আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা ● ১-১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-৩০ মাঘ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

বরুণ বিশ্বাস - এক প্রতিবাদের নাম

অম্বিকেশ মহাপাত্র


দেশভাগ, ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, স্বাধীনতালাভ

পনেরই আগস্ট ১৯৪৭, আমাদের দেশ ভারতবর্ষের প্রায় ১৯০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তি ঘটেছিল; দেশভাগের যন্ত্রণা ও কান্নার মধ্যদিয়ে। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর মানচিত্রে নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারত। পাকিস্তানের দু’টি পৃথক এবং বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড; একটি ভারতের পশ্চিমে, পশ্চিম পাকিস্তান (যার বেশিরভাগের মাতৃভাষা উর্দু) এবং অপরটি ভারতের পূর্বে, পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ (যার বেশিরভাগের মাতৃভাষা বাংলা); দুই ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী ভূতল-দূরত্ব প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার। দেশভাগের ফলে মধ্যবর্তী ভূতল পুরোটাই ভিনদেশ অর্থাৎ ভারতের ভূখণ্ড। দুই ভূখণ্ডের যোগাযোগে কেবলমাত্র আকাশপথ-ই ভরসা! ষোলই ডিসেম্বর ১৯৭১, পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গের মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তির মধ্যদিয়ে দু’টি ভূখণ্ড দু’টি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র; ‘পাকিস্তান’ এবং ‘বাংলাদেশ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানের পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ, দু’টিই আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। একদা এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নাগরিক আমাদের সহ-নাগরিক, ভাই-বন্ধুর মতই ছিল।

ছিন্নমূল শরণার্থী পরিবার ও জীবনসংগ্রাম

স্বাধীনতালাভের সময়কালে সাম্প্রদায়িক এবং ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার মধ্যদিয়ে বাংলাভাষী বাঙালি অধ্যুষিত বঙ্গপ্রদেশ দুই ভাগে বিভাজিত হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে বরুণ বিশ্বাসের মা ও বাবা সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে তথা পূর্ববঙ্গে এবং অপরদিকে বরুণের মামার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। অর্থাৎ স্বাধীনতালাভের কারণে বরুণ এবং বরুণের মামার বাড়ি প্রতিবেশী দুই ভিন্ন রাষ্ট্রে! ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে আর একবার বহু ছিন্নমূল বাঙালি শরণার্থী পরিবারগুলি দলে দলে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় চলে আসেন। সেই সময়কালে বরুণের মা ও বাবা, গীতারানী ও জগদীশ বিশ্বাস তিন সন্তান প্রমিলা, অসিত এবং অরুণকে সঙ্গে নিয়ে এপার বাংলায় চলে আসতে বাধ্য হন।

এপার বাংলায় বরুণের মামাবাড়ি অধুনা উত্তর ২৪ পরগণা জেলার গাইঘাটা থানার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাঁচপোতায় চলে আসেন। মামাবাড়ির একচিলতে উঠানে ঘর বেঁধে, নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেন তিন সন্তানের জননী ও জনক, গীতারানী ও জগদীশ বিশ্বাস। পরবর্তী সময়কালে বরুণ এবং অনিতা পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করে। পাঁচ সন্তান সহ গীতারানী ও জগদীশ বিশ্বাসের জীবনপণ লড়াই কেবলমাত্র টিকে থাকার জন্য। সেই লড়াইয়ের ফসল ফলতে শুরু করে। বিশেষ করে তিন পুত্রসন্তান প্রভূত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়াশোনা করে একে একে চাকরি পায়। বড় পুত্র অসিত এলআইসি-তে চাকরি পাওয়ার পর, ১৯৯৪ সালে পাঁচপোতা নিকটবর্তী সুটিয়া গ্রামে অল্প পরিমাণ জমি-জায়গা কিনে, বাড়ি তৈরি করে নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানা করতে সমর্থ হন, গীতারানী ও জগদীশ বিশ্বাসের পরিবার। অসিত এবং অরুণ চাকরি পাওয়ার পর চাকরি এবং সংসার ধর্ম প্রতিপালনের লক্ষ্যে গ্রাম ছাড়ে। অসিতকে তার নিজের চাকরি এবং স্ত্রীর চাকরির কারণে কলকাতায় বাড়ি করে বসবাস করতে বাধ্য হতে হয়। দুই কন্যা প্রমিলা ও অনিতা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। বরুণের মা ও বাবা বার্ধক্যজনিত কারণে উপার্জনশীল কাজকর্ম থেকে খানিক অবসরগ্রহণ করেন। অপরদিকে বরুণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ থেকে স্নাতকস্তরে বাংলায় সাম্মানিক ডিগ্রি অর্জন করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স অর্থাৎ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে। এবং বামফ্রন্ট সরকার গঠিত পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রথম ব্যাচে পরীক্ষা দিয়ে কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন নিকটবর্তী মিত্র ইন্সটিটিউশন (মেইন)-এ শিক্ষকতায় যুক্ত হয়।

বরুণ বিশ্বাস থেকে মাস্টারদা

২০০১ সাল পরবর্তী সময়কাল। স্থান সুটিয়া। একটি মেয়ে বিয়েবাড়িতে ফুচকা খেতে গিয়ে বলে বসে; "ইসস, কি বাজে খেতে...।" কি এত বড় আস্পর্ধা! ব্যস, বাইকবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটিকে সবক শেখাতে। তারা টেনে নিয়ে গেল কিশোরী মেয়েটিকে পাশের ধান জমিতে...। আরেক ঘটনা, স্বামী-স্ত্রী রিকশা করে যাচ্ছেন। রিকশাওয়ালার সঙ্গে ভাড়া নিয়ে সামান্য মতান্তর হয়েছে। ব্যস, বাইকবাহিনী হাজির। প্রথমেই দম্পতিকে প্রশ্ন, তারা কি বিবাহিত? হলে প্রমাণ কী? প্রমাণ নেই, অতএব ধর্ষণ। ভদ্রমহিলার যোনিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হল বরফের টুকরো। তাঁর নগ্ন দেহের ছবি তোলা হল। পরে এ'ছবি দেদার বিকোবে। কারুর টুঁ শব্দটি করার সাহস ছিল না...! পুলিশ অভিযোগ নিত না। হইহই করে বাড়ছিল হায়নার দল। দাদার অভয়বাণী, যে মেয়েকে ইচ্ছে তাকে তুলে নিয়ে আয়। নিয়ে চল সুখ সাধুর ভিটেতে। সেখানে মজুত অফুরন্ত মদ ও ক্যামেরা। গ্রামে যে কোনও বিবাদ, জমি বা অর্থকরী সংক্রান্ত বিবাদ? নিদান একটাই, ধর্ষণ। অনেক সময় লাঞ্ছিতা মেয়েটিকে তারা বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে যেত। মেয়েটির মা-কে বলে যেত, মেয়েটিকে তাদের মনে ধরেছে। যেন সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। পরের দিন আবার নিয়ে যাবে।

এই নরক গুলজারের নাম সুটিয়া। উত্তর চব্বিশ পরগনার একদম প্রান্তিক গ্রাম। একঘণ্টা হাঁটলেই বাংলাদেশ সীমান্ত। সুটিয়ার উপর দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতী ও যমুনা নদী। ১৯৭১-এর পর থেকে ওপার বাংলা থেকে এসেছে মানুষের ঢল। প্রতি বছর বর্ষাতে সুটিয়া ভেসে যায়। সরকারি, বেসরকারি রিলিফ ফান্ড আসে। এই রিলিফ ফান্ডের দখলদারি নিয়েই উত্থান সুশান্ত চৌধুরী, বীরেশ্বর ঢালি... প্রমুখদের। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং লোকাল লুম্পেনকে পাশে নিয়ে এরা দখল করলেন সুটিয়ার ত্রাণ তহবিল। হুমকি, মারধর, বাইকবাহিনী। নতুন সহস্রাব্দের শুরু থেকে সুটিয়ার নতুন পরিচয় ধর্ষণনগরী। ২০০০ থেকে ২০০৩ অবধি শুধু পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী ধর্ষণের সংখ্যাটি ছিল তেত্রিশ। স্থানীয়দের মতে, আসল সংখ্যাটি ঢের বেশি। উল্লেখ্য, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এলাকার বিধায়ক ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী নেতা মাননীয় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী ছিলেন মাননীয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

ডেনমার্ক নামক কারাগারটি ভেঙে ফেলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন হ্যামলেট। বরুণ বিশ্বাস সুটিয়ার হ্যামলেট। নতুবা আরও বড় কিছু। ফরিদপুর থেকে এসেছিল তার পরিবার। শরীরে দুর্মর তথাকথিত বাঙাল রক্ত। নইলে ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হয়েও কেউ সে চাকরি ছেড়ে দেয়? দিব্যি তো ছিলেন মিত্র ইনষ্টিটিউশনে বাংলার শিক্ষক হয়ে। পারতেন কলকাতায় শিফট করতে, এই পাপনগরী থেকে দূরে থাকতে। আমি-আপনি হলে তাই-ই করতাম। কিন্তু তিনি যে মাস্টারদা...। নিজের উদ্যোগে তৈরি করে ধর্ষণ বিরোধী মঞ্চ, ‘সুটিয়া প্রতিবাদী মঞ্চ’। পাশে পেয়ে যায় কতকগুলো উৎসাহী ছেলে ও মেয়েকে। মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নেতৃত্বাধীন সরকারের উপরমহলে বরুণ লেখে একটার পর একটা চিঠি।ধর্ষিতা মেয়েদের বিয়ে দেয়। নেকড়ের পাল-রা কামড়াতে এলে গড়ে তোলে পাল্টা প্রতিরোধ। রাতের পর রাত বাইকে টহল দিত গোটা গ্রাম। তার বাইকের আওয়াজে গোটা গ্রাম নিশ্চিন্তে ঘুমোতো। লালকমলের আগে নীলকমল জাগে।

বরুণ বিয়ে করার কথা ভাবেনি। যে ঘরে বরুণ থাকত, তাতে একটা খাট আছে। গদি নেই, প্লাস্টিক পাতা। এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের বই, খাতা, পেন, পেন্সিল কিনে দিত। যথেষ্ট রোজগার করলেও টাকা-পয়সা কিস্যু জমত না। প্রয়োজনে দাদা, দিদি-র কাছে হাত পাততে দ্বিধা করত না। দাদা এবং দিদিও যথাসাধ্য ভাইয়ের কাজে সহযোগিতা করত। স্কুলে যাতায়াতে বরুণ রোজ ঘন্টা চারেক সময় ব্যয় করত; রাতটা গ্রামে কাটাবে বলে। জবাফুল বড্ড প্রিয় ছিল বরুণের। ওর একটার পর একটা চিঠি শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নেতৃত্বাধীন সরকারের টনক নাড়িয়ে দেয়। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত হলে গ্রেফতার হয় সুশান্ত, বীরেশ্বর সহ আরও অনেকে। পুলিশ সুশান্ত চৌধুরীদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে বরুণ একটি ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’ কিনে সুশান্ত চৌধুরীদের হাতে ধরিয়ে দেয়। মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় তাদের। বরুণ বিশ্বাসের গায়ে যেন কারুর হাত না পড়ে, সেই নির্দেশ আসে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে। গোটা গ্রাম নিশ্চিন্তে হাঁফ ফেলে।

কিন্তু বরুণের লড়াই এতে শেষ হয়না।মাস্টারদা বরুণ লক্ষ্য করছিল, প্রতিবছর গ্রামে বন্যা হয়। কারণ কী? জানা গেল, ভাঁটার সময় কেটে নেওয়া হয় মাটি। মাটি-মাফিয়ারা সেই মাটি পাঠিয়ে দিচ্ছে চড়া দামে। ফলে প্রতিবছর বর্ষাকালে অবশ্যম্ভাবী বন্যা। নতুন বাঁধ, নতুন রিলিফ ফান্ড, নতুন ঠিকাদার একটা বিরাট সংঘটিত অপরাধচক্র। এর বিরুদ্ধে বরুণ শুরু করে নতুন আন্দোলন; তার ক্রুসেড বাহিনি ‘সুটিয়া প্রতিবাদী মঞ্চ’। প্রবীণ মা ও বাবা যখন চিকিৎসার প্রয়োজনে বা অন্য সন্তানদের সামাজিক অনুষ্ঠানে সাময়িকভাবে সুটিয়া গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হতেন, তখন যোগ্য সহযোগিতা করতেন বড় দিদি প্রমিলা রায় বিশ্বাস, শুধু দিদি হিসেবে নয়, আন্দোলন সংগ্রামের সাথী হিসেবেও।

মাস্টারদা এবং পূর্বাপর

আজ থেকে ঠিক তেরো বছর আগে বহুচর্চিত 'মা-মাটি-মানুষ' সরকার তার মেয়াদের এক বছর সময়কাল সবেমাত্র অতিক্রম করেছে। সরকারের নেতৃত্বে সংসদীয় নির্বাচনী অভিষেকে ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহারকারী, বিধানসভা ভাঙচুরে মদতদাত্রী, চরম নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে রাজ্য থেকে শিল্প সম্ভাবনাকে কবরস্থকারী এবং স্বঘোষিত ‘সততার প্রতীক’ মাননীয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মন্ত্রীসভার ক্যাবিনেট মন্ত্রী তথা জেলার দোদন্ডপ্রতাপশালী নেতা মাননীয় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। সেই সময়কালে পাঁচই জুলাই ২০১২, পরিকল্পনা করে খুন করা হয়েছিল অকৃতদার, শিয়ালদহ মিত্র ইন্সটিটিউশন (মেইন)-এর বাংলার জনপ্রিয় শিক্ষক, গরীবের বন্ধু, প্রতিবাদী মাস্টারদা বরুণ বিশ্বাস (৩৯)-কে। প্রতিদিনের মতো গাইঘাটা থানার সুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা বরুণ মোটরবাইকে করে গোবরডাঙ্গা স্টেশনে এসে, যন্ত্রযান-টিকে স্টেশন চত্বরে রেখে, বনগাঁ-শিয়ালদহ লোকালে চেপে স্কুলে যেত এবং সন্ধ্যায় গোবরডাঙ্গা স্টেশনে নেমে মোটরবাইকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে বাড়ি ফিরত। পাঁচই জুলাই ২০১২, বৃহস্পতিবার, সন্ধের মুখে বনগাঁ লোকাল থামল গোবরডাঙ্গা স্টেশনে। ট্রেন থেকে নামে মাস্টারদা। তিন নম্বর থেকে এক নম্বর প্লাটফর্মের দিকে হাঁটা দেয়। স্টেশনের বাইরে মোটরবাইক রাখা। বাকিটা আমরা সবাই জানি। মোটরবাইকে ওঠার পরে, লুকিয়ে থাকা আততায়ীরা কাছ থেকে বরুণকে গুলি করে। একটি গুলি তাঁর পাঁজর ভেদ করে চলে যায়। রক্তাক্ত শরীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বরুণ বিশ্বাস। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়া বরুণকে ঘিরে থাকে আততায়ীরা। যাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বরুণের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বরুণ আবেদন করতে থাকে। রেল পুলিশ? না পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ? কে নিয়ে যাবে? এই বিতর্ক তুলে দিয়ে, সময় নষ্ট করানো হয়। একটু পরে সে মারা যাবে। অস্তে যাবে সুটিয়ার মুক্তিসূর্য...। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় প্রতিবাদী মাস্টারদা বরুণের। শেষমেশ কার্যত মৃত অবস্থায় বরুণকে নিয়ে যাওয়া হয় হাবড়া হাসপাতালে। পরের দিন মানে ছয়ই জুলাই। ভারী বর্ষা। সব ভুলে স্থানীয় হাজার, হাজার মানুষ মাঠে জমায়েত হয়েছিল। সবাই মাস্টারদাকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানাতে চায়। তীব্র ক্রোধে ফুঁসতে থাকা স্থানীয় মহিলারা হাতে তুলে নিয়েছিলেন হাতা, খুন্তি, ঝাঁটা। তারা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি।

কেন মারা হল বরুণকে? জেলে বসে সুশান্তই কি মারল? নাকি মাটি-মাফিয়া? নাকি আরও কোনো বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? আমাদের দেশে এসব প্রশ্নের উত্তর হয় না, আমরা জানি। ‘মা-মাটি-মানুষ’ সরকারের সময়কালে এই সকল প্রশ্নের উত্তর প্রায় অধরা। বরুণ হত্যার পরে কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে, ঠিকই। কিন্তু আজ ঘটনার তেরো বছর বাদেও দোষীরা সাজা পায়নি। বনগাঁ মহকুমা আদালতে আজও সেই খুনের মামলা চলছে। পুনরায় উল্লেখ্য, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তথা সুশান্ত-বীরেশ্বর... প্রমুখদের দাদাগিরি-র সময়কালে গাইঘাটা বিধানসভার জনপ্রতিনিধি ছিলেন বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগণা জেলার নেতা তথা তথাকথিত ‘মা-মাটি-মানুষ’ সরকারের দাপুটে মন্ত্রী বর্তমানে জেল ফেরত আসামী মাননীয় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক।

এলাকাবাসী সহ সারা রাজ্যের সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন, অনেকে রাস্তায় নেমেছিলেন। দাবি উঠেছিল, "খুনিদের গ্রেফতার করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।" মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী মাননীয়া সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবং প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতার এবং যথোপযুক্ত শাস্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন। তেরো বছর অতিক্রান্ত। শহীদ বরুণ বিশ্বাসের পরিবারের সদস্য (বাবা জগদীশ, মা গীতারানী, বড়দি প্রমিলা, বড় দাদা অসিত, মেজো দাদা অরুণ এবং ছোট বোন অনিতা)-দের সঙ্গে প্রতিবাদী রাজ্যবাসী সহ 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চ রাস্তায় নেমেছিল। এখনও তাঁরা বিচার চেয়ে রাস্তায়। বাবা জগদীশ বিশ্বাস সহ 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চ রাষ্ট্রপতি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সহ সর্বত্র বিচার চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আজও বিচার অধরা। ইতোমধ্যে জন্মদাত্রী মা গীতারানী বিশ্বাস তাঁর ছোট পুত্রসন্তান অকৃতদার বরুণের জন্য চোখের জল ফেলতে ফেলতে রুগ্ন-শুষ্ক হয়ে পরপারে চলে গেছেন। শহীদ বরুণের নবতিপর বাবা বিপত্নীক জগদীশ বিশ্বাস বিচার চেয়ে চেয়ে অনেক রাস্তা এবং ঝড়-ঝাপ্টা পেরিয়ে জীবন সায়াহ্নে উপনীত। এবং বার্ধক্যজনিত কারণে আকাশের দিকে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দিন অতিবাহিত করে চলেছেন।

এদিকে শাসকদলের জেলার নেতা, বিধায়ক এবং মাননীয় মন্ত্রী (জেলবন্দি ছিলেন, বর্তমানে জামিনে) শহীদ বরুণের বড়দি প্রমিলা রায় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিধাননগর আদালতে পাঁচ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেছেন। সেকারণে প্রতিবাদে মুখর 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রমিলা রায় বিশ্বাসকে নিয়মিত আইনজীবি সহ আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তার সঙ্গে অর্থদণ্ড এবং হেনস্থা-হয়রানি ফ্রি। বরুণ হত্যার মূল মামলা বনগাঁ আদালতে বিধিসম্মত শুনানি না হওয়ায় এবং দীর্ঘসূত্রিতার মাধ্যমে সমস্ত প্রমাণ লোপাটের চেষ্টাকে সিলমোহর দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকায়, তেরো বছর পর শহীদ বরুণের পরিবার হাইকোর্টে দ্রুত বিচার(!) চেয়ে মামলা করেছেন।

'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চ মনে করে, মুখ্যমন্ত্রী না চাইলে বিচার মিলবে না। এবং আজ অত্যন্ত স্পষ্ট গুন্ডা কন্ট্রোলকারী মুখ্যমন্ত্রী তা চাননা; চাইতে পারেননা তাঁর গুন্ডা ভাইদের জন্য। এই সময়কালে অর্থাৎ গত তেরো বছরে এবং সামগ্রিকভাবে 'মা-মাটি-মানুষ' সরকারের চোদ্দ বছর সময়কালে এই ধরণের প্রচুর উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। তপন দত্ত, পার্ক স্ট্রিট, শিলাদিত্য চৌধুরী, কামদুনি, ধূপগুড়ি, সুদীপ্ত গুপ্ত, মইদুল ইসলাম মিদ্দা, আনিস খান,... আর. জি. কর প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড, শাসকদলের ছোঁড়া সকেট বোমায় লাশ হয়ে যাওয়া তামান্না খাতুন, সাউথ ক্যালকাটা ল' কলেজ অভ্যন্তরে গণধর্ষণ সহ মনোজিৎ মিশ্রা মডেল... শত শত উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেহেতু সাংবিধানিক পরিকাঠামোয় আদালতে বিচার পাওয়া যাচ্ছেনা, সেকারণে জনগণের আদালতকে বিচারের দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি শহীদ বরুণের রক্তঋণ শোধ করার দায়িত্ব গণদেবতাদের নিতে হবে।

প্রতিবাদের মৃত্যু হয় না

শিয়ালদহ মিত্র ইনস্টিটিউশন (মেইন)-এর প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্ররা তাঁদের প্রিয় মাষ্টারমশায় বরুণকে ভোলেননি। সারাবছরই ছাত্ররা বিভিন্ন সামাজিক কাজের মধ্যদিয়ে মাস্টারমশায়কে স্মরণ করে। জানি, আমরা খুব নগণ্য সাধারণ মানুষ। জীবনযুদ্ধে ধ্বস্ত। সর্বক্ষণ ভয়-ভয় করে আমাদের। হেরে যাওয়ার ভয়, পিছিয়ে যাওয়ার ভয়। তবু এতটা স্মৃতিভ্রষ্ট হবো কি আমরা? মহাকালের কাছে কী উত্তর দেবো? বরং এই অন্ধকার সময়ে বরুণকে স্মরণ করাই হয়ে উঠুক আমাদের একমাত্র প্রতিবাদ প্রতিরোধের রাজনীতি। কারণ, বরুণ বিশ্বাস মানে প্রতিবাদের উজ্জ্বল স্তম্ভ। উদয়ন পণ্ডিতের বংশধর। মাস্টারদা সূর্য সেনের উত্তরসূরি। বরুণ বিশ্বাস মানে গ্রাম বাংলায় পায়ে পায়ে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অপরাজিত ঘোড়ার ক্ষুর...। নারীদের সম্ভ্রম এবং নিরাপত্তার একশ শতাংশ গ্যারান্টি। আজকের সমাজে এমন বরুণ বিশ্বাস-দেরই যে আরও বেশি বেশি করে দরকার।