আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৬ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
কাগজের কথা
স্বপন ভট্টাচার্য
কাগজের আবিষ্কার যে চীনদেশে হয়েছিল এ নিয়ে কোন বিতর্ক আছে বলে জানা ছিল না। চীনের রাজ দরবারের একজন অমাত্য কাই লুন (Cai Lun) ১০৫ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ প্রথমবার কাগজের ব্যবহার করেন বলে শোনা যায়। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকায় আমাতে (Amate) নামের একটা লিখনমাধ্যম পঞ্চম শতকে মায়া সভ্যতায় ব্যবহৃত হত এবং স্পেনীয় দখলদারদের হাতে পড়ার আগে পর্যন্ত এটাই ছিল পছন্দের লিখন-আধার। আমাতে কাগজের মতই ছিল বটে কিন্তু এতে আঁশের মাত্রা অধিকতর হত। আমাতের ব্যবহার কিন্তু কাগজের বহু আগে থেকেই হচ্ছিল এবং প্রাচীনতমটি মেক্সিকোর হুইতসিলাপা থেকে খ্রিস্টের জন্মের ৭৫ বছর আগেকার নমুনা বলে প্রমাণিত হয়েছে। কাগজ নয়, তবে কাগজের একটা পুর্বসুরি যে চিনের আগে থেকেই মায়ারা ব্যবহার করত তা নিয়ে সংশয় নেই। যাই হোক, চীন থেকে প্রথমে পূর্ব এশিয়া এবং সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কাগজ যখন ভালোভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে, ভাবলে অবাক লাগে, ইউরোপ তখনও সে বস্তু চোখে দেখে নি। ইউরোপে কাগজ পৌছায় ১১৫১ তে মুর শাসনাধীন স্পেনে মুসলিম আরব ও বার্বেরিয়ানদের হাত ধরে। সেখান থেকে ইতালিতে ১২৭৬ সালে, ফ্রান্সে ১৩৪৮ সালে, জার্মানিতে ১৩৯০ এবং ইংল্যান্ডে ১৪৯৫ তে।
কাগজ শব্দটি পার্সি। ইন্দো-ইরানী 'সোদিয়ান' (Sogdian) ভাষায় প্রথম কাঘজ শব্দটি পাওয়া যায় বটে তবে সম্ভবত এ নামও কোন চীনা উৎস থেকে ধার করা। আরবে এসে তা হল কাগদ এবং কমবেশি সমোচ্চারিত শব্দে বস্তুটি বাংলা, কুর্দ, মারাঠি, নেপালি, তেলুগু, তামিল, জর্জিয়া, তুর্কি, বলকান সার্বিয়ান ইত্যাদি নানা ভাষায় পরিচয় পেয়েছে। কাগজের ব্যবহার সমগ্র ইউরেশিয়া জুড়ে শিল্প-সাহিত্যে এবং তথ্যাদি নথিভুক্তি ও সংরক্ষণে পারসিক প্রভাবের ছাপ রেখেছিল যাকে 'পার্সোগ্রাফিয়া' (Persographia) নামে অভিহিত করেছেন কেউ কেউ।
আরবভূমি হয়ে ইউরোপে
খ্রিষ্টান ইউরোপে কাগজ তৈরির আর্ট নিয়ে আসে আরব বন্দীরা। ইতালির বোর্জো-সারাসেনো নামের শহরে এদের পরিচিতি ছিল 'ফাব্রিয়ানো' কৃৎকুশলী নামে। উল বোনা এবং কাপড় বোনায় এদের নাম ছিল। এই ফাব্রিয়ানো বা কাপড়শিল্পীরাই তৈরি করত অতি উৎকৃষ্ট মানের হ্যান্ড-মেড পেপার। দড়ি-দড়া, বস্তা, মাছ ধরার জাল ইত্যাদি থেকে কাগজের মণ্ড বানানো, তা পেটাই করে জলমুক্ত করা, শুকিয়ে তোলা, পশুচর্বি থেকে তৈরি আঠা দিয়ে মাড়াই করা, জলছাপ তোলা ইত্যাদির আর্ট তারা জানতো। এরাই প্রথম জল-কল চালিয়ে পেটাই বা হ্যামারিং-এর কাজটি যান্ত্রিক করে তোলে। পরে ধীরে ধীরে তা বাকি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু মুখ্য অবদান ফার ইস্ট এবং মিডল ইস্টের তো বটেই। ইউরোপে কাগজের সবচেয়ে প্রাচীন নমুনাটি হল একাদশ শতাব্দীর মোজারাব মিসসাল অফ সাইলোস (Mozarab Missal of Silos, ১০৮০)। আন্দালুসিয়াতে মুসলিম শাসকদের অধীনে বসবাসকারী খ্রিষ্টান প্রজাদের বলা হত মোজারাব। মিসাল হল তাদের আচার-আচরণ-প্রথা এবং ধর্মাচরণের বিধি-বিধেয় ইত্যাদির ১৫৭ খণ্ডের ফোলিও যার মধ্যে ১ থেকে ৩৭ নম্বর ছিল কাগজে লেখা আর বাকিগুলি পার্চমেন্টে। এই ফোলিও এখন রয়েছে সান্তো দমিনিগো দি সাইলোস লাইব্রেরিতে। দেখা যাচ্ছে এই কাগজে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ক্যানাবিস বা গাঁজা গাছের ছাল এবং লিনেন। ইউরোপের মধ্যে প্রথম স্পেনের আইবেরিয়া অঞ্চলের ইসলামী রাজতন্ত্রে কাগজ উৎপাদন শুরু হয়। আইবেরিয়ার খাতিবা(Xativa)-তে ১০৫৬ সালে ইউরোপের প্রথম কাগজকলটি স্থাপিত হয়। সেখান থেকে ইতালির তোলেদো-তে ১০৮৫ সালে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে দেখা যাচ্ছে কাগজ পুরোদস্তুর পছন্দের মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফ্রান্স, হল্যান্ড, জার্মানি-তে। ইংল্যান্ডে প্রথম কলটি স্থাপিত হয়েছিল হার্টফোর্ডে ১৪৯০ তে কিন্তু সে নেহাতই স্থানিক ব্যাপার ছিল। ১৫৮৮-র আগে ইংল্যান্ডে কাগজ পুরোদস্তুর বাণিজ্যিকভাবে লভ্য হয় নি। সে বছর জন স্পিলম্যান কেন্টের ডার্টফোর্ডে একটি বড় কাগজকল প্রতিষ্ঠা করেন।
আমেরিকা মহাদেশে কাগজ
মায়াদের আমাতে নামক কাজজের মত মাধ্যমটিকে যথার্থ কাগজ বলে মানেন নি সবাই, যদিও পার্চমেন্টের তুলনায় কাগজের নিকটতম আত্মীয় বোধ হয় একেই বলা উচিৎ। মায়াদের দ্বারা আর একটা মাধ্যমের কথা ব্যবহারের কথা জানা গেছে যেটাকে বলা হত হুন, এবং পঞ্চম শতক থেকে এটিও ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। বুনো ডুমুরের বাকল থেকে তৈরি হত এটা এবং যথার্থ কাগজ এটিকেও বলা যাবে না। অ্যাজটেকরা লিখনের জন্য আমাতে (ওদের লব্জে আমাতি) ব্যবহার করত এবং অ্যাগেভ গাছের পাতার আঁশযুক্ত অবয়বও ব্যবহার করত। এগুলিও সংজ্ঞা মেনে কাগজ নয়, কিন্তু ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত পছন্দের মাধ্যম ছিল। পরিস্থিতি বদলে যায় স্পেনীর অভিযানের পর। আগে ৪২টি গ্রাম এমন ছিল অ্যাজটেক রাজত্বে যেগুলিতে আমাতে তৈরি হত। স্পেনীয় যাজকরা কাগজ আমদানি করার পর সেগুলি বন্ধ হয়ে যায়। এখনো মেক্সিকোতে কিছু কিছু উপজাতির লোকেরা আমাতি তৈরি করে, শৈল্পিক চাহিদাও আছে এগুলির কিন্তু ডুমুর বা লাক্ষা গাছের অপর্যাপ্ততায় এই কুটির-কাগজ আজ অবলুপ্তির পথে।
উত্তর আমেরিকায় কাগজ আসে সবচেয়ে দেরিতে, ১৫৭৫ সালে মেক্সিকো থেকে কাগজের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং প্রথম কাগজকল তৈরি হয় ফিলাডেলফিয়াতে ১৬৯০ তে। জানা যায় উইলিয়াম রিটেনহাউস ঐ বছর ব্রিটিশ আমেরিকার প্রথম মিলটি বানান এবং দুই দশক ধরে এটিই ছিল একমাত্র মিল। এরা ইউরোপ থেকে কাঁচামাল হিসাবে কাপড়ের টুকরো (র্যাগ) এবং বস্তা আমদানি করত। নিউ ইংল্যান্ডের একটি প্রধান কাগজকল ছিলই 'ইন্টারন্যাশানাল পেপার' যারা ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাগজকলে পরিণত হয় ১৮৮০-এর মধ্যে। ২০১৭ তেও পৃথিবীর কাগজ ব্যবসার ২০ শতাংশ এরা নিয়ন্ত্রণ করত এবং একসময় সারা বিশ্বের নিউজপ্রিন্ট ব্যবসার ৬০ শতাংশ এদের দখলে ছিল। অপরপক্ষে 'ফাইন পেপার' তৈরি হত ম্যাসাচুসেটসে। ১৯২০তে 'আমেরিকান রাইটিং পেপার কোম্পানি' পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ফাইন পেপার প্রস্তুতকারক কোম্পানি ছিল। কারেন্সি পেপার তৈরি হওয়া শুরু হয় উইসকনসিন-এ ক্রেন কোম্পানি ও কিম্বারলি ক্লার্ক কোম্পানির সালফেট পেপারে।
কাগজ তৈরির আরবী কৌশল
প্রাচ্যে কাগজ তৈরির কৌশল ত্রয়োদশ শতাব্দীর এক পাণ্ডুলিপি আল-মুখতারা-ফি ফুনুন মিন আল সুনা তে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এটির রচয়িতা ছিলেন ইয়েমেনের রাসুলিদ রাজতন্ত্রের এক রাজা মালিক-আল-মুজফফর ইউসুফ আল ঘাসান (১২৯৪)। সেখানে মূল কাঁচামাল ডুমুর বা বটজাতীয় গাছ (Fig) থেকে সংগৃহীত হত বলে বলা হয়েছে। ভেজানো, পেটাই এবং ড্রাইং-এই তিন পর্যায়ের কাজ ১২ দিনে সম্পন্ন করা হত বলে বলা হয়েছে। ১০০ টি উচ্চমানের মাঝারি আকারের কাগজ তৈরিতে এই সময় লাগত। মণ্ড তৈরি করে সেগুলিকে পিটিয়ে ঘনকাকার খণ্ডে খণ্ডে আলাদা করা হত। এই ঘনকগুলোকে বলা হত কুব্বা (kubba) এবং তাদের আয়তনের ওপর নির্ভর করত কাগজের সাইজ। মণ্ডের ঘনক হত তিন সাইজের, যথাক্রমে লেবু (lemon) সাইট্রাস ফ্রুট (citron) ও কমলালেবুর (orange) মত এবং এর প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন সাইজের কাগজের পাতায় রূপান্তরিত হত। প্রতিটি ধাপ পৌনঃপুনিকভাবে করা হত অনেকবার ফিনিশড প্রোডাক্ট পাবার আগে। কাগজের ফিনিশিং বা সাইজিং-এর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে কাগজের পাতার ওপর মাখানো হত ভাতের মাড়, গমের মণ্ড এবং সাদা শর (সরঘাম) এর বীজের লেই। পাতাগুলোকে বিছানো হত যে ফ্রেমের ওপর তাঁকে বলা হত 'মোহর' (Mohrey)। এই শ্রমসাধ্য পদ্ধতির আধুনিকীকরণের শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যেই, মূলত বাগদাদে। মণ্ড তৈরির কাজে হাওয়াকলের (Windmill)ব্যবহার প্রথম হয়েছিল অষ্টম শতকে সমরখন্দে। আব্বাসিদ রাজতন্ত্রে মানুষ বা অশ্বে টানা মাড়াই কলে একই কাজ হত বলে জানা যায় বাগদাদে ৭৯৪-৯৫ তে। পেটাইয়ের কাজে ট্রিপ হ্যামার (Trip Hammer) এর ব্যবহার মুসলিমরাই প্রথম করেছিল। তার আগে চীনারা ট্রাডিশনাল খল-নুড়ির কমার্শিয়াল ভার্সানই ব্যবহার করত এবং মানুষই সে কাজ করত। ট্রিপ হ্যামার হল জলচালিত পেষাইয়ের যন্ত্র এবং চীনারা এর ব্যবহার করছে খ্রিষ্টপূর্ব ৪০ সাল থেকে তবে অন্য কাজে, কাগজের কাজে ব্যবহার শুরু হল মধ্যপ্রাচ্যকে অনুসরণ করে। আর একটা কথা যেটা উল্লেখ করার মত তা হল নবম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যে কাগজের ব্যবহার পুরমাত্রায় চালু হলেও ইসলামের মূল গ্রন্থ কুর-আন তখনও লেখা হত চামড়ার ওপর, কাগজের সেই 'পবিত্রতা' ছিল না। বই বাঁধাইয়ের কাজও শুরু হয় সেখানেই। কাগজে লেখা গ্রন্থ সিল্ক দিয়ে সেলাই করে চামড়ার আস্তরণে মোড়া পেস্ট বোর্ড ব্যবহার করা হত। বাঁধাই হোক না হোক, পাণ্ডুলিপি সিল্কে মুড়ে রাখার প্রথা ছিল। ১০৯৬ তে প্রথম ক্রুসেডের পরে, দামাস্কাসে কাগজ তৈরি অনিয়মিত হয়ে পড়ে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অন্যত্র- মিশর এবং ইরানে বাণিজ্যিকভাবে কাগজ তৈরির কাজ চলতে থাকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কাগজ যে ইউরোপে পৌঁছায় সে কথা আমরা আগেই জেনেছি।
ভারতে কাগজ
ভারতেও প্রায় একই সময়ে আরব বণিকদের হাত ধরে কাগজ এসেছিল তবে বৌদ্ধ বিহারগুলিতে চৈনিক ভ্রমণার্থীদের যাতায়াত ছিল বলে অনুমান করা যেতে পারে কাগজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভারতের একাংশ আগে থেকেই ওয়াকিবহাল ছিল। অক্সফোর্ডের বোডলিয়ান লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ওয়েবার (Waber MSS) পাণ্ডুলিপি হল নয়টি হস্তলিখিত খণ্ডাংশ (ফ্র্যাগমেন্টস) যেগুলি নাকি কাগজে লিখিত ভারতে তৈরি প্রথম নথির নজির। এগুলি উদ্ধার হয় চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ থেকে। এও জানা যায় এদের মধ্যে চারটি নেপালে তৈরি এবং বাকিগুলি হল মধ্য এশিয়ায় তৈরি কাগজের নমুনা। এগুলি মূলত তামিল ভাষায় লিখিত। এগুলি তো হল প্রামাণ্য নথি, আর কথা-কাহিনী থেকে জানা যায় ভারতীয় উপমহাদেশে কাগজ ব্যবহারের কথা বলেছেন সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীর চীনা ভ্রামণিকেরা। ভারতীয় বৌদ্ধ শ্রমণরা, যেমন কাকলি এবং সয়া (চীনা শি এবং ইজিং-এর ভাষান্তর) লিখে গেছেন যে, শ্রমণেরা তো বটেই এবং সাধারণ লোকেরাও সিল্কে এবং কাগজে বুদ্ধের ছবির ছাপ তুলে আরাধনা করত। এ ছাড়া ইজিং তাঁর ভ্রমণকথায় অন্যত্র লিখেছেন ভারতে টুপি (টোকা) বানাতে, ছাতার বাঁটে সাপোর্ট দিতে এবং অবাক কাণ্ড, টয়লেটে নাকি কাগজের ব্যবহার ছিল। অনুমান করা যায় কাগজ বস্তুটি যবন উৎস হোক বা অপবিত্র ব্যবহারের বদনাম বহন করেই হোক, হিন্দু লিপি ও লিপিকরের পছন্দের মাধ্যম হতে উঠতে পারে নি বহুকাল। ভুর্জপত্র এবং তালপত্র ছিল সংস্কৃত লিপি লেখার জন্য পছন্দের আধার। তথাপি প্রাচীনতম কাগজে লিখিত পাণ্ডুলিপির নমুনা পাচ্ছি আমরা কাশ্মীর থেকে 'শতপথ ব্রাহ্মণ'। গুজরাট থেকে পাওয়া যাচ্ছে ১১৮০ এবং ১২২৪ এর পাণ্ডুলিপি। ভারতের প্রাচীন কাগজের পুঁথির অনেকগুলি পাওয়া গেছে গুজরাট ও রাজস্থানের কোনও কোনও জৈন মন্দিরগুলি থেকে। কায়রোতে রাখা মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদী উপাসনালয়গুলি থেকে প্রাপ্ত কিছু নথি, যেমন তিউনিসিয়াবাসী বেন-ইজু (Ben Yiju) নামের বণিক যিনি ভারতে ব্যবসা করতেন, তাঁর ভাষ্য থেকে জানা যায় একাদশ শতাব্দীতে গুজরাটে, মালাবার উপকূলে বহুল পরিমাণে কাগজ রপ্তানি করেছিলেন তিনি নিজেই। ইরফান হাবিবের মত অনুযায়ী একাদশ শতাব্দীতেই সিন্ধু প্রদেশে কাগজ পৌঁছেছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সিন্ধুর মানসুরা ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া আরবী পাণ্ডুলিপি ১০৩০ সালে কাগজের ব্যবহার ছিল বলে প্রমাণ করেছে। আমীর খসরু কাগজ তৈরির পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করেছেন ১২৮৯ সালে। পঞ্চদশ শপ্তাব্দীতে মা হুয়ান (ফা হিয়েন?) লিখেছেন, বাংলায় অতি উচ্চমানের সাদা কাগজ তৈরি হত এমন গাছ থেকে যার বল্কল "glossy and smooth as deer's skin" এবং অনুমান করা যায় এই কৌশল বৌদ্ধ বিহারগুলিতে এসেছিল চীন থেকে সরাসরি, মুসলিমদের মাধ্যমে নয়। কারণ তালপত্র পুঁথি পাওয়া গেছে চীনের অনেক বিহার থেকে (যেমন তুওহুয়ান সূত্র) এবং এর থেকেই মনে করা যেতে পারে লেখার কাজে কাগজ ভারতে নিকট প্রাচ্য ও দূর প্রাচ্য -দুদিক থেকেই এসেছিল প্রায় একই সময়ে।
কাগজের মানে ক্রমোন্নতি
হাতে তৈরি কাগজের পাতাটির গুণমান আজও যেমন, তখনও তেমনই নির্ভর করত কতটা সমসত্বভাবে ফাইবারগুলো ছড়িয়েছে পুরো তলটি জুড়ে। ম্যাসেরেশন -যে পদ্ধতিতে উদ্ভিদদেহের ফাইবার জাতীয় কোষগুলো একে অন্যের থেকে পৃথকীভূত হয়ে যায়, সেটা প্রথম থেকেই নিপুণভাবে করা যেত তা নয়, ফলে যেটা হত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, ফাইবার পাতার মধ্যভাগে দলা পাকিয়ে থাকত। তবে এসব ত্রুটি ধরার নিয়মও এখনকার মত তখনো ছিল আলোর বিপরীতে শীটটিকে তুলে ধরা। এতে কাগজে আটকে পড়া বায়ুর বুদবুদ, ময়লার দানা, ছোটবড়ো ছিদ্র, সাইজিং এর সমসত্ত্বতার অভাবে 'ব্লুমিং, (জায়গা বিশেষে সাদা সাদা চকচকে ছোপ) ইত্যাদিও প্রকট হত। এইভাবে একটির সঙ্গে অন্য শীট তুলনামূলকভাবে পরীক্ষা করে প্রথম থেকেই কাগজের গ্রেডেশন পদ্ধতি চালু হয়েছিল। এছাড়া কাগজে থেকে যেত তারজালির ছাপ, যে তলের ওপর শুকোতে দেওয়া হয়েছিল তার ছাপ এবং জলছাপ ও এমব্রসিং-এর মত কারিকুরিও। বলাই বাহুল্য, মেশিন পেপারের যুগে এসব কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়েছিল। কাগজের পাতায় লেখার উপযোগী তল প্রথমে যে দুটোই ছিল, অর্থাৎ পাতা ওল্টালেই যে বিপরীতে কিছু লেখা যাবে এমন অবস্থায় আসতেও সময় লেগেছিল। ১৭৩৬ সালে চালু হয় 'ওভ মোল্ডস' (Wove Moulds) এর ব্যবহার। এগুলি হল কাঠের ফ্রেমে আটকানো সূক্ষ্ম ক্রিস-ক্রস তারজালির স্তর যা একই সঙ্গে ছাঁকনির কাজ করত এবং উভয় দিকেই মসৃণ পৃষ্ঠতল গড়তে সাহায্য করত। পরবর্তীকালে এই পদ্ধতির আরও উন্নতিসাধন করেন হেনরি সিলি ফোর্ড্রিনিয়ের যখন তিনি চলমান তারজালির প্রচলন ঘটালেন। একে বলা হয় 'ফোর্ড্রিনিয়ের প্রেস'। ১৮২৫ সালে জন মার্শাল পেটেন্ট পেলেন 'ড্যান্ডি রোল' (Dandy roll) নামের কাগজ তৈরির মেশিনের যা আসলে উন্নতমানের ফাঁপা তারজালির সিলিন্ডার। কাগজের উভয় তলকে সমমানের করতে, ফিনিশিং-এ নৈপুণ্য আনতে, জলছাপ বসাতে (কাগজে লেখনের সিকিউরিটি মূল্যমাণ রাখতে তখন থেকেই জলছাপ রাখা হয়, এখনও হয়) বা এমব্রসিং-এর কাজ তখন থেকে সহজতর হল। এরও নকল হত, এখনো হয়। সুনির্দিষ্ট জলছাপের হুন্ডি বা দলিল ইত্যাদি কাগজ তৈরির সময়কার অরিজিনাল না প্রেসের কারিকুরিতে নকল তা বুঝতে হলে আজকের দিনে বিটা-রেডিওগ্রাফি করতে হয় এবং কেবল সত্যিকারের আসল জলছাপই বিটা-রেডিওগ্রাফে ধরা পড়ে। কাগজে জলছাপের প্রথম ইউরোপীয় নিদর্শন পাওয়া যায় ১২৮৯ সালের ইতালির ফাব্রিয়ানো থেকে। মূল জলছাপের সঙ্গে অতিরিক্ত তথ্যসম্বলিত 'কাউন্টারমার্ক' রাখার রীতি চালু হয় পরে। কাগজ তৈরির সাল-তারিখ ইত্যাদি রাখা চালু হয় জলছাপের মাধ্যমে। ১৭৪১ সালের এক ফরাসী রাষ্ট্রীয় সনদে বলা হল সব কাগজে 1742 ছাপটা থাকতে হবে কাউন্টারমার্ক করে। সনদ বদলাতে বহু বছর লাগলেও কাগজনির্মাতারা ঐ বিশেষ বছরের ছাপ রাখতে বাধ্য ছিলেন আইনবলে। ইংল্যান্ডে একই সনদ আসে ১৭৯৪ সালে। তবে, এক আমেরিকান হ্যান্ডমেড পেপার প্রস্তুতকারক যোসেফ উইলকক্স ১৮১০ সালের জলছাপযুক্ত কাগজ বানাতেন বহু বছর পরেও কোন আইন বা আদেশ ছাড়াই। এই কারণে জলছাপের ওপর দ্বিতীয় ধাপের সিকিউরিটি কাউন্টারমার্ক কাগজের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়েছিল বস্তুটিকে সনদের মাত্রা দিতে, নয়তো লিখতে বসে কে আর তোয়াক্কা করে কাগজ আসল না নকল!
তথ্যসূত্র:
১) ফ্রেডেরিক হ্যারিসন (১৯৪৩), এ বুক এবাউট বুকস, জন মারে, লন্ডন।
২) ডগলাস ম্যাকমার্টী (১৯৪৩), দ্য বুকঃ দ্য স্টোরি অফ প্রিন্টিং এন্ড বুকমেকিং, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
৩) জোনাথ ব্লুম (১৯৯৯), রেভোলিউশন বাই দ্য রীমঃ এ হিস্ট্রি অফ পেপার, আরামকো, সংখ্যা ৫০(৩)।
এবং অন্যান্য।