আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
নিরাপত্তাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়
অর্ধেন্দু সেন
দেশের সাধারণ মানুষ সরকারের কাছে সর্বাগ্রে কী চায়? অবশ্যই নিরাপত্তা। বহুশত বছর আমরা অন্যের গোলামি করেছি। বিদেশি শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। 'শক হূণ দল পাঠান মোগল' একের পর এক আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমাদের দেশ দখল করেছে। তারপর এসেছে ইংরেজ। বিকীর্ণ করেছে তার তেজ। কথিত আছে যে তিরিশ হাজার ইংরেজ সৈন্য এবং কর্মচারী রাজত্ব করেছে তিরিশ কোটির দেশে। আমরা কি চাইব আমাদের সীমান্ত আবার আক্রান্ত হোক? কখনোই নয়। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরে আমরা একটা সরকার পেয়েছি যে সরকার এই সত্যটি উপলব্ধি করেছে। তাই 'রোটি কাপড়া আর মকান' একপাশে সরিয়ে রেখে দেশকে প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে উদ্যোগী হয়েছে।
তবে দেশের সব শত্রু যে সীমান্তের ওপার থেকে হানা দেয় তা নয়। দেশের অভ্যন্তরীণ শত্রু - সে আরও ভয়ানক। এক জেনারেল বলেছেন, যুদ্ধ লাগলে আমাদের লড়তে হয় আড়াইটা মোর্চায় - চীন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং ভিতরের শত্রুর বিরুদ্ধে। সবাই কিন্তু এই চ্যালেঞ্জটা হাল্কাভাবে নেয় না। 'হিন্দুদ্বেষ বন্ধ কর' নামে ওয়েবসাইটে একটা লেখা পড়ছিলাম। কোনো রাখঢাক না করেই লিখেছে করণ থাপার, প্রশান্ত ভূষণ ইত্যাদি দেশদ্রোহীদের কীভাবে জব্দ করতে হবে। মহুয়া মৈত্রের নাম দেখলাম না কেন?
গণতন্ত্র নিজেই নিজের বড়ো শত্রু। তাই প্রাচীন ভারতই হল গণতন্ত্রের জননী - এ কথা স্বীকার করেও সরকারকে যথেষ্ট সাবধানী হতে হয়েছে। দেশের শত্রু খুব সহজেই সংবাদ মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে পারে। কাজেই সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখতে কঠিন সরকারি নিয়ন্ত্রণ জরুরি। যারা ৭০ বছর সরকার চালিয়েছেন তারা কি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন? এখন হাত কামড়ে কি লাভ? অন্যদিকে, গণতন্ত্রে যেকোনো সদাগরি সংস্থানের অধিকার আছে পত্র-পত্রিকা চালাবার। এই অধিকার শুধু সরকার-বিরোধীদের থাকবে তা তো হতে পারে না।
সংবাদ মাধ্যম সুনিয়ন্ত্রিত হলে দেখবেন সংবাদের সু-বাতাস বইছে। লিবারাল-রা বলবে গোদি মিডিয়া। বলুক না! দেখে নেওয়া যাক ২০২৫-এর কিছু বিশেষ বিশেষ খবর:
মে ২০২৫
অপারেশন সিঁদুরের প্রতিরোধে বোমারু বিমানের পাশাপাশি পাকিস্তান কাজে লাগিয়েছিল অজস্র ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গতিবিধি ঠাহর করে এদের নিষ্ক্রিয় করতে আমরা ব্যবহার করেছিলাম 'আকাশতীর' এবং 'সুদর্শন চক্র'। ইজরায়েলের 'আয়রন ডোম' অথবা আমেরিকার 'গোল্ডেন ডোম'-এর মতো 'আকাশতীর' বহু র্যাডারের তথ্য একত্রিত করে পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে বোঝে এবং তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
অক্টোবর ২০২৫
আপনাদের স্মরণ আছে যে আগস্ট মাসে সরকারি অনুমোদন পাওয়া গিয়েছিল ৬৭,০০০ কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করার। তিন মাস যেতে না যেতেই অনুমোদন মিলল আরও ৭২,০০০ কোটির। স্থল-সেনা, বায়ু-সেনা ও নৌ-সেনার জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ক্রয় করা হবে ড্রোনের ঝাঁক যা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে টার্গেটের উপর। আরও থাকবে 'ব্রাহ্মস' এবং 'এস-৪০০' ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ-সেনার জন্য 'ল্যান্ডিং ডক'।
খবরে প্রকাশ যে এই ঘোষণার পরে দেশের অস্ত্র তৈরির কোম্পানিগুলির শেয়ার মূল্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে।
ডিসেম্বর ২০২৫
ফ্রান্সের হ্যামার বোমা/ক্ষেপনাস্ত্র এখন ভারতেই তৈরি হবে। 'অপারেশন সিঁদুর'-এ হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে পাকিস্তানের টেররিস্ট ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিতে। ফরাসি সংস্থা সাফরান ও ভারত ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে চুক্তির ফলে ভারত হ্যামার তৈরি করতে পারবে। হ্যামার ক্ষেপণাস্ত্রও বটে, আবার বোমাও বটে। এই অস্ত্র রাফাল ছাড়া অন্য বিমানের সঙ্গেও ব্যবহার করা যায়। সীমান্তের এপারে থেকেও আমাদের বায়ুসেনা হ্যামার ব্যবহার করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ টার্গেটে পৌঁছতে সফল হয়েছে।
পূজ্য বাপুর নাম এতদিন মাটি কাটার স্কিমে ব্যবহার করা হয়েছে। নামটা এখন ফ্রি। কোনো স্কিমের সঙ্গে যুক্ত নয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবার স্কিমে তাকে ব্যবহার করলে কেমন হয় - 'নমামী গান্ধী শত্রু-সংহার-প্রযুক্তি-উন্নয়ন মহাপ্রকল্প অথবা মহাযজ্ঞ'? আশ্চর্য হব না যদি তাই করা হয়!
গান্ধীজী কোনোদিনই ভারত সরকারের নীতিকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেননি কিন্তু মোদী সরকারের কথায় এবং কাজে তাঁর সঙ্গে বিভেদ স্পষ্ট। গান্ধীজীর কথায় সেই নীতিই গ্রহণযোগ্য যাতে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র লোকটির উপকার হয়। মোদী সরকারকে প্রশ্ন করলে জবাব হবে, এ সম্বন্ধে কোনো তথ্য সরকারের হাতে নেই। অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে পাঁচ পারসেন্টে নেমেছে। তাদের ভোটের মূল্য খুবই কম। তাই তাদের নিয়ে সরকার সময় নষ্ট করতে নারাজ। ভারতের জিডিপি বিশ্বে চতুর্থ স্থান দখল করেছে, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী গর্ব করে থাকেন। নিন্দুক তখন প্রশ্ন করে মাথাপিছু জিডিপি কত? এমন নয় যে তিনি মাথাপিছুর অঙ্ক জানেন না। ভালই জানেন কিন্তু তাঁর ভারতের জনসংখ্যা ২০-৩০ কোটি। তার বেশি লোকের খবর তিনি রাখেন না।
দেশের এই অংশের মানুষের উপার্জন এবং জীবনযাত্রার মান ইংল্যান্ড-এর চেয়ে কম নয়। দেশের সম্পদের ৭৫ শতাংশ এখন ১ শতাংশ মানুষের হাতে। নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে আছে ৩০ শতাংশ সম্পদ। প্রশ্ন উঠেছে ক্রমাগত বাড়তে থাকা অসাম্যের বিষয়ে সরকার কী করছে? এক সময়ে নীতি আয়োগের কর্ণধার বলেছিলেন অসাম্য না থাকলে বৃদ্ধি হবে না। বৃদ্ধির হার বেড়ে ৮.২ শতাংশ হয়েছে। অসাম্য কতটা বাড়ল?
মোদী সরকার শুধু দেশীয় নীতিতে বদল আনেনি। বিদেশ নীতিতেও সংস্কারের কোপ পড়েছে। স্বাধীনতার পরে আমরা ঠিক করি আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সমান দূরত্ব বজায় রেখে চলব। এখন আমরা আমেরিকার কাছে এসেছি, প্রাণপণ চেষ্টা করছি আরও কাছে আসার। এর একটা ফল হয়েছে ইজরায়েলের কাছে আসা। এমনিতেও হয়তো আসতাম আমাদের সাধারণ শত্রুর কারণে। আরও কারণ আছে। ইজরায়েলের অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি উন্নত। তারা এখন আমাদের নানা ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করে।
হায়দ্রাবাদে ভারত-ইজরায়েলের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয় হারমিস ক্ষেপণাস্ত্র।
ইজরায়েলের কাছে আমরা পেয়েছি 'পেগেসাস সফটওয়্যার'। অভিযোগ এই সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়েছে সরকার বিরোধী সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে ভীমা কোরেগাও মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। শীর্ষ আদালত চেষ্টা করেছিল অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই করতে। সরকার সহযোগিতা না করায় পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সরকার নিরাপত্তার দোহাই সর্বত্র দেয়। প্রধানমন্ত্রীর সার্টিফিকেট প্রকাশ করা যায় না জাতীয় নিরাপত্তার কারণে। কত বাতিল নোট ফিরে এল তা জানানো যায় না নিরাপত্তার কারণে। পেগেসাস মামলায় দেখলাম শীর্ষ আদালতও মাথা নত করল নিরাপত্তার প্রশ্নে।
আপাতত মেনে নেওয়া যাক, নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস হয় না। হয়তো এই চাহিদা আসছে সেই ২০-৩০ কোটি মানুষের কাছ থেকেই। অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ চায় 'মনরেগা' ফিরে আসুক। তারা তাদের কণ্ঠস্বর ফিরে পেলে এই কোলাহল আর শোনা যাবে না।