আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

বাণিজ্য চুক্তি নয়, আত্মসমর্পণ!


ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের পাতায় সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের যে বর্বর বিবরণ লেখা রয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি ঘটালো মোদী সরকার, ট্রাম্প তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের মানুষের শোষণের বিনিময়ে যে প্রাচুর্য অর্জন করে তার অন্যতম স্থপতি ছিল তাদের বাণিজ্য নীতি। ভারত থেকে কাঁচামাল (তুলো ইত্যাদি) তারা আমদানি করত ইংল্যাণ্ডে, আর সেখানে তৈরি কাপড় ও অন্য পণ্য তারা বিক্রি করত ভারতে। ভারতে রপ্তানি করা ব্রিটিশ পণ্যের উপরে কোনো আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ) বসানো হতো না। কিন্তু ভারতে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের উপরে চড়া আমদানি শুল্ক বসানো হতো ইংল্যাণ্ডে। অর্থাৎ, ইংল্যাণ্ডের পণ্য বিনা বাধায় ভারতে চলে আসত। কিন্তু ভারতের শিল্পপণ্য ইংল্যাণ্ডে প্রবেশাধিকার পেত না, বিশাল পরিমাণ ট্যারিফের জন্য। সেই সময় ভারত একটি পরাধীন দেশ ছিল। লন্ডন থেকে নির্ধারিত হতো ভারতের আর্থিক নীতি। কিন্তু এখন ভারত একটি স্বাধীন দেশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী স্বঘোষিত 'বিশ্বগুরু'। কিন্তু সেই মোদী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তার থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্যনীতির বিশেষ কোনও তফাত নেই।

সদ্য স্বাক্ষরিত এই বাণিজ্য চুক্তিতে বলা হয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতে উৎপাদিত পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করবে। তদুপরি যেই অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক ট্রাম্প ভারতের উপরে আরোপিত করেছিলেন, রাশিয়া থেকে খনিজ তেল আমদানি করার জন্য, তা সরিয়ে দেওয়া হবে। অতএব, মোদী ভক্তরা ঢাক পেটাতে শুরু করেছে যে এই বাণিজ্য চুক্তি মোদীর আরেকটি সাফল্য হিসেবে যেখানে তিনি ট্রাম্পকে নাকি বাধ্য করেছেন ভারতের উপর চাপানো আমদানি শুল্ক কমাতে। তথাকথিত মিডিয়া এই গল্প মানুষকে লাগাতার বলে চলেছে। আসলে এই ১৮ শতাংশ আমদানি শুল্কের উলটো দিকে রয়েছে ভারতের এই প্রতিশ্রুতি যে আমেরিকায় উৎপাদিত পণ্যের উপরে ভারত আর কোনো আমদানি শুল্ক বসাবে না। অর্থাৎ, ভারতের উপরে আমেরিকা ১৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসালো এবং আমেরিকায় তৈরি পণ্যের উপরে ভারত কোনো আমদানি শুল্ক বসালো না। ভারতের পণ্য আমেরিকায় ঢুকতে হলে মোটা কর দিতে হবে ট্রাম্প সরকারকে। আর আমেরিকার পণ্য ভারতে বিনা বাধায় চলে আসবে। এই হল মোদী সরকারের বিদেশ তথা বাণিজ্য নীতির সাফল্যের নমুনা!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪-২৫ সালে ভারতের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা ভারতের মোট রপ্তানির ১৯ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। অর্থাৎ ভারতের আমেরিকায় রপ্তানির তুলনায় সেই দেশ থেকে আমদানি অনেক কম। ট্রাম্প তথা মার্কিন প্রশাসন এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চায়। অতএব তারা ভারত থেকে আমদানি কমাতে চায়, তাই ১৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক, আর চায় যে ভারতের বাজার তাদের পণ্যের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হোক। অতএব, ভারত আমেরিকাজাত পণ্যের উপর শূন্য আমদানি শুল্ক চাপাবে। মুক্ত বাণিজ্যের এহেন পরিভাষা একমাত্র ট্রাম্প এবং মোদীর মস্তিষ্কপ্রসূত হতে পারে!

আমেরিকা এখন থেকে ভারতে কৃষি পণ্য রপ্তানি করবে বিনা কোনো বাধায়। আপেল, তুলোজাত পণ্য, বিভিন্ন প্রকারের বাদাম, ভুট্টা, বিভিন্ন প্রকারের ফল, সোয়াবিন তেল, মদ ও সুরা, ইত্যাদি পণ্য ভারতে বিনা শুল্কে আমদানি করা হবে। ভারতের কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে আমেরিকার কৃষি ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ভারতের কৃষি মূলত ছোট ও মাঝারি চাষি নির্ভর। আমেরিকার কৃষি হয় বিশাল বড়ো বড়ো ক্ষেতে যা প্রায় সম্পূর্ণভাবে যন্ত্র দ্বারা পরিচালিত। শুধু তাই নয়, মার্কিন সরকার কৃষিক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়। অতএব, আমেরিকার কৃষিপণ্যের সঙ্গে ভারতের ছোট ও মাঝারি কৃষক দ্বারা উৎপাদিত পণ্যের পাল্লা দেওয়া মুশকিল। অতএব, এই বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে মোদী সরকার দেশের কৃষকদের বিপদের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কৃষকদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হতে চলেছে।

অন্যদিকে, ভারতের কাপড় শিল্পের অন্যতম প্রধান বাজার হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আপাতত, ট্রাম্প সরকার বাংলাদেশ-জাত কাপড়ের উপরে শূন্য আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে, যেখানে ভারতের উপরে এই শুল্কের পরিমাণ ১৮ শতাংশ। অতএব ভারতের কাপড় শিল্পের উপর বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। যদি এই শুল্ক নীতি বজায় থাকে তাহলে দেশে বেকারত্ব ও রোজগারের সমস্যা আরো বাড়বে।

এই বাণিজ্যনীতির ঘোষণাপত্রে বলা আছে যে ভারত আমেরিকা থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য কিনবে। আপাতত, প্রত্যেক বছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বাড়াবে ভারত। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এই ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। ভারত সরকার সমগ্র দেশবাসীর তরফে কী করে এই ঘোষণা করতে পারে যে আমরা হঠাৎ বেশি করে মার্কিন পণ্য কিনব! ভারতের বাজারকে মার্কিন সরকারের কাছে বাণিজ্য নীতির নামে বিক্রি করে এসেছে মোদী সরকার।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামনে মাথা নোয়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু হচ্ছে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করার বিষয়টি। ট্রাম্প ক্রমাগত বলে গেছেন যে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনবে না। এবং এখন বলছেন যে তাঁকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে রাশিয়া থেকে তেল কেনা ভারত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেবে। এর ফলে ভারতের উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক সরিয়ে নিয়েছে ট্রাম্প সরকার। কিন্তু ভারতের সার্বভৌমত্বের উপরে এই নীতি এক বড় আক্রমণ। ভারত কোন দেশ থেকে তেল কিনবে বা কিনবে না, তার একমাত্র নির্ধারক হওয়া উচিত ভারতের মানুষের স্বার্থ। রাশিয়া থেকে ভারত অনেক কম দামে তেল কিনেছে বিগত বেশ কিছু বছর। এই তেল কেনা আমেরিকার চোখ রাঙানির ফলে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে ভারতের আমদানিকৃত তেলের দাম বাড়বে, যার বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকে। রাতারাতি এই তেল কেনা বন্ধ হয়ে গেলে ভারত তেল কিনবে কোথা থেকে? কেন, আমেরিকা থেকে! এই যে প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানি বাড়াতে হবে বলে বলা হয়েছে চুক্তিতে, তার একটি ভাগ আসবে আমেরিকা থেকে তেল আমদানি করে। ট্রাম্প আগেই বলে রেখেছেন যে ভারতকে মার্কিন অথবা ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে হবে। মুশকিল হচ্ছে যে মার্কিন তেলের দাম রাশিয়ার তেলের থেকে অনেক বেশি। অতএব ভারতের মানুষের উপরে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপবে ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য।

মোদী সরকার এই বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব তথা স্বাধিকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদতলে সমর্পণ করে দিয়েছে। ভারতের জনগণের বিরোধী বাণিজ্য চুক্তিতে সই করে প্রচারের ঝড় তোলা হচ্ছে যে মোদী নাকি আবারও বাজিমাত করে দিয়েছেন। আসলে যেই দল কোনোদিন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সেই ক্রান্তিকালেও লাগাতার সমঝোতা করে চালিয়েছে, তারা যে বর্তমান মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বাধ্য বালক হয়ে থাকতে চাইবে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ভারতের জনগণ নয়, মোদী সরকারের প্রধান চিন্তা ভারতের ধনকুবেরদের স্বার্থসিদ্ধি করা। তা করতে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা নির্দেশিত একটি অসম বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করতেও হয়, তাতেও 'বিশ্বগুরুর' হাত কাঁপে না।

বাম তথা প্রগতিশীল শক্তিসমূহের উচিত অবিলম্বে এই চুক্তির বিরুদ্ধে সার্বিক আন্দোলন গড়ে তোলা। মোদী সরকার যে জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ট্রাম্পকে খুশি করার নীতি নিয়েছে এই কথা জনগণকে বোঝানোর দায়িত্ব নিতে হবে বাম ও প্রগতিশীল শক্তিকে।