আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৬ ● ১-১৫ চৈত্র, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু আমার দেশে


বিগত ১১ই মার্চ ২০২৬ দিনটি ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে। কারণ এই দিনটিতেই ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু বা প্যাসিভ ইউথ্যানাশিয়া (Passive Euthanasia) কার্যকর করার অনুমতি দিল, হ্যাঁ এই প্রথম সুপ্রিম কোর্ট সম্মানজনক মৃত্যুর অধিকারকে কার্যকর করার অনুমতি দিল।

সম্মানজনক মৃত্যুর অধিকারকে সংবিধানের ২১তম অনুচ্ছেদের আওতায় ২০১৮ সালে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালতই। অরুণা শানবাগ মামলায় ১৯৭৩ সালে মুম্বাই হাসপাতালের জুনিয়র নার্স অরুণাকে কুকুর বাঁধার শিকল গলায় পেঁচিয়ে ধর্ষিতা হতে হয়েছিল সেই হাসপাতালের সাফাই কর্মী দ্বারা। ৪২ বছর কোমায় থাকার পর অরুণা মারা যান। যদিও ধীরে ধীরে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর জীবনদায়ী ওষুধপত্র, পুষ্টি সহ অন্যান্য সাপোর্ট সরিয়ে নিয়ে অরুণার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করাতে কোর্ট মান্যতা দিয়েছিল। পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ সেই সময় সম্মানজনক মৃত্যুকে মৌলিক অধিকারেরই স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু তাঁকে দেখভাল করার জন্য সহকর্মীদের আপত্তিতে অরুণা শানবাগের নিষ্কৃতি-মৃত্যু হয় নি।

এবারে আসা যাক হরিশ রাণার নিষ্কৃতি-মৃত্যু প্রসঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ কোর্টের সাম্প্রতিক রায়। হরিশ রাণা ৩২ বছরের তরতাজা যুবক। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যে বাড়ীর সে পেয়িং গেস্ট ছিল সেই বাড়ীরই পাঁচতলার উপর থেকে পড়ে যান। ফল হিসাবে তীব্র হেড ইনজুরি এবং তার হাত-পা সহ সারা শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে ঘটনাটি ঘটে। সেই থেকে কোমায় চলে যাওয়া হরিশ ডাক্তারী পদ্ধতি মেনে ডাক্তারের পরামর্শ মতই ক্যালোরি এবং পুষ্টি দিয়ে তাঁকে বাড়িতেই বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। বাঁচিয়ে রাখা মানে শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদযন্ত্র চালু থাকে। আর কিছুতেই কোনো অভিব্যক্তি নেই। বাড়ির লোকেরা আত্মীয়স্বজন বিচার-ব্যবস্থার মাধ্যমে হরিশের এই বেঁচে থাকা কতটা বেদনাদায়ক তা উল্লেখ করেন। বাবা-মা, প্রিয়জনেরা, মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা সকলেই যদি মনে করেন এভাবে কাউকে বাঁচিয়ে রাখা উদ্দেশ্যহীন, সেই সবকিছু মাথার রেখে ১১ই মার্চ, ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথনের বেঞ্চ প্যাসিভ ইউথ্যানাশিয়ার পক্ষে রায় দেন। অর্থাৎ প্রাথমিক এবং সেকেন্ডারী মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ মতো রোগী যাতে আর কষ্ট না পেতে পারে তাই ধীরে ধীরে জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হবে। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুবরণ করাকেই বলা হয় - প্যাসিভ ইউথ্যানাশিয়া।

সবশেষে, আসা যাক বর্তমান সালে অর্থাৎ ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইউথ্যানাশিয়া সম্পর্কিত বিশ্ব পরিস্থিতি কীভাবে বিভিন্ন ধরনের সহায়তায় মৃত্যুকে বৈধতা দিয়ে থাকে। যদিও এখনও বেশিরভাগ দেশই অ্যাকিউট ইউথ্যানাশিয়াকে ফৌজদারী অপরাধহিসাবে গণ্য করে থাকে। তবুও কিছু দেশ এবং তাদের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান যারা সক্রিয় ইউথ্যানাশিয়ার পক্ষে চলে এসেছে - নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, কানাডা, স্পেন, কলম্বিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া ডাক্তার দ্বারা পরিচালিত এবং সহায়তায় মৃত্যু-সংঘটিত হয়ে থাকে। সুইটজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া এবং কিছু মার্কিন রাজ্যে যেমন - ওরেগন, ওয়াশিংটন, ক্যালিফোর্নিয়াতে চিকিৎসকের সহায়তায় আত্মহত্যা বৈধ, কিন্তু সক্রিয় ইচ্ছামৃত্যু বৈধ নয়। সাম্প্রতিক কালে ইকুয়েডর, উরুগুয়েতে আইন পাস বাস্তবায়িত হওয়ার অপেক্ষায়। সক্রিয় ইচ্ছামুত্যু এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে মূলত অবৈধ।

চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।