আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা ● ১-১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-৩০ মাঘ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

শক্তি সূচকে 'মেজর পাওয়ার'-এর তকমা, এরপর!

গৌতম সরকার


এশিয়ার মানচিত্রে আরও একধাপ উপরে উঠল ভারত। জাপান ও রাশিয়াকে পিছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তিধর দেশের স্বীকৃতি পেল। অস্ট্রেলিয়ার লোই ইনস্টিটিউট প্রকাশিত '২০২৫ এশিয়া শক্তি সূচক'-এ ভারতের স্থান হয়েছে বিশ্বের মধ্যে তৃতীয়, সামনে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর চীন। ২০২৫ সালে লোই ইউনিভার্সিটি কর্তৃক প্রকাশিত এই শক্তি সূচক এশিয়ার ২৭টি দেশের ৮টি বৈশিষ্ট্যের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। সেই বৈশিষ্ট্যগুলো হল - আর্থিক সক্ষমতা, সামরিক ক্ষমতা, প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সার্বিক স্থিতিস্থাপকতা, ভবিষ্যৎ সম্পদ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এই সবকিছুর বিচারে শক্তির নিরিখে ১০০-এর মধ্যে আমেরিকা পেয়েছে ৮১.৭; দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের পয়েন্ট ৭৩.৭, আর জাপান, রাশিয়ার মতো দেশকে পিছনে ফেলে ৪০ স্কোর করে ভারত দখল করেছে তৃতীয় স্থান।

ভারত কেন তৃতীয়?

অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে ক্রমশই আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে ভারত। এখন শুধুমাত্র দেশীয় সেনাবাহিনীর জন্যই নয়, দেশে দেশে সামরিক সরঞ্জামের রফতানিও শুরু করেছে। একটা সময় রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশ থেকে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র কিনে নিজের সম্ভার শক্তিশালী করে তুলেছিল, তারই ফলশ্রুতিতে জঙ্গি হামলার জবাব দিতে শত্রু দেশের হেঁসেলের মধ্যে ঢুকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করে দিতে ভারত এখন দু'বার ভাবেনা। ভারতের এই উত্থানের কারণ হিসেবে লোই ইনস্টিটিউট তাদের রিপোর্টে বলেছে, '২০২৫ সালের এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্সে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বৃদ্ধি, সাবমেরিন স্কোয়াড্রন শক্তিশালী করা, সাইবার ও স্পেস ডিফেন্সের বৃদ্ধি ভারতকে সামরিক শক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। দেশের অর্থনীতিও কোভিড-১৯ মহামারির পর দ্রুত পুনরুদ্ধার করেছে তারা।' এই কমিটি আশাপ্রকাশ করেছে, ভারত যদি একই গতিতে সামরিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে চলে তাহলে ভবিষ্যৎ সম্পদের স্কেলে ভারত আরও উন্নতি করতে পারবে।

এই মুহূর্তে ভারত পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। জিডিপির ক্রমবৃদ্ধি একদিকে বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্ব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে আত্মনির্ভরশীল ভারত উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের দেশীয় উৎপাদনে উৎসাহিত করছে। যদিও আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যে টালবাহানা চলছে তাতে বৈদেশিক বাণিজ্য সামান্য হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে দেশীয় প্রযুক্তি ও উপাদানের সঠিক ব্যবহারে আমরা প্রতিরক্ষা খাতেও ধীরে ধীরে আত্মনির্ভর হয়ে উঠছি। পাকিস্তানের সাথে ভারতের সংঘাত নতুন কিছু নয়। তবে গতবছর পাকিস্তান জঙ্গিদের পহেলগাঁও সংঘাতের জবাবে ভারতীয় সেনাদের 'অপারেশন সিঁদুর' আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তাই পাঠিয়েছে যে, ভারত কোনো মূল্যেই নিজের নিরাপত্তার প্রশ্নে আপোস করবে না।

কেন্দ্রের দাবি

সামরিক শক্তির দুনিয়ায় ভালো ফল করার পর কেন্দ্রের দাবি, দেশের গতিশীল বৃদ্ধি, যুব জনসংখ্যা এবং সরকারি পরিকল্পনার সাফল্যই এই উত্থানের মূল কারিগর। করোনা পরবর্তী সময়ে ভারতের জনসংখ্যা এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে জিডিপির বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। একইসাথে বৃদ্ধি পেয়েছে ভবিষ্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা। শক্তিসূচকে এর বৃদ্ধি ঘটেছে ৮.২ শতাংশ। কেন্দ্রের বিশ্বাস, ভারতের ক্রমবর্ধমান যুব সম্প্রদায় আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থান ভারতকে কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছে। এই মুহূর্তে ভারত আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় এক বিশেষ শক্তি, কোনো দেশের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে সুচারুভাবে সরে থেকে সাংস্কৃতিক প্রভাবের উন্নয়ন ঘটিয়ে শক্তি সূচকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে তুলেছে। অন্যদিকে সামরিক ক্ষেত্রে ভারতের সেনারা এখন বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শক্তিধর তকমা অর্জন করেছে। কেন্দ্রের দাবি কূটনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সম্পদ ও প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সামগ্রিক উন্নতির জোরে ভারত এশিয়া মহাদেশের অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ ও ভারত

প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে চীনকে বাদ দিলে বাকি দেশগুলির সাপেক্ষে ভারতের অবস্থান অনেকটা ভালো। এশিয়া শক্তি সূচকের তালিকায় জাপানের স্থান চতুর্থ (৩৮.৮) এবং রাশিয়ার পঞ্চম (৩২.১)। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম তালিকায় রাশিয়ার অবস্থানের উন্নতি ঘটেছে, আর বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল না করলেও সামগ্রিকভাবে জাপান একটি স্থিতিশীল জায়গায় পৌঁছেছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাপারে লোই ইনস্টিটিউট জানিয়েছে ভবিষ্যতে দেশটির পক্ষে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে শীর্ষে অবস্থান করলেও আমেরিকা মোটেই স্বস্তিতে নেই। ২০১৮ সালে শুরুর পর এই প্রথমবার দেশটির স্কোর এতটা নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন ও অনুবর্তী বৈশ্বিক দ্বন্দ্বকে দায়ী করেছেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীন ধীরে ধীরে শক্তির পার্থক্য কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে। এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্সে পাকিস্তানের স্থান ১৬তম। স্কোর কম থাকার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা দেশটিতে চলতে থাকা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অস্থির অর্থনীতি, বিদেশী নির্ভরতা, সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট এবং ক্রমশ বেড়ে চলা সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মকে দায়ী করেছেন।

চীনের সাথে পার্থক্য ক্রমশ বাড়ছে

সামরিক শক্তির নিরিখে চীনের সাথে ক্রমাগত ব্যবধান বেড়ে চলার বিষয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। চীন ২০২৫ সালে আরও এক পয়েন্ট বাড়িয়ে সূচকে নিজের দ্বিতীয় অবস্থান পাকাপোক্ত করে তুলেছে। ভারতের সাথে তার পার্থক্য ৩৩.৭ পয়েন্ট, যথেষ্ট বেশি। এই দুই দেশের শক্তির পার্থক্য অর্থনৈতিক প্রগতি, প্রতিরক্ষা বাজেট এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বেশি করে চোখে পড়ে। ভারতের উল্লেখযোগ্য উত্থান স্বীকার করে কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে চীনের পরিকাঠামো উন্নয়নে নিরন্তর বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সক্ষমতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্রমন্নয়ন এশিয়ার মানচিত্রে দেশটির প্রতিপত্তি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।

ভারতের শক্তি ও দুর্বলতা

২০২৫-এর শক্তিসূচক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ভারতের শক্তির জায়গাগুলি হল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ সম্পদ, সামরিক শক্তি এবং দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক। কিন্তু দুটি জায়গায় আশানুরূপ ফল ভারত করতে পারেনি; সেগুলো হল, প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক আর কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুটি জায়গায় ভারতের আরও অনেক উন্নতির অবকাশ আছে। কমিটির রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আগামী দিনে ভারতকে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব, সাংস্কৃতিক কূটনীতির বিস্তার এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্কের আরও বেশি উন্নতির খোঁজে পরিকল্পনার যথাযথ রূপায়ণ ঘটাতে হবে।

সামরিক শক্তিতে 'মেজর পাওয়ার'-এর তকমা যথেষ্ট গর্বের সন্দেহ নেই, তবে একইসাথে মানব উন্নয়ন সূচক থেকে শুরু করে লিঙ্গ বৈষম্য, বিশ্ব সুখ সূচক থেকে ওয়ার্ল্ড ইনইকোয়ালিটি ইনডেক্সে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া বিরুদ্ধ বিজ্ঞাপন ছড়াচ্ছে। এব্যাপারে সরকার যত শীঘ্র যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে ততই মঙ্গল।