আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৬ ● ১-১৫ চৈত্র, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

জোট নিরপেক্ষতার পক্ষে থাকুক ভারত


ভারতের জনগণ প্রায় প্রত্যেক বছর নিত্যনতুন কারণে লাইনে দাঁড়ানো শিখছেন। ২০১৬ সালে নোট বাতিলের পরে নিজের টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তোলার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি আমরা, ২০২০ সালে কোভিডের সময় নিকটাত্মীয়ের জন্য অক্সিজেন পেতে লাইনে দাঁড়িয়েছি, ভ্যাক্সিন নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি, ২০২৫ সাল থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছি ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য, আর এখন জনগণ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন রান্নার গ্যাসের জন্য।

যুদ্ধ চলছে পশ্চিম এশিয়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পাহারাদার ইজরায়েল ইরান আক্রমণ করেছে। সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণকারীরা ভেবেছিল যে দিন কয়েকের মধ্যেই তারা ইরানকে পরাস্ত করে, তাদের পেটোয়া সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে সগর্বে নিজেদের বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করবে। কিন্তু ইরান হার মানেনি। তারা লড়াই করে চলেছে। একের পর এক মার্কিন সেনার ঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে ইরান। এখন তারা বন্ধ করে রেখেছে হরমুজ প্রণালী, যার মধ্য দিয়ে ভারত তথা এশিয়ার অধিকাংশ তেল বা গ্যাস পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতে আসে। যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তেলের উৎপাদন কমেছে ইতিহাসে সর্বাধিক, প্রায় ১৫ শতাংশ। ফলত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছুঁয়ে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে তেলের দাম কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তার কোনও হিসেব এই মুহূর্তে নেই।

যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া এই জ্বালানি সংকট ভারতে এসে পৌঁছিয়েছে। প্রচুর মানুষ রান্নার গ্যাস পাচ্ছেন না। হোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মানুষ নাজেহাল হয়ে আবারও লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, কিন্তু সুরাহা পাচ্ছেন না। সরকার তথা তাদের পোষা মিডিয়া এমন একটি আখ্যান নির্মাণ করার চেষ্টা করছে যে যেন দেশে কোনও সমস্যাই নেই। তারা ক্রমাগত মানুষকে বিভ্রান্ত করার কাজ করে চলেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে পশ্চিম এশিয়ায় তৈরি হওয়া এই সংকটের ফল সমগ্র পৃথিবী-সহ ভারতকে ভোগ করতে হচ্ছে, কিন্তু দেশে গ্যাস ও তেল নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে তার দায় মোদী সরকারের নয়। এই ধারণাটি অনেকগুলি কারণে ভুল।

প্রথমত, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় সরকারের তরফে মানুষকে কোনও কথা বলা হয়নি। পেট্রোল মন্ত্রী, যার নাম এপস্টাইন ফাইলসে রয়েছে, তিনি আপাতত নিজের কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে বেশি ব্যস্ত। তাই দেশে গ্যাস বা তেলের যোগান কী হল, তা নিয়ে তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন। মোদীর ভৃত্য মিডিয়া খবর ভাসিয়ে দিল যে চিন্তার কিছু নেই, দেশে নাকি ২৫ দিনের তেল ও গ্যাস বজুত রয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এক ধাক্কায় গ্যাসের দাম এত বাড়ানো হল কেন? কালো বাজারে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে কী করে? কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না কেন? সরকার স্পষ্টভাষায় জানাচ্ছে না কেন যে এই পরিস্থিতিতে তারা কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে?

তেল তথা গ্যাসের যোগানের সমস্যার নেপথ্যে আসলে রয়েছে মোদী সরকারের ভ্রান্ত বৈদেশিক নীতি। ইজরায়েল ও আমেরিকার নেতৃত্বে ইরানে যে আক্রমণ চলছে তা শুরু হওয়ার ঠিক দুইদিন আগে মোদী মহানন্দে ইজরায়েলে গিয়ে বেঞ্জামিন নেতানইয়াহুর আতিথেয়তা গ্রহণ করে আনন্দে গদগদ হয়ে ইজরায়েলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে এসেছিলেন। এরপরেই ইরানের প্রধান নেতা খামেইনিকে হত্যা করে আমেরিকা ও ইজরায়েল। যেই ইরানের সঙ্গে আমাদের দেশের সুপ্রাচীন সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বহুবার ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুতে কোনও শোকবার্তা প্রধানমন্ত্রী পাঠাননি। আবার ইরানের উপরে আক্রমণে আমেরিকার মিসাইলের আঘাতে ইরানে মৃত ১৭০ জন স্কুল ছাত্রীর মৃত্যুতেও মোদী তথা ভারত সরকারকে নিন্দা বা শোকজ্ঞাপন করতে দেখা যায়নি। ভারতের আমন্ত্রণে ইরানের নৌসেনার জাহাজ বিশাখাপত্তনমে এসেছিল। ইরান ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার কাছে মার্কিন ডুবজাহাজের টর্পেডোর আঘাতে সেই জাহাজ ধ্বংস করা হয়, মৃত হয় বহু নাবিক। এই জাহাজে কোনও অস্ত্র ছিল না, তারা যুদ্ধ করছিল না, তবু তা ধ্বংস করা হয়। ভারত এর বিরুদ্ধে কোনও নিন্দা করেনি। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবার ভারত নির্লজ্জের মতন আগ্রাসী শক্তিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে পশ্চিম এশিয়ার মানুষের মনে হতেই পারে। নেতানইয়াহুর সঙ্গে দোস্তি, খামেইনির মৃত্যুতে নীরবতা, ইরানি জাহাজ আক্রমণের প্রশ্নে উদাসীনতা এই বার্তাই ইরানকে দিচ্ছে যে ভারত তার বহু প্রাচীন বন্ধুকে ত্যাগ করে আক্রমণকারীদের পরোক্ষভাবে সমর্থন করছে।

এই পরিস্থিতিতে, ইরান যেখানে চিনের জাহাজকে হরমুজ প্রণালী থেকে যাওয়ার ছাড়পত্র দিয়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে তা দিতে তারা অনেক সময় লাগিয়েছে। খবরে প্রকাশ যে দুটি গ্যাস ভর্তি জাহাজকে আপাতত হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে ভারতের চাহিদা খুব বেশি মিটবে না। ইরানের সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরদার করতে হবে যাতে দেশে গ্যাসের সংকটের নিরশন হয়। কিন্তু বিষয়টি শুধু তাই নয়। রাজনৈতিকভাবে ভারত এখনও অবধি এই আগ্রাসী যুদ্ধের কারিগর আমেরিকা তথা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি। তেহরানে ইজরায়েল মহাত্মা গান্ধীর নামে তৈরি হাসপাতাল বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভারত তাতেও চুপ করে থেকেছে। আন্তর্জাতিক এই অস্থির সময়ে ভারতের উচিত ছিল জোট নিরপেক্ষতার আদর্শ এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বেআইনি আক্রমণের বিরুদ্ধে অভিমত রেখে শান্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বিশ্বগুরু মোদী ভারতের স্বার্থ তথা নীতিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বন্ধক রেখেছেন। তাই তাঁর মুখ থেকে এই বিষয় কোনও কথা শোনা যায়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মোদীর এই দোস্তি কি ভারতের কোনও উপকারে এসেছে? ট্রাম্প ওপেরেশন সিন্দুরের সময় আগ বাড়িয়ে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে বললেন তিনি নিজে যুদ্ধ থামিয়েছেন। মোদী সরকারের ভাষ্য এর বিপরীত। কিন্তু ট্রাম্প বারবার এই দাবি করে গেলেও, মোদী নিজে এই নিয়ে মুখ খুললেন না। ভারতের উপর বিপুল পরিমাণ শুল্ক চাপানো হল, রাশিয়া থেকে তেল কিনতে মানা করে দেওয়া হল, ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ছাতিওয়ালা বিশ্বগুরু তা বাধ্য বালকের মত মেনে নিলেন। আবারও একটি তথাকথিত বাণিজ্য চুক্তি সাক্ষরিত করা হল আমেরিকার সঙ্গে, যেখানে ভারতের উপর আমেরিকা ১৮ শতাংশ শুল্ক চাপালেও, ভারত আমেরিকা থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর এক টাকাও শুল্ক চাপাবে না। মোদীর ভৃত্য মিডিয়া এই চুক্তিতেও মোদীর জয় দেখল। এখন যখন তেলের সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, ট্রাম্প সরকার ভারতকে 'অনুমতি' দিল রাশিয়া থেকে তেল কেনার! মোদীর ক্ষমতা হল না ট্রাম্পকে বলার যে অনুমতি দেওয়ার আপনি কে? দেশপ্রেম, রাষ্ট্রবাদের নামে জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়া মোদী ট্রাম্পের সামনে ভারতের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে দিলেন কোন স্বার্থে, এই প্রশ্ন তুলতেই হবে।

এর উত্তরের কিছুটা আভাস পাওয়া গেলে কয়েক দিন আগে। আমেরিকার টেক্সাস প্রদেশে একটি তেল শোধনাগার গড়ে তোলা হবে যার জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ কোনও মার্কিন কোম্পানি করবে না, করবে আমাদের দেশের রিলায়েন্স অর্থাৎ মুকেশ আম্বানির কোম্পানি। প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু মুকেশ আম্বানি আমেরিকায় কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করবেন আর মোদী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে তা এক সঙ্গে যে হয় না, তা ভারতের শিশুও বোঝে। আবার মোদীর প্রিয় আরেক শিল্পপতি আদানির বিরুদ্ধে আমেরিকায় মামলা চলছে, মোদীর মন্ত্রীর নাম এপস্টাইন ফাইলে রয়েছে, এই পরিস্থিতিতে সত্যিই তো ট্রাম্পকে চটানো সমীচীন নয়। অতএব, অন্যায় যুদ্ধের সমালোচনা বন্ধ, রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন নেই, ইরানের সঙ্গে প্রাচীন বন্ধুত্বের পক্ষেও দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

আমেরিকার সামনে মোদীর এই ঐতিহাসিক মাথা নোওয়ানোর মাশুল আপাতত গুনছে গ্যাসের লাইনে দাঁড়ানো লক্ষ লক্ষ জনতা, পশ্চিম এশিয়ায় বসবাসকারী অগুনতি ভারতবাসী। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতে ইরান ভারতের তেল তথা গ্যাসকে অতিক্রমণের অনুমতি দেয়, তার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে। এই অন্যায় যুদ্ধ যাতে অবিলম্বে বন্ধ হয় তার জন্য সরকারের কূটনৈতিক সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করা উচিত। ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব। বুদ্ধ ও গান্ধীর দেশের উচিত বিশ্বশান্তির পক্ষে দাঁড়ানো। কতিপয় ধনকুবেরদের স্বার্থরক্ষার জন্য আমেরিকার পদতলে ভারতীয় মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলী দেওয়ার মোদীর রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে প্রগতিশীল শক্তিদের।