আরেক রকম ● নবম বর্ষ অষ্টাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪২৮
সম্পাদকীয়
ত্রিপুরাঃ আক্রমণ ও প্রতিরোধ
ত্রিপুরা আপাতত জ্বলছে। কয়েকদিন আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র ধনপুরে যাওয়ার পথে তাঁর কনভয়ে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে। কনভয়ের দু'একটি গাড়িতে হামলার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিজেপি লাঠি, বাঁশ নিয়ে হামলা করে গাড়িগুলির উপর। ঘটনার সময় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে বলেও অভিযোগ। এসব দেখে মানিক সরকার নিজে গাড়ি থেকে নেমে প্রতিরোধের ডাক দেন। বিজেপির দুষ্কৃতীদের রুখতে পালটা ঝাঁপিয়ে পড়েন সিপিআই(এম) কর্মীরা। উত্তেজিত জনতা রীতিমতো তাড়া করে দুষ্কৃতীদের। কয়েকটি বাইক ভাঙা হয় যাতে করে দুষ্কৃতীরা এসেছিল। বিপদ বুঝে পালায় বিজেপির গুণ্ডারা। এরপর বাম কর্মী সমর্থক নেতৃত্বের বিশাল মিছিল মানিক সরকারকে সঙ্গে নিয়ে ধনপুরের দিকে এগিয়ে যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে মিছিল আটকানোর চেষ্টা করলেও সেই বাধা অমান্য করে মানিক সরকারের নেতৃত্বে মিছিল এগিয়ে নিয়ে যান দলীয় কর্মীরা। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হিংস্র আক্রোশে পরদিন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজেপি। সারা রাজ্য জুড়ে বাম কর্মীদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা, পার্টি অফিস ভাঙচুর, এমনকি রাজ্য অফিসেও আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয়েছে দলীয় মুখপত্র 'ডেইলী দেশের কথা' দপ্তরেও।
ফ্যাসিবাদ কী, যাঁরা জানতেন না, অথবা হয়ত ভ্রমের বশেই বাংলাতে তৃণমূলকে শায়েস্তা করতে বিজেপির উপর ভরসা রেখেছিলেন, তাঁরা পারলে ত্রিপুরার দিকে চোখ ফেরাবেন। বাম কর্মীদের উপর এই হামলা সম্ভবত পূর্বপরিকল্পিত, কিন্তু শুধু সেটুকুই নয়। এই যে একটার পর একটা পার্টি অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া, হামলা নামিয়ে আনা গ্রামে গ্রামে, এগুলো ফ্যাসিবাদ না হলে ফ্যাসিবাদ কাকে বলে আমাদের জানা নেই। একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, বাংলাতেও তৃণমূল আলাদা কিছুই করেনি। বিশেষত তরুণ বাম কর্মী সুদীপ্ত গুপ্তকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করার পর তার প্রতিক্রিয়াতে যখন দিল্লিতে অমিত মিত্রর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়েছিল বামপন্থীরা, সেটাকে অজুহাত করে কয়েক'শ পার্টি অফিস ভাঙা হয়েছিল এই বাংলাতে, ঘরছাড়া হয়েছিলেন বহু সমর্থক ও কর্মী। এইরকম অজুহাত দেখিয়েই তখন এবং এখন, দু'বারেই আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছিল বামেদের উপর, যা দুটি পরিপূরক দিক স্পষ্ট করে দেয়। বিজেপি আদ্যন্ত ফ্যাসিবাদী দল এবং তাদের সম্বন্ধে কোনওরকম মোহ রাখা তো দূরের কথা, অন্য দলকে আটকাতে তাদের ব্যবহার করার কথা যারা ভাবে তাদের রাজনৈতিক চেতনার পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। এবং একই সঙ্গে, তৃণমূল কংগ্রেসও বিরোধীদের উপর আক্রমণে বিজেপির মতই সিদ্ধহস্ত। আজ যতই ত্রিপুরাতে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বা কুণাল ঘোষেদের মত আদ্যোপান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত ও সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদেরা নাটক করুন না কেন এবং নিজেদের যতই তাবড় ফ্যাসিবিরোধী রূপে প্রমাণ করতে ব্যাস্ত থাকুন না কেন, বিরোধীদের উপর দমনপীড়ন নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁদের চরিত্র যে কীরকম, তা ওই সুদীপ্ত গুপ্ত হত্যার পরে, অথবা ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়েই দেখা গিয়েছে। তাই বিজেপি-কে আটকাতে তৃণমূল বড় শক্তি এরকম ভাবনা যাঁদের আছে তাঁদের প্রজ্ঞার প্রতিও স্মিত করুণা বাদে আর কিছু দেবার নেই। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে তৃণমূল নিয়ে এই সম্পাদকীয়তে এতটা জায়গা কেন খরচ করা হচ্ছে। হচ্ছে, তার কারণ এই মুহূর্তে ত্রিপুরাতে তৃণমূল 'গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার' নামক একটি নাটকে নেমেছে, এবং বিজেপি-ও সমানভাবে সেই নাটকে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বাম কর্মীদের প্রতিরোধ ও তাদের উপর আক্রমণের গুরূত্বপূর্ণ ইস্যুগুলি। স্বাভাবিকভাবেই চলতি মিডিয়াও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বা কুণাল ঘোষকেই বেশি ফুটেজ দেবে। কিন্তু তৃণমূল যে ক্ষমতায় এলে বিজেপির মতই হিংস্র নরখাদক হয়ে উঠবে সেটার গ্রামবাংলা কিছুটা সাক্ষী। তাই বিজেপি-কে আটকাতে তৃণমূল অথবা তৃণমূলকে আটকাতে বিজেপি, কোনওটাই আসল বিকল্প হতে পারে না।
এবার আসা যাক সিপিআই(এম)-এর প্রসঙ্গে। প্রতিরোধ তারা করেছে। স্বাভাবিক, কারণ এতদিন ধরে বিজেপির আক্রমণের লক্ষ্যও তারাই। প্রতিরোধ এবং পালটা মার সবসময়ে অভিনন্দনযোগ্য ব্যাপার, এবং নিজেরা পাঁচ ঘা খেলেও সেই খবরের তুলনায় বেশি করে বলা উচিত শত্রুকে এক ঘা দেবার আখ্যান, কারণ মানুষ ওটাই চায়। মানুষ শহীদের কান্না ভালবাসে না, তারা চায় বীরের প্রত্যাঘাত। কমিউনিস্টরা সেটা করেছেন, তার জন্য তাঁদের অভিনন্দন। আশা করা যায় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এভাবেই পরবর্তী আঘাতগুলিও তাঁরা রুখে দেবেন। অবশ্য ত্রিপুরার পার্টি নির্বাচনে হেরে আন্দোলন বিমুখ হয়ে যায়নি কখনওই। মানিক সরকারের নেতৃত্বে তারা রাস্তায় থেকেছে বরাবর, এবং লাগাতার নানা ইস্যুতে আন্দোলন করে জনজীবন মুখরিত করে রেখেছে। টোকেন প্রতিবাদ নয়, সরকারী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা ঘরে বসে তীব্র ধিক্কার জানানো নয়, ভোটের আগে মিলিজুলি জোট গড়বার সুবিধাবাদ নয়, বাম আন্দোলনের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে রাস্তায়, মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের মধ্যে। বিজেপির মত একটা স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট দলকে রুখতে গেলে একমাত্র সংসদীয় কৌশলই যথেষ্ট নয়। তার জন্য দরকার সারা বছর ধরে অবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম, মানুষের মধ্যে মিশে থাকার ক্ষমতা ঠিক যেভাবে ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পিঁপড়ে। খবর এটা নয় যে বিজেপি আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। এটা খবর নয় কারণ বিজেপির কাছ থেকে তা প্রত্যাশিত এবং সমস্ত প্রচলিত সংবাদমাধ্যমও এটাই বড় করে দেখাবে যে কমিউনিস্টরা আক্রান্ত হচ্ছে। প্রকৃত খবর এটাই যে কমিউনিস্টরা প্রত্যাঘাত করেছিল। তাদের সম্মিলিত আক্রমণে তছনছ হয়ে গিয়েছিল দুষ্কৃতী বাহিনী। অন্তত হতোদ্যম হয়ে যাবার দিনগুলোতে, দিকে দিকে নির্বাচন ও অন্য ক্ষেত্রগুলোতে পর্যুদস্ত হবার কালে এই রকম খবরগুলোই বাম গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মানুষের কাছে প্রেরণা হয়ে থাকবে। তাই, আপাতত, নেতৃত্বের নাম মানিক সরকার, এবং লড়াইয়ের নাম ত্রিপুরা সিপিআই(এম)!