আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
বীণা দাস: বিদ্রোহ, শিক্ষা ও আত্মবিসর্জনের এক অনমনীয় ইতিহাস
উৎপল সরকার
ইতিহাস অনেক সময় আমাদের কাছে আসে বিজয়ী শাসকের ভাষায় - তারিখ, ঘোষণা, ক্ষমতার পরিসংখ্যান নিয়ে। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি স্রোত আছে, যা বইয়ের মার্জিনে, ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায়, কিংবা কোনো অচেনা নারীর দৃঢ় নীরবতায় প্রবাহিত হয়। সেই ইতিহাস উচ্চকণ্ঠ নয়, তবু গভীর; প্রকাশ্য নয়, তবু প্রভাবশালী। বীণা দাস সেই প্রান্তিক অথচ অপরিহার্য ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নাম।
বাঙালি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে নারীশিক্ষা ছিল শিষ্টাচারের অনুষঙ্গ - একটি সামাজিক অলংকার, যার উদ্দেশ্য প্রশ্ন তৈরি করা নয়, বরং প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া। সেই পরিসরে দাঁড়িয়ে যে নারী শিক্ষা ও বিদ্রোহের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখেননি, বরং বিদ্রোহকেই শিক্ষার স্বাভাবিক পরিণতি বলে মেনে নিয়েছিলেন, তিনি কেবল সময়ের সন্তান নন - তিনি সময়কে চ্যালেঞ্জ করা এক মানসিকতা। বীণা দাস সেই মানসিকতার প্রতিনিধি।

বীণা দাস
তাঁর জীবন পড়লে বোঝা যায়, বিপ্লব তাঁর কাছে কোনো তাৎক্ষণিক আবেগ নয়; তা ছিল দীর্ঘদিনের আত্মিক প্রস্তুতির ফল। সংসার, সমাজ, শিক্ষা - সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজেছেন একটি মৌলিক প্রশ্ন: অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে বেঁচে থাকার অধিকার কি মানুষের আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি কখনও রিভলভার হাতে নিয়েছেন, কখনও কারাগারের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মানুষের চোখের ভাষা পড়েছেন, আবার কখনও কংগ্রেসের মঞ্চে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
বীণা দাসের জীবন তাই কেবল একটি বিপ্লবী জীবনী নয়; এটি এক নাগরিক চেতনার দলিল। যেখানে ব্যক্তিগত সুখ নয়, সামাজিক দায়িত্ব বড় হয়ে ওঠে; যেখানে স্বাধীনতা মানে শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়, নৈতিক সাহসও। তাঁর কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় - ইতিহাস গড়ে শুধু বিজয়ীরা নয়, সেই মানুষরাও, যাঁরা কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।

বীণা দাস
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলি কেবল রাজনৈতিক ঘটনামাত্র নয় - সেগুলি এক একটি নৈতিক ঘোষণাপত্র। ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের দিকে ছোড়া সেই গুলি তেমনই এক ঘোষণাপত্র। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল বুলেট, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি ইতিহাস।

স্ট্যানলি জ্যাকসন
সেই মুহূর্তে এক তরুণী ছাত্রী বুঝিয়ে দিয়েছিলেন - শিক্ষা যদি প্রশ্ন না তোলে, যদি অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে না শেখায়, তবে সে শিক্ষা কেবল কেতাবি অলংকার, নিষ্প্রাণ আচারমাত্র। সেই তরুণীর নাম বীণা দাস।
"দেশের কোনো ডাকেই সাড়া দেব না, মুক্তিসংগ্রামের নির্বাক দর্শক হয়ে থাকব - তাহলে কী হবে এই অসাড় মিথ্যে কেতাবি শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে?"
এই প্রশ্ন ছিল বীণার জীবনের মূলমন্ত্র। এই প্রশ্নই তাঁকে কলেজের বেঞ্চ থেকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সশস্ত্র বিপ্লবের পথে, কারাগারের অন্ধকারে, আবার পরবর্তীতে কংগ্রেসের সংগঠনী রাজনীতিতে। বীণা দাস ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের কাছে আদর্শ কখনও পর্বভিত্তিক ছিল না - জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা ছিল অবিচল।
বেথুন কলেজ: বিদ্রোহের আঁতুড়ঘর
বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত নারীর কাছে 'ভদ্রতা' মানেই ছিল নীরবতা, তখন বেথুন কলেজ হয়ে উঠেছিল এক অন্যরকম পরিসর। এখানেই শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজনৈতিক সচেতনতা, আর সেই মেলবন্ধনের ফলেই জন্ম নিয়েছিল একাধিক নারী বিপ্লবী। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কমলা দাশগুপ্ত - এই ধারার সবচেয়ে দীপ্ত উত্তরসূরি ছিলেন বীণা দাস।

কমলা দাশগুপ্ত
বেথুন কলেজের রাজানুগত অধ্যক্ষ ও কড়া অনুশাসনের পরোয়া না করে বীণা ছাত্রাবস্থাতেই রাজনীতির ময়দানে নেমে পড়েন। ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে তিনি শুধু অংশ নেননি, কার্যত নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কলেজ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতে তিনি একের পর এক ক্লাসে গিয়ে ছাত্রীদের হরতালে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব - হরতালের দিন বেথুন স্কুল ও কলেজে ছাত্রীসংখ্যা দাঁড়ায় শূন্য। এই বিদ্রোহে ছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, যা সেই আন্দোলনকে দিয়েছিল ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
বীণা জানতেন, গভর্নমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করে বিপ্লবী হওয়া কার্যত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তবু নিজের অবস্থান ও দায়িত্ব সম্পর্কে এতটাই সচেতন ছিলেন যে কোনো দ্বিধা তাঁকে আটকাতে পারেনি। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রস্তুতি - তা যদি বিদ্রোহে না পৌঁছয়, তবে সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ।
সশস্ত্র বিপ্লব ও ১৯৩২-এর দিনটি
বেথুন কলেজে পড়াকালীনই বীণা যুক্ত হন 'যুগান্তর' দলের সঙ্গে। সহপাঠী কমলা দাশগুপ্তের সহায়তায় তিনি সংগ্রহ করেন রিভলভার। এই পর্বে তাঁর মানসিক প্রস্তুতি, আত্মসংযম ও নৈতিক দৃঢ়তা ছিল অসাধারণ। বিপ্লব তাঁর কাছে কোনো রোমান্টিক আত্মাহুতি নয়, বরং সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
১৯৩২ সালের সেই সমাবর্তনের দিনটি আজও ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে। সেনেট হলে উপস্থিত ছিলেন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন - ব্রিটিশ শাসনের এক প্রতীকী মুখ। বীণা তাঁর দিকে গুলি চালান। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, জ্যাকসন বেঁচে যান। কিন্তু সেই মুহূর্তে ব্রিটিশ শাসনের অভেদ্যতার মিথ ভেঙে যায়। উপাচার্য স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর হস্তক্ষেপে বীণা ধরা পড়েন। বড়োলাটকে হত্যার চেষ্টার অপরাধে তাঁর নয় বছরের কারাদণ্ড হয়।

১৯৩২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে 'গ্লাসগো হেরাল্ড' সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর।
এই ঘটনাকে কেবল 'হত্যাচেষ্টা' হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল উপনিবেশিক ক্ষমতার কেন্দ্রে এক শিক্ষিত, সচেতন নারীর সরাসরি চ্যালেঞ্জ - যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে নৈতিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
কারাগার: শৃঙ্খল ও ঝংকার
কারাগার বীণাকে ভেঙে দেয়নি; বরং আরও গভীরভাবে মানবিক করে তুলেছিল। রাজবন্দী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে আলাদা করে রাখেননি। সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে মিশে তিনি দেখেছিলেন সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতা - মানসিক ভারসাম্যহীন এক ফিরিঙ্গি মহিলা, স্বল্পমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত দুর্গি, স্বামীহত্যার দায়ে দণ্ডিত শহরজান। এই মানুষগুলির জীবনকথা তিনি শুনেছেন, অনুভব করেছেন, আর সেই অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর আত্মজীবনী 'শৃঙ্খল ঝংকার'-এ।

'শৃঙ্খল ঝংকার'-এর প্রচ্ছদ।
গ্রন্থটি বীরত্বের আত্মপ্রচারণা নয়। বরং এখানে বিপ্লবী বীণা নিজের অন্তর্জীবনের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করান। গভর্নরকে হত্যার চেষ্টা - এই ঘটনাটি তিনি প্রায় উল্লেখমাত্র করেছেন। বিপ্লবী পরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় কমলা দাশগুপ্তের 'রক্তের অক্ষরে' বইতে। বীণার লেখায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর মানসিক দ্বন্দ্ব, উপলব্ধি ও মানবিক সংবেদন।

'রক্তের অক্ষরে'-র প্রচ্ছদ।

কমলা দাশগুপ্ত
গ্রন্থটির নামকরণ করেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র - নামেই যেন ধরা পড়ে বীণার জীবনদর্শন: শৃঙ্খলের মধ্যেও যে প্রতিবাদের ঝংকার থেমে থাকে না।
গান্ধিবাদ, কংগ্রেস ও আরেক লড়াই
সাত বছর পর কারামুক্ত হয়ে বীণা যোগ দেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে এবং মহাত্মা গান্ধির অনুগামী হন। অনেকের চোখে এটি ছিল আদর্শচ্যুতি - সশস্ত্র বিপ্লবী থেকে অহিংস রাজনীতিতে আসা। কিন্তু বীণার কাছে এটি ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী সংগ্রামের রূপান্তর, আদর্শের নয়।
তিনি কলকাতা কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক হন, ১৯৪২ সালে আবার কারারুদ্ধ হন তিন বছরের জন্য। পরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন। তবু ক্ষমতার রাজনীতিতে কখনও তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তাঁর আসল জায়গা ছিল মাঠে - মানুষের পাশে।
নোয়াখালি ও মানুষের পাশে দাঁড়ানো
নোয়াখালির দাঙ্গা বীণাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। দাঙ্গাবিধ্বস্ত নমঃশূদ্র অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে বিশেষ করে নারীদের উপর হওয়া পাশবিক অত্যাচার তাঁকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তিনি সেখানে ত্রাণকার্যে যুক্ত হন, বিশেষত নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করেন। এই পর্বের বিবরণ তাঁর আত্মজীবনীতে এক করুণ দলিল - যেখানে রাজনীতির চেয়ে মানবিক বেদনা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বঞ্চনা ও নৈতিক প্রতিবাদ
স্বাধীনতার পর বীণার জীবনে আসে এক তীব্র হতাশা। বিপ্লবী ও শহিদদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ তাঁকে আহত করেছিল। তিনি সরকারের দেওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশন নেননি - কারণ তাঁর কাছে তা ছিল আত্মসম্মানের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, জরুরি অবস্থার সময় প্রতিবাদ করেন, মরিচঝাঁপিতে পুলিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। কোনো দলীয় স্বার্থ নয় - মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর রাজনীতি।
শেষ জীবন: এক করুণ নিঃসঙ্গতা
বীণা দাসের শেষ জীবন বেদনাদায়ক। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি হরিদ্বার-ঋষিকেশ অঞ্চলে চলে যান। ১৯৮৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর সহায়সম্বলহীন অবস্থায় পথপ্রান্তেই তাঁর মৃত্যু হয়। রাষ্ট্র যাঁর কাছ থেকে সব নিয়েছিল, তাঁকে শেষ পর্যন্ত কিছুই ফেরত দেয়নি।
উপসংহার: কেন আজও বীণা দাস প্রাসঙ্গিক
বীণা দাসকে শুধু নারী বিপ্লবী বা স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন এক নৈতিক অবস্থান - যেখানে শিক্ষা মানে প্রশ্ন, রাজনীতি মানে দায়িত্ব, আর জীবন মানে আত্মবিসর্জন। আজকের সময়ে যখন শিক্ষা ক্রমশ বাজারমুখী, রাজনীতি ক্ষমতামুখী, তখন বীণা দাসের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় - বিদ্রোহ এখনও প্রয়োজন, সংবেদনশীলতা এখনও বিপ্লব।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলে সেই গুলি আজও প্রতিধ্বনিত হয় - শুধু ইতিহাসে নয়, আমাদের বিবেকেও।