আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮
সমসাময়িক
কাবুলের নতুন সরকার
কাতার-এর রাজধানী দোহায় ২০২০-র ২৯শে ফেব্রুয়ারি সম্পাদিত যৌথ চুক্তি অনুযায়ী গত ১৫ই অগস্ট তালিবান আফগানিস্তানের শাসন ব্যবস্থার দায়িত্ব পেয়েছে। দীর্ঘ তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বিস্তর টালবাহানার পরে শেষ পর্যন্ত গত ৭ই সেপ্টেম্বর নতুন সরকারের কার্যনির্বাহী মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তেত্রিশ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়েছে তালিবানের অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আলাপ আলোচনার পর পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়, অনেকের মতে সরাসরি হস্তক্ষেপে, গঠিত মন্ত্রিসভায় কট্টরপন্থী মৌলবাদী সংগঠন 'রেহবারি সূরা'-র নেতা অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় পাশতুন গোষ্ঠীর প্রাধান্য বজায় আছে। তেত্রিশ জন মন্ত্রীর মধ্যে তিরিশ জন পাশতুন। অথচ জনসংখ্যার ৪২% পাশতুন। বাদবাকিদের মধ্যে ২৭% তাজিক, ৯% হাজারা, ৯% উজবেক, ৪% আইমাক, ৩% তুর্কমেন, ২% বেলুচ এবং ৪% অন্যান্য। অর্থাৎ মন্ত্রিসভায় দেশের মোট জনসংখ্যার অধিকাংশর প্রতিনিধিত্ব অনুপস্থিত। প্রত্যাশা মতোই অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় কোনো মহিলা নেই।
আফগানিস্তানের নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোল্লা মহম্মদ হাসান আখুন্দ। দোহায় তালিবানের রাজনৈতিক দফতরের চেয়ারম্যান মোল্লা আব্দুল গনি বরাদরকে কার্যনির্বাহী উপ-প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী হাক্কানি নেটওয়ার্কে রেশারেশির ফলে বরাদর নিহত।
২০১৬ সালের মে মাস থেকে তালিবানের 'সুপ্রিম লিডার' হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। তালিবান ঘোষিত তথাকথিত 'ইসলামিক এমিরেট অফ্ আফগানিস্তান'-এর তিনি শীর্ষ নেতা। উনিশশো আশির দশকে তিনি আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন। তবে সামরিক কমান্ডারের তুলনায় একজন ধর্মীয় নেতা হিসাবেই তার পরিচিতি বেশি। নব্বইয়ের দশকে শরিয়া আদালতের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন আখুন্দজাদা।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার তালিবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানে কট্টর মৌলবাদী ধর্মীয় আইনকানুন চালু হয়। সেই সময় হত্যাকারী ও ব্যভিচারীদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত এবং চোরদের হাত কেটে ফেলা হত। তখনকার তালিবান নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের (তিনি ২০১৩-য় মারা গেলেও ২০১৫-য় তালিবান মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করে) নেতৃত্বে তালিবান টেলিভিশন, সংগীত, চলচ্চিত্র নারীদের মেকআপ বা রূপসজ্জার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১০ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়াও তারা নিষিদ্ধ করেছিল।
হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার বয়স আনুমানিক ৬০ বছর। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি আফগানিস্তানেই কাটিয়েছেন। তথাকথিত 'কোয়েটা সূরা'-র সঙ্গে বরাবরই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে এসেছেন তিনি। পাকিস্তানের কোয়েটা-য় বসবাসকারী আফগান তালিবান সদস্যরা কোয়েটা সূরা নামে পরিচিত। তালিবানের সুপ্রিম লিডার হিসাবে হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা রাজনৈতিক, সামরিক এবং ধর্মীয় সব বিষয়ের শীর্ষ নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্য তালিব নেতাদের তুলনায় কম পরিচিত মুখ হলেও আখুন্দের নাম রয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের জঙ্গি-তালিকায়। সরকারের প্রধান হিসেবে আখুন্দের নাম প্রস্তাব করেছিলেন তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লা আখুন্দজাদা। সংবাদমাধ্যমে এমনটাই প্রচারিত হয়েছে। হিবাতুল্লাকে ইরানের কায়দায় দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার অর্থাৎ আমীর পদে বসিয়ে তাঁর অধীনে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তালিবান সরকার গড়বে বলে শোনা যাচ্ছিল। তবে আমিরের ভূমিকা এখনও চূড়ান্ত ভাবে ঘোষিত হয়নি। হিবাতুল্লা আখুন্দজাদা অবিশ্যি এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, নতুন মন্ত্রীরা দেশে শরিয়া আইন এবং ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে কঠোর পরিশ্রম করবেন। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, শ্রীবৃদ্ধি এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করবেন তাঁরা। কেউ যেন দেশ ছাড়ার চেষ্টা না করেন। ইসলামি আমিরশাহীতে কাউকে নিয়েই কোনও সমস্যা নেই।
গত ২০ বছর ধরে তালিবানের নীতি-নির্ধারক পরিষদ ‘রেহবারি শুরা’-র প্রধানের পদে রয়েছেন নতুন কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রী আখুন্দ। তালিবান প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের সহযোগী এবং হিবাতুল্লার ঘনিষ্ঠ বলেই তিনি পরিচিত। কান্দাহারের এই নেতা তালিবানের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সংগঠনে রয়েছেন। তিনি সবচেয়ে বেশিদিন ধরে তালিবানের নেতাদের কাউন্সিল বা রেহবারি সূরা-র প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তালিবানের আগের জমানায় বিদেশমন্ত্রী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদেও ছিলেন তিনি। তবে সেই সময় কাতার, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী ও পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। ওই সময়ে তালিবান সরকারের দায়িত্ব পালন করার কারণে তাঁর উপর রাষ্ট্রপুঞ্জের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
হক্কানি নেটওয়ার্কের প্রধান সিরাজুদ্দিন হক্কানি হয়েছেন কার্যনির্বাহী অভ্যন্তরীণ (স্বরাষ্ট্র) মন্ত্রী। পিতা জালালুদ্দিন হাক্কানির মৃত্যুর পর থেকেই তিনি হাক্কানি নেটওয়ার্কের নতুন নেতা। আফগানিস্তানে আফগান বাহিনী এবং আইস্যাফের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর যৌথ বাহিনী) ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ কিছু হামলার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। অনুমান করা হয়, তাঁর বয়স ৪৫ বছর।
হাক্কানি নেটওয়ার্ক হচ্ছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ভীতিকর জঙ্গি গোষ্ঠী। অনেকে মনে করেন, আফগানিস্তানে আইএস (ইসলামিক স্টেট) গোষ্ঠীর চেয়ে হাক্কানি নেটওয়ার্ক অনেক বেশি প্রভাবশালী। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় থাকা এই গ্রুপটি আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে তালিবানের আর্থিক ও সামরিক সম্পদের তত্ত্বাবধান করে থাকে।
দোহার শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের আগে 'নিউইয়র্ক পোস্ট'-এ ছাপা একটি প্রতিবেদনে সিরাজুদ্দিন হাক্কানি লিখেছিলেন, ''চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিদিন অমূল্য আফগান জীবন ঝরে যাচ্ছে। প্রত্যেকে এমন কাউকে হারিয়েছে যাকে তারা ভালোবাসত। যুদ্ধে সবাই ক্লান্ত। আমি উপলব্ধি করতে পারছি, পরস্পরকে হত্যা বা আহত করা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।''
পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে ঘাঁটি গেড়ে থাকা সিরাজুদ্দিনের সঙ্গে তালিবান এবং আল কায়েদার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় থাকা সিরাজুদ্দিন হক্কানিকে ধরতে আমেরিকা ৫০ লক্ষ ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। কাবুল দখলের পরে তালিবান বলেছিল, আমেরিকা-সহ সব দেশের সঙ্গেই তারা সুসম্পর্ক চায়। কিন্তু হক্কানি মন্ত্রী হওয়ায় সেই ঘোষণার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। কারণ, দোহা চুক্তি অনুযায়ী তালিবানকে জঙ্গি-সংস্রব পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
কার্যনির্বাহী প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন হিবাতুল্লার শিষ্য এবং মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা মহম্মদ ইয়াকুব। ত্রিশোর্ধ্ব এই যুবনেতা বর্তমানে দলের সামরিক শাখার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সালে তখনকার নেতা আখতার মানসুর নিহত হওয়ার পর তালিবানের একটি অংশ ইয়াকুবকে নিজেদের সুপ্রিম লিডার হিসাবে মনোনীত করতে চেয়েছিল। কম বয়স এবং অনভিজ্ঞতার জন্য সেই প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।
কার্যনির্বাহী বিদেশমন্ত্রী হয়েছেন আমির খান মুত্তাকি, উপ-বিদেশমন্ত্রী শের মহম্মদ আব্বাস স্তানিকজ়াই, কার্যনির্বাহী অর্থমন্ত্রী হেদায়েতুল্লা বদ্রি। অর্থাৎ তালিবানের অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় ‘জঙ্গি’ তকমা পাওয়া একাধিক শীর্ষ নেতা স্থান পেয়েছেন। সমস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব রেখে ‘গ্রহণযোগ্য’ একটি সরকার যে তাদের কাছে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, সেই বার্তা বিভিন্ন দেশের তরফে তালিবানকে দেওয়া হয়েছিল। তালিবানও জানিয়েছিল, গ্রহণযোগ্য সরকার গড়ার লক্ষ্যে এগোনোর জন্যই দেরি হচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারে অন্তত শীর্ষ পদগুলিতে অ-তালিব কোনও মুখ নেই। বরং হাক্কানি নেটওয়ার্কের রমরমা।
বরাদরের ‘পদাবনতি’ নিয়েও চলছে চর্চা। মনে করা হচ্ছিল, তাঁর নেতৃত্বেই সরকার গড়বে তালিবান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পেলেন উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ। তাঁর সঙ্গে আব্দুল সালাম হানাফিকেও উপ-প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরেও নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব তালিবানকে ভোগাচ্ছিল বলে খবর প্রচারিত হয়। একসময় নাকি বরাদরের গোষ্ঠী এবং হক্কানি নেটওয়ার্কের মধ্যে সংঘর্ষও বাধে। বরাদর তাতে জখম হন। এই পরিস্থিতিতে নেপথ্য ভূমিকা ছেড়ে মঞ্চে নেমে পড়ে আইএসআই। পাক গুপ্তচর সংস্থার প্রধান ফৈজ হামিদ ৩রা সেপ্টেম্বর আচমকা কাবুলে এসে বরাদর-সহ একাধিক তালিব নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। আইএসআইয়ের মধ্যস্থতাতেই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন নিয়ে জট কাটে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হয় আখুন্দকে। তালিবান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের এই নয়া সরকার একান্তই ‘কার্যনির্বাহী’। স্থায়ী সরকার কবে গঠন হবে, তালিবানের প্রধান মুখপাত্র তথা কার্যনির্বাহী উপ-তথ্যমন্ত্রী জবিউল্লা মুজাহিদের বক্তব্যে তা স্পষ্ট নয়। নির্বাচনেরও কোনও ইঙ্গিত নেই। তালিবান জানিয়েছে, নতুন সরকারের সূচনা উপলক্ষে অনুষ্ঠান পরে কোনও সময়ে আয়োজিত হবে। চিন এবং রাশিয়া ইতিমধ্যেই বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের তালিবান নিয়ে তেমন কোনো স্পর্শকাতরতা নেই। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণার পরে জবিউল্লা বলেছেন যে, সরকারের স্বীকৃতি পাওয়াটা আফগানিস্তানের অধিকার। সব দেশকে আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে। তবে সব দেশই পরিস্থিতির উপরে সতর্ক নজর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বরাদার তালিবানের একজন সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ২০০১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর অভিযানে তালিবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি তালিবানের একজন প্রধান ব্যক্তি বলে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। ২০১০-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের একটি যৌথ অভিযানে করাচি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী আট বছর ধরে তিনি কারাগারে বন্দী থাকেন। দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। পাকিস্তান সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি বরাদারের মুক্তির ব্যবস্থা করেন। তালিবান নেতা হিসাবে ২০২০-তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বরাদার। তালিবানের সঙ্গে এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট টেলিফোনে কথা বলার পর আফগানিস্তান বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হন যে, তালিবান, পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে।
কাতারের রাজধানী দোহায় চালু করা তালিবানের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান হিসাবে ২০১৯-র জানুয়ারি থেকে বরাদার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০২০-র ২৯শে ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের দোহা চুক্তিতে তালিবানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বরাদার। সম্প্রতি (২৯শে জুলাই, ২০২১) তালিবানের প্রতিনিধি হিসেবে চিন সফরে যান বরাদার। চিনের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বরাদারের আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে বলে চিনের সরকারি সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়।
তালিবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসার পর ধারণা করা হয়েছিল তিনি নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে দেখা গেল তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।
আফগানিস্তানে সরকার গড়লেও তালিবানের এই শীর্ষ নেতাকে গত এক মাসে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বরাদর সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন বলে একটি খবর ছড়িয়েছিল। তাঁর মৃত্যু নিয়ে যে গুজব ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন বলে তালিবান দাবি করেছে। যদিও বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী হাক্কানি নেটওয়ার্কের সঙ্গে রেশারেশির ফলে বরাদর নিহত।
তবে গত রবিবার (১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১) যখন আফগানিস্তানের নতুন সরকারের প্রতিনিধিরা কাতারের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে কাবুলে দেখা করেন, সেখানেও বরাদর উপস্থিত ছিলেন না। এমন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তালিবানের যাবতীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া বরাদরের অনুপস্থিতি অনেকেরই নজরে পড়েছিল। বরাদরের মৃত্যু নিয়ে জল্পনাও তারপরই বেশি করে শুরু হয়।
কাবুলের চায়ে-খানা বা চায়ের দোকানের আড্ডার খ্যাতি বহুকাল ধরেই সুবিদিত। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা হলেও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের হাওয়া মোরগ হিসেবে কাবুলের চায়ে-খানার গুজব বা সংবাদ দেশের মানুষের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বরাদার সংক্রান্ত গুজব অথবা সংবাদ এখন নাকি কাবুলের চায়ে-খানায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। কাজেই বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
আফগানিস্তানের নতুন সরকারের গতিবিধি আন্দাজ করতে হলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তালিবান, পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বরাদরের মুক্তি, দোহা চুক্তি, বিপুল অস্ত্রসম্ভার ফেলে রেখে মার্কিন সেনাবাহিনীর দেশে ফিরে যাওয়া, তালিবানের ক্ষমতায়ন এবং সরকার গঠনে পাকিস্তানের অতি সক্রিয় ভূমিকা এই ধারণাকে সম্পৃক্ত করতে সাহায্য করছে। ভারতীয় উপমহাদেশের শান্তির পক্ষে এমন অপ্রত্যক্ষ জোট নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়।