আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

প্রবন্ধ

আঁদ্রে বেতেই (Andre Beteille): জ্ঞানচর্চায় একান্তই ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব

অমিত পান


২০১৬ সালের ২১শে অক্টোবর, 'হিন্দুস্থান টাইমস'-এর এক প্রতিবেদনে (Review of Ram Chandra Guha's 'Democrats and Dissenters') ঐতিহাসিক ও লেখক রামচন্দ্র গুহের কিছুদিন আগের নেওয়া এক সাক্ষাৎকার থেকে কিছু অংশ তুলে ধরা হয়, "Andre Beteille is a sociologist who has lived in Delhi all his life but has never been contaminated... He's virtually never on television ; he doesn't hang around politicians and the IIC."

'Democrats and Dissenters' বইটির একটি অধ্যায়ে রামচন্দ্র গুহ আঁদ্রে বেতেই সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, "He is indisputably the 'wisest man living in India'." এবং খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে অতি পরিচিত অমর্ত্য সেনের কথা মনে রেখেই!

ঠিক এই মুহূর্তে 'জীবিতদের মধ্যে' বলা সম্ভব না হলেও, স্বাধীনতোত্তর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ হিসাবে আঁদ্রে বেতেই-এর নাম চিরকাল রয়ে যাবে অন্তত তন্নিষ্ঠ শিক্ষানুরাগীদের কাছে। কলকাতায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে যখন সদ্যগঠিত 'দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিকস'-এ অধ্যাপক (লেকচারার) পদে যোগ দেন, তখন সেখানে আক্ষরিক অর্থেই 'স্বর্ণযুগের উজ্জ্বল ঊষাকাল'!

"...দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিকসের তখন চোখধাঁধানো ঔজ্জ্বল্যের দিন। তখন শিক্ষকমণ্ডলীতে অষ্টবজ্র সম্মেলন ঘটেছে। আমি ও খালেক কাজে যোগ দেওয়ার কিছু দিন পরে অর্থনীতির তিন অধিরথ মাত্র সাতাশ বছর বয়সে অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন। অমর্ত্য সেন, জগদীশ ভগবতী, সুখময় চক্রবর্তী ওই বয়সেই জগদ্বিখ্যাত। অর্থনীতির ব্যাপারে সরকারি সব বড়-মেজ কর্তারা পরামর্শ নেওয়ার জন্য সর্বদা ওঁদের দ্বারস্থ। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীও মাঝে মাঝেই ওঁদের শরণাপন্ন।...

সমাজতত্ব বিভাগে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সমাজতাত্বিক শ্রীনিবাস অধ্যাপক ও বিভাগ প্রধান। ওই বিষয়ে উদীয়মান প্রতিভা তরুণ পণ্ডিত আঁদ্রে বেতেই প্রথমে লেকচারার ও পরে রিডারের পদ অলংকৃত করছেন। এই নামগুলো এখন সর্বজনবিদিত। কিন্তু আরও অনেকে ছিলেন যাঁরা নিজের নিজের বিষয়ে অসাধারণ খ্যাতিসম্পন্ন। আমাদের এক বন্ধু একবার দিল্লি স্কুলে এসে বলেছিলেন, 'মনে হচ্ছে একটা ইনটেলেকচুয়াল পাওয়ার হাউসে ঢুকেছি। এর উত্তাপ সহ্য করা কঠিন'।"

এই অংশটি ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরীর 'বাঙালনামা' থেকে উদ্ধৃত, যখন তিনি যোগ দেন অর্থনৈতিক ইতিহাসে রিডার পদে। উদ্ধৃতিতে উল্লেখিত খালেক হলেন খালেক নাকভি, ক্লাসিক অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসের রিডার।

১৯৫৯ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'সোসিওলজি' বিভাগ শুরু হলে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সেখানে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে অধ্যাপনা করেন আঁদ্রে বেতেই। অতি বিখ্যাত শিক্ষকদের বেশিরভাগই চলে গেছেন বিভিন্ন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে। কিন্তু, আঁদ্রে বেতেই যথা পূর্বম তথা পরম, চাকরির শেষ দিন পর্যন্ত। কিন্তু, এমন নয় তাঁর কাছে বিদেশের প্রস্তাব ছিল না। একে একে ফিরিয়েছেন অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস, হাভার্ড প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'অফার'।

বস্তুতঃ, সেই যুগে খুব অল্প হলেও কিছু মানুষ ছিলেন যাঁরা বিশ্বাস করতেন দেশে থেকেও বিদ্যাচর্চা ও গবেষণা  বা রিসার্চ সম্ভবপর। চিকিৎসা শাস্ত্রের অধ্যাপক ডাঃ শম্ভু নাথ দে, কলেরা রোগের কার্যকারণে যাঁর  আবিষ্কার যুগান্তকারী বললেও কম বলা হয়, বিদেশে গবেষণার অনেক লোভনীয় প্রস্তাব সত্ত্বেও সারাজীবন সরকারি হাসপাতাল ও নিজস্ব ল্যাবরেটরিতেই কাজ করেছেন। নোবেল পুরস্কারের জন্য দু'বার মনোনয়ন পেলেও দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি বঞ্চিতই থাকেন, সম্ভবতঃ যথেষ্ট জোরালো সুপারিশের অভাবে, এবং তৃতীয় বিশ্বের  দেশের স্থায়ী নাগরিক হওয়ার কারণে।

একই প্রজাতির মানুষ ছিলেন আঁদ্রে বেতেই, যাঁর কাছে বিদ্যাচর্চাই ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অর্থ, সম্মান, প্রচারের আলো কোনো কিছুই মনে হয় না সেভাবে তাঁকে আকর্ষণ করত। আসলে, দিল্লিতে থাকলেও তিনি সত্যি করেই ছিলেন দিল্লির গতানুগতিক জীবন থেকে অনেক দূরে। তাঁর নব্বই বছর জন্মদিন উপলক্ষে রামচন্দ্র গুহ 'দ্য টেলিগ্রাফ' পত্রিকায় লেখেন, "Though he lives in the national capital, unlike some other Delhi intellectuals, Professor Beteille has never remotely been interested in befriending or influencing important or powerful individuals. His duty has been to research, write and teach, not to anoint himself as some sort of Rajguru, whispering advice in the ear of a minister or a leader of the Opposition."

বাস্তবিক পক্ষে, ক্ষমতাবানদের কাছে যাওয়া তো অনেক দূর, এমনকি 'মিডিয়া'কেও তিনি রাখতেন সযত্ন দূরত্বে। এ সম্বন্ধে তাঁর অভিমত ছিল, "Media attention is not only the enemy of scholarship, it is also the enemy of moral integrity." রীতিমতো মারাত্মক অভিমত, নিঃসন্দেহে...

ঐ একই প্রতিবেদনে রামচন্দ্র গুহ জানান, "His own sociological expertise equipped him to offer criticisms of specific state policies, but never to offer alternative policies of his own... Some sociologists and historians wanted to follow them in this regard by canvassing support with politicians in and out of power. But not Andre. He would, very occasionally, venture into policy analysis, but never into policy prescription."

তাঁর 'থিসিস' ছিল Caste, class, and power... আর সারা জীবনই কাজ করে গেছেন এই তিনটে বিষয়ের দ্বন্দ্ব, বিবর্তন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রকৃত অবস্থান নির্ণয়ে, power বলতে অবশ্যই political power-কেই বোঝানো হয়েছে। ডুব দিয়েছেন জ্ঞানের অতল সাগরে, অতি সযত্নে সন্তর্পণে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর ও তাঁর ছাত্রদের আহরিত তথ্যাবলীকে, চিরন্তন গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গিতে, এবং কোনো বিশেষ চিন্তাধারার প্রতি পক্ষপাত বা গোঁড়ামি ছাড়াই।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের পরে যোগ দেন অশোকা ইউনিভার্সিটিতে, প্রতিষ্ঠানটির প্রথম আচার্য হিসাবে। কিন্তু, নীরবে কাজ করে গেছেন নিজের জগতে।

মনেপ্রাণে আগাগোড়া পুরোদস্তুর ভারতীয় এই মানুষটির বাবা ছিলেন ফরাসি, মরিস বেতেই, চন্দননগরে ফরাসি রাজত্বে কর্মরত। তবে, মা ছিলেন বিশুদ্ধ বঙ্গসন্তান রেণুকা মুখার্জী (বিবাহের পূর্বে)। জন্ম, শৈশব ও প্রাথমিক পড়াশোনা চন্দননগরেই। পরে কিছুদিন পাটনায় কাটিয়ে পড়াশোনার জন্যই কলকাতায় স্থানান্তর। কিন্তু,  ছুটিছাটায় বারেবারে চন্দননগরে আসা প্রায় নিয়ম করেই। সেখানে তাঁর দিদিমার বাড়ি। আর বাবাও থাকতেন চন্দননগরে অবসর পর্যন্ত।

তাঁর মা ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা মহিলা এবং মূলতঃ তাঁর উদ্যোগেই চন্দননগরে তৈরি হয়েছিল গরীব মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য 'রামমোহন রায় সেবা প্রতিষ্ঠান', যা এখনও কাজ করে চলেছে সমান উদ্যমে। আঁদ্রের দাদা এবং বোন পরেও নানাভাবে যুক্ত ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। দাদা নীলু বেতেই ছিলেন একসময়ের নামী ফুটবল ও হকি খেলোয়াড়।

কলকাতা ছিল আঁদ্রে বেতেই-এর সর্বাপেক্ষা প্রিয় শহর। তুলনামূলক ভাবে তখনকার চন্দননগর ছিল অনেক ছোট  প্রায় মফস্বল শহর, "There were very few places to go to in Chandannagar... In our town, one saw only cycle rickshaws and horse carriages but no buses, except for the ones that ran along the Grand Trunk Road on their way to Chinsurah or Hooghly..."

তবে, এসব সত্ত্বেও শৈশবের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে অনেক টুকরো টুকরো কথা, খুব সুন্দর বর্ণনা আছে তৎকালীন ফরাসি চন্দননগরের... "There was, of course, the strand within a couple of furlongs of our house where I went for walks in the evening... The strand, in fact, afforded a very pleasant walk, and people came from outside our town to walk along it or sit on its green benches and enjoy the river breeze. But for someone who had lived so close to it from the day of his birth, it had very little novelty.

There were two cinema houses in Chandannagar: Sri Durga Chhabighar, the older one, which was about a furlong away from where we lived and Cinema de France which came up within my sight where a hotel had stood almost directly opposite our home.

Chandannagar in fact enjoyed a certain notoriety on account of its bars because, under French administration, liquor was both cheap and plentiful, and the British employees of the jute mills across the river regularly visited its hotels and bars. I can still hear the languid notes from a piano, or a gramophone record wafted by the breeze on a Saturday afternoon from the Caledonian Hotel, separated from our house by only a run-down and untenanted garden."

(Excerpts from 'Sunlight in the Garden: A Story of Childhood and Youth' )

সবটাই যে খুব মনোমুগ্ধকর, এমন নয়, তবে অবশ্যই বেশ interesting...

সত্যি করে বলতে গেলে, আঁদ্রে বেতেই-এর মতো মানুষের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র সারস্বত সাধনায় নিমগ্ন থাকা, কোনো ধরনের আত্মপ্রচার ছাড়া, এযুগে একেবারেই অচল এবং ভীষণ ভাবেই অসঙ্গতিপূর্ণ।

জীবিতকালে ২০০৫ সালে 'পদ্মভূষণ' অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত হওয়া ছাড়া সেভাবে জনসমক্ষে বিশেষ এসেছেন বলে মনে হয় না। অবশ্য, তিনি নিজেও তো সম্ভবতঃ তাই চেয়েছিলেন।

বস্ততঃ, চলেও গেছেন প্রায় নিঃশব্দে, কোথাও কোনো 'হেডলাইন' ছাড়াই। সারা জীবন তিনটে জিনিস থেকে সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় দূরে থেকেছেন, ১) আত্মপ্রচার, মানে নিজের ঢাক নিজেই বাজানো বা অপরকে দিয়ে বাজানোর ব্যবস্থা করা, ২) মিডিয়া, এবং ৩) কোনো না কোনো গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি, বাম, ডান বা মধ্যপন্থী যাই হোক!

এই ত্রয়ীর ব্যতিরেকেও আঁদ্রে বেতেই নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন, অন্তত বিদগ্ধ সমাজের মননে; যা আজকের দিনের প্রেক্ষিতে সত্যি করেই অতি একান্ত অসম্ভব...