করে রেখেছিলেন কৃষকরা। সেভাবে খবর নেই।
শেষ পর্যন্ত ১০ সেপ্টেম্বর হরিয়ানা সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করতে হয়েছে, বিচারবিভাগীয় তদন্ত হবে। ওই আইএএস-কে সরানো হয়েছে। কারনালের সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট বলেছিলেন, কৃষকদের মাথা ভেঙে দাও, যদি ওঁরা কর্ডন ভাঙতে যায়।
আন্দোলন যদি শুধু দেখানো প্রতিবাদ নথিভুক্ত করা বা প্রচারমাধ্যমের মুখাপেক্ষী না হয়ে করা হয়, তা হলে কিছুটা হলেও সাফল্য আসে - দেখিয়ে দিল কার্নালের কৃষক আন্দোলন।
২০২০-র ৯ আগস্ট 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের দিন কৃষি ও কৃষক বিরোধী তিনটি আইন বাতিলের দাবিতে কৃষক আন্দোলন শুরু হয় দেশজুড়ে। বিশেষ করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, গুজরাট, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রে।
পশ্চিমবঙ্গ সে তুলনায় পিছিয়ে। অনেকটা নামকাওয়াস্তে আন্দোলন। শাসক বিরোধী কোনো দল সেভাবে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলতে আগ্রহী হননি। কলকাতায় ভবানীপুর অঞ্চলে শিখ ধর্মের মানুষ বরং অনেক ধারাবাহিক ছিলেন। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর আওতার বাইরে থাকা বহু সংগঠন কৃষক বিরোধী আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু সমস্যা একটাই - ধারাবাহিকতা নাই।
কিন্তু ৯ আগস্ট শুরু হওয়া আন্দোলন যখন ২৬ নভেম্বর ডাক দিল ট্রাক্টর মিছিলের তখন দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। ২৬ জানুয়ারি সাজানো লোক দিয়ে বদনাম করার চেষ্টা হয় আন্দোলনের। লাঠি গুলি চলে।
তবু দিল্লির বর্ডারে ধর্না বন্ধ হয়নি। দিল্লির প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং গরম ও বর্ষা উপেক্ষা করে ধর্না অবস্থান চলছে। ১০ মাসের বেশি পার হয়ে গেল অবস্থান। এ-পর্যন্ত ৬০৩ জন কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন ধর্না দিতে গিয়ে। অনেকেই ঠান্ডায় বা শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন। একজন শিখসন্ত আত্মঘাতী হয়েছেন। পুলিশের অত্যাচারে মারা গেছেন একাধিকজন।
তবু আন্দোলন থামেনি।
কৃষকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতকে গ্রেপ্তারের আদেশ জারি হয়েছে। হাজার হাজার কৃষক মাঝরাতে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের গ্রাম কাঁপিয়ে হাজির হয়ে রুখে দিয়েছেন গ্রেপ্তারি। রাকেশ টিকায়েত এরপর দেশজুড়ে মহাপঞ্চায়েত করে বেড়াচ্ছেন।
পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে ২০১৩-তে হিন্দু মুসলমান লাভ জেহাদ ধুয়ো তুলে দাঙ্গা বাধিয়ে ২০১৪ এবং ২০১৭-তে বিপুল নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু কৃষক আন্দোলন উলটো হাওয়া বওয়াচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে হুঁকো বেরাদরি প্রথা ছিল। একে অন্যের হুঁকো মুখে দিতেন। পরে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এখন কৃষক আন্দোলন শেখাচ্ছে, হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান শিখ সব কৃষকের স্বার্থ অভিন্ন। এখন 'শ্লোগান বেরাদরি' শুরু হয়েছে। 'হিন্দু'রা শ্লোগান দিচ্ছেন, আল্লাহো আকবর। 'মুসলিম'রা বলছেন, হর হর মহাদেব।
বিপদ বুঝে লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন মহেন্দ্রপ্রতাপের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য হুড়োহুড়ি পড়েছে। মহেন্দ্রপ্রতাপ জন্মসূত্রে ছিলেন জাঠ। ভারতের বাইরে প্রথম স্বাধীন ভারত সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বরকতুল্লাহ। এবং বিদেশমন্ত্রী ওবাইদুল্লা সিন্ধি। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে তখন জনসংঘ নেতা পরে বিজেপির, অটলবিহারী বাজপেয়ী পরাজিত হন মহেন্দ্রপ্রতাপের কাছে। বাজপেয়ী হন চতুর্থ। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবল বিরোধী মানুষের ভাবমূর্তি ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে ভোটের ভয়ে। শেষ রক্ষা হবে কি না সময় বলবে।
তবে কৃষক আন্দোলন এবং করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতার জেরে উত্তরপ্রদেশের অধিকাংশ জেলা পরিষদের নির্বাচনে বিজেপি গোহারা হেরেছে। গায়ের জোরে কিছু দখল করেছে।
আর ভোটটাকে হিন্দু মুসলমান লড়াইয়ে নিয়ে যেতে বিশ্বাসী মৌলবাদী আসাদুদ্দিন ওয়াইসিকে দিয়ে হিন্দু মুসলমান আখ্যানে পরিণত করতে চাইছে বিজেপি। বিজেপি হারবে এমন ১০০টি আসনে ওয়েইসির দল মিম প্রার্থী দেবে সংখ্যালঘু ভোট কাটতে। প্রচারমাধ্যমের দু'তিনটি করে ক্যামেরা ঘুরছে তাঁর পিছনে। তালিবান, ওয়েইসি ইত্যাদি ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে কৃষক আন্দোলন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারি, অপশাসন, শিশুমৃত্যু - ইত্যাদিকে ঢেকে ফেলতে চাইছে চাইবে বিজেপি।
কিন্তু কৃষকরা আর পাঁচটা মানুষের মত নন। আন্দোলনে সহজে নামেন না, নামলে না জিতে ঘরে ফিরতে চায় না।
ওড়িশায় ঝাড়িগ্রামে আগস্ট মাসের শুরুতে সার পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৩ আগস্ট রাস্তা অবরোধ, মহাসড়ক অবরোধ করেন ২৬ পঞ্চায়েতের কৃষকরা। সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় ২০ আগস্টের মধ্যে সার পৌঁছে দেব। দেয়নি। ২১ আগস্ট ল্যাম্পসের দপ্তর তছনছ করে দেন কৃষকরা।
ওড়িশা সরকার ধান কেনায় রেকর্ড করেছে। তবু চাষিরা বাধ্য হয়ে রাস্তায়। দাম নেই। এখানে বিজেপির কৃষক নেতারা আন্দোলনে।
২৪ আগস্ট কেন্দাপাড়ায় সরকারের দপ্তরে গোরু ছেড়ে দিয়েছেন কৃষকরা। কারণ গোরু বেড়ে গেছে। গোহত্যা নিষিদ্ধ। গোরু বিক্রি হচ্ছে না। ফসলের খেত খেয়ে নিচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে চাষিরা গোরু নিয়ে সরকারের দপ্তরে।
এর মাঝেই ওড়িশায় কৃষকদের কাছ থেকে কর্পোরেটের জমি কেনার ঊর্ধসীমা বাড়াতে চলেছে নবীন পট্টনায়ক সরকার। গ্রামাঞ্চলে ৫০০ একর এবং শহরাঞ্চলে ১০০ একর জমি কিনতে পারবেন কারখানার নামে। আগে ছিল এই সিলিং যথাক্রমে ২০০ একর ও ৫০ একর।
ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানিদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা জোগাতে রেললাইন পাতবে। ধামরা বন্দর থেকে কয়লা যাবে। এ-জন্য ৭০০ আদিবাসী উচ্ছেদ হবেন। আন্দোলন চলছে। খালি খবর নাই।
এর মাঝে আদানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য এসেছে পাঞ্জাবের লুধিয়ানার কাছে কিলা রায়পুরে। সেখানে আদানির হাব হচ্ছিল। ফসল মজুতসহ নানা কারণে। জানুয়ারি মাস থেকে ধর্না চালাচ্ছিলেন কৃষকরা। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা উপেক্ষা করে। অবশেষে বন্ধ কাজ। আদানিরা আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু কৃষকের আদালত জনতার আদালতে ওদের হার মানতে হয়েছে।
গুজরাটে লড়াই চলছে বহুদিন। কৃষকরা দলমত নির্বিশেষে সংগঠন গড়েছেন - কসম। কিষান সংঘর্ষ মোর্চা। গুজরাটের কৃষকরা ডিসেম্বরে ট্রাক্টর নিয়ে দিল্লি অভিযানে বের হন। আটকে দেওয়া হয়। এমনকী সাংবাদিক সম্মেলন থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কৃষক নেতা যুধবীর সিং সহ অন্য নেতাদের। সাংবাদিক সম্মেলন করতেও অনুমতি? তখন দেখানো হয়েছে মহামারী আইন লঙ্ঘন। অর্থনৈতিক মহামারী চলছে দেশে, তা ঠেকাতে সবাইকে যেতে হবে জনতার আদালতে, কৃষকের আদালতে।
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীকে জন অসন্তোষ সামলাতে পালটাতে হয়েছে ১৪ সেপ্টেম্বর, আগেই বদলাতে হয়েছে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীকে। আসলে বদলানো দরকার প্রধানমন্ত্রী তথা সঙ্ঘ পরিবারের জনবিরোধী সরকারটাকেই।
পুনশ্চঃ ২৭ সেপ্টেম্বর দেশ জুড়ে ভারত বন্ধের ডাক দিয়েছেন কৃষকরা। এতে সাড়া দেওয়া জাতীয় কর্তব্য।