আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৬ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
মৃত্যুর রাজনীতি, জীবনের রাজনীতি
অনন্য মুখার্জি
"দাদা আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম, আমি যে বাঁচতে বড়ো ভালোবাসি" - 'মেঘে ঢাকা তারা'য় নীতার আর্তনাদ দাদা শঙ্করের কাছে। ঋত্বিক ঘটকের প্রেক্ষিতে 'আমি বাঁচবো'র অস্তিত্বকামী আন্তরিক বাসনা ততক্ষণে অনুরণিত গোটা প্রকৃতি, চেতনায়। জেন-জি হয়তো না জানলেও দূরদর্শনের শেষ জমানাও যারা দেখেছে সেসব তথাকথিত সচেতন মধ্যবিত্ত বাঙালির অবচেতনে, কোনো এককোণে সেই দৃশ্যপট এখনো নিশ্চয়ই ধরা আছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ঘোষণার চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে উত্তর ২৪ পরগনার ৫৭ বছর বয়সি ব্যবসায়ী প্রদীপ কর আত্মহত্যা করার ঠিক আগের মুহূর্ত অবধি - সেই এক হিন্দু তরুণী যিনি গায়ে আগুন দেন বেনাগরিক হওয়ার আশঙ্কায় এবং ৩২ বছর বয়সি সেই মুসলিম যুবক, যিনি আত্মহত্যা করেন তাঁর বাবার নামের বানান বিভিন্ন সরকারি নথিতে মাত্র একটি অক্ষরের পার্থক্যে লেখা থাকায় হয়তো তাঁকে সন্দেহভাজন "অবৈধ" ঘোষণা করা হবে ভেবে - বা সেই কৃষক ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নিজের নাম না পেয়ে মাঠেই কীটনাশক পান করলেন - ঠিক আগের মুহূর্ত অবধি হয়তো এরা সকলেই নীতার মতোই বাঁচতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উপায় ছিল না। রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের হয়ে মৃত্যু পরোয়ানা সরকারিভাবে লেখার আগেই তারা স্বহস্তে নিজের মৃত্যু লিখে নিজেদের সার্বভৌমত্বকে বজায় রাখতে চেয়েছিলেন হয়তো।
পরিবার ও নিজের জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায়কে বুলডোজারের সামনে পিষে যেতে দেখা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী - রাজ্যের নানা ব্লকে অবরোধ করা মহিলারা যাদের মাইক্রোফিনান্সের সুদ মেটানোর সমস্ত হিসেব গত দুমাসে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা না পেয়ে একেবারে তছনছ হয়ে গেছে - গত কুরবানী ঈদে গরু বিক্রি না করতে পারা যেসব ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষী যাদের পুরো ঘরোয়া অর্থনীতির বৃত্ত হঠাৎ ঘেঁটে যাওয়ায় শেষে গলায় দড়ি দিতে চেয়েছেন - নয়ডা গুজরাট রাজস্থানে পরিযায়ী শ্রমিক যারা বেড়ে যাওয়া তেল গ্যাসের দামের সাথে নিজেদের সংসারের খরচ পাল্লা দিতে না পেরে যারা রাস্তায় নেমে কদিনের জন্য সব স্তব্ধ করে দিলেন - বহুজাতিকের হাতে জল-জমি-জঙ্গল চলে যাওয়া ঠেকাতে লাঠিগুলির সামনে বুক পেতে দেওয়া আদিবাসীরা; প্রত্যেকেই বাঁচতে চেয়েছেন। এখানে একটি সর্বজনীন ভাষ্য আছে যা রাজনৈতিক: বাঁচতে চাওয়ার রাজনীতি। আর তা আছে 'মরে যেতে দেওয়া'র একটা রাজনীতি আছে বলেই। ভাঙা বাঁশের কাঠামো, ছেঁড়া ত্রিপল, পড়ে থাকা টিন, ছড়িয়ে থাকা পণ্যসামগ্রী, অস্থায়ী দোকানের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে রাতের অন্ধকারে স্টেশন দিয়ে গুঁড়ি মেরে চলা গাঢ় বাদামি মালগাড়ি সেই মৃত্যুরাজনীতির, আজকের পৃথিবীর বস্তুগত সহিংসতার কিছু চিত্রকল্পমাত্র।
জলের কুঁজো, চায়ের ভাঁড় থেকে ক্যাফেতে ডিজাইনার মাটির গ্লাস আর দেবীমূর্তি বানাতে মৃৎশিল্পীরা যে কাদামাটির উপর নির্ভর করেন, তার সরবরাহের সংকটের বয়ান সম্প্রতি আমরা শুনতে পাই। বালি ও মাটি উত্তোলন এবং পরিবহণের ওপর কড়াকড়ি, নজরদারি ও তার নতুন কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনার কারণে বালি-মাটির দাম আকাশ ছোঁয়ার খবরের সাথে সাথে কুমোরটুলির সৌন্দর্যায়নের জন্য বৃহৎ বহুজাতিকের সাথে চুক্তি এবং অনতিবিলম্বেই নগর ভূমি (সিলিং ও নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রত্যাহারের ঘোষণার মতো ঘটনাগুলো একসঙ্গে একটি বিদ্যমান সামগ্রিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে।
পুঁজিবাদ তার জন্মলগ্ন থেকেই অর্থ-পুঁজির মালিকানার থাকা ও না থাকার ওপর ভিত্তি করে শ্রেণিগত পারস্পরিক সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফলে শুরু থেকেই পুঁজিবাদ একটি উদ্বৃত্ত শ্রমবাহিনীর সাথে সাথে উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার জন্ম দিয়ে গেছে মজুরি ও জীবন পুনরুৎপাদনের খরচ কমিয়ে আরো বেশি পুঁজি সঞ্চয়নের জন্য। কিন্তু এখনকার সম্পর্কের চরিত্র বদলে গেছে। আজকের দুনিয়ায় প্রবৃদ্ধি আর শুধু পণ্য উৎপাদন ও শ্রমের শোষণের উপর নির্ভর করে না; বরং ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে ভাড়া-নির্ভর সঞ্চয়ন, নিষ্কাশন আর মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সাধারণ সম্পদ বা কমনস-এর উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ওপর। এই নতুন ব্যবস্থায় ক্রমাগত প্রান্তিক হতে থাকা উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা আজ এমন এক পর্যায়ে গেছে যে তাদের জীবনই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে যেখানে মানুষ আর শুধু শ্রমিক বা ভোক্তা হিসেবে বিচার্য থাকছে না বরং তাকে বিচার করা হচ্ছে তার জীবনের মূল্যের নিরিখে।
এখন এই বিপুল উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা পুঁজিবাদের কাছে এমন এক জনগোষ্ঠী, যাদের শ্রমের আর কোনও স্থায়ী ব্যবহার নেই, কিন্তু যাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ, সীমাবদ্ধ এবং প্রান্তিক করে রাখা পুঁজির জন্য প্রয়োজনীয়। ফলে এখনকার পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রাজনীতি রূপ নিয়েছে এক জৈবিক রাজনীতির যার মূল প্রক্রিয়া হলো "পরিত্যাজ্য মানুষদের পরিকল্পিত অমানবিকীকরণ" অর্থাৎ, সমাজকে এমনভাবে নির্মাণ করা যাতে মানুষের শ্রম, জীবন এবং অস্তিত্ব ক্রমশ কম গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। রাষ্ট্র একদিকে কিছু জীবনকে সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তির নামে নিয়ন্ত্রণ করে আবার অন্যদিকে কিছু জীবনকে এমন অবস্থায় ফেলে রাখে, যেখানে তারা ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তা, অভাব এবং অবহেলার মধ্যে দিয়ে মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ক্রমাগত তৈরী হয়ে চলা 'উদ্বৃত্ত জীবন'কে 'মরে যেতে দেওয়া'র জন্য কোনও বড় বিপর্যয় বা প্রকাশ্য ধ্বংসের প্রয়োজন হয় না। এটি কাজ করে ধীরে, কাঠামোগতভাবে এমন এক সহিংসতার মাধ্যমে, যা মানুষকে ক্রমশ সংক্ষিপ্ততর, সীমিত এবং অনিরাপদ জীবনযাপনে বাধ্য করে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র জনগণের জীবনকে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অধিক থেকে অধিকতর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে যেতে থাকে।
এসআইআর এমনই একটি প্রক্রিয়া। বাংলা বিহার সবখানেই প্রথমে মানুষকে ভোটারসূচি থেকে বাদ দেওয়া হলো। তারপর তাদের রেশনকার্ড বাতিল করা হলো বা করা চলছে। সাথে চলছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে সরকারি প্রকল্প থেকে বাতিলের প্রক্রিয়া। যারা প্রতিমাসে ভাতা পেতেন তাদের ভাতা দেওয়া বন্ধ করা হলো। এই অর্থে এসআইআর কেবল একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের সাথে মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কগুলিকে ভেঙে দেওয়া যার মাধ্যমে বহু দরিদ্র প্রান্তিক পরিবার রাষ্ট্রের সাথে তাদের ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখত। ভোটাধিকার হারানোর সম্ভাবনা তাই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক অধিকার হারানোর প্রশ্ন নয়; বরং বহু পরিবারের কাছে এটি এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে জীবনের ধারাবাহিকতাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ দিলে এই প্রক্রিয়া আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এখানে উচ্ছেদ, এসআইআর এবং চলমান ধ্বংসযজ্ঞকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দৃশ্য হিসেবে সামনে আনা হয়েছে, এক বিজ্ঞাপিত প্রদর্শনীর মতো। এই প্রদর্শনের একটি ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে যার জন্য বাংলার সামাজিক ইতিহাস দায়ী। তেভাগা আন্দোলন, দেশভাগের পর ইউসিআরসির নেতৃত্বে শরণার্থী আন্দোলন,সত্তর ও আশির দশকের ভূমি সংস্কার ও তার সাথে সাথে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস বিশেষ করে উদারীকরণের পরবর্তী শিল্পক্ষয়ের গতিপথ ও উচ্ছেদবিরোধী গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতা পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি স্থানীয় 'প্রয়োজনের অর্থনীতি' তৈরি করেছে। যা পুরো ভারতের শ্রমজীবী মানুষের ব্যাপকতর অংশের মানুষ যারা অসংগঠিত ক্ষেত্রে বৈতনিক ও অবৈতনিক নানান ধরণের কাজে যুক্ত মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে এক ও অভিন্ন; যদিও সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে একটু আলাদা শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে। এই 'প্রয়োজনের অর্থনীতি' কোনও আনুষ্ঠানিক বাজারের বিকল্প নয়; বরং এটি এমন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র যেখানে মানুষ নিজেদের সীমিত সম্পদ,পরিচিত সম্পর্ক, স্থানীয় নেটওয়ার্ক এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে জীবন চালিয়ে নিয়ে যায়। এই ব্যবস্থার মধ্যে থাকা মানুষদের কাছে তাদের সামান্য দোকান, রাস্তার ধারের জায়গা, শৈল্পিক দক্ষতা ও অনানুষ্ঠানিক সম্পদ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এগুলি তাদের সামাজিক অস্তিত্বের ভিত্তি। এই সম্পদের উপর নির্ভর করেই উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বিশ্বপুঁজি ও নয়াউদারবাদী রাষ্ট্রের সাথে দৈনন্দিন দরকষাকষির মধ্যে দিয়ে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে পেরেছে কখনো কম বা বেশি, যা নির্ভর করেছে গণআন্দোলনের ওপর। কিন্তু নয়াউদারবাদী রাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো জনগণের সমস্ত স্বায়ত্তশাসনের সম্ভাবনার সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো। কারণ পুঁজির কাছে এমন কোনও ক্ষেত্র গ্রহণযোগ্য নয় যেখানে মানুষ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে নিজেদের জীবনকে পুনরুৎপাদন করতে পারে। ফলে উচ্ছেদ, নিয়ন্ত্রণ এবং 'আনুষ্ঠানিকীকরণ'-এর মাধ্যমে সেই সমস্ত অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রকে সম্পূর্ণভাবে পুঁজির নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা সে রাষ্ট্র করবেই।
ফলে বর্তমান বিশ্বপুঁজিবাদে নয়াউদারবাদী রাষ্ট্র এমন এক অবস্থায় পৌঁছতে চায় যাতে জনগণের কোনো সার্বভৌমত্ব না থাকে এবং বদলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে সর্বশক্তিমান। রাষ্ট্র ঠিক করতে শুরু করে কোন নাগরিক অধিকার ভোগ করবে, কে সরকারি সুবিধা পাবে, কার নথি গ্রহণযোগ্য হবে, কার অস্তিত্ব সন্দেহের চোখে দেখা হবে। কোন আইন কার্যকর থাকবে আর কোন আইন পালনে ব্যাতিক্রম করা হবে তা ঠিক করার সিদ্ধান্তও রাষ্ট্রক্ষমতা মারফত পুঁজির হাতে সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত হয়। এই অবস্থায় 'প্রয়োজনের অর্থনীতি', যা এতদিন উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার কিছুটা সার্বভৌম জীবন টিকিয়ে রাখার একটি উপায় ছিল , তার অস্তিত্বও নির্ভর করতে থাকে রাষ্ট্রের অনুমতি এবং ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের উপর। এখানে মানুষ জৈবিকভাবে জীবিত থাকলেও রাজনৈতিক অধিকার এবং দরকষাকষির ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়। সে রাষ্ট্রের বাইরে নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের মধ্যেই তার অবস্থান এমন যে তাকে সহজেই ইচ্ছেমতো বাদ দেওয়া যায়। তার জন্য রাষ্ট্র চেষ্টা করবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব স্থাপনের স্থায়ী স্মৃতি হিসেবে এক সহিংস চিত্রকল্প তৈরী করতে যা ভবিষ্যতে জনগণের মননে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে ক্রমাগত পুনর্নির্মিত হতে থাকবে। এসআইআর, উচ্ছেদ এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম - এই সবকিছুকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। বরং এগুলি একই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার: সমসাময়িক পুঁজিবাদের জৈব-রাজনীতির রূপ।
গাজায় সাম্প্রতিক যুদ্ধ পুঁজিবাদের এই জৈব-রাজনীতির এক চরম স্বরূপকে সামনে নিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেচেসকা আলবানেজের প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয় যে গাজা কার্যত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সামরিক প্রযুক্তির একটি জীবন্ত পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। প্যালান্টির-এর মতো প্রযুক্তি সংস্থার তথ্য-পরিকাঠামো ব্যবহার করে 'ল্যাভেন্ডার' নামে একটি এআই-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যা দিয়ে মানুষের আচরণ, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতো যে কাদের মেরে ফেলা হবে। এভাবে ৩৭০০০ এর বেশি মানুষকে 'টার্গেট' করতে প্যালানটির ইজরায়েলি রাষ্ট্রকে সহায়তা করে যাকে নাম দেওয়া হয় 'কিল চেইন' টেকনোলজি, সাপ্লাই চেইনের মতোই। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের জীবন ক্রমশ তথ্যবিন্দুতে পরিণত করা হয়েছিল। একজন মানুষ তার সামাজিক সম্পর্ক, চলাফেরা, পরিচয় এবং দৈনন্দিন আচরণের ভিত্তিতে একটি সংখ্যাগত স্কোরে পরিণত করা হয় যে স্কোরের ভিত্তিতেই তাকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণ শুরু হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে, ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যপরিষেবা বিভাগের (NHS England) সাথে প্যালান্টিরের ৩৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি হয় একটি কেন্দ্রীভূত তথ্যভান্ডার ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যার মাধ্যমে দ্রুততর ও কার্যকর স্বাস্থ্য পরিষেবা ইংল্যান্ডের মানুষকে পৌঁছে দেওয়া যাবে। যে তথ্য-অবকাঠামো একদিকে গাজায় যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের উপর নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং হত্যালীলা চালাতে ব্যবহৃত হয়েছে,পরীক্ষিত ও পরিমার্জিত হয়েছে ফিলিস্তিনি মহিলা-শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে, সেই একই অবকাঠামো ও সফটওয়ার ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির প্রযুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়।
এখানে এসে আমরা অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি হই। তাহলে কি বৈশ্বিক দক্ষিণের সেই শত শত কোটি মানুষ, যারা প্রতিদিন এক ডলারেরও কম আয়ে কোনওমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন, যাদের খাদ্য, পরিশ্রুত পানীয় জল, দূষণমুক্ত বাতাসের অভাবে তিলে তিলে মরে যেতে দেওয়া হচ্ছে তারাই কি সেই 'উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠী' যাদের জীবনও উদ্বৃত্ত? তাঁদের জীবন থেকে পুঁজি কীভাবে মূল্য আহরণ করে? যেসব ফিলিস্তিনি মানুষের ওপর নজরদারি করা হয়েছে এবং লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে, তাঁদের জীবন ও শ্রমকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? প্রচলিত অর্থে তাঁদের শ্রম প্যালান্টিরের মতো বহুজাতিকের জন্য কোনও উৎপাদনশীল মূল্য সৃষ্টি করেনি। তাদের জীবন্ত শ্রম কোনও পণ্য উৎপাদন করেনি, কোনও পরিষেবা দেয়নি, কোনও সরাসরি শ্রমের মাধ্যমে মুনাফা তৈরি করেনি। কিন্তু তাঁদের জীবন গতিবিধি, দুর্বলতা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের মৃত্যু একটি নতুন ধরনের মূল্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে। পুঁজি তাদের জীবনের সার্বভৌমত্বকে কেড়ে নিয়ে জীবন থেকে সংগৃহীত তথ্য দিয়ে এআই ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে, নতুন সামরিক চুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে এবং প্রযুক্তি সংস্থার জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করেছে। এই অর্থে, ফিলিস্তিনি জনগণকে শুধু উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি হিসেবে দেখা যায় না; বরং বিশ্বপুঁজিবাদ এদের জীবনকেই উদ্বৃত্ত হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাদের অস্তিত্ব পুঁজির উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য নয়, অথচ তাদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, তার তথ্য, এবং তাদের জীবনের ধ্বংসসাধন পুঁজিসঞ্চয়নের নতুন ক্ষেত্র।
প্রদীপ কর থেকে শুরু করে উচ্ছেদ হওয়া সমস্ত হকার, ক্ষুদ্র প্রান্তিক ব্যবসায়ী, চাষী ও নানা ধরণের উৎপাদক, নয়ডার পরিযায়ী শ্রমিক ও ঝাড়খন্ড ছত্তিসগড় ওড়িশায় আদিবাসীদের জীবন একই সহিংসতার সূত্রে বাঁধা। অবশ্যই এসব ক্ষেত্রে সহিংসতার রূপ ও মাত্রা ভিন্ন, কিন্তু কাঠামোগত যুক্তিটি একই। যা একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আনে - কোন জীবন মূল্যবান? কোন জীবন রক্ষা করার মতো? কোন জীবনকে এমনভাবে পরিচালিত করা যায় যাতে তার ধ্বংসও নতুন মূল্য আহরণের কাজে ব্যবহৃত হয়? এগুলো যদি পুঁজি ও রাষ্ট্র ঠিক করে তাহলে মানুষের জীবন থাকলেও তার সার্বভৌমত্ব অবশিষ্ট থাকে না। কারণ পুঁজিবাদের বাস্তবতা এটাই যে যদি আজ উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার একটি অংশ আগামীকাল যদি মারাও যায়, তবে মুনাফার হার একই থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বরং বৃদ্ধি পেলেও পেতে পারে।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদের দুটোমাত্র যে উৎস অর্থাৎ মানুষ আর পরিবেশ - তাদের ধ্বংস করার মধ্য দিয়েই পুঁজিবাদ টিকে থাকে; তার কোনো মানবিক মুখ থাকা সম্ভব নয় কারণ পুঁজিবাদ যত এগোতে থাকে ততই তার অভ্যন্তরীণ সংকট ঘণীভূত হয় - মুনাফা আর জীবনের দূরত্ব বাড়তে থাকে আর সাথে প্রকট হয় জৈব-রাজনীতির এই মৃত্যুকামী রূপ। আধিপত্যকামী রাষ্ট্রের জৈব-রাজনীতি ফলে আগাগোড়াই সহিংস - জীবনের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিয়ে জনগণকে সার্বিক ভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য মৃত্যু তার রাজনৈতিক আধার। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই রাজনৈতিক রূপকল্পে যেন রাজরূপে ঈশ্বর; জীবনদান থেকে মৃত্যু সবই তার নিয়ন্ত্রণে - জনগণ শুধু আজ্ঞাবহ প্রজা - সে শুধু রাজপ্রাসাদের বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁটু গেড়ে রাজার অনুগ্রহপ্রাপ্তির জন্য অনুনয় বিনয়মাত্র করতে পারে।
ফলে মানুষ যখন রাষ্ট্রের থেকে, এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার থেকে নিজেদের জীবনের সার্বভৌমত্ব ফেরত নিতে চায় - একমাত্র তখনই এই জৈব-রাজনীতির পরিকল্পে ফাটল ধরে। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন হয়তো বলতেন, এ ধরনের মুহূর্ত ইতিহাসের স্বাভাবিক প্রবাহে একটি ছেদ সৃষ্টি করে। যখন সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে এক সাধারণ বিচারপ্রার্থী আর বিচার না চেয়ে বিচারককে আদেশ করে - জনবিরোধী রাষ্ট্রনির্মিত আইনীকাঠামোর উর্দ্ধে উঠে ঘোষণা করে 'আমিই সার্বভৌম', তখন সোচ্চারে ঘোষিত হয় যে সংবিধানের নির্মাতা আর রাষ্ট্রের ক্ষমতায়নের উৎস, একমাত্র জনগণ। রাষ্ট্র জনগণকে ক্ষমতা দেয় না বরং ঠিক তার উল্টো। যখন রাষ্ট্রস্বীকৃত প্রতিবাদের জায়গা ও ধরণ ছুড়ে ফেলে শ্রমজীবী মানুষ বলেন - আমার জীবন আমি ফেরত চাই, আমার পাড়া পরিবেশ যাপন চর্যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাই, আমার জীবন্ত শ্রমের মালিক একমাত্র আমি - একমাত্র তখনই তৈরী হয় জনমুখী প্রতিরোধ, উঠে আসে জনগণের লেখা এক নতুন ভাষা যা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে ভেঙে দেয়। এই কথাটা হয়তো নৈরাজ্যবাদী শোনাতে পারে। মৃত্যুকামী রাজনৈতিক সমাজনির্মাণের বিপরীতে জীবনের গান গাওয়া নৈরাজ্যবাদী বৈকি। আমরা সবাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আমরা সবাই রাজা' গানটির শুনেছি গেয়েছি। বাঙালিমাত্রই শিশুবয়সের সমবেত গান বা নাচের প্রথম উপস্থাপনা হয়তো সেই গান: "আমরা যা খুশি তাই করি, তবু তার খুশিতেই চরি/ আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে/ নইলে মোদের রাজার সনে মিলবো কি স্বত্বে? উপনিষদের ভাষায়, "সোহম": "আমিই সে"। এটা বলা নৈরাজ্যবাদী কি?