আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩২
সমসাময়িক
আসামে আবার অশান্তি
উত্তপ্ত আসাম। জ্বলছে আসামের পশ্চিম কার্বি আংলং জেলা। এখনও পর্যন্ত হিংসার ঘটনায় দু'জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত আরও অনেকে। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন এক বাঙালিও। শুধু তা-ই নয়, সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ঘায়েল হয়েছে পুলিশও। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই জেলায় কার্ফু জারি করা হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫) সকাল থেকে থমথমে পশ্চিম কার্বি আংলং জেলা।
অনেক দিন ধরেই পশ্চিম কার্বি আংলং জেলা এবং সংলগ্ন কার্বি আংলং জেলায় বহিরাগতদের উচ্ছেদ নিয়ে টানাপড়েন চলছে। জমির অধিকার নিয়ে কার্বি জনগোষ্ঠীর লড়াই চলছে। বহিরাগতদের বসতি উচ্ছেদ করা এবং ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত অঞ্চলে কার্বি জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার দাবিতে ১৬ দিন ধরে অনশন আন্দোলন চলছিল। মঙ্গলবার অনশনরত কার্বি জনগোষ্ঠীর এক আন্দোলনকারীকে হাসপাতালে পাঠানোর পরই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। খবর ছড়ায়, কার্বি নেতাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ!
প্রশাসনের মতে, এক বিক্ষোভকারী নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে ভুল তথ্য ছড়ায়, যার জেরে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার এই এলাকায় একসঙ্গে অনেকে জড়ো হন। অনশনের কারণে এক বিক্ষোভকারীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু খবর রটে যায় তাঁকে নাকি গ্রেফতার করা হয়েছে।
প্রশাসনের মতে বিক্ষোভকারীরা এলাকার একটি সেতুর দখল নিতে চেয়েছিলেন। তাতে বাধা দিতে গেলেই পুলিশের উপর হামলা শুরু হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে পুলিশও। তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। বিভোক্ষকারীরা নাকি পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, পাথর তো বটেই তীরও ছুঁড়তে থাকেন। তাতে নাকি অনেক পুলিশকর্মী জখম হন।
কার্বিদের অভিযোগ, বহিরাগতেরা তাদের জমি দখল করে রেখেছে। তাদের উচ্ছেদের কথা বার বার বলা হলেও কোনও পদক্ষেপ করেনি প্রশাসন।
অশান্তিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে পশ্চিম কার্বি আংলং জেলার খেরোনি এলাকায়। এই এলাকায় কার্বি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিহারি, বাঙালি এবং নেপালিদেরও বসতি রয়েছে। বস্তুত, অশান্তি ছড়ানোর পর থেকেই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্ফু জারি করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও। নতুন করে অশান্তি না ছড়ালেও এখনই কার্ফু প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। বন্ধ থাকছে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও।
খেরোনিতে দোকান এবং বাজারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। থমথমে পরিবেশ। বড়দিনের সকালেও অস্বস্তিকর চাপা উত্তেজনা ছিল। তবে নতুন করে কোনও অশান্তি ছড়ায়নি আসামের পশ্চিম কার্বি আংলং জেলায়। অশান্তি কবলিত এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রচুর পুলিশকর্মী, আধাসেনা এবং সেনা জওয়ানদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
আসামের এই জেলায় বহিরাগতদের উচ্ছেদ নিয়ে অনেক দিন ধরেই টানাপড়েন চলছে। জনজাতি এলাকায় হিন্দিভাষীরা জমি দখল করে নিচ্ছেন - এই অভিযোগে স্থানীয় কার্বি গোষ্ঠী এবং বহিরাগতদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। এই 'জমিদখল'-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও চালাচ্ছে কার্বি জনগোষ্ঠী।
কার্বি আংলং জেলাতে মাটির নীচে খনিজ তেল থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই এই সংঘাতের আঁচ করা গিয়েছিল। বছর দশেক আগে অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের দুলিয়াজান কেন্দ্র থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা কার্বি আংলং জেলার সদর শহর ডিফুর আশপাশে সমীক্ষা চালিয়ে তৈল ভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়ার পর থেকেই জমির স্বত্ত্ব নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। কার্বি আংলং স্বশাসিত পরিষদের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন 'অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড'-এর বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানান যে ডিফুর পূর্ব দিকে দিলাজি, দলদলি, ধনসিরি, রঙাপাহাড় ও মাইসিবাইলাম এলাকায় হাইড্রোকার্বন ভাণ্ডার থাকার ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিত। বিধানসভা ভোটের পর সেই জায়গাগুলিতে খনন শুরু হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু হয়নি। তারপর ২০২১-এ আবার বিধানসভা নির্বাচন হয়। কিন্তু খনন শুরু হয়নি। এখন শোনা যাচ্ছে যে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন শেষ হলেই খননকাজ শুরু হবে। তাই বহিরাগতরা অবিলম্বে জমির দখলদারিত্ব পেতে চান। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের জমিজমা হাতছাড়া করতে রাজি নন। কাজেই এই সংঘাত অবধারিত ছিল। এখন দেখার বিষয় প্রশাসন কী চায়।