আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

প্রবন্ধ

কেন্দ্রীয় বাজেট: প্রতিশ্রতি ও রূপায়নের সালতামামি

গৌতম সরকার


২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে মূল তিনটি স্তম্ভ বা কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলি হল - টেকসই ও দ্রুতগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ, এবং সম্পদ ও সুযোগের ক্ষেত্রে সার্বজনীন যোগদান নিশ্চিতকরণ। এটা অনস্বীকার্য এই কর্তব্যগুলোর মূল ভিত্তি হল বিবিধ সামাজিক প্রকল্পের সফল রূপায়ণ ও বাস্তবায়ন, দেশের যুবশক্তির সুষ্ঠু ও সর্বাত্মক ব্যবহার, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণ ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। অথচ মাননীয়া অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের সওয়া একঘণ্টার বাজেট ভাষণে কর্তব্য ও কাজে ভীষণভাবে বৈপরীত্য চোখে পড়ল। গতবারের মতো এবারও একই ছকে 'ভবিষ্যত ভারত', 'দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধি', 'বিনিয়োগ বান্ধবের' মতো প্রতিশ্রুতিগুলির পুনরাবৃত্তি হলেও, এটা অনস্বীকার্য যে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট গরীব ও মধ্যবিত্তের নয়, অনেক বেশি কর্পোরেট দরদী। সেটা প্রতিফলিত হয়েছে ধনী কর্পোরেটদের একাধিক কর ছাড় আর উৎসাহ ভাতা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে। যদিও এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়, বিজেপি জমানায় কর্পোরেট ক্ষেত্রকে তোয়াজ করা এক স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে পর্যবসিত হয়েছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, স্বাধীনোত্তরকালে এই প্রথমবার (২০২৫-২৬ বর্ষে) আয়কর আদায়ের (১৪.৬৬ লক্ষ কোটি টাকা) তুলনায় কর্পোরেট কর আদায় (১২.৩১ লক্ষ কোটি টাকা) কম হয়েছে। এবারেও তার অন্যথা হবেনা বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। বাজেটে এই সেক্টরকে বিবিধ সুবিধা ও উৎসাহ ভাতা দেওয়ার সাথে ন্যূনতম বিকল্প কর (মিনিমাম অল্টারনেটিভ ট্যাক্স) ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ শতাংশ করা হয়েছে। এখন এই ঘাটতি মিটবে কীভাবে? এর জন্য আছে আমজনতা, যাদের গত অর্থবর্ষে জিএসটি এবং আয়কর বাবদ ২৮.৭ লক্ষ কোটি টাকা গুনতে হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্প ও এবারের বাজেট

২০২৬ সালের বাজেটের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক ভিডিও বার্তায় দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এবারের বাজেট 'মেক ইন ইন্ডিয়া' এবং 'আত্মনির্ভর ভারত'-এর মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগগুলোকে আরও গতি দেবে। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগকে উৎসাহ দিতে অভাবনীয় সহায়তার আশ্বাস এই বাজেটে রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় স্তরে উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছতে পারবে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, এই পদ্ধতিতে 'লোকাল ফর গ্লোবাল ক্ষমতায়ন' ঘটবে। অথচ এবারের বাজেট পর্যালোচনা করলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে অনেকটাই মেলেনা। শিল্পী ও কারিগরদের জন্য 'পি এম বিশ্বকর্মা যোজনা'য় বরাদ্দ বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য কোনওরকম সামাজিক সুরক্ষা কিংবা আর্থিক নিরাপত্তার কথা বাজেটে উল্লেখ নেই। গ্রামীণ শিল্প বিকাশে 'মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজ যোজনা'র কথা বলা হলেও নজরকাড়া বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়নি।

কৃষি ও এবারের বাজেট

প্রধানমন্ত্রী বাজেট প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, সরকার এই বাজেটে কৃষি, দুগ্ধ উৎপাদন ও মৎস্য পালনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এছাড়া নারকেল, কাজু, কোকো এবং চন্দন কাঠের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা হয়েছে। তাঁর মতে পশুপালন ও মৎস্য চাষে বিশেষ উৎসাহদান গ্রামাঞ্চলে যথেষ্ট কর্মসংস্থানে সাহায্য করবে। এই বাজেট স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে আর্থিকভাবে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলবে। কৃষিক্ষেত্র বর্তমান ও ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করে গ্রামাঞ্চলের কৃষক ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। তবে বাস্তব অন্য কথা বলছে।

এবারের বাজেটে কৃষি ও কৃষকের কথা উল্লেখ করা হয়নি বললেই চলে। কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ ১.৪০ লক্ষ কোটি টাকা গতবারের তুলনায় ৫.৩ শতাংশ বেশি হলেও, ২০২৫-২৬ সালের সংশোধিত হিসাবের তুলনায় যৎসামান্য। অর্থমন্ত্রী মুখে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি 'অবশ্য কর্তব্য' বলে স্বীকার করেছেন, কিন্তু বাজেটে কৃষি গবেষণা ও কৃষি শিক্ষায় বরাদ্দ গত বাজেটের ১০,২৮১ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৯,৯৬৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। শুধু তাই নয় ছোট ও প্রান্তিক চাষীদের যন্ত্রণা বাড়িয়ে রাসায়নিক সারে ভরতুকি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ কর্মসংস্থানে পূর্বতন 'মনরেগা' কিংবা নতুন 'জি. রামজী' প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো তো হয়ইনি, উল্টে হিসেবে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। ভারতের ৫২ শতাংশ কৃষক ঋণগ্রস্ত, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রকৃত আয় বাড়ানোর কোনও সুনির্দিষ্ট পথের সন্ধান এই বাজেটে নেই। উল্টে অর্থমন্ত্রী ঋণ গ্রহণের সক্ষমতাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হিসেবে দেখিয়ে জনগণকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা চালিয়েছেন।

যুবশক্তি ও এবারের বাজেট

প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদির ভাষায়, ছকভাঙা সংস্কারমুখী এই বাজেট ভারতের সাহসী ও প্রতিভাবান যুব সম্প্রদায়ের আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করে তুলবে। অন্যদিকে শ্রীমতী নির্মলা সীতারমন তাঁর ভাষণে এবারের বাজেটকে 'যুবশক্তির বাজেট' বলে উল্লেখ করেছেন। সীতারমণের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই বাজেট সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবক, সৃজনশীল এবং নেতৃত্বদানের ক্ষমতাসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। দেশের যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে মোদি জানিয়েছেন, প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপে পাঁচটি মেডিক্যাল হাব গড়ে তোলা হচ্ছে যেখানে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে পেশাদার কর্মী তৈরির প্রয়োজনীয় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া অডিও ভিজ্যুয়াল গেমিং, পর্যটন ও 'খেলো ইন্ডিয়া মিশন'-এর মতো একাধিক ক্ষেত্রে প্রসারণ ঘটিয়ে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এখন দেখা যাক বাজেটে যুব জনশক্তির জন্য ঠিক কি কি প্রস্তাবনা আনা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই 'যুবশক্তির' কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শেষ করলেন 'শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ' স্থায়ী কমিটির মেয়াদ ২০৪৭ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণার মধ্যে দিয়ে। সমস্যা হল অর্থমন্ত্রী যেটা বুঝেও না বোঝার ভান করছেন সেটা হল, দেশের বেকার যুবকেরা স্থায়ী এবং ভদ্রস্ত কাজ চায়, কোনও সুদূর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায়না। গত বছরের বাজেটে খুব ঘটা করে 'পি. এম. ইন্টার্নশিপ', 'পি. এম. উচ্চতর শিক্ষা অভিযান' ঘোষণা করা হয়েছিল। 'পি. এম. ইন্টার্নশিপ' প্রকল্পে দেশের শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানিতে ১ কোটি তরুণ-তরুণীকে ১২ মাসের ইন্টার্নশিপের সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা হয়েছিল। নির্বাচিতদের মাসিক ৫ হাজার এবং এককালীন ৬ হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১০,৮৩১ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে খরচ হয়েছে মাত্র ৫২৮ কোটি টাকা। এরপরেও অর্থমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী সবাইয়ের দাবি বর্তমান সরকারের বাজেট হল 'দেশের তরুণদের উন্নয়নের পথ দেখানোর বাজেট'।

নারীর ক্ষমতায়ন ও এবারের বাজেট

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দাবি এই বাজেটে মহিলাদের ক্ষমতায়ন প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে বলেছেন, বর্তমানে ২০ কোটির বেশি মহিলা বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণে বাজেটে মহিলা নেতৃত্বাধীন এবং মহিলা পরিচালিত স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মহিলাদের শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করতে প্রতিটি জেলায় একটা করে ছাত্রীদের হোস্টেল তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এগুলোই সব! এগুলো হলেই নারী ক্ষমতায়ন সম্পূর্ণ হয়ে যাবে?

বিরোধীদের কথায়, বাজেটে নারী ক্ষমতায়নের বুলিই সার, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় 'নারী ক্ষমতায়ন' শব্দবন্ধ শোনা গেলেও এই বাজেটে মহিলাদের দুর্দশা কোনও অংশেই কমবে না, এটা খুবই স্পষ্ট। কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের নিরাপত্তা বা আইনি সহায়তা, শ্রমজীবী ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের জন্য কোনও সুবিধার ঘোষণা নেই। মহিলা ও মহিলা চালিত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর জন্য ঋণ ও প্রকল্পের ঘোষণা হলেও স্থায়ী কাজের কোনও সুলুকসন্ধান দিতে পারেননি অর্থমন্ত্রী। আয়করে ছাড় বা 'সম কাজে সম মজুরি' সংক্রান্ত কোনও ঘোষণাও নেই যেটা মহিলাদের উৎসাহিত করবে। এককথায় লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও মহিলাদের বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও গরীব মহিলাদের আর্থিক অবস্থা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

মা ও শিশু পুষ্টি সংক্রান্ত প্রকল্পে আগের বরাদ্দই বজায় আছে, স্কিল ডেভলপমেন্টে মহিলাদের অংশগ্রহণের কথা বলা হলেও উচ্চশিক্ষায় আলাদা করে কোনও সুযোগ সুবিধার ঘোষণা হয়নি। মহিলা ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রকের বরাদ্দ মোট বাজেট ব্যয়ের ০.৫৩ শতাংশ থেকে কমে ০.০৫ শতাংশ হয়েছে। আইসিডিএস, আশা, অঙ্গনওয়াড়ি এবং গৃহ সহায়িকাদের মতো মহিলাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান প্রকল্পগুলোতে বিশেষ কোনও ব্যয়বৃদ্ধির ইঙ্গিত বাজেটে নেই। 'ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি'র পক্ষ থেকে বাজেটের তীব্র নিন্দা করে বলা হয়েছে, এই বাজেট মহিলাদের দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়াকে উপেক্ষা করেছে এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি, আদিবাসী সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মহিলাদের জন্য ন্যায্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে।

শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও এবারের বাজেট

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বারংবার মেডিক্যাল হাব তৈরির কথা উল্লেখ করেছেন, উচ্চশিক্ষা প্রসারে জেলায় জেলায় ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল তৈরির ঘোষণাও দিয়েছেন, যুব সমাজের স্বপ্নপূরণের জাদুকাঠি সন্ধানের পথ বাতলাবেন বলে আশ্বাস জুগিয়েছেন, কিন্তু সবকটাই যে কথার চমক সেটা বাজেটটা একবার ঠিক করে দেখলেই বোঝা যায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটি ক্ষেত্রেই কোনও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নেই। যখন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরাই ২০১৭ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি মেনে স্বাস্থ্য খাতে মোট জিডিপির ২.৫ শতাংশ ব্যয়ের সওয়াল করছেন, তখন এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ০.৫ শতাংশ অর্থাৎ ১,০৪,৫৯৯ কোটি টাকা। 'অ্যালায়েড হেলথকেয়ার প্রফেশনালস' প্রকল্পে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার ঘোষণা হয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক তৈরির জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হল, সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামোর উন্নয়নে কোনও কিছু ব্যয়বরাদ্দ না করে স্বাস্থ্য সহায়ক তৈরি করে মানুষের কোন উপকারে লাগবে, সেটা সরকারের ভাবা উচিৎ।

শিক্ষার অবস্থাও তথৈবচ, এই খাতে বরাদ্দ হয়েছে ১,৩৯,২৮৯ কোটি টাকা, জিডিপির ০.৬ শতাংশ। অথচ ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি আরোপের সময় ঢাক-ঢোল-সোহরতে ঘোষণা করা হয়েছিল, শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য এই খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়বরাদ্দ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে সমবর্তী বা যুগ্ম তালিকায় থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষার দায় রাজ্যগুলির ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে।

প্রতিবছর নতুন বাজেট ঘোষণা হয়, নতুন প্রতিশ্রুতি, নতুন শপথ নিয়ে আসে, কেউ লাভবান হয়, কেউ খুশি, কেউ অসন্তুষ্ট। সমস্যা হল ঘোষণার পর বছর জুড়ে সেইসব পরিকল্পনা ও প্রকল্প কতটা বাস্তবায়িত হল, তার কোনও সরকারি ঘোষণা জনসাধারণকে দিতে বাধ্য নন দেশের সরকার। তাই প্রতিশ্রুতি ও কাজের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক থেকে যায় সেটাকে গোপন রাখা যায়। গত বাজেটে ঘোষিত হয়েছিল 'জল জীবন মিশন' প্রকল্প, যেখানে গ্রামীণ ভারতে বাড়ি বাড়ি নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও খরচ হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া আরও অন্যান্য সামাজিক প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ খরচের ঘোষণা হয়েছিল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই অর্থের তুলনায় অনেক কম খরচ করেছে মোদি সরকার। 'পি. এম. পোষণ' অর্থাৎ মিড-ডে মিল প্রকল্পে প্রতিশ্রুত অর্থ খরচ হয়নি। 'প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা'র গ্রাম ও শহর প্রকল্প কোনো ক্ষেত্রেই ঘোষিত অর্থ খরচ হয়নি। শহরের জন্য প্রাথমিকভাবে ঘোষণা হয়েছিল ১৯,৭৯৪ কোটি টাকা, পরে তা সংশোধন করে ৭,৫০০ কোটি টাকা করা হয়। গোপন কথা হল, এই সংশোধনের বিষয়টি সাধারণ মানুষকে অফিসিয়ালি জানানোর দায় সরকারের নেই। তবে শেষমেশ ৭,৫০০ কোটিও নয়, এই খাতে আদতে খরচ হয় মাত্র ৩,৫০০ কোটি টাকা। গ্রামীণ ক্ষেত্রেও বরাদ্দের অনেক কম মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তফসিলি জাতিদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে চালু হয়েছিল 'প্রধানমন্ত্রী অনুসূচিত জাতি অভ্যুদয় যোজনা'। সেখানেও বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ হয়নি। গ্রামীণ সড়ক তৈরির জন্য 'প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা'র বরাদ্দকৃত ১৯ হাজার কোটি টাকার মধ্যে খরচ হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা।

তাই সাধু সাবধান! ঘোষিত বাজেটই কিন্তু শেষ কথা নয়। সেই বাজেটে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে সেটা জানার অধিকারও একজন নাগরিকের আছে এটা আমরা যত সত্বর উপলব্ধি করবো ততই মঙ্গল।