আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২
সমসাময়িক
আসামের মুখ্যমন্ত্রীর ঘৃণাভাষণ
ধর্মীয় বিভাজনে নিয়মিত উস্কানি দেওয়ার ব্যাপারে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বরাবরই স্বচ্ছন্দ। মুসলমান বিশেষত বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে আকথা-কুকথা বলতে তিনি অভ্যস্ত। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় নিয়মিত চালানো হয় তাঁর উন্নয়নের বুলডোজার। এবার সরাসরি সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিনাশ করার বার্তা দিচ্ছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী এবং তা প্রকাশ্যে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ৭ ফেব্রুয়ারি মুসলিম সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশিদের প্রতি তাঁর ধারাবাহিক ঘৃণাপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক বার্তায় নতুন এক মাত্রা যোগ করলেন।
একটি ভিডিওর স্থিরচিত্রে দেখা গেছে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা টুপি পরা দুই ব্যক্তির দিকে রাইফেল তাক করে রয়েছেন। টুপি ও দাড়ি তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট। যে ভিডিও থেকে এই ছবি নেওয়া হয়েছে, সেই ভিডিও শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে আসাম রাজ্য বিজেপি। ভিডিওর ক্যাপশন ছিল 'পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শট'। এবং উচ্চারিত হয় 'বাংলাদেশিদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই' এবং 'বিদেশিমুক্ত আসাম'।
এই ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে বিজেপি তাদের 'এক্স' (সাবেক ট্যুইটার) হ্যান্ডেল থেকে পোস্টটি মুছে ফেলেছে। এবং দলের আইটি সেলের এক কর্মীকে বিদায় করে দিয়েছে।
বিরোধী দলগুলি এই ভিডিওকে 'গণহত্যার প্রস্তুতি' বলে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে সংখ্যালঘুদের সরাসরি (পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক) হত্যা করাকে এখন বড় করে প্রচার করা হচ্ছে। এই ভিডিওর মাধ্যমে কার্যত গণহিংসা এবং গণহত্যার ডাক দেওয়া হয়েছে। এটি ফ্যাসিবাদী শাসনের আসল চেহারার প্রতিফলন। এরা দশকের পর দশক ধরে এই ঘৃণা লালন করেছে। গত ১০ বছরে এই বিদ্বেষকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি দশকের পর দশক ধরে এই ঘৃণা লালন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং তাঁর দল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার করতে এবং মুসলিমদের নিশানা করে সহিংসতার ডাক দিয়ে অনুপ্রবেশকারী বলে ভয় দেখাচ্ছে। রাজ্যের বিরোধী দলগুলির মতে আসামে কোনো বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তকে গ্রেপ্তার করে তাঁর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি এবং জনসমক্ষে সহিংসতার ডাক দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবিলম্বে তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে।
তবে এই ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো কীভাবে সুরক্ষিত হবে, সে সম্পর্কে কোনো দলই নির্দিষ্টভাবে কোনো প্রস্তাব দেয়নি। বা এখনও পর্যন্ত কোনো কর্মসূচিও ঘোষণা করেনি।
অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে আসামেও আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই রাজ্য স্তরের নির্বাচন হতে চলেছে। তার আগে প্রতিবারের মতোই হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এবং বিশেষত বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের মাত্রা বাড়িয়েছেন। হিমন্ত ধারাবাহিকভাবে মুসলিম সমাজ বিশেষত বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাপূর্ণ ভাষণ দিয়ে চলেছেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই করা হয়নি।
যেমন গত জানুয়ারি মাসেই বিশ্ব শর্মা বলেছিলেন, ভোটার তালিকা থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ 'মিয়া' অর্থাৎ বাঙালি মুসলিম ভোটারকে বাদ দিতে হবে। একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে মুসলিম সমাজের মানুষকে আরও কষ্টের মধ্যে ঠেলে দেওয়া তাঁর কাজ। একই সঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এ-ও বলেছিলেন যে মিয়া (মুসলিম) ভোটারদের ভারতে নয় বাংলাদেশে গিয়ে ভোট দেওয়া উচিত।
বাঙালি মুসলিম ভোটারদের কাছেও যে ভারতের নাগরিকত্বের যথাযথ প্রমাণ রয়েছে, সে বিষয়টির দিকে আলোকপাত না করে সরাসরি হিমন্ত একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে আক্রমণ করছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আসামের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, আসামের মুসলিম সমাজ ক্রমশ বিত্তবান হয়ে উঠছে, যা 'আসামের সাধারণ মানুষের আত্মসমর্পণের পরিচায়ক'। অর্থনৈতিকভাবে মুসলিম সমাজের স্বাবলম্বী হওয়াকে তিনি রাজ্যের জন্য একটি হুমকি বলেও চিহ্নিত করেছিলেন। এর আগেও হিমন্ত নির্দিষ্ট সমাজ ও সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে একাধিক মন্তব্য করেছেন। এরপরও বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে পারেননি। ভারতের বিচারব্যবস্থাও সেভাবে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেয়নি।
আসামের জল-জমি-জঙ্গল বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার কাজে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সিদ্ধহস্ত। শিল্প গড়ে তোলার নামে যেসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তার অধিকাংশেই বসবাস করতেন সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। বুলডোজার দিয়ে তাঁদের বাসস্থান, ক্ষেত-খামার-বাগিচা ধূলিসাৎ করে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
আসামের ইতিহাসে বিভাজনের রাজনীতি নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশকে হয়েছিল বাঙালি বিদ্বেষী আন্দোলন। ১৯৮০-র দশকে গড়ে উঠেছিল অসমীয়া অস্মিতা রক্ষার আন্দোলন। দুই আন্দোলনের শেষে দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ নিরীহ মানুষ। আর এবার ধর্মীয় বিভাজন শুরু করার চেষ্টা হচ্ছে। আশার কথা রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কার তেমন সাড়া ফেলেনি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ময়মনসিংহ (বর্তমানে বাংলাদেশের জেলা) থেকে কৃষিজীবী মানুষদের রীতিমতো আমন্ত্রণ জানিয়ে আসামে নিয়ে আসা হয়। কারণ তাঁরা বিভিন্ন ধরনের ধান চাষের ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ। আসামের বাসিন্দাদের সেই দক্ষতা ছিল না বলে ব্রিটিশ সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছিল। দেড়শো বছর পর সেই কৃষিজীবীদের উত্তরসূরীদের বহিরাগত বলে দাগিয়ে দেওয়া মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। তার উপরে এঁদের অনেকেই আবার ১৯৬০-এর বাঙালি বিরোধী আন্দোলনের সময় অসমীয়া ভাষাকে নিজেদের মাতৃভাষা বলে ঘোষণা করেন। জান-জমি-সম্পত্তি বাঁচানোর জন্য এ ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না।
দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে কয়েক প্রজন্মের বাঙালি কৃষিজীবীদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগ আনতে না পেরে এবার ধর্মীয় মৌলবাদীরা সরাসরি ধর্মীয় বিভাজনের পথ বেছে নিয়েছে। এবং দিন দিন তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ প্রকট হয়ে পড়েছে।
এই সঙ্কটের সময় দুই বামপন্থী দল আশার আলো জ্বালিয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে সিপিআই(এম) এবং সিপিআই। দুই দলের পক্ষে আইনজীবী নিজাম পাশা দায়ের করেছেন আবেদন। আবেদনে বলা হয়েছে, "বিপজ্জনক বক্তব্য রাখছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।... সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ জরুরি।"
আদালতে লড়াই করে এই ভয়ঙ্কর আক্রমণ সাময়িকভাবে রুখে দেওয়া গেলেও তা মোটেও স্থায়ী সমাধান সূত্র নয়। জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে সমগ্র আসামবাসী মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলেই এই আধিপত্যবাদী আচরণ চিরতরে স্তব্ধ হতে পারে।