আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
ঋত্বিক কুমার ঘটক
আনন্দ দাশগুপ্ত

ঋত্বিক কুমার ঘটক, যিনি ঋত্বিক ঘটক হিসেবেই সচরাচর অভিহিত, (৪ নভেম্বর, ১৯২৫ - ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতিমান বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর জন্ম অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) রাজশাহী শহরের মিয়াঁপাড়ায়। ছেলেবেলায় তিনি কিছুদিন দাদা মণীশ ঘটকের সঙ্গে কলকাতায় ছিলেন। তখন পড়াশোনা করতেন দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চবিদ্যালয়ে। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাজশাহী শহরে ফিরে যান। রাজশাহী শহরের পৈতৃক বাড়িতে শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের একটি অংশ কাটিয়েছেন।
ঋত্বিক ঘটক রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে পড়েছেন। রাজশাহী কলেজ এবং মিয়াঁপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার মাঠে কথাসাহিত্যিক [শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়]কে সঙ্গে নিয়ে নাট্যচর্চা করেছেন। ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পরে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়। ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে তিনি যেমন প্রশংসিত ছিলেন; ঠিক তেমনি বিতর্কিত ভূমিকাও রাখেন।
তাঁর মায়ের নাম ইন্দুবালা দেবী এবং বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক। তিনি বাবা-মায়ের ১১তম এবং কনিষ্ঠতম সন্তান। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৭-এর ভারত বিভাগের পরে পূর্ববঙ্গের প্রচুর মানুষ কলকাতায় আশ্রয় নেয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়। শরণার্থীদের অস্তিত্বের সংকট তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং পরবর্তী জীবনে তাঁর চলচ্চিত্রে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফিরে যান বাংলাদেশের রাজশাহীতে। ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ. এবং ১৯৪৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ. কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন।
তাঁর বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাঁর বড়ভাই ঐ সময়ের খ্যাতিমান এবং ব্যতিক্রমী লেখক মনীশ ঘটক ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক এবং সমাজকর্মী। আইপিটিএ থিয়েটার মুভমেন্ট এবং তেভাগা আন্দোলনে মনীশ ঘটক জড়িত ছিলেন। মনীশ ঘটকের মেয়ে বিখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী। তাঁর মেজভাই সুধীশ ঘটক টেলিভিশন এক্সপার্ট ছিলেন। সুধীশ গ্রেট ব্রিটেনে ডকুমেন্টারি ক্যামেরাম্যান হিসেবে ছয় বছর কাজ করেন। মেজভাই সুধীশ ঘটকের মাধ্যমেই তাঁর চলচ্চিত্র জগতের সান্নিধ্যে আসা।
ঋত্বিক ঘটকের স্ত্রী সুরমা ঘটক ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। তিনি ছিলেন বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শের অনুরাগী।
ঋত্বিক ঘটক ১৯৪৭ সালে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন, পত্রিকাটির নাম 'অভিধারা'। পত্রিকাটিতে তাঁর লেখা 'অয়নান্ত' গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। যেখানে তিনি শৈল্পিকভাবে রাজশাহী কলেজ ও পদ্মাপাড়ের বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে তাঁর প্রথম নাটক 'কালো সায়ার' লেখেন। এছাড়াও তিনি 'নবান্ন' নাটকে অংশগ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৫১ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (আইপিটিএ) যোগদান করেন। এসময় নাটক লেখক, পরিচালক ও অভিনয়ে তাঁর দক্ষতার পরিচয় ফুটে উঠে। নিমাই ঘোষের মাধ্যমে ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম সিনেমা 'ছিন্নমূল' ১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি এই সিনেমায় সহকারী পরিচালক ও অভিনেতা হিসাবে কাজ করেন। এর দু'বছর পর তাঁর একক পরিচালনায় মুক্তি পায় 'নাগরিক'।
'নাগরিক'-এর ছয় বছর পর ১৯৫৭-এ তৈরি হয় ঋত্বিকের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র 'অযান্ত্রিক', যা মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। ছবির নায়ক ড্রাইভার এবং নায়িকা তার গাড়ি। সেসময় পুরো ভারত জুড়েই অন্যরকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ছবিটি। 'অযান্ত্রিক' প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন,
"ঋত্বিক ঘটকের দ্বিতীয় ছবি 'অযান্ত্রিক' যারা দেখেছিলেন, তারা ঋত্বিকের অসামান্য বৈশিষ্ট ও মৌলিকতার পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হয়েছিলেন।"
ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমলের যে চরিত্র ঋত্বিক নির্মাণ করেন তার সাথে পরবর্তীতে মিল পাওয়া যায় সত্যজিৎ-এর 'অভিযান' (১৯৬২) সিনেমার ট্যাক্সিচালক নরসিং ও মার্টিন স্করসেসির 'ট্যাক্সি ড্রাইভার'-এর (১৯৭৬) ট্রাভিস বিকেল চরিত্রের। 'অযান্ত্রিক' ১৯৫৯ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রদর্শিত হয়। সেখানে ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা বিখ্যাত সমালোচক জর্জেস সাডৌল বর্ণনা করেন:
"অযান্ত্রিক কথাটার অর্থ কি? আমার জানা নেই এবং আমার বিশ্বাস ভেনিস ফেস্টিভালের কারোরই এটা জানা ছিল না। আমি পুরো গল্পটাও বলতে পারব না, কারণ সেখানে কোনো সাবটাইটেল ছিল না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দেখেছিলাম।"
'অযান্ত্রিক' ফিল্ম হয়েছিল সুবোধ ঘোষের প্রথম ছোটগল্প 'অযান্ত্রিক' থেকে। একজন মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সৃষ্ট সম্পর্ক নিয়ে এই সিনেমাটি।
সত্যজিৎ রায় এ ছবিটি দেখে ঋত্বিককে বলেছিলেন,
"ঋত্বিকবাবু, সিনেমাটা সময়মতো রিলিজ করলে আপনি পথিকৃৎ হতেন।"
'চলচ্চিত্র সাহিত্য ও আমার ছবি' নিবন্ধে ঋত্বিক কুমার ঘটক 'অযান্ত্রিক' সম্পর্কে বলেছিলেন,
"কতখানি সার্থক হয়েছি সেটা আপনারা বলবেন - তবে আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। সুবোধবাবুর মূল বক্তব্যের প্রতি আমি চেষ্টা করেছি বিশ্বস্ত থাকতে। জানিনা কতখানি কৃতকার্য হয়েছি।"
একই বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে ঋত্বিকের তৃতীয় চলচ্চিত্র 'বাড়ী থেকে পালিয়ে' মুক্তিলাভ করে। মূল গল্প শিবরাম চক্রবর্তীর - কাঞ্চনের চোখ দিয়ে তৎকালীন কলকাতার বাস্তব চালচিত্র দেখা যায়।
এই চলচ্চিত্রে লক্ষণীয় সিনেমাটোগ্রাফিতে ডীপ ফোকাসের ব্যবহার। ফ্রান্সের ন্যুভেলভাগের বিখ্যাত সিনেমা ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর 'ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ' (১৯৫৯)-এর কাহিনীর সঙ্গে এই ফিল্ম-এর গল্পের সাদৃশ্য রয়েছে।
১৯৫৯ সালে 'কত অজানারে' নামের একটি সিনেমার কাজ অনেকদূর সম্পন্ন করেও অর্থনৈতিক কারণে সেটা আর শেষ করতে পারেননি ঋত্বিক।
এক সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক বলেছিলেন,
"মানুষের অবক্ষয় আমাকে আকর্ষণ করে। তার কারণ এর মধ্যদিয়ে আমি দেখি জীবনের গতিকে, স্বাস্থ্যকে। আমি বিশ্বাস করি জীবনের প্রবাহমানতায়। আমার ছবির চরিত্ররা চিৎকার করে বলে আমাকে বাঁচতে দাও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে বাঁচতে চায় - এ তো মৃত্যু নয়, জীবনেরই জয় ঘোষণা।"
এই জয় ঘোষনার সূত্রপাত হয়েছিল ১৪ এপ্রিল, ১৯৬০; কলকাতায় মুক্তি পাওয়া ঋত্বিক ঘটকের বাংলা ছবি 'মেঘে ঢাকা তারা'র মাধ্যমে। 'মেঘে ঢাকা তারা' ঋত্বিকের চতুর্থ ছবি আর বক্স অফিসে তার প্রথম সাফল্য। শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালের বার্ষিক 'চিত্রবীক্ষণ' পত্রিকায় ঋত্বিক ঘটক জানান, দেশবিভাগের প্রেক্ষাপটে নির্মিত 'মেঘে ঢাকা তারা' (১৯৬০), 'কোমল গান্ধার' (১৯৬১) এবং 'সুবর্ণরেখা' (১৯৬২) এই তিনটি চলচ্চিত্র মিলে ট্রিলজি নির্মিত হয়েছে।
তাঁর ভাষ্যে,
"একটি ছেলের সঙ্গে একটি মেয়ের দেখা হল - এধরনের পুতুপুতু গল্পে আমার রুচি নেই। আমি আপনাদের ঘা দেব এবং বোঝাব, এ কাহিনী কাল্পনিক নয়। বলব, চোখের সামনে যা দেখছেন তার অন্তর্নিহিত বক্তব্য, আমার বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করুন। যদি সচেতন হন এবং আমার উত্থাপিত প্রতিবাদটি উপলব্ধি করতে পারেন, তবে বাইরে বেরিয়ে বাস্তবকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলেই সার্থক আমার ছবি করা।"
'মেঘে ঢাকা তারা' চলচ্চিত্র সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটক বলেন,
" 'মেঘে ঢাকা তারা' নামটি আমার দেয়া, মূল গল্পটি 'চেনামুখ' নামে নামকরা একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গল্পটার ভেতর কিছু একটা ছিল যা আমাকে খোঁচা দিচ্ছিল, যে কারণে শেক্সপিয়রের 'দ্য ক্লাউডক্যাপড স্টার' নামটা মাথায় ঢুকে গিয়েছিল এবং সাথে সাথে নতুন চিত্রনাট্য লেখায় হাত দিয়ে দিলাম।" (অনূদিত)
'মেঘে ঢাকা তারা'র মূল গল্পকার শক্তিপদ রাজগুরুর ভাষ্য মতে,
"সাত বছর আমি ঋত্বিকের সঙ্গে ঘর করেছি। 'মেঘে ঢাকা তারা', 'কুমারী মন', 'কোমল গান্ধার' ও 'সুবর্ণরেখা' পর্যন্ত ওঁর সঙ্গে ছিলাম। পরে আমি অন্য কাজে মুম্বাই চলে যাই শক্তি সামন্তের কাছে। আমাদের একটা জমাটি টিম ছিল। কোমল গান্ধারের পর থেকে টিম ভাঙতে শুরু করে।"
এই সিনেমায় ঋত্বিক শব্দ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। দক্ষিণ ভারতীয় হংসধ্বনি রাগ এবং এই রাগভিত্তিক খেয়াল ব্যবহার করেন সিনেমার আবহসংগীত হিসেবে। প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করেন এই ছবিতে৷ এছাড়াও বাংলার লোকসঙ্গীতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। ভারতের এক জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার সাম্প্রতিক জরিপে প্রকাশ যে, নীতার মুখে 'দাদা, আমি বাঁচতে চাই' বাংলা ছবির সবচেয়ে প্রচলিত সংলাপ। ঋত্বিক ঘটকের এই সিনেমায় ভারত বিভাজনের সেই করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে 'পথের পাঁচালী'র পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চর্চিত এই সিনেমাটি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদী সিনেমা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। 'সাইট অ্যান্ড সাউন্ড' চলচ্চিত্র বিষয়ক মাসিক সাময়িকীতে সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় এটি ২৩১ নম্বরে অবস্থান করছে।
ঋত্বিকের নিজের ভাষায়,
'বাংলাভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি - আজও পারি না। ইতিহাসে যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো ভীষণ মুশকিল, সেটা আমার কাজও নয়। সাংস্কৃতিক মিলনের পথে যে বাধা, যে ছেদ, যার মধ্যে রাজনীতি - অর্থনীতি সবই এসে পড়ে, সেটাই আমাকে প্রচণ্ড ব্যথা দিয়েছিল'।
ঋত্বিক যে সাংস্কৃতিক মিলনের কথা বলেছেন সেটা তিনি চিত্রায়ণ করেছিলেন তাঁর পরের সিনেমাতে - 'কোমল গান্ধার' (১৯৬১)।
'কোমল গান্ধার' উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি রাগবিশেষ। এই রাগের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সিনেমার এই নামকরণ। এই ছবিতে ঋত্বিক দু'টি রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি' গানটি ব্যবহার করেন, এছাড়াও বিয়ের প্রাচীন সুরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
'কোমল গান্ধার' যেমন সাংস্কৃতিক মিলনের কথা বলে, তেমনভাবে ঋত্বিকের পরের ছবি 'সুবর্ণরেখা' বর্ণনা করে দেশভাগের কুফল। ১৯৬২ সালে তৈরি হলেও ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৫ সালে। ঋত্বিক তিনটি প্রজন্মের গল্প বলেছেন এই সিনেমাতে। প্রথম প্রজন্ম ঈশ্বর, হরপ্রসাদ। দ্বিতীয় প্রজন্ম সীতা, অভিরাম। তৃতীয় প্রজন্ম বিনু। দেশভাগ ও তার ফলাফলের কারণে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে প্রথম দুইটি প্রজন্মের স্বপ্ন-আকাঙ্খা। তৃতীয় প্রজন্ম মাত্র তাঁর যাত্রা শুরু করেছে, তার ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা আমরা জানি না। তবে ঋত্বিক চেয়েছিলেন যেন তা সুন্দর হয়, তাই সিনেমার শেষে লিখে দিয়েছিলেন, 'জয় হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের'।
ঋত্বিকের এই ট্রিলজিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি বড় ভূমিকা আছে। একটি সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক বলছিলেন,
"রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারিনা। আমার জন্মের অনেক আগেই তিনি আমার সমস্ত অনুভূতি জড়ো করে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে বুঝেছিলেন এবং সেসব লিখেও ফেলেছিলেন। আমি যখন তাঁর লেখা পড়ি তখন আমার মনে হয় যে সবকিছুই বলা হয়ে গেছে এবং নতুন করে আমার আর কিছুই বলার নেই।"
১৯৬২ সালে বানালেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'সিজর্স' ও ১৯৬৩ সালে ডকুমেন্টারি 'ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান'। এই সময় 'বগলার বঙ্গদর্শন' নামে একটি সিনেমার কাজ শুরু করলেও আর শেষ করতে পারেননি।
১৯৬৫ সালের দিকে বাংলা মদ ধরলেন, এমনকি স্নান করাও ছেড়ে দিলেন। তাঁর এমন জীবনযাত্রার ফলে অতিষ্ঠ হয়ে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হলেন।
ঋত্বিক ১৯৬৫ সালে স্বল্প সময়ের জন্য পুনেতে বসবাস করেন। ১৯৬৫/৬৬ সালের দিকে পুনের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন, দু'বছর কাজ করেছেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ হিসেবে ছিলেন আরও ৩ মাস। এখানে শিক্ষকতা করার সময় তিনি শিক্ষার্থীদের নির্মিত 'ফিয়ার' ও 'রঁদেভূ' নামের দুইটি সিনেমার সাথে যুক্ত ছিলেন।
ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মণি কাউল, কুমার সাহানি এবং প্রসিদ্ধ আলোকচিত্রী কে. কে. মহাজন তাঁরই ছাত্র। ঋত্বিক তাঁর এই শিক্ষকতা জীবনকে চলচ্চিত্র কেরিয়ারের উপরেই স্থান দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য,
"আমি মনে করি, আমার জীবনে যে সামান্য কয়েকটি ছবি করেছি সেগুলো যদি পাল্লার একদিকে রাখা হয়, আর মাস্টারি যদি আরেক দিকে রাখা হয় তবে মাস্টারিটাই ওজনে অনেক বেশি হবে। কারণ কাশ্মীর থেকে কেরালা, মাদ্রাজ থেকে আসাম পর্যন্ত সর্বত্র আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আজকে ছড়িয়ে গেছে। তাদের জন্য আমি যে সামান্য অবদান রাখতে পেরেছি সেটা আমার নিজের সিনেমা বানানোর থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ।"
এরপর ১৯৬৯ সালের দিকে মানসিক ও শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় ঋত্বিককে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুরমা ঘটকের এক লেখায় জানা যায়, ঋত্বিকের সিজোফ্রোনিয়া ছিল। 'সুবর্ণরেখা' সৃষ্টির পর দীর্ঘদিন তাঁর হাতে কোনো ছবি ছিল না। নিজের প্রতি অত্যাচারের জেদ ঐসময় থেকে। মদ তখন তাঁর ব্যর্থতা ভোলার অনুষঙ্গ। ঐসময়ে তিনি একবার মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং দীর্ঘদিন তাঁকে মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল। এই অত্যাচারের ফলেই ঋত্বিকের দেহে বাসা বাঁধে মারণব্যাধি।
১৯৬৯ সালেই ভারত সরকার তাঁকে 'পদ্মশ্রী' উপাধিতে ভূষিত করেন। ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে এই সময়কালে কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে না পারলেও তিনি কিছু তথ্যচিত্র ও শর্টফিল্মের কাজ করেন। এর মধ্যে আছে, 'সায়েন্টিস্টস অফ টুমরো' (১৯৬৭), 'ইয়ে কিঁউ' (১৯৭০), পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য নিয়ে 'পুরুলিয়ার ছৌ' (১৯৭০), লেনিনের ১০০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে 'আমার লেনিন' (১৯৭০), বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে 'দূর্বার গতি পদ্মা' (১৯৭১) এবং আরও পরে ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজকে নিয়ে তথ্যচিত্র 'রামকিঙ্কর' (১৯৭৫, অসমাপ্ত)।
প্রায় এক যুগ বিরতি নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' শীর্ষক উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আগমন করে 'তিতাস একটি নদীর নাম' শিরোনামে চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। মাঝখানে কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র তৈরি করেননি তিনি। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ হিসেবে তিনি বলেন,
"তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলী, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সঙ্গীতের টুকরো, সবমিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করা যায়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল।... অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্তু লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। বইয়ে তিতাস একটি নদীর নাম। তিনি এরপরের পুনর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুনর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার যৌবনবতী। আমার ছবিতে গ্রামনায়ক, তিতাস নায়িকা।"
এই চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, চরে গজিয়ে ওঠা নতুন ঘাসের মধ্যে দিয়ে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে ছুটে আসছে একটি শিশু। নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে সিনেমাটি শেষ হয়। ঋত্বিকের ভাষায়,
"একটি সভ্যতাকে কি চিরতরে ধ্বংস করে ফেলা যায়? না, যায় না। এর শুধু রূপান্তর ঘটে। এটাই আমি এই ফিল্মের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলাম।"
ছবিটিতে বাংলাদেশের তখনকার তরুণী নায়িকা কবরী (চৌধুরী)-কে চরিত্রের প্রয়োজনে বলতে গেলে একেবারে ভেঙ্গে গড়েছিলেন ঋত্বিক। ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেন বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র। ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে প্রবীর মিত্র এভাবেই বলেন,
"এই মাকড়া, এই ছোঁড়া এদিকে আয়, এইসব বলেই তিনি (ঋত্বিক) আমাকে ডাকতেন। কখনোই আমার নাম ধরে ডাকতেন না। বলতেন, এডিটিংয়ের সময় তুই আসিস। তোর সঙ্গে আমার কথা আছে। আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তিনি কিছুই বলেন না। কাজের ভেতরেই ডুবে থাকেন। মুখ তুলেন না। ঋত্বিক-দা চলে গেলেন। তার না-বলা কথাটা আমার আর শোনা হয়নি।"
২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের করা দর্শক, চলচ্চিত্র সমালোচকদের ভোটে চলচ্চিত্রটি 'সেরা বাংলাদেশী ছবি' হিসেবে শীর্ষস্থান দখল করে।
ঋত্বিকের মূল্যায়ন, "আমি ছাড়া তিতাস হত না। তিতাস ছিল আমার স্বপ্ন। আমার মতো মমতা নিয়ে এই কাহিনীকে কেউ তুলে ধরতে আগ্রহী হতেন না।"
১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিকের শেষ ছবি 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'। সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র। মূল চরিত্র একজন মাতাল বুদ্ধিজীবী নীলকণ্ঠ বাগচী, যে তাঁর বন্ধুদের মতো সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে নিজেকে বিক্রি করে দেয়নি। নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন ঋত্বিক স্বয়ং। সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক হলেও এটা ১৯৪৭-এর দেশভাগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আর নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সময়ের একটি নির্মোহ-নির্মম সমালোচনাও বটে। সুশীল লেখক সত্যজিৎ বসু যখন তাঁকে বলছেন বাংলাদেশ নিয়ে তার ভাবনার কথা, নীলকণ্ঠ বাগচীর কণ্ঠে তখন চরম উপহাস, "ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাক্টিস করো।"
এই ছবির ব্যাপারে ঋত্বিক বলেন,
"১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমি যেমনটি দেখেছি, 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'তে আমি ঠিক সেটাই দেখাতে চেয়েছি। এটাতে কোনো ভাবাদর্শের বর্ণনা নেই। আমি কোনো রাজনীতিকের দৃষ্টিতে এটাকে দেখিনি। কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শকে তুষ্ট করা আমার কাজ নয়।"
মাত্র দু'দিনে ঋত্বিক ঘটক এ'ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ঋত্বিকই একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজের চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনায় নির্মিত ছবিতে নিজেরই চরিত্রে অভিনয় করেছেন।