আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৬ ● ১-১৫ চৈত্র, ১৪৩২

প্রবন্ধ

কেউ খাবে, কেউ খাবে না, তা কেন?

অম্বিকেশ মহাপাত্র


১৯৭০-এর দশকের গোড়ায়, ছেঁড়া কাপড় পরা মাঝবয়েসি মহিলা, কোলে একটি বাচ্চা,সঙ্গে আরও দু'টি বাচ্চা, বাড়িতে ভিক্ষে চাইতে এসেছেন।মুঠো করে চাল, মহিলার পেতে ধরা ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে এমনভাবে দিচ্ছি, যাতেমুঠোয় কতটা চাল আছে দেখতে না পায়। মহিলা বলে ওঠেন, "মুঠোটা ভর্তি করে দাও, বাবা।" মুষ্টিভিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না। মা বলেছিলেন, "ভিখারি তো একজন নয়, শ'য়ে শ'য়ে। ঢের চাল লাগবে। অত চাল আসবে কোত্থেকে? ধান থেকে চাল করা কি চাট্টিখানি কথা! ধান ভেজাও, ছেঁকে তোল,সেদ্ধ কর, শুকনো কর, বস্তাবন্দি কর,মাথায় নিয়েমেশিনে ভাঙতে নিয়ে যাও, কুলো দিয়ে চাল-কুঁড়ো আলাদা কর, কম ঝামেলা! কাউকে তো ফেরাতে পারবি না, তাই প্রত্যেককে এক হালকা-মুঠো চাল দিয়ে দিবি।" আমি সেইমত কাজ সারলাম। এরপর মহিলা কোলের বাচ্চাকে মাটির দাওয়ায় শুইয়ে দিয়ে বললেন, "বাবা, মাকে বল, দু'টি খাবার দিতে, কাল থেকে বাচ্চাগুলো না খেয়ে আছে।" শুনে মনে কষ্ট হল। তবুও বললাম, "কোনও খাবার হবে না।" মহিলা ফের বললেন, "তুমি মাকে গিয়ে বল" বলে ঠায় বসে রইনলেন। অন্য ভিক্ষুকেরা চাল নিয়ে যাওয়ার সময়মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, "দু-বাড়ি ঘুরলে দুটো চাল পাবি, সময় নষ্ট করছিস কেন?" কিন্তু মহিলা বসেই র‌ইলেন। অগত্যা পেছনে রান্নাঘরে মায়ের সামনে দাঁড়াতে মা বল্লেন, "কী, ভিখারি খাবার চাইছে? খাবার কোথায়,যে খাবার দেব? ভিখারি তো একজন নয়, একজনকে দিলে আর একজন চাইবে। গিয়ে বল, খাবার হবে না। কিছুক্ষণ বসে চলে যাবে।" গিয়ে বললাম। তাও গেলেন না।

কিছুক্ষণ পর আবার রান্না ঘরে গেলাম, মা দুপুরের রান্নার তোড়জোড় করছেন। বললাম, "যাচ্ছে না।" মা শুনে বললেন, "কি খাবার দিই বল্ তো, দু-মুঠো পান্তা ভাত বেঁচেছে, পেছনে ডাক।" দৌড়ে গিয়ে বললাম। পেছনে আসতে মা একটা গভীর জামবাটিতে পান্তাভাত, তাতে জল ঢেলে, কাঁচা পেঁয়াজ ও লঙ্কা সহ খেতে দিলেন। ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে, জলের মধ্যে থেকে পান্তাভাত ছেঁকে তুলে, মা বাচ্চা দুটোর মুখে তুলে দিচ্ছেন। মা নিজের মুখে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। নিমেষে শেষ। - "আর দু'টি পান্তা হবে মা?" মা বললেন, "দেখ তো টিনে মুড়ি কতটা আছে? থাকলে, দু-কৌটো মুড়ি এনে দে।" দৌড়ে গিয়ে মুড়ি এনে দিলাম। তাদের খাওয়া দেখলাম। খাওয়া শেষে, জামবাটি ধুয়ে দিয়ে, পরিবারের সকলের মঙ্গলকামনা করে চলে গেলেন।

মানুষের চাহিদা কত অল্প, তবুও সকল মানুষ খেতে পায়না কেন? শিশুকে কোলে নিয়ে মা-কে দোরে দোরে ঘুরে খাবার জোগাড় করতে হয় কেন? প্রকৃতি তো প্রকৃতিসৃষ্ট সকলের প্রাণধারণের জন্য যা প্রয়োজন অকাতরে দিয়েছেন। তবুও এই অবস্থা কেন? আমি তখন ছোট। বিশেষ করেছোটদের জন্য প্রবচন, "ছোট মুখে বড় কথা বলতে নাই" প্রণিধানযোগ্য। তাই কাউকে কিচ্ছু বলিনি।১৯৭৭, লালঝান্ডা পার্টির জ্যোতি বসুর সরকার। ১৯৭৮ ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচন, গ্রাম সরকার গঠন। গ্রামের মানুষ গ্রামোন্নয়নের কাজে হাত লাগিয়েছেন। গ্রামবাংলার অর্থনীতির চাকা বিপরীতে ঘুরতে শুরু করে। ফলে ভিক্ষুকের সংখ্যা কমতে কমতে একদা ভ্যানিশ হয়েগেছিল।