আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের নির্বাচন


শেষ পর্যন্ত সমস্ত রকম আশঙ্কা-উদ্বেগ দূরে সরিয়ে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটের উপর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। ভোটের হারও মোটামুটি ভালো ছিল। তবে ভোট দিলেও আসলে কতটা বাস্তব পরিবর্তন বা লাভ পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে অনেকের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। এই আস্থার ঘাটতির কারণেই হয়তো ভোটের হার আরও বেশি হয়নি। তবে মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে।

বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি অর্থাৎ বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের জনাদেশ পেয়েছে। এই নির্বাচনে কোন দল বা জোট জিতল, কোন দল/জোট কত ভোট পেল, কারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেল না ইত্যাদি নিয়ে নানা রকম বিশ্লেষণ করা যেতেই পারে, তবে এই মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হল, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি জিততে পারেনি বা ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছে। আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল তথাকথিত ছাত্র অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের প্রবল বিক্ষোভে দেড় বছর আগে শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের পর বাংলাদেশের বুকে যে চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা তৈরি হয়েছিল এবং তার পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল যে মুসলিম মৌলবাদীরা, বাংলাদেশের মানুষ তাদের সমর্থন করেননি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলে যারা বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষের বধ্যভূমি বানাতে চেয়েছিল, নির্বাচকমণ্ডলী তাদের ক্ষমতার অলিন্দে ঢুকতে দেননি। যে ছাত্রসমাজ হাসিনা সরকারবিরোধী কার্যত গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল সেই ছাত্ররা মৌলবাদীদের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে পৃথক দল গড়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও কোনও সুবিধা করতে পারেনি। অসাম্প্রদায়িক মানুষ যারা গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তারা মৌলবাদী জামায়েতের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের ঘনিষ্ঠতাকে মেনে নেননি।

বাংলাদে‍‌শের গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক ও শান্তি সম্প্রতি সৌহার্দকামী মানুষের আপাত দুশ্চিন্তামুক্তি ঘটেছে। একই সঙ্গে ভারত সহ প্রতিবেশী দে‍‌শের ও অন্যান্য দেশের উদার মনোভাবাপন্ন গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে যারা বিভাজন চায় না, সব মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখে সেই মানুষ তারা যে দেশেরই নাগরিক হোন না কেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে খুশি।

বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও এটা মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয়নি। মৌলবাদী জামায়েতে-ইসলামীকে (সাধারণ ভাষ্যে জামায়েত) আটকানোর জন্য আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটা বড় অংশের ভোট বিএনপি'র দিকে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে এই নির্বাচন অনেকটাই ধর্মান্ধতা-যুক্তিবাদ, সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক, গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র এমন বিভাজনকে স্পষ্ট করেছে।

এখন দেখতে হবে বিএনপি'র সরকার বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতার ভিতকে মজবুত করতে কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তবে কাজটা যে খুব সহজ হবে না সেটা বলাই বাহুল্য। মনে রাখতে হবে জামাত পরাজিত হলেও তাদের আসন ও ভোটের হার অনেক বেড়েছে। তাছাড়া গত দেড় বছর ধরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অসংবিধানিক সরকার দেশে নৈরাজ্য বিস্তার, মুসলিম মৌলবাদীদের যথেচ্ছাচারে কোনো আপত্তি করেনি। অর্থাৎ সরকারের কাছ থেকে মৌলবাদী শক্তির প্রসারে সবচেয়ে বেশি সহায়তা এসেছিল। তাই ইতিমধ্যে মৌলবাদীরা যতটা শেকড় ছড়িয়েছে তাকে সহজে উপড়ে ফেলা যাবে কি? বিএনপি যে কোনও না কোনোভাবে মৌলবাদীদের সঙ্গে আপস করবে না সেটাও জোর দিয়ে এখনই বলা যাবে না। কারণ, ইতিপূর্বে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে সরকার পরিচালনা করেছিল। অন্যদিকে প্রচারে থাকলেও বামপন্থীরা বিশেষ কোনও সুবিধা করতে পারেনি। বামপন্থীদের প্রভাব বাড়লেও মৌলবাদীদের ঠেকানো মোটেও সহজ কাজ নয়। মৌলবাদী দাপটের ভয়ে অসাম্প্রদায়িক দলও মহিলাদের প্রার্থী করতে চায়নি। এমন কি বিএনপি-ও তাদের জনপ্রিয় নেত্রীদের প্রার্থী করেনি। তাঁরা নিরপেক্ষ (স্বতন্ত্র) হিসেবে দাঁড়িয়ে অনেকে জয়ী হয়েছেন। প্রথম ধাপে এ এক বিরাট জয়, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক মানুষকে এবার আরও বড় লড়াই করতে হবে।

নির্বাচনের ফলাফল ভারত বিশেষত পশ্চিমবাংলার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তের ভারত লাগোয়া জেলাগুলিতে জামায়াতের আসনসংখ্যার বৃদ্ধি যথেষ্ট চিন্তার বিষয়। সীমানার এই পারের পশ্চিমবাংলার জেলাগুলিতে আবার হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদের অবাধ বিচরণ। সীমান্ত লাগোয়া দুই দেশের জেলাগুলিতে ধর্মীয় মৌলবাদের এহেন বিচরণ মোটেও স্বস্তিজনক নয়। কাজেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষের দায়িত্ব এখন অনেক বেড়ে গেল। সব রকমের ধর্মীয় মৌলবাদের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপের উপর সদা সতর্ক থাকতে হবে।