আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮
সমসাময়িক
বিজ্ঞান ও রাজনীতি
বিজ্ঞান ও রাজনীতির দ্বন্দ্ব অতি প্রাচীন। সেই গ্যালিলিও, ব্রুনো, কোপারনিকাসের সময় থেকেই ক্ষমতাসীনরা বিজ্ঞানের সত্যকে অস্বীকার করেছে যদি তা তাদের ক্ষমতার আখ্যানের বিরুদ্ধে যায়। আবার রাজনীতিবিদরা বিজ্ঞানকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে। আণবিক বোমা বানিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা, বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে মারতে প্রয়োজন পড়ে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীর। কিন্তু এই মারণ বিজ্ঞানের জঠর হল রাজনীতির গভীর পাঁক, যা অতি বড় বিজ্ঞানীকেও টেনে নেয় তার গহীন অন্ধকারে।
আমাদের দেশেও বিজ্ঞান ও ক্ষমতার লড়াই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। দীর্ঘ ইতিহাসে না গিয়ে আমরা যদি সাম্প্রতিক ভারতের ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে দেখব যে ভারতের সংবিধান সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র সংবিধান যা জনমানসে বৈজ্ঞানিক মানসিকতা (scientific temper) তৈরি করার কথা বলে, যার দায়িত্ব নাগরিক ও রাষ্ট্র উভয়েরই। কিন্তু সংবিধান মেনে চলা বর্তমান সরকারের কর্তব্য বলে মোদী-শাহ ও বিজেপি মনে করে না। অতএব প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে লাগাতার চলে অপবিজ্ঞানের আস্ফালন। তাই গণেশের মাথায় হাতির মুণ্ডু প্রধানমন্ত্রীর মতে বিশ্বের প্রথম প্লাস্টিক সার্জারি, কর্ণ হলেন প্রথম টেস্টটিউব বেবি। আবার গরুর মুত্রে সোনা আছে বলে প্রচার করেন রাজ্যের বিজেপি সভাপতি, গো-মুত্রের উপযোগিতা নিয়ে গবেষণার নিদান দেওয়া হয়, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের টিভি সম্প্রচার আবিষ্কার করেন সঞ্জয়ের ভাষ্যে।
অনেকে হয়ত ভাবছিলেন যে এই উদাহরণগুলি নিয়ে কিঞ্চিৎ মজা করা যেতে পারে কিন্তু এই বিষয়গুলিকে নিয়ে গভীর ভাবনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারা ভুল ভাবছিলেন দুটি কারণে। প্রথমত, দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন অবৈজ্ঞানিক মতের প্রচার করেন তখন সংবিধান বর্ণিত বৈজ্ঞানিক মানসিকতার ধারণাটি হোঁচট খায়। এবং দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানকে নেপথ্যে পাঠিয়ে যদি চালিকাশক্তিতে উঠে আসে অবিজ্ঞান এবং ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ তবে তা প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
অবাক হবেন না। 'নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের প্রধান চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্র আইসিএমআর-এর বিজ্ঞানীরা দেশের বিভিন্ন শহরে সমীক্ষা করে দেখেন যে, করোনার প্রকোপ যথেষ্ট রয়েছে। জুলাই ২০২০-তে তারা দেখেন যে দিল্লি মুম্বাইয়ের মত শহরে প্রচুর মানুষ করোনা সংক্রমিত। কিন্তু সেই গবেষণাপত্র এবং তথ্য চেপে দেওয়া হয়, কারণ মোদীর সরকার ততদিনে বলতে শুরু করে দিয়েছে যে করোনার উপর তারা বিজয়ী হয়েছে। দেশের মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে আইসিএমআর-এর ডিরেক্টর এবং দেশের সরকার। একটি ভ্রান্ত গাণিতিক মডেলের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যে দেশে ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালের মধ্যে করোনা চলে যাবে। এই তথ্যকে বারবার লোকসমক্ষে নিয়ে আসে দেশের সংবাদমাধ্যম এবং দেশের মন্ত্রীরা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানুয়ারি ২০২১ সালে ঘোষণা করে দেন যে, করোনা মহামারির বিরুদ্ধে ভারত যুদ্ধের অন্তিম পর্যায়ে রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানো হয় ভিড়ে ঠাসা আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামে। কুম্ভ মেলা আয়োজন করার অনুমতি দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গে আট দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তারপরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা। প্রবল গতি ও তীব্রতায় দেশের মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। অথচ, আমাদের বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই বলছিলেন যে করোনা ভাইরাস লকডাউনের ফলে কিছুটা পিছু হটলেও তার বিপদ প্রবলভাবে দেশের মানুষের সামনে রয়েছে। কিন্তু করোনা রয়েছে বললে মোদীর পশ্চিমবঙ্গ জয় করা অথবা ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। অতএব, বিজ্ঞান কী বলছে তাতে কী বা যায় আসে! ‘গো করোনা, গো’ স্লোগান তো দেওয়াই হয়েছে। তাহলে আর চিন্তা কী! অতএব, বিজ্ঞানীদের যাবতীয় সাবধানবাণীকে উপেক্ষা করে মোদী ঘোষণা করে দিলেন ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের মঞ্চে যে করোনার বিরুদ্ধে ভারতের বিজয় হয়েছে। সরকারের দম্ভ, অবিমৃশ্যকারিতা, অবৈজ্ঞানিক মনোভাবের বলি হলেন দেশের লাখো মানুষ।
আসলে আরএসএস-এর মতন একটি দক্ষিণপন্থী, অবৈজ্ঞানিক শক্তি যখন দেশের মসনদে বসে তখন বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের কথার কোনো দাম থাকে না। মঙ্গলযান বা চন্দ্রযান আকাশে উড়লে দেখতে ভালো লাগে, মনে হয় যেন দেশের গর্ব বাড়ছে, মোদীর ব্যক্তিত্বের আরো বন্দনা করা যায়, তাই এই প্রকল্পগুলি রাজনীতির বাজারে চলে। কিন্তু দেশের গরীব মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে যেই করোনা অতিমারি তা স্বীকার করে নিলে আবার সরকারের ইজ্জত থাকে না। এহেন ভ্রান্ত ধারণার সামনে বিজ্ঞানীরা আর কীই বা করতে পারেন। তাঁরা তাঁদের তথ্য সরকারের সামনে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সরকারের ধামাধরা অধিকর্তারা সেই তথ্য প্রকাশ্যে আনতে অস্বীকার করেছেন। ফল ভুগতে হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষকে।
হিন্দুত্ববাদী শক্তি দেশের প্রাচীন বিজ্ঞান নিয়ে নানা মিথ্যা প্রচার করে নিজেদের ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে বলিয়ান করতে চায়। আসলে দেশের প্রাচীন বিজ্ঞান একসময় সত্যিই অগ্রগতি করেছিল। আর্যভট্ট, ভাস্করাচার্যের মত বিজ্ঞানী বহুযুগ আগে নানান চমকপ্রদ আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজও অবাক করে। কিন্তু প্রাচীন বিজ্ঞানীরা তাঁদের আবিষ্কারগুলি করেছিলেন বৈজ্ঞানিক মানসিকতার মাধ্যমে ও দীর্ঘ অধ্যবসায় দিয়ে। আজগুবি মিথ্যার পথ ধরে ভারতে প্রাচীন বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়নি।
করোনাকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞানকে বলি দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করার মাধ্যমে মোদী সরকার প্রমাণ করেছে যে তাদের কাছে প্রাচীন বা আধুনিক কোনো বিজ্ঞানেরই কোনো দাম নেই। যেই বিজ্ঞান মোদীর গুণগান করতে সাহায্য করবে তাহাই প্রকৃত বিজ্ঞান বাকি যে কোনো সত্য পরিত্যাজ্য। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সরকারের অপদার্থতা এবং বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা তার অকাট্য প্রমাণ।