আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৬ ● ১-১৫ চৈত্র, ১৪৩২

প্রবন্ধ

নিঃশর্ত নগদ সহায়তা প্রকল্পের আড়ালে

অনন্য মুখার্জি


ভারতে বর্তমানে বিভিন্ন রাজ্যজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নারীকেন্দ্রিক নিঃশর্ত নগদ সহায়তা প্রকল্প। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে সদ্যসমাপ্ত ২০২৫ বিহার নির্বাচন, সর্বত্র এই প্রকল্পগুলি নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। মাত্র তিন বছরের মধ্যে এই ধরনের প্রকল্প চালু থাকা রাজ্যের সংখ্যা ২ থেকে বেড়ে ১২-তে গিয়ে পৌঁছেছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক যে রাজ্যটি এই তালিকায় যোগ দিয়েছে, তা হল তামিলনাড়ু। সেখানে দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগম (ডিএমকে)-নেতৃত্বাধীন সরকার জানিয়েছে গৃহস্থালি খরচ সহায়তা প্রকল্পের আওতায় তারা ১.৩ কোটি নারীকে এককালীন ৫,০০০ টাকা করে দিয়েছে যা আসলে পাঁচ মাসের অগ্রিম কারণ এই প্রকল্পে প্রত্যেক উপভোক্তাকে প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ডিএমকে সরকার আরও বলেছে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তারা যদি আবার ক্ষমতায় ফেরে, তাহলে এই মাসিক সাহায্যের অঙ্ক বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা করা হবে।এরকিছুদিন আগেই, নির্বাচনমুখী পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের মাসিক নগদ সহায়তা প্রকল্পে আরও ৫০০ টাকা বাড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ ও ওবিসি শ্রেণির নারীরা এখন মাসে ১,২০০ টাকা করে পাচ্ছেন, আর এসসি ও এসটি শ্রেণির নারীদের জন্য এই অঙ্ক বেড়ে হয়েছে ১,৭০০ টাকা।

রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে কার্যত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে কে কত টাকা দেবে। নারীদের গৃহস্থালির শ্রম পুঁজিবাদী উৎপাদনপ্রক্রিয়ার একেবারে অপরিহার্য প্রাকশর্ত হলেও রাষ্ট্র এমনকি শ্রমিক আন্দোলনও এই শ্রমের তেমন কোনো প্রয়োগিক স্বীকৃতি সেভাবে দেয়নি। এই প্রথমবার সে স্বীকৃতির একটা আভাস দেখা যাচ্ছে যদিও তা খুবই সীমিত, প্রায় প্রতীকী । তবুও আজ শ্রমজীবী শ্রেণির নারী এবং সাধারণভাবে নারীরা যেন হঠাৎই দরকষাকষির এক নতুন হাতিয়ার পেয়ে গেছেন: রাষ্ট্রের সাথে এক ধরনের অতিবাস্তববাদী, প্রায় চুক্তিভিত্তিক বিনিময়ে নিজেদের ভোটের মূল্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা। এই প্রকল্পগুলি ভারতে ভোটের আগে নানা রাজনৈতিক দলগুলোর 'ফ্রি' জিনিসপত্র বা সরাসরি অর্থবিতরণের প্রথাগত সংস্কৃতির থেকে আলাদা হলেও, এগুলিকে সাধারণত দু'ভাবে দেখা হচ্ছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের ভোট কেনার কৌশল হিসেবে, অন্যদিকে স্রেফ দারিদ্র্য লাঘবের কল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু এই দুই ব্যাখ্যাই একটি গভীরতর বাস্তবতাকে আড়াল করে দিচ্ছে যে সমসাময়িক পুঁজিবাদে শ্রমসর্ম্পর্কের চরিত্র এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা কীভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

এই প্রকল্পগুলির রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে প্রথমেই 'শ্রম' এবং 'কাজ' বা ওয়ার্ক -এর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি, যদিও আমরা প্রায়ই এই দুই শব্দকে এক অর্থে ব্যবহার করি। মার্কসের মতে, শ্রম হল মানুষের স্বাভাবিক কার্যকলাপ, যার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং নিজের জীবন টিকিয়ে রাখে। বাজার, সমাজ বা পুঁজিবাদের আগেও মানুষ শ্রম করত। অর্থাৎ শ্রম, মজুরি বা বিনিময়ের সম্পর্কে বাঁধা নয়। কিন্তু কাজ' বা ওয়ার্ক হল শ্রমের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক রূপ যেখানে শ্রমকে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে, উদ্বৃত্ত উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এই ব্যবস্থায় জীবনধারণ নির্ভর করে শ্রমসময়কে বিশ্বায়িত বাজারে বিক্রি করার ওপর। এই ব্যবস্থা চিরন্তন নয় বরং পুঁজিবাদ বিশিষ্ট একটি সামাজিক সম্পর্ক। কেউ স্থায়ী মজুরির কর্মী হোক বা ঋণে জর্জরিত স্বনিযুক্ত তাতে ফারাক খুব একটা নেই যদি বাঁচার জন্য তাকে নিজের শ্রমসময় বিক্রিই করতে হয়।

এই প্রশ্নটি আজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমসাময়িক পুঁজিবাদ এক গভীরতম কাঠামোগত সংকটে পড়েছে। একদিকে স্বয়ংক্রিয়তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ফাইনান্সিয়ালাইজেশন বা ঋণকেন্দ্রিকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌলতে দ্রুত উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। অন্যদিকে স্থায়ী ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ ক্রমেই কমছে। মার্কস এই সংকটকে বোঝাতে 'রিলেটিভ রিজার্ভ লেবার আর্মি'র ধারণার অবতারণা করেছিলেন। পুঁজিবাদ সব সময় প্রয়োজনের তুলনায় এক উদ্বৃত্ত শ্রমিকের জনগোষ্ঠী তৈরি করে, যাদের পুরোপুরি উৎপাদনে কাজে লাগানো হয় না। কিন্তু তাদের উদ্বৃত্ত শ্রমই মজুরি কমিয়ে রাখে এবং মুনাফা বাড়ায়। ভারতে এই উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে দুটো প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে- এক, জমিদখল, উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম, এবং দুই এমন এক পুঁজিবাদী পর্যায় যাতে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর প্রয়োজন কমছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে শ্রমশক্তি ছাড়া আর কিছু নেই, অথচ তা বিক্রি করার স্থায়ী সুযোগ নেই। অনানুষ্ঠানিক শ্রম, গিগ ওয়ার্ক, চুক্তিভিত্তিক চাকরি, কৃষি থেকে উৎখাত এই সবই সে বাস্তবতার লক্ষণ।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদ নিজে এই সংকটের সমাধান করতে পারে না, অথচ রাজনৈতিকভাবে এই অচলাবস্থা সামলানো তার ব্যবস্থাগত অস্তিত্বের জন্য জরুরি। তাই প্রয়োজন পরে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের, আজকের দিনে যাকেউদ্বৃত্ত জনগণের সামাজিক পুনরুৎপাদনের, বেঁচে থাকার ন্যূনতম একটা ব্যবস্থা করতে হস্তক্ষেপ করতে হয়। নারীকেন্দ্রিক নিঃশর্ত নগদ সহায়তা প্রকল্পগুলি ঠিক এই কাঠামোর মধ্যেই কাজ করে। এগুলি কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, আবার নিছক দয়ার দানও নয়।

এখানেই একটি দ্বান্দ্বিক প্রশ্ন উঠে আসে। এই প্রকল্পগুলি কি কেবল পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখছে, নাকি এমন এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে যেখানে বেঁচে থাকা আর বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমসময় বিক্রির ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানে মার্কসের 'বাধ্যতামূলক শ্রমসময়' বা নেসেসারি লেবার-টাইমের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। বাধ্যতামূলক শ্রমসময় বলতে বোঝায় সমাজে একজন শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় উপকরণ বা মিনস অফ সাবসিস্টেনস-এর সংস্থান করতে যতটা শ্রমসময় ব্যয় করতে হয়। সমাজের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে যে পরিমাণ শ্রম দরকার, প্রযুক্তির উন্নতি ও উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ফলে তা ক্রমশ কমে এসেছে। তৈরি হয়েছে বিপুল উদ্বৃত্ত শ্রমসময় এবং তার ফলস্বরূপ ব্যাপক পরিমাণ উদ্বৃত্ত সামাজিক সম্পদ।

কল্যাণকারী রাষ্ট্র এই উদ্বৃত্তের সামান্য অংশ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিতরণ করে। গণবণ্টন ব্যবস্থায় খাদ্য, সরকারি পরিবহন, সরকারি শিক্ষা ওস্বাস্থ্যব্যবস্থা, কিংবা একবার ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরি হলে স্বল্প খরচে লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিষেবা- এই সবই দেখায় যে সমাজের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সবার অবিরাম শ্রম করে যাওয়া আর অপরিহার্য নয়। প্রশ্ন হল, উৎপাদনশীলতার এই উন্নতি কি কেবল বর্তমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতেই ব্যবহৃত হবে, নাকি সামাজিক সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের পথ খুলবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যার কেন্দ্রে শোষণ ও অসাম্য রয়েছে তা এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত হতে দেয় না। মানুষের মুক্তির যে সম্ভাবনা প্রযুক্তি তৈরি করে, সেটাই পুঁজিবাদে এক সংকটে পরিণত হয়। আর এই সংকট স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের মধ্য দিয়ে আগামীতে আরও তীব্র হতে চলেছে।

আজ ভারতে নারীকেন্দ্রিক নগদ সহায়তা প্রকল্পগুলির মোট বরাদ্দ দেশের জিডিপির প্রায় ০.৫ শতাংশ। এর বহু আগেই ২০১৬-১৭ সালে ভারত সরকারের ইকোনোমিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে তৎকালীন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম একপ্রকার সর্বজনীন মৌলিক আয় বা ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের (UBI) রূপরেখা দেন। প্রস্তাব ছিল দেশের ৭৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে বছরে ৭,৬২০ টাকা দিলে খরচ হবে জিডিপির প্রায় ৪.২ শতাংশ। কোনও ইউটোপিয়ান কল্পনা নয়, বরং বিদ্যমান কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের বাস্তবসম্মত পুনর্গঠনের প্রস্তাব হিসাবেই একে পেশ করা হয়েছিল। আজ দেশের জিডিপি বেড়ে যাওয়ায় শতাংশের হিসেবে UBI-এর খরচ কম হলেও, মুদ্রাস্ফীতি ধরলে মাথাপিছু নগদ সহায়তার অঙ্ক অনেক বেশি হওয়ার কথা। এই পরিসংখ্যান কেবল রাষ্ট্রের আর্থিক সামর্থ্যের কথাই বলে না বরং আরো গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য সংকেত দেয়। রাষ্ট্রের টেকনোক্র্যাটিক কেন্দ্র থেকেই এমন প্রস্তাবের উঠে আসা, এটাই প্রমাণ করে যে 'কাজ'-এর সংকট এবং এক বিপুল উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার সমস্যা সমাজকাঠামোর কতটা গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে।

শিল্পভিত্তিক পুঁজিবাদের যুগে পুঁজির সঞ্চয়ন হতো বেশি বেশি দ্রব্যপণ্য উৎপাদনের মধ্য দিয়ে অধিকতর ব্যবহারিক মূল্য বা ইউস ভ্যালু তৈরি করার মধ্য দিয়ে। তার ফলে পুঁজিবাদের সেই রূপে উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও সামাজিক সম্পদের প্রাচুর্যের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক থাকে , যাআজকের পুঁজিবাদে ভেঙে যাচ্ছে। আজকের পুঁজিবাদে পুঁজি সঞ্চয়ন ক্রমশ কৃত্রিম সংকট তৈরি, রেন্ট আদায় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের একচেটিয়া দখলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। আর এই পুরো বন্দোবস্তের মধ্যে যখন নিঃশর্ত নগদ সহায়তা বা সর্বজনীন মৌলিক আয় যুক্ত হয়, তখন তা বিশাল শ্রমজীবী জনগণের ন্যূনতম জীবনধারণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এক ধরনের জনব্যবস্থাপনা বা শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এতে রাষ্ট্রের হাতে এমন এক অভূতপূর্ব ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন হতে পারে, যা জীবনের সবচেয়ে মৌলিক বিষয়, অর্থাৎ মানুষের বেঁচে থাকাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

তবু এই কৌশলই আবার ব্যবস্থার গভীরতম আশংকা ও ভয়কেও প্রকাশ করে। 'উদ্বৃত্ত মানুষে'র জীবন টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন স্বীকার করা মানে পুঁজিবাদী শ্রমসম্পর্ক আর পুরো সমাজকে সংগঠিত করতে পারছে না, এই বাস্তবতাকেও মেনে নেওয়া। আর এখানেই দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট। একদিকে নগদ সহায়তার প্রকল্পগুলো জনগণের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের আধিপত্য জোরদার করতে চেষ্টা করে অথচ তা করার মধ্য দিয়ে 'কাজ' বা পুঁজিবাদী শ্রমসম্পর্ককে জীবনধারণের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাকেও উন্মোচিত করে দেয়। রাষ্ট্রের বিপুল নিরাপত্তাহীনতা একেবারে সামনে বেরিয়ে আসে- সেই উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠীর ভয়, যারা আর শ্রমসম্পর্কের শৃঙ্খলে বাঁধা নয়, যারা ক্রমশ অশাসনযোগ্য, রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত ও অনির্দেশ্য।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, নিঃশর্ত নগদ সহায়তা ও সর্বজনীন মৌলিক আয় কেবল দারিদ্র্য দূরীকরণের নীতি নয়। এগুলি সামাজিকভাবে উৎপাদিত বিপুল উদ্বৃত্তের সামান্য অংশ জনগণের মধ্যে বণ্টনের মধ্য দিয়ে সঙ্কটদীর্ণ ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা। যে প্রক্রিয়া বকলমে এও স্বীকার করে নিচ্ছে যে বেঁচে থাকার জন্য কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকাই একমাত্র শর্ত নয়। এগুলি অবশ্যই পুঁজিবাদ অতিক্রম করে না, কিন্তু জীবনধারণ ও শ্রমের মধ্যেকার পুঁজিবাদী সম্পর্ককেই নাড়িয়ে দেয়।

এতেই উঠে আসে মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটি। মানবমুক্তির রাজনীতি কি শুধুমাত্র 'ভালো চাকরি', বেশি মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এমন এক সমাজের দিকে এগোতে চাইবে যেখানে জীবনধারণ আর পুঁজিবাদী শ্রমসম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক আঁদ্রে গোর্জ 'কাজ' বা ওয়ার্ক আর 'পূর্ণ কর্মসংস্থান'-এর সমালোচনায় বলেছিলেন যে সবার জন্য 'কাজ' মানেই মানুষের 'স্বাধীনতা' বা তার আকাঙ্ক্ষাকে সার্বজনীন করে তোলা নয়, বরং উল্টে সেটি এক আধিপত্যকারী ব্যবস্থাকেই সার্বজনীন করে দেওয়ার প্রক্রিয়া। কারণ মানুষের বেঁচে থাকা যদি তার শ্রমসময় বিক্রি করার ওপরই নির্ভর করে যেতে থাকে তাহলে তার পক্ষে সত্যিকারের স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব নয়। স্বাধীনতা সেক্ষেত্রে কাঠামোগতভাবেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন জীবনের সাথে শ্রমসময়কে পণ্য হিসেবে বিক্রি করার বাধ্যবাধকতার সম্পর্কটা ভেঙে পড়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিঃশর্ত নগদ সহায়তা ও সর্বজনীন মৌলিক আয় এমন এক বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিসর খুলে দিতে পারে, যেখানে বাধ্যতামূলক শ্রমের সময় ন্যূনতম হয়ে আসার মধ্য দিয়ে অর্থশাস্ত্রের 'ল অফ ভ্যালু'র ক্রমবিলুপ্তির ধারণা এক বিকল্প সামাজিক চিত্রকল্প নিয়ে হাজির হয়।

ফলে প্রশ্নটি অধিকার বনাম কল্যাণের নয়। আসল প্রশ্ন হল, এই নীতিগুলি কি কেবল সংকট সামলানোর ক্ষতিপূরণমূলক ব্যবস্থায় আটকে থাকবে, নাকি সামাজিক উদ্বৃত্তের উৎপাদন, আহরণ ও বন্টনের ওপর জনগণের বৃহত্তর ও যৌথ গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের আন্দোলনের রূপ নেবে। এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যত ভারতের রাজনীতি, রাষ্ট্রের চরিত্র ও সমাজজীবনের দিশা।