আরেক রকম ● অষ্টম বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১-১৫ অক্টোবর, ২০২০ ● ১৬-৩১ আশ্বিন, ১৪২৭
প্রবন্ধ
কৃষি পণ্য আইনঃ সরকারি দাবি ও বাস্তবতা
রাজীব সূত্রধর
যেই পত্রিকা অশোক মিত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে লেখার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। বিশেষ করে এমন একটি বিষয় নিয়ে কলম ধরেছি, যাকে বুঝতে হলে ওনার ক্ষুরধার ভাবনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে। কৃষি ও শিল্প পণ্যের আপেক্ষিক দাম বা Terms of Trade বিষয়ে ওনার তত্ত্বায়ন আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে যখন কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের সংকট এবং গ্রামের উদ্দেশ্যে গমন প্রমাণ করেছে যে কৃষিক্ষেত্র ত্যাগ করে শিল্প ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষ চলে গেছে (Lewisian Transformation), এই দাবি নিছক স্বপ্ন বৈ আর কিছু নয়। বিতর্কিত কৃষক সংক্রান্ত বিল রাজ্যসভায় পাশ হয়েছে, যার পর্যালোচনা করতে হলে শ্রীমিত্রের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির কাছে আমাদের পুনরায় শরনাপন্ন হতে হবে।
কোভিড-১৯ সংক্রান্ত লকডাউন কৃষিজাত খাদ্য পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলকে অবিন্যস্ত করেছে। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার কৃষিজাত পণ্য প্রস্তুত ও ব্যাবসা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ Farming Produce Trade and Commerce (Promotion and Facilitation) Ordinance 2020 (FPTCO, 2020 বলে আমরা উল্লেখ করব) জারি করে জুন মাসের ৩ তারিখ যাতে কৃষি বাজার সংক্রান্ত সংস্কারের বিষয় রাজ্য সরকারগুলি বাধা না দিতে পারে। সরকার দাবি করেছে এই সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকরা তাদের ফসল বেচার স্বাধীনতা পাবেন। এই অধ্যাদেশের সঙ্গেই সরকার আরেকটি অধ্যাদেশ জারি করে যার মাধ্যমে কৃষি পণ্য বাজার কমিটি বা APMC-র দায়রা বেঁধে দিয়েছে শুধুমাত্র সেই সমস্ত বাজারের পরিসরে। এই আইনের মাধ্যমে সরকার ফড়ে এবং সংগঠিত কর্পোরেট ক্রেতা, সুপারমার্কেট, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প ইত্যাদিদের অনুমোদন দিল সরাসরি কৃষকদের থেকে কৃষি পণ্য কেনার, প্রয়োজনমত চুক্তিচাষের মাধ্যমে। এই দুই অধ্যাদেশের পরিপূরক হিসেবে আরেকটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য আইনেও বদল আনা হয়েছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে চাল, ডাল, গম, পেঁয়াজ ইত্যাদি কৃষি পণ্যকে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য তালিকার বাইরে আনা হল, যার ফলে কৃষি পণ্যের ব্যবসায়িক চলাচল বৃদ্ধি পাবে। তিনটি অধ্যাদেশই সদ্য সমাপ্ত সংসদ অধিবেশনে আইনের মর্যাদা পেয়েছে। এই তিনটি আইনের মধ্যে সর্বাধিক বিতর্কিত FPTCO, 2020 যার মাধ্যমে Agricultural Produce Market Committee (APMC) বাজারকে পাশ কাটিয়ে কৃষক সরাসরি তাদের উৎপন্ন কৃষি পণ্য যেখানে খুশি, যার কাছে খুশি বিক্রি করতে পারবে। তাই বলা হচ্ছে যে এই আইনের মাধ্যমে কৃষকদের ফসল যেমন খুশি বেচার স্বাধীনতা দেওয়া হল। দেশের সংসদে পাশ হওয়া এই আইনগুলির প্রেক্ষিত বুঝতে হলে APMC আইনের ইতিহাসের দিকে আমাদের একবার তাকাতে হবে, যেই আইন ভারতের স্বাধীনতার আগে থেকে বলবত আছে।
মহাজন, জমিদার, ফড়েদের শোষণের হাত থেকে কৃষকদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে APMC আইন ১৯২৯ সালে বলবত করা হয়। চাষিদের বিপুল দেনা, গ্রামে তাদের দর কষাকষি করার ক্ষমতা না থাকার সুযোগ নিয়ে মহাজন, জমিদার ও ফড়েরা কৃষকদের ফসল অত্যন্ত কম দামে তাদের থেকে সংগ্রহ করত। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার APMC বাজারের বাইরে কৃষি পণ্য ক্রয়কে বেআইনি ঘোষণা করে। এই APMC বাজার APMC আইন দ্বারা পরিচালিত। দেশের স্বাধীনতার পরেও এই আইন বলবত ছিল এবং সবুজ বিপ্লবের সময় যখন সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (MSP) কৃষি পণ্য সরকার সংগ্রহ করত, তখন এই APMC বাজার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার ভূমিকা পালন করে। ১৯৯০ দশকের শুরুর বছরগুলি অবধি APMC বাজারের প্রতি সরকারের সমর্থন বজায় থাকে। সেই সময় পর্যন্ত এই বাজারগুলির বৃদ্ধি কৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিল। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে এই বাজারগুলির সংখ্যা ৩৫২৮ থেকে বেড়ে ৬২১৭ হয়। অর্থাৎ এই ১৫ বছরে APMC বাজারের সংখ্যা বৃদ্ধি হয় ৭৬%, যেখানে কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনের বৃদ্ধির হার এই একই সময়ে ছিল ৭৪%। কিন্তু ভারতে আর্থিক সংস্কার শুরু হওয়ার পরে কৃষি ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হয়। বর্তমানে কৃষি ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি-র ১ শতাংশেরও কম। অতএব, এই সময় APMC বাজারের বৃদ্ধির হার কমে হয় মাত্র ২২%, যেখানে আর্থিক সংস্কার শুরু হওয়ার পর প্রথম ১৭ বছরে কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনের বৃদ্ধির হার ছিল ৭০%। ভারতে বর্তমানে মোট APMC বাজারের সংখ্যা মাত্র ৭২০০, যেখানে জাতীয় কৃষি কমিশনের মতে এই সংখ্যা হওয়া উচিত ছিল ৪২০০০। এই যে ৭২০০ বাজার তা ভারতের সমস্ত রাজ্যে সমানভাবে বন্টিত নয়। যেমন অন্ধ্রপ্রদেশে দেখা যায় একটি APMC বাজার ১৪৬টি গ্রামের জন্য রয়েছে, সেখানে উত্তরপ্রদেশে ১৭টি গ্রামের জন্য একটি APMC বাজার রয়েছে (Mahapatra, 2018)। APMC বাজারগুলিতে পরিকাঠামোর গুণগত মান অপর্যাপ্ত। নিলামের জন্য নির্মিত প্লাটফর্ম, ঝাড়াই-বাছাই করা, পণ্যকে মজুত রাখা এবং শুকনো করার মতন পরিকাঠামোর অভাবের ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষি পণ্য নষ্ট হয়, একটি হিসেবের মতে যার পরিমাণ ২০০৯ সালে ছিল ৪৪০০০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাঙ্কের একটি গবেষণা দেখাচ্ছে যে, পরিকাঠামোর এই অভাবের ফলে ছোট চাষিরা বড় চাষিদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি পণ্যের দাম বিষয়ক তথ্য সবার কাছে সমানভাবে থাকে না। এই বিষয় APMC বাজারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে (Harris-White 1996)। ঋণের অপ্রতুলতা, অপর্যাপ্ত সম্পদের ফলে ছোট চাষিরা ফড়ে বা কমিশন এজেন্টদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই এজেন্টরা স্থানীয়ভাবে বিবিধ পরিষেবা প্রদান করে, যা সরকারি স্তরে উপলব্ধ নেই। এর ফলে কৃষকদের নিজ ফসল স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের ক্রেতার কাছে বিক্রি করার স্বাধীনতা লুন্ঠিত হয়।
আর্থিক সংস্কার শুরু হওয়ার পর থেকে কৃষি পণ্যের বিক্রয় এবং প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের ২৫ শতাংশ সংগঠিত পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করে, খাদ্য বিক্রয় ক্ষেত্রে যার পরিমাণ ১২ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য উঠে আসতে থাকে যে সংগঠিত পুঁজি, যেমন বৃহৎ প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানি এবং সুপারমার্কেটরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং নির্দিষ্ট মানের কৃষি পণ্য APMC বাজারগুলি থেকে সংগ্রহ করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে আরো বলা হয় যে সংগঠিত পুঁজিকে যদি APMC বাজারকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি কৃষকদের থেকে কৃষি পণ্য সংগ্রহ করতে দেওয়া হয় তাহলে ছোট চাষিরা ঋণ এবং সম্পদের যেই অপ্রতুলতার সমস্যায় ভোগেন তার সুরাহা হবে। এই আলোচনার ফলশ্রুতিতে ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার একটি মডেল APMC আইনের খসড়া হাজির করে। এই আইনের মধ্যে চাষিদের থেকে সরাসরি কৃষি পণ্য সংগ্রহ, চুক্তিচাষ এবং বেসরকারি পাইকারি বাজারের কথা বলা হয়েছিল। রাজ্যগুলিকে এই মডেল আইনের দিশাতেই নিজ আইন প্রণয়ন করতে বলা হয়। এই আইনের মধ্যে ক্রেতারা APMC বাজারগুলিকে পাশ কাটাতে পারলেও, তারা এই বাজারের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের থেকে লাইসেন্স পেতে হত এবং এই বাজারের ভেতরে যারা ব্যাবসা করেন, তাদের মতই বড় সংগঠিত পুঁজিকেও কর দিতে হত। কিন্তু ২০১০ দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত মাত্র ১০টি রাজ্য এই মর্মে আইন সংশোধন করে। ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় সরকার আরও একটি আইন আনে, যেখানে চুক্তিচাষ এবং বেসরকারি পাইকারি বাজারকে APMC বাজারের আওতার বাইরে নিয়ে আসা হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে APMC বাজার কর্তৃপক্ষগুলি এই বাজারের বাইরে বিকল্প প্রক্রিয়াকে উৎসাহ দান করতে চায় না, যার ফলে এই ব্যাবসায় APMC বাজারগুলির ভাগই কমে যাবে। কমিশন এজেন্টদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই আইন বলে ব্যাবসায়ীদের দোকান না থাকলেও কমিশন এজেন্টের মর্যাদা দেওয়া হবে। তবে এই আইনকে বলবত করার দায় রাজ্য সরকারের এবং অল্প সংখ্যক রাজ্যই কেন্দ্রের নির্দেশিত পথে আইন সংশোধন করে।
কোভিড-১৯ জনিত লকডাউনের মধ্যে, যেখানে কৃষি ও খাদ্য পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল অবিন্যস্ত হয়ে পড়েছে, সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার কৃষি পণ্য নিয়ন্ত্রণ, মজুত এবং তার চলাচল সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করে। এর মধ্যে সর্বাধিক বিতর্কিত FPTCO 2020 প্রস্তাব দেয় যে APMC বাজারের নিয়মাবলী শুধুমাত্র বাজারের পরিধির মধ্যেই বলবত থাকবে। এর ফলে নাকি চাষিরা তাদের ফসল যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে যেকোনো জায়গায় বিক্রি করার স্বাধীনতা পাবে।তদুপরি, এই আইনে বলা হয় যে যারা APMC বাজারের বাইরে কৃষি পণ্য কিনবেন তাদের কোনো কর দিতে হবে না, কিন্তু APMC বাজারের মধ্যে কিনলে তাদের কর দিতে হবে। এহেন দ্বিমুখী কর সংগ্রহের নীতি বাজারের উপর গুরুতর প্রভাব ফলবে। APMC বাজারগুলি আগামীদিনে কর বাবদ প্রচুর টাকা হারাবে কারণ সেখানে বাড়তি কর দিয়ে কৃষি পণ্য না কিনে সবাই এই বাজারের বাইরে গিয়েই তা ক্রয় করবে যেখানে কোনো কর দিতে হবে না। তাই শীঘ্রই APMC বাজারগুলি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
এই সম্ভাবনা আছে বলে আমাদের তাকাতে হবে কীভাবে বেসরকারি ব্যাবসায়ীরা APMC বাজারের বাইরে কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করবে। ক্ষেত্র সমীক্ষার মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বলছে যে APMC বাজারগুলি তাদের বহু সমস্যার মধ্যেও দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। APMC বাজারে কৃষি পণ্যের দরের ভিত্তিতেই সুপারমার্কেটগুলি তাদের কৃষি পণ্য ক্রয়কেন্দ্রে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। এই প্রক্রিয়া বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, সুপারমার্কেটগুলি তাদের ক্রয়মূল্য কোনো নিলামের ভিত্তিতে নির্ণয় করে না।
ক্ষেত্র সমীক্ষার ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে সংগঠিত পুঁজির কৃষি পণ্য ক্রয় প্রক্রিয়ার মধ্যে বিবিধ রকম বঞ্চনার বীজ রয়েছে। প্রথমত, এই সংস্থাগুলি সেখানেই তাদের কৃষি পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করে যা সম্পদশালী এবং শহরের কাছাকাছি। অতএব, দূরবর্তী স্থান বা গরিব এলাকা থেকে এই সংগঠিত পুঁজি কৃষি পণ্য কিনবে না (Narayanan 2015)। একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে কৃষি পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে নির্ধারিত হয় কোন চাষির থেকে পণ্য কেনা হবে। সুপারমার্কেটগুলি চাষিদের কোনো সম্পদ বৃদ্ধির চুক্তিতে আবদ্ধ নয়। অতএব, স্থানীয় মধ্যসত্ত্বভোগী বা ফড়েরা বাধ্য হয় একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় নামতে যার মাধ্যমে সুপারমার্কেট নিশ্চিত করে যে সব থেকে কম দাম দিয়ে তারা উৎকৃষ্ট পণ্য কিনবে, কারণ চাষি বা মধ্যসত্তভোগীদের ন্যূনতম দাম দেওয়ার কোনো দায় সুপারমার্কেটগুলির নেই (Sutradhar and Das, 2020)। সুতরাং, গরিব চাষি বা নিম্ন সম্পদশালী চাষিরা হয় এই লেনদেন থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয় অথবা সীমিতভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বড় চাষিরা অধিক সম্পদশালী হওয়ায় তারা তাদের সম্পদ কাজে লাগিয়ে অধিক মানের কৃষি পণ্য সুপারমার্কেটগুলিকে বিক্রয় করে লাভ পেতে পারে। যেই সব ফসল শ্রমনিবিড় প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, সেখানে বড় ও ছোট চাষির মধ্যে সম্পদের তারতম্য এই ক্ষেত্রে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে না। কিন্তু বহু ছোট চাষির মধ্যে পণ্য বেচার প্রতিযোগিতা বিদ্যমান বলে তারা খুব কম দাম পায়, যার মাধ্যমে তাদের লাভ হয় খুব সামান্য (Sutradhar and Das, 2020)। অতএব, বোঝাই যাচ্ছে যে সংগঠিত সুপারমার্কেট চাষিদের থেকে সরাসরি কৃষি পণ্য সংগ্রহ করলে, তাতে কম সম্পদশালী গরিব ছোট চাষির বিশেষ সুবিধা হবে না।
এই প্রেক্ষিতে বিহারের অভিজ্ঞতা প্রণিধানযোগ্য। ২০০৬ সালে এই রাজ্যে APMC আইন বাতিল করা হয়। অতএব, বিহারের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে আমরা কিছুটা আন্দাজ পাব কেন্দ্রীয় কৃষি আইনের অভিঘাতে কৃষি ক্ষেত্রের অবস্থা কী হতে চলেছে। বিগত ১৪ বছরে, বিহারে কোনো সংগঠিত বেসরকারি পাইকারি বাজার তৈরি হতে দেখা যায় নি, কোনো সংগঠিত পুঁজি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভঙ্গুর বাজার পরিকাঠামোর উন্নতি সাধন করেছে বলেও জানা নেই। বেসরকারি ব্যাবসায়িদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বিহার। তারা কৃষকদের থেকে গম কেনে সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের ৩০ শতাংশ কম দামে। তারপরে তারা সেই গম পাঞ্জাব বা হরিয়ানায় বিক্রি করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দরে। এই অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয় সার্বজনীন পরিকাঠামো গড়ে তোলার গুরুত্ব। যদি পর্যাপ্ত রাস্তার পরিকাঠামো থাকত, গ্রামীণ রাস্তার সঙ্গে পাইকারি বাজারের সরাসরি যোগাযোগ থাকত তবে ব্যাবসায়ীরা এই পন্থা গ্রহণ করতে পারত না। ফসলের কম দাম লাগাতার পেতে পেতে বিহারের কৃষি অর্থনীতি আর লাভজনক অবস্থায় নেই। তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে বিহার থেকে সর্বাধিক সংখ্যক শ্রমিক দেশের শহরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে জীবিকার সন্ধানে।
উত্তর ভারতে নয়া কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকরা তীব্র বিক্ষোভ সংঘটিত করছে। এই অঞ্চলের কৃষকরা সরকারের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কৃষকদের থেকে ফসল সংগ্রহের নীতির দ্বারা সর্বাধিক উপকৃত। এই কৃষকরা মনে করছেন যে তাঁদের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ভিত্তিক সরকারি ফসল সংগ্রহের প্রক্রিয়া APMC বাজারকে দুর্বল করে দেওয়ার ফলশ্রুতি হিসেবে স্তিমিত হয়ে আসবে। তাদের এই দুশ্চিন্তা সম্পূর্ণ অমূলক নয়। ইতিমধ্যেই দেশের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টার দপ্তর থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছে যে সরকার জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইনকে শিথিল করে দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষের পরিবর্তে ২০ শতাংশ গরিব মানুষকে গণবন্টন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য দেবে। তাই যদি হয় তবে কৃষকদের থেকে খাদ্যশস্য ক্রয় করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সরকারি স্তরে কমে যাবে। এমনকি খোলা বাজারেও যেই চাল বা গম বিক্রয় হয়, সেখানেও সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, ন্যূনতম দামের পরিবর্তে তার উপরিসীমা নির্ধারণ করে। তাহলে কি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য অত্যধিক চড়া হারে বাধা? কিন্তু ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেখলে দেখা যাবে যে ১৯৭০ সাল থেকে শুরু করে প্রকৃত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বেড়েছে ১৯ গুণ। একই সময়ে স্কুল শিক্ষকদের মাইনে বেড়েছে ৩০০ গুণ। বোঝাই যাচ্ছে যে কৃষির আপেক্ষিক মূল্য কমছে। কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য মোট চাষ করার খরচ (পারিবারিক শ্রম এবং জমির দাদন ধরে)-এর থেকে ৫০ শতাংশ বেশি হওয়া উচিত বলে মনে করেন কৃষি বিজ্ঞানী এমএস স্বামীনাথন। শান্তা কুমার কমিটি-র রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের মাত্র ৬ শতাংশ কৃষক, যাদের অধিকাংশই পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা রাজ্যের বাসিন্দা, তারাই সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সুবিধা ভোগ করে। বাকিরা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের থেকে কম দামে তাদের ফসল বেচেন। ২০১৫-১৬ সালের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, একটি কৃষিজীবি পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ২০০০০ টাকায় নেমে এসেছে। তাদের এই বাড়তে থাকা সংকটের সম্মুখীন হয়ে তারা দলে দলে কৃষি ক্ষেত্র ত্যাগ করে শহরে অসংগঠিত শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। প্রয়াত অশোক মিত্র তাঁর বিখ্যাত বই “Terms of Trade and Class Relations” -এ সরকারি খাদ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার নিহিত অসামঞ্জস্যের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিলেন, সেই সমস্যার এখনও সমাধান হয়নি। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দিন এই লড়াই লড়তে হবে। হয়ত, এই লড়াই লড়ার ক্ষেত্রেও APMC বাজারের প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয়তা থাকবে।
যদি এই সময়ের সর্বাধিক মানব সংকটের কথা ভাবি তবে কোভিড-১৯ জনিত লকডাউনের দরুন পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরের উদ্দেশ্যে যাত্রার কথাই মাথায় আসবে। কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিকদের এই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দিল যে এই ধরনের সংকটের সমাধান খুঁজতে হলে আমাদের তাকারে হবে উপেক্ষিত কৃষি ক্ষেত্রের দিকে। কৃষি ও খাদ্য পণ্যের একটি গণমুখী সরবরাহ শৃঙ্খল নির্মাণ কৃষি সংকট সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু APMC বাজারকে উপেক্ষা করে এবং তার প্রভাবকে খর্ব করে সরকার ঠিক বিপরীত কাজটিই করেছে।