আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
অলীক কুনাট্য
ইডি এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর যে বচসা এবং সংঘাত গোটা দেশের মানুষ টিভির পর্দায় দেখলেন তার তুলনীয় লজ্জাজনক ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আর নেই বললে অত্যুক্তি করা হবে না। ইডি একটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যারা আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করতে আই-প্যাকের অফিসে আসে। কেন এসেছিল? কী পেল? এই হানা আইনসিদ্ধ কি? এই সমস্ত প্রশ্ন তোলার অধিকার তৃণমূলের মতন একটি আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত দলেরও আছে। আছে, কারণ ভারতের সংবিধান সেই অধিকার তাদের দিয়েছে। কিন্তু একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত তথা তল্লাশি চলাকালীন অফিসে গিয়ে সরাসরি ইডি অফিসারদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়েছেন এবং কিছু কাগজপত্র অফিস থেকে বার করে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেছেন, এমন ঘটনা এই বিচিত্র দেশেও শুধু বিরল নয়, বেনজির। এই বেনজির লজ্জাজনক ঘটনা সংবিধান অবমাননা তথা আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
দেশের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে বিষয়টি গুরুতর এবং কলকাতা পুলিশ ইডির বিরুদ্ধে যেই এফআইআর করেছে, তা স্থগিত করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা জানিয়েছেন যে আইনের শাসন বহাল রাখা, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কীরূপ ব্যবহার থাকা উচিত, তা নিয়ে এই ঘটনা গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
মুখ্যমন্ত্রীর দল এবং তার দলের নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা রয়েছে। কয়লা চুরি, গরু পাচার, বালি পাচার, চাকরি চুরি থেকে শুরু করে হেন কোনও দুর্নীতি নেই যা নিয়ে নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এইসব নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাননি। দলের দামাল ছেলেরা একটু আধটু চুরি-জোচ্চুরি করবে, একে যেন তিনি মান্যতা দিয়েছেন। তাই নারদা হোক অথবা সারদা, প্রত্যেক অভিযুক্ত নেতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন তিনি। অতএব, ইডি হানা দিলে তিনি তার সাগরেদদের বাঁচাতে আসবেন তা আর পশ্চিমবঙ্গের জনতাকে অবাক করে না। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন যে তাঁর দলের গোপন তথ্য চুরি করার জন্য ইডির আগমন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যকে সত্যি বলে ধরে নেওয়ারও কোনও কারণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। এমনকি তা যদি সত্যিও হয়, একজন মুখ্যমন্ত্রী নিজে সরকারী কাজে বাধা দিচ্ছেন তা কখনই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রী এর আগেও রাজ্যের পুলিশ স্টেশনে ঢুকে আসামীকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। তখন তিনিই মুখ্যমন্ত্রী, এবং তাঁর রাজ্যের পুলিশই সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু নিজের দলের দামাল ছেলেকে বাঁচাতে সেইদিন তিনি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। অতএব এই প্রশ্ন অবশ্যই উঠবে যে এই ক্ষেত্রেও কি তিনি অপরাধীদের আড়াল করতে এসেছিলেন?
কিন্তু ইডির মতন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ধোয়া তুলসিপাতা ভাবলে ভুল হবে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ইডি-সিবিআই-এর মতন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে তাদের ক্যাডারে পরিণত করেছে বিরোধী স্বরকে স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে। একের পর এক বিরোধী দলের নেতা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ইডি-সিবিআইকে ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে যারা বিজেপিতে যোগ দিয়েছে তাদের সমস্ত অপরাধ আর বিজেপির নজরে পড়েনি। সাধারণ নাগরিকদের ব্যতিব্যস্ত করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুললে বা আন্দোলন করলে। এই পরিস্থিতিতে, যেই কেস বিগত বহু বছর ধরে চলছে, তা নিয়ে ইডি হঠাৎ হানা দিল পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের মাস দুয়েক আগে। তাই সন্দেহ জাগাই স্বাভাবিক যে দুর্নীতিগ্রস্থদের শাস্তি দেওয়াই কি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য নাকি তৃণমূলের মতন বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষতি করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য! তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে একটি আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্থ এবং স্বৈরাচারী সরকার চালাচ্ছে। কিন্তু ইডি-সিবিআইকে যেভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, তারপরে তাদের গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। আবার সারদা-নারদা-চাকরি চুরি থেকে শুরু করে অভয়া কান্ডের অপরাধীদের ক্ষেত্রে সিবিআই-এর ভূমিকাও আমরা দেখেছি, যেখানে অভিযুক্তরা হয় ছাড়া পেয়েছে অথবা সিবিআই সঠিকপথে তদন্ত করেনি।
আসলে তৃণমূল ও বিজেপি দুই-ই জনবিরোধী স্বার্থান্বেষী দল। মানুষের কল্যাণে এদের কোনও আগ্রহ বা ভূমিকা নেই। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা চালানোই এই দুইয়ের উদ্দেশ্য। তাই ইডি বনাম মমতার লড়াইয়ে থাকতে হবে সংবিধান ও স্বচ্ছতার পক্ষে। আশা করব মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে মানুষকে পথ দেখাবেন।