আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮
সম্পাদকীয়
অসাংবিধানিক, সীমাহীন ঔদ্ধত্য
অতি সম্প্রতি ভারতবর্ষের রাজনৈতিক বাতাবরণে একটি আপাত কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপুর্ণ একটি বিতর্ক গড়ে উঠেছে ‘পেগাসেস’ নামক একটি নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার বা বলা ভালো অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে। আপাতভাবে এই সংক্রান্ত খবরাখবর বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রগুলির ভেতরের পাতায় চলে গেলেও বিতর্কটি প্রাসঙ্গিক ও এদেশের সমাজে আলোচনার দাবি রাখে। ১৮ই জুলাই, ২০২১ ‘দি ওয়্যার’ নামক সংবাদসংস্থা প্রথম একটি তালিকা প্রকাশ করে যাতে দেখা যায় এদেশের প্রায় ৩০ জন সাংবাদিকসহ, রাজনীতিবিদ, আমলা, আইনজীবী ও সামাজিককর্মী সহ প্রায় ১৬১ জনের নামের তালিকা এই 'পেগাসেস' নামক প্রযুক্তির সম্ভাব্য নজরদারীর তালিকায় রয়েছে। এদের ভেতর অন্তত জনা দশেকের ওপর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে নজরদারী করাও হয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ফরেনসিক রিপোর্টের থেকে তার প্রমাণ মিলেছে। গ্রিক পুরাণের পক্ষীরাজের নাম ধার করে যে প্রযুক্তিটি তৈরি করা হয়েছে তার ক্ষমতা বড়ই মারাত্মক। এটি এমন একটি সফটওয়্যার যার সাহায্যে যে কোনো ধরনের মোবাইল ফোনের ভেতর একটি নজরদারী চালানোর প্রযুক্তি, ফোনের মালিকের অজান্তেই ভরে দেওয়া সম্ভব এবং ফোনের ব্যবহারকারী কোনওভাবেই বুঝতে পারবেন না যে তাঁর হাতের ফোনে এমন একটি গুপ্তচরকে ভরে দেয়া হয়েছে। এরপর ঠাণ্ডা ঘরে বসে সেই ব্যক্তির যে কোনো রকমের ফোনের বাক্যালাপ, বার্তাবিনিময় এমনকি তিনি কোন ধরনের খবর দেখছেন, ইন্টারনেটে কি দেখছেন সমস্ত কিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখা সম্ভব। অর্থাৎ এককথায় একজন মানুষের ব্যক্তি জীবনটি আর ব্যক্তিগত নয়। প্রযুক্তির কৃপায় তা আমদরবারে হাট করে খুলে দেওয়া সম্ভব। প্রতিটি ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সরকারি মহাফেজখানার তথ্যে পরিণত করা সম্ভব। এই 'পেগাসেস' নামক প্রযুক্তি একজন ব্যক্তি মানুষকে সমাজ ও তার দন্ডমুন্ডের কর্তাদের সামনে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম যা আমজনতার কল্পনারও বাইরে।
এই 'পেগাসেস' নামক প্রযুক্তি বা সফটওয়্যার তৈরি করেছে ইজরায়েলের সাইবার আর্ম সংস্থা এনএসও। এই সংস্থা দাবি করে থাকে যে এরা এই নজরদারী প্রযুক্তি কেবলমাত্র বিভিন্ন দেশের সরকারকেই বিক্রি করে থাকে। ইতিমধ্যেই ইজরায়েলে এই সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে যে তারা বেআইনিভাবে সরকারের বাইরে অন্য কাউকে এই প্রযুক্তি বিক্রি করেছে কিনা।
কিন্তু ভারতবর্ষে এই বিতর্ক দানা বেঁধেছে কারণ এদেশের ছাপান্ন ইঞ্চির বাহাদুর সরকার একথা স্পষ্ট করে বলে উঠতে পারছেন না যে তাঁরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারোর ওপর নজরদারী চালিয়েছেন কিনা। তাঁরা হ্যাঁও বলছেন না, আবার নাটিও জোর গলায় বলে দিতে অক্ষম। লোকসভার বিগত বাদল অধিবেশনে বিরোধী দলগুলি বিস্তর চেষ্টা করেছেন এই প্রশ্নটিকে সভায় উত্থাপন করার এবং এ বিষয়ে কেন্দ্রের সরকারের প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীর জবাব পাওয়ার। কিন্তু যথারীতি এবিষয়ে কোন ‘মন-কি-বাত’ শোনা যায়নি। এমনকি গোটা সংসদ অধিবেশন জুড়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বা অন্য কোনো দপ্তরের থেকেও কোনো বিবৃতি এ বিষয়ে সরকার জারি করেনি। এই একটিমাত্র বিষয়ে গোটা সরকারি প্রচারযন্ত্রটি আজ অবিশ্বাস্য রকমের মৌনব্রত অবলম্বন করে আছে।
এ বিষয়ে বিরোধী দলগুলিও কোনো ঐক্যমত্য অবস্থান নিতে পারেননি, এমনকি দেশের নাগরিক সমাজে বিতর্কটিকে যথাযথ গুরুত্বসহ হাজির করতে পারেননি। আপাতদৃষ্টিতে এই নজরদারির বিষয়টি দেশের অধিকাংশ মেহনতি জনতার দৈনন্দিন জীবন সংগ্রামের সাথে সরাসরি যুক্ত না হলেও, মেহনতির অধিকারের লড়াইকে যে আগামীতে যথেষ্ট প্রভাবিত করবে এ সত্যটি সবার আগে এঁদের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে।
এই প্রযুক্তি এতই শক্তিশালী যে সরকারের হাতে এমন এক অস্ত্র এটি তুলে দিতে পারে যার সাহায্যে যে কোনো গণআন্দোলনকে শুরুতেই ভেঙ্গে দেওয়া সম্ভব। এই প্রযুক্তি সরকারকে ক্ষমতা দেয় সীমাহীনভাবে মানুষের ব্যক্তি পরিসরে ঢুকে পড়ার। ক্ষমতা দেয় মুহূর্তে কোনো মানুষকে জনসমক্ষে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক মানুষ হিসাবে তুলে ধরার। আর তারপর সমস্ত সরকারি ক্ষমতা নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার। বিশেষত নজরদারীর সম্ভাব্য তালিকায় যখন একাধিক সমাজকর্মীর নাম পাওয়া যায় তখন এই সম্ভাবনাকে অমূলক হিসাবে উপেক্ষা করা যায় না।
কিন্তু এদেশের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি সেই বিপদকে অনুধাবন করতে পারছেন না। তারা বিষয়টিকে নিছক কলতলার ঝগড়াতে পরিণত করলেন এবং কিছু চটকদার শব্দ বানিয়ে বিতর্কটিকে আমজনতার আগ্রহের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেললেন। এমনকি এরাজ্যের মাননীয়া, যিনি নিজেকে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে তুলে ধরেন তিনিও এ বিষয়ে ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা একটি রাজনীতি চালিয়ে গেলেন গোটা অধিবেশন জুড়ে। পাড়ার মাস্তান মার্কা গা জোয়ারি রাজনীতি যে এই কেন্দ্রের সরকারকে আদৌ বিচলিত করে না তার প্রতিফলন সরকারের প্রতিটি আচরণে প্রকাশ পেয়েছে এই পেগাসেস কাণ্ডে। সরকারপক্ষ তার অসীম ঔদ্ধত্য নিয়ে এমন গুরুতর বিষয় একটি দিনের জন্যও সংসদের ভেতরে জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন অনুভব করেনি।
এমতাবস্থায় গোটা বিতর্কটি হাজির হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের দরজায়। বিগত ৫ই অগাস্ট রুপেশ কুমার সিং ও ইপ্সা সতাক্ষি পৃথকভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেন যে সুপ্রিম কোর্ট এই পেগাসেস জাতীয় সফটওয়্যারের ব্যবহার অসাংবিধানিক ঘোষণা করুক এবং কেন্দ্র সরকারকে আদেশ দিক এই সম্বন্ধিত সমস্ত কাগজপত্র প্রকাশ করতে। ওই দিনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র সরকারকে এই মামলায় যুক্ত করে এবং এই বিষয় সম্বন্ধিত কাগজ আদালতের কাছে জমা দিতে বলে। তারপর থেকে আজ অবধি কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে কোনো হলফনামা আদালতে জমা পড়েনি।
বিগত ১৩ই সেপ্টেম্বর শুনানিতে কেন্দ্রের তরফ থেকে সুপ্রিম কোর্টে জানানো হয় যে এই বিষয়ে কোনো তথ্যই তারা এমনকি আদালতের কাছেও প্রকাশ করবে না। সরকার যুক্তি দিচ্ছেন যে এটি দেশের নিরাপত্তার সাথে যুক্ত। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এই প্রেক্ষিতে বলেছেন যে তাঁরা তাঁদের চূড়ান্ত রায় কয়েকদিন স্থগিত রাখছেন। সরকার যদি এরপরেও এই বিষয়ে আদালতে কিছু জানাতে অস্বীকার করেন তাহলে তাঁরা সেইমতো ব্যবস্থা নেবেন। ইতিমধ্যেই এই দাবি উঠেছে যে প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কমিটি হোক যারা এই বিষয়টি খতিয়ে দেখবে যে সরকার এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারী চালিয়েছে কিনা।
আজ সুপ্রিম কোর্টের ওপর তাই এই দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে যে তাঁরা সরকারের এই গা-জোয়ারির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের স্বাধীন চরিত্র বজায় রাখার। সুপ্রিম কোর্ট ব্যক্তিগত পরিসরকে মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত পরিসরের সমস্ত তথ্য সরকার বিদেশী সফ্টওয়ারের সাহায্যে বেআইনি নজরদারি চালিয়ে হস্তগত করবে আর জাতীয় নিরাপত্তার জুজু দেখাবে সুপ্রিম কোর্ট তথা জনতাকে, এই অন্যায় সুপ্রিম কোর্ট আশা করি মেনে নেবে না।
তবু, না আঁচালে বিশ্বাস নেই। কারণ ইতোমধ্যেই আমরা দেখেছি যে বাবরি মসজিদ, ৩৭০ ধারা বিলোপ করা নিয়ে দেশের প্রধান ন্যায়ালয়ের ভূমিকা, যেখানে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারেননি।এনআরসি রায়, যা আসামে ১৯ লক্ষ মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে সেই রায়ও সুপ্রিম কোর্টই দিয়েছিল। কয়েক'শ মামলা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলেও তার শুনানি প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্ট শুরু করেনি। অন্যদিকে, প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসর নেওয়ার পরে বিজেপি-র দাক্ষিণ্যে এখন রাজ্যসভার সাংসদ। আরেক প্রাক্তন বিচারপতিকে সম্প্রতি আরএসএস-এর সদর দপ্তরে দেখা গেছে।
এই ঘটনাগুলির ফলে সাধারণ জনমানসে সুপ্রিম কোর্টের ছবি যে খুব উজ্জ্বল হয়নি তা বলা বাহুল্য। মানুষের ধারণা তৈরি হয়েছে সরকার যা বলে সুপ্রিম কোর্টও তাই করে। আপাতত দেশের সরকার সুপ্রিম কোর্ট বলার পরেও পেগাসাস কাণ্ডে হলফনামা দাখিল করতে অস্বীকার করছে। মোদী সরকার এই অবস্থান নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও দেশের বিচারব্যবস্থার সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে যে তারা প্রধান বিচারপতির অনুরোধকেও গ্রাহ্য করে না। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের উপর বেআইনি নজরদারি চালানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবে নাকি, সরকারের গা-জোয়ারির সামনে সরকারের একতরফা ঔদ্ধত্য মেনে নেবে, এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। আপাতত এই কথা বলা যায় যে এই প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করবে সুপ্রিম কোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভারতের সাংবিধানিক অধিকারের বিশুদ্ধতা। সুপ্রিম কোর্ট যদি সরকারের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে তাকে উচিত শিক্ষা না দেয়, তবে দেশের সংবিধান বর্ণিত সাংবিধানিক অধিকারগুলি শুধু বইয়ে থাকবে, শাসন ব্যবস্থায় নয়।