আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৬ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

হে রাম!


সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণ করা হয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী রাম মন্দির ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা করেন। এই ট্রাস্টের অধিকাংশ সদস্য কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা মনোনীত, ট্রাস্টের সম্পাদক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সহ-সভাপতি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে এই মন্দির উদ্বোধন করা হয়, প্রধানমন্ত্রী মোদীর উপস্থিতিতে। আজ আড়াই বছর পরে রাম মন্দির আবার খবরের শিরোনামে কারণ সেখান থেকে কোটি কোটি টাকার অনুদান তছরুপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

লাখো ধর্মপ্রাণ রামভক্ত হিন্দু অযোধ্যায় রাম মন্দির দর্শন করেছেন, প্রণামীর বাক্সে টাকা দিয়েছেন রামের কথা মনে রেখে। বহু মানুষ সোনা-রূপা দান করেছেন। কয়েক মাস ধরে অভিযোগ উঠেছে যে সেই দানের টাকা চুরি হয়েছে। মন্দিরে জমা হওয়া টাকা গোনার ক্ষেত্রে বা টাকার হিসেব রাখার ক্ষেত্রে যে পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে সেই কথা আগেই বিভিন্ন সংস্থার তরফ থেকে বলা হয়েছিল। এমনকি স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, যারা মন্দিরের অর্থের দেখভাল করে তারাও সন্দেহ করেছিল যে মন্দিরের টাকা হয়ত চুরি করা হচ্ছে। তারা তাদের নিযুক্ত কর্মীদের এই কাজ থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এতসবের পরেও মন্দির কর্তৃপক্ষ কোনও কথায় কান দেয়নি। তারা যেমন চলছে তেমন চলুক নীতি নিয়ে এগিয়ে গেছে। আজ গোটা দেশে হিন্দু ভক্তদের রামের জন্য নিবেদিত অর্থ তছরুপ হয়েছে বলে হইচই পড়ে গেছে।

এই ঘৃণ্য কাজের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে শুধু যে বিজেপি বিরোধীরা করছে তা কিন্তু নয়। বরং বহু বিজেপি কর্মী-সমর্থক-নেতা রাম মন্দিরে চুরি হয়েছে এই অভিযোগে সোচ্চার হয়েছে। কিন্তু তাতে উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার এক অদ্ভুত অবস্থান নিয়েছে। চুরির অভিযোগ আসার পরে যা সর্বাগ্রে করণীয়, এফআইআর দায়ের করা, তা করা হয়নি। এফআইআর দায়ের না করে বিশেষ টিম (এসআইটি) গঠিত করে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই এসআইটি দলে কোনও ফিনান্স বা ব্যাঙ্কিং অথবা সাইবার বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়নি। তদুপরি এসআইটি রিপোর্ট ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কিত আধিকারিকদের দেখানো হয় সরকার বা আদালতকে জমা দেওয়ার আগে। তাহলে এই প্রশ্ন জনগণের মনে ওঠা স্বাভাবিক যে যাদের তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় মন্দিরের অর্থ তছরুপ হয়েছে তাদেরকেই তদন্তের রিপোর্ট যদি দেখানো হয় তাহলে কি আর তদন্তকে নিরপেক্ষ বলা যায়! এসআইটি রিপোর্ট জমা করার পরে এফআইআর দাখিল করা হয়েছে এবং কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা মন্দিরের টাকা গোনার কাজে নিযুক্ত ছিল। কিন্তু যেই ট্রাস্টের অধীনে এই টাকা গচ্ছিত হত, যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ জনপরিসরে রয়েছে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এই চুরির ঘটনায় সঙ্ঘ পরিবারের যে দাবি যে তারা হিন্দুদের স্বার্থে নিবেদিত প্রাণ তাতে আঘাত লেগেছে। মন্দির ট্রাস্টের শীর্ষে বসে থাকা চম্পত রাই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সহ-সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছের লোক বলে পরিচিত। চম্পত রাইয়ের কার্যকলাপ নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠেছে। তিনি আপাতত ট্রাস্ট থেকে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু হিন্দুদের জন্য নিবেদিত বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা মন্দিরের চাঁদা তছরুপ হওয়ার পরে পদত্যাগ করলে এই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য যে রামের নামে গচ্ছিত টাকা এই হিন্দুদের রক্ষাকর্তাদের নাকের ডগার চুরি হয়ে গেল কী করে?

এই অস্বস্তিকর প্রশ্ন যাতে না ওঠে তার জন্য সঙ্ঘ পরিবার ও তাদের সমর্থকরা এক অদ্ভুত যুক্তির অবতারণা করেছে। রাম মন্দিরের চুরি নিয়ে কথা বললে তারা বলছে যে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লাগছে, তারা বলছে যে হিন্দু-বিরোধী গোষ্ঠীরা এই সব কথা বলছে। এমনকি এমন কথাও বলা হচ্ছে যে হিন্দুদের দান করা টাকা যদি হিন্দুরা আত্মসাত করেই থাকে, তাতেই বা কার কী বলার আছে। অর্থাৎ চুরি নিয়ে কথা বলা যাবে না। বললেই তাকে হিন্দু বিরোধী ঘোষণা করে দেওয়া হবে।

এই সব কথা বলে হিন্দুত্ববাদীরা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে। ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের দান করা টাকা হিন্দুত্ববাদীদের তত্ত্বাবধানে চুরি হয়ে গেল এই লজ্জা লোকানোর জায়াগা তারা খুঁজে পাচ্ছে না। তাই তাদের চিরাচরিত নীতি নিয়ে তারা ন্যায়ের কথা যারা বলছেন, চোর ধরার কথা যারা বলছেন, তাদেরকে হিন্দু বিরোধী দাগিয়ে দিয়ে তাদের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে জনগণকে বোকা বানাতে চাইছেন। জনগণ তা মেনে নেবেন কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেখে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না যে রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে এত কিছু ঘটে চলেছে। যেই নরেন্দ্র মোদী রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা করার যাবতীয় কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যিনি মন্দির উদ্বোধন করেছেন, যিনি ট্রাস্ট বানানোর ঘোষণা লোকসভায় দাঁড়িয়ে করেছেন, যিনি নিজেকে হিন্দু হৃদয় সম্রাট বলে ভাবতে ভালোবাসেন, তিনি এই ঘটনায় নীরবতা পালন করে চলেছেন। একটি শব্দও এই বিষয়ে তাঁকে বলতে শোনা যায়নি।

অসংখ্য হিন্দুদের বিশ্বাস রয়েছে রাম তথা রাম মন্দির নিয়ে। এই মন্দিরের অর্থ তছনছকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া ভারতের সরকার ও বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। যেকেনো অর্থ চুরির ঘটনা ভারতের আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন মেনে সমস্ত ষড়যন্ত্রী ও চোরদের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। তা করতে যদি বিজেপি সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে এর থেকে লজ্জার কিছু হতে পারে না।