আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
শাস্তি-টোলায়
অমিয় দেব
এই মর্মে এক গল্প আছে কাফকার। নাম 'In der Strafkolonie' - ইংরেজি-পাঠের জগতে 'In the Penal Colony' নামেই বিখ্যাত। বলা বাহুল্য তাঁর শাস্তি-ভাবনার আরও এক নিদর্শন। বস্তুত এক অনিবার্য নিদর্শন। লেখা ১৯১৪-তে, ছেপে বেরোয় ১৯১৯-এ। সেই অর্থে প্রথম মহাযুদ্ধের সমসাময়িকও। চরম শাস্তিদানের এক জটিল যন্ত্র তথা শাস্তি শিরোমণিই এ-গল্পের মুখ্য আলম্বন। মৃত্যুদণ্ড হাসিল করে যাওয়াই এর কাজ। এবং এতাবৎ সে-কর্ম এ কম করেনি। শাস্তি-টোলার বাইরেকার এক ক্ষুদ্র প্রান্তরে সে দাঁড়িয়ে আছে। কাছেই এক গর্ত, যেখানে তদোৎক্ষিপ্ত সব আবর্জনা এসে জড়ো হয়। আজ অদূরেই এক শৃঙ্খলিত দণ্ডিত, সঙ্গে এক প্রহরারত সিপাহী - মৃত্যুদণ্ড হাসিলের অপেক্ষা। সেই মৃত্যুদণ্ড দর্শনের, বস্তুত খতিয়ে দেখার, আমন্ত্রণ অবজ্ঞা করতে পারেননি এক অভিজ্ঞ ভ্রাম্যমাণ ভিনদেশি। নিতান্তই ভদ্রতাবশত। শাস্তি-টোলার তিনি বিশিষ্ট অতিথি। আর তাঁকে আমন্ত্রণ করেছেন স্বয়ং কমান্ডান্ট, টোলার বর্তমান অধিনায়ক। তবে তিনি নিজে এখানে, অন্তত এখনও, আসেননি। হয়তো আসবেনও না। অতিথির অভিজ্ঞতাই হয়তো প্রামাণ্য হতে যাচ্ছে।

'In der Strafkolonie'-এর প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ।
এসেছেন পূর্বতন কমান্ডান্টের সহকারী এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক, যিনি এই যন্ত্রের উদ্ভাবনে ও নির্মাণে তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এবং তাঁর আদর্শ সেই প্রয়াত পূর্বতন কমান্ডান্টই, যিনি শুধু এই যন্ত্রেরই নয়, শাস্তি-টোলারও প্রকৃত জনক। বর্তমান কমান্ডান্টের ধরণধারণে - আর তার মধ্যে টোলার কর্মকাণ্ডে মহিলাদের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা ও প্রভাবও অবশ্যই গণনীয় - এই আধিকারিক দেখেন তাঁর আদর্শের চ্যুতি।
বস্তুত তাঁর বিচারেই আজকের অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড। কী ছিল তার অপরাধ? সেনাবাহিনির এক ক্যাপ্টেনের ভৃত্য হিসেবে সে ঘন্টায় ঘন্টায় না জেগে উঠে তাঁর দরজার বাইরে বসে ঘুমোচ্ছিল; তার কর্তব্যনিষ্ঠা পরীক্ষা করতে দরজা খুলে তা দেখে ক্যাপ্টেন রেগে গিয়ে তার মুখে চাবুক চালাতেই, সে উল্টে তাঁকেই মারতে গিয়েছিল। সেই অভিযোগই ক্যাপ্টেন করেছেন তার বিরুদ্ধে: তার আপাত হিংস্রতা তথা অবাধ্যতা তথা অভক্তি। ন্যায়বিচার কি হয়েছিল, অর্থাৎ তার আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ কি সে পেয়েছিল? না। বিচার এখানে, অন্তত অদ্যাবধি, একতরফা। তার যে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তাও তাকে জানানো হয়নি। শুধু দণ্ড হাসিলের জন্য তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে।
শাস্তিদান-যন্ত্রের গুণকীর্তনে পঞ্চমুখ আমাদের এই আধিকারিক। এমন একটি যন্ত্র পূর্বতন কমান্ডান্টের মাথা থেকেই বেরোতে পেরেছিল। অতুলনীয়! বিশিষ্ট অতিথি অনেক দেখেছেন শুনেছেন, তিনি কি একথা বুঝবেন না? তাকে বোঝাতেই হবে যেনতেন প্রকারেণ। তাই কথান্তরে না গিয়ে এ-ব্যাপারেই পুরো মনোনিবেশ আধিকারিক মশায়ের। যন্ত্রের আছে তিনটে অংশ। নীচে এক তুলোয় মোড়া কম্পমান শয্যা, উপরে এক উৎকীর্ণক, আর মাঝখানে এককর্তনী বা 'মই' - জমিতে যেমন দেওয়া হয় তেমনি, তবে তার আকৃতি মস্তিষ্ক নিম্ন মনুষ্যদেহের এবং তা একসার তীক্ষ্ণ সূচসংবলিত। দণ্ডিতকে উলঙ্গ করে ওই শয্যায় উপুড় করে শুইয়ে দেওয়া হয়। শক্ত পটিতে পটিতে তার হাত-পা-গলা হয় বাঁধা। মুখে ঢুকিয়ে রাখা হয় এক টুকরো 'ফেল্ট' যাতে সে যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠতে না পারে। বলাবাহুল্য, যন্ত্রণার উৎস ওই সমূহ সূচ যারা তার পিঠের উপর বয়ে বেড়াবে। ক্রমান্বয়ে, বারো ঘন্টা (মৃত্যু আসুক তিলে তিলে), বইয়ে বেড়িয়ে উপরের উৎকীর্ণক তাদের দিয়ে সেই পিঠে দণ্ডোদ্ভূত এক বাণী খোদাই করিয়ে দেবে, কোনো সদুপদেশ (এবং তন্নিমিত্তই কর্তনীটি কাঁচের যাতে শাস্তিদান কর্মের অধিকর্তা দেখতে পান কী লেখা হচ্ছে)। যেমন আমাদের এই দণ্ডিতের ক্ষেত্রে, 'ঊর্ধ্বতনকে সম্মান কোরো'। এক নিত্য প্রচারিত বিধি হয়ে তা থাক শাস্তি-টোলার। যন্ত্রোৎক্ষিপ্ত শবের পিঠে সেই উৎকীর্ণ বাণী এসে দেখুক সকলে যারা মৃত্যুদণ্ড দর্শন করতে এসেছে ভিড় করে। অন্তত এতদিন তা-ই এসেছে। মানে, প্রয়াত কমান্ডান্টের আমলে। বর্তমান কমান্ডান্ট বুঝি-বা বদল চাইছেন? ভ্রাম্যমাণ ওই অতিথিকে বুঝি সেই কারণেই অদ্যকার মৃত্যুদণ্ড দর্শনের আমন্ত্রণ? কট্টর শাস্তিবাদী এই আধিকারিকমশাই যে সর্বতোভাবে বর্তমান কমান্ডান্টের বিরোধী, তা বলে দিতে হয়না। সম্মুখসমরও আসন্ন।

'In the Penal Colony'-র আধুনিক সংস্করণের প্রচ্ছদ।
এই মৃত্যুদণ্ড সম্পাদনের সময় এল এবার। অর্থাৎ শাস্তা যন্ত্রের ভয়াবহ দক্ষতা এবার প্রমাণ হতে চলেছে। আধিকারিকের আদেশে প্রহরারত সিপাহী নিয়ে এল দণ্ডিতকে। সে বিহ্বল - যে-সংলাপ এতক্ষণ হচ্ছিল আধিকারিকে-অতিথিতে তা সাগ্রহে শোনার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাঁরা কথা বলছিলেন ফরাসিতে যা তার বোধগম্য নয়। তাকে নগ্ন করে নীচের শয্যায় শুইয়ে দেওয়া হল। দিয়ে তার হাত-পা-গলা তন্নিমিত্ত পটিতে-পটিতে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, এমন সময় দেখা গেল একটা পটি কেমন আলগা হয়ে আছে - বস্তুত খুলেই এল - বন্ধন তা দিয়ে হবে না। মেরামতির ব্যবস্থা আর আগের মতো নেই, বলে অতিথিকে তাঁর নালিশ শোনালেন আধিকারিক। ফিরিস্তিও দিলেন একের পর এক। তবে সামাল তিনি দিতে পারবেন আপাতত, কিন্তু তার আগে একটা কথা। মান্যবর অতিথির কাছে তাঁর এক প্রার্থনা আছে। পরের দিনই শাস্তি-টোলার সকল বিভাগের সব আধিকারিকদের এক সভা ডেকেছেন বর্তমান কমান্ডান্ট। আসল উদ্দেশ্য আমাদের আধিকারিকের মতো পূর্বতন 'আদর্শ'পন্থীদের দাবড়ে দেওয়া। সেখানে, বলা বাহুল্য, তিনি তাঁর বিরুদ্ধতা করবেন। এবং একমাত্র তিনিই তা করবেন, কারণ অন্য অনেকেই করতে চাইলেও করবার সাহস পাবে না। এখন, তাঁর পরিকল্পনা ও তদনুযায়ী তাঁর প্রার্থনা: সেই সভায় উপস্থিত থাকতে অবশ্যই আমন্ত্রিত হবেন মান্যবর অতিথি, কিন্তু কোনো কারণে তা না হলেও যেন তিনি দয়া করে তাতে উপস্থিত হবার অনুরোধ করেন। এবং উপস্থিত হয়ে আমাদের আধিকারিকের সপক্ষে কথা বলেন। বলেন, এই আশ্চর্য শাস্তা যন্ত্র মারফত এতদিনের চলে-আসা শাস্তিব্যবস্থা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।
কিন্তু কী করে তা বলবেন সেই অতিথি, তিনি তো অমন শাস্তি সমর্থন করেন না - সমর্থন করতে পারেন না? আর ওই বিচার, যাতে অভিযুক্তের কোনো কথা বলবারই অধিকার নেই - এমনকী তার দণ্ডও তাকে জানানো হয় না - তা-ই বা কী করে মেনে নেন? তাছাড়া, তিনি তো পরের দিন প্রত্যুষেই শাস্তি-টোলা থেকে প্রস্থান করবেন, কোনো সভায় কী করে থাকবেন? তবে হ্যাঁ, তার আগে তাঁর অভিমত তিনি বর্তমান কমান্ডান্টকে একান্তে জানিয়ে দেবেন।
এর পর যা ঘটল তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। খালি আধিকারিক নিজের মনে বলে উঠলেন, 'এবার তবে সময় হল'। সবে আজকের দণ্ডিতের শাস্তি শুরু হয়েছে - অর্থাৎ কর্তনী তার পিঠে চলতে শুরু করেছে - যন্ত্র থামিয়ে তাকে শয্যা থেকে নামিয়ে আনবার আদেশ দিলেন আধিকারিক। আর তাকে বললেন, সে মুক্ত, সে এখন যেখানে খুশি যেতে পারে। তারপর, তাঁর কাছে পরমসম্পদ রূপে এই যন্ত্রের যে-নকশানিচয় আছে তা থেকে একটি বের করে, আধিকারিক তা অতিথির হাতে না দিয়ে, তাঁর চোখের সামনে ধরে তাঁকে পড়তে বললেন। অত আঁকিবুকির মধ্যে সেই লেখা যখন পড়ে উঠতে পারলেন না অতিথি, তখন তিনিই তা পড়ে শোনালেন: 'ন্যায়পরায়ণ হও'। এই উৎকীর্ণনই হোক ভবিতব্য।
অতঃপর এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক হিসেবে এই গ্রীষ্মেও যে-ভারী ইউনিফর্ম তিনি ধারণ করেছিলেন, এবং ঘামছিলেনও, তা একে একে খুললেন। খুলে নিয়ে, যথাবিধ যত্নসহকারেই তাদের নিক্ষেপ করলেন যন্ত্রসংলগ্ন ওই গর্তে। করে নগ্নদেহে, ওই শয্যায় উপুড় হয়ে শুলেন তিনিই। যন্ত্রও সচল করে দিলেন। কিন্তু অচিরেই ওই কর্তনী উৎকীর্ণকের নিয়ন্ত্রণ অমান্য করে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠল। সূচসমুদয় পিঠের উপর বয়ে না বেড়িয়ে ছুরিকাঘাত করতে লাগল। কোথায় এক মহান বাণী খোদাই করবে তা নয়, বুঝি আশু অভীষ্ট হত্যাই। এদিকে শয্যাও নিতান্ত কাঁপতে না থেকে ওঠানামাও করতে লাগল। অতঃপর উৎকীর্ণকও আর অটুট রইল না, খুলে খুলে আসতে লাগল। শুরু হল যন্ত্রের ভাঙন। বারো ঘন্টায় যা হবার কথা, তার জন্য খুব বেশি সময় লাগল না। হল না তাঁর ন্যায়পরায়ণতার মন্ত্রে কোনো দীপ্য অন্তর্ধান। সেই সঙ্গে এই সহনির্মাতার প্রাণাধিক যে-যন্ত্র তাও ভেঙে টুকরো টুকরো হল। উভয়েরই সাক্ষী হয়ে রইলেন মৃত্যুদণ্ড দেখতে আসা আমাদের ভ্রাম্যমাণ ভিনদেশি।
দৃশ্য বদল হল। ভ্রাম্যমাণ ভিনদেশি এখন শাস্তি-টোলার অভ্যন্তরে এসেছেন। তাঁর পেছন পেছন এসেছে অধুনামুক্ত ওই 'দণ্ডিত' ও তার সেই 'প্রহরী' সিপাহী যে এখন তার সুহৃদস্বরূপ। শাস্তি-টোলার সাধারণ লোকজন খুব গরিব, তাদের বাড়িঘর ভাঙাচোরা - ব্যতিক্রম কমান্ডান্টের প্রাসাদোপম আবাস। এই তিনজনকে আমরা এক চা-ঘরে ঢুকতে দেখছি। তাও মলিন। তবে শোনা গেল এখানে এক টেবিলের তলাতেই মহানিদ্রাবৃত শাস্তি-টোলার প্রাক্তন কমান্ডান্ট। তাইই করতে হয়েছে শববাহীদের, কেননা শাস্তি-টোলার সমাধিক্ষেত্রের যাজক তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এক প্রস্তরফলকও এই মাটিতে উৎকীর্ণ করে রেখেছেন তাঁর অনুগামীরা। তাতে এক ভবিষ্যদ্বাণীও আছে যে তাঁর পুনরুত্থান হবে। চাই প্রত্যয় ও অপেক্ষা। এই ফলক পড়লেন ভিনদেশি অতিথি। পড়েই তিনি জাহাজঘাটা অভিমুখে প্রস্থান করলেন। একটু দেরি করে হলেও অন্য দুজনও, মানে দণ্ডিত ও সিপাহী, সে-পথে এগোল। তারাও কি শাস্তি-টোলা ছাড়তে চায়? বস্তুত, তিনি বাধা না দিলে যে-নৌকোয় করে তিনি জাহাজ ধরতে যাচ্ছেন তাতে তারাও উঠে পড়ত।
গল্পটা কি শেষ হল? (কাফকার চার বছর আগে জন্মানো ইংরেজ লেখক ই. এম. ফর্স্টার বোধকরি বলবেন, না। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রও বোধকরি প্রশ্ন তুলত। কিন্তু কাফকার কাছে অভিজ্ঞতা স্বয়ংবর।)