আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৬ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

নির্মাণ বিপর্যয় রুখতে বুলডোজার নয়, চাই আইনের শাসন


মাস ছয় আগে, এক শীতের রাত্রে কলকাতার নাজিরাবাদ অঞ্চলে তালা বন্ধ গুদাম ঘরে ছাব্বিশ জন শ্রমিক পুড়ে মারা গিয়েছিল। আর সেই ঘটনার ছ মাস যেতে না যেতেই রাজধানী খাস কলকাতাতেই আবারও ষোলো জন মানুষ প্রকাশ্যে দিবালোকে মারা গেল এক নির্মীয়মান গুদামের কাঠামো চাপা পড়ে। খাস কলকাতার তারাতলার এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যে চালু বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের সুরক্ষা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সেই প্রশ্ন আরো জোরালো হয়ে উঠেছে যখন সেই প্রকল্পের নির্মাণ নকশার ত্রুটি স্বীকার করেছে স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।

রাজ্যে পালাবদলের আগে মানুষ 'সরষের মধ্যে ভুতের' প্রয়োগ রূপ দেখেছে শিক্ষা, আবাস কিংবা রেশন দুর্নীতির মতো গুরুতর জনস্বার্থের বিষয়ে। ফলে তারাতলার এমন নির্মাণ কাঠামো বিপর্যয়ের পর সেই অবৈধ নির্মাণের বীজ পুরসভার অন্দরে পোঁতা ছিল কিনা সেই প্রশ্ন সঙ্গতকারণেই জোরালো হচ্ছে। কারণ বিরোধীশূন্য পুরসভার পুরপ্রতিনিধিদের নজর এড়িয়ে যেখানে একটা চালাঘর উঠতে পারত না সেখানে আইন ভেঙে কয়েক হাজার স্কোয়ার ফিটের ইস্পাতের কাঠামো কী করে গড়ে উঠলো গোটা পুরসভাকে মূক এবং বধির বানিয়ে সেটাই এখন জরুরি প্রশ্ন ! এমন আরও কিছু প্রশ্ন উঠে আসছে এমন বিপর্যয়ের পর যেগুলির উত্তর খোঁজা জরুরি জনস্বার্থেই।

আমরা সকলেই জানি যে বেআইনি নির্মাণ রাতের অন্ধকারে চুপিসারে হয় না বরং সেটা ঘটে প্রকাশ্যে দিবালোকে পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায়। সাম্প্রতিক অতীতে শহর জুড়ে ঝুড়ি ঝুড়ি বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ যে উঠে এসেছে জনসমক্ষে সেগুলির পেছনে ছিল রাজনৈতিক মদত এবং প্রশাসনিক যোগ। একথা অজানা নয় যে ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ নকশার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নির্মাণের মানের সাথে আপোস করে নির্মাতার লাভের কড়ি বাড়িয়ে তোলা। নির্মাণে আপস করতে গিয়ে যখন নির্মাণ কাঠামো দুর্বল কিংবা ঝুঁকিপ্রবণ হয়ে ওঠে তখনই বাড়ে মানুষের প্রাণের ভয়। কিন্তু এমন ত্রুটিপূর্ণ নকশায় আখেরে লাভ প্রোমোটার কিংবা ডেভলপারের হলেও সেই লাভের গুড় পৌরসভা থেকে পুলিশ প্রশাসন সর্বত্রই পৌঁছে যায়। ফলে আজ বেআইনি নির্মাণ রুখতে গেলে কেবল চোর ধরার অভিযান-'চোর-পুলিশ' খেলা কিংবা বুলডোজার দিয়ে প্রতীকী নির্মাণ ধ্বংস করে অবৈধ নির্মাণ রোখা যাবে না। অবৈধ নির্মাণ রুখতে সরকারকে স্বচ্ছ দায়বদ্ধ এক পুর প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।

বিগত দশ বারো বছরে পুর প্রতিনিধিরা বাহুবলে পুর প্রশাসন ছলে -বলে-কৌশলে বেদখল করে এই বেআইনি নির্মাণের বাস্তুতন্ত্র তৈরি করেছিল রাজ্য জুড়ে। আজ রাজ্যের নতুন সরকার যদি এক্ষেত্রে মানুষের ভরসার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠতে চায় তবে ওই অবৈধ নির্মাণকারিদের বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ থেকে শুরু করে পাড়ার কাউন্সিলর যারা এমন ভয়াবহ দুর্নীতিতে হাত পাকিয়ে এখন সরকারের খাতায় 'গুডবয়' সাজার চেষ্টা করছেন শাসকের অনুগত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কি অবস্থান নেয় সেটাই আজ রাজ্যবাসির কাছে বহুমুল্যের প্রশ্ন ! এ রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রাক্তন ঘাসফুল নেতারা আজ তাদের অবৈধ সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে শিবির বদলের উদ্যোগ নিচ্ছেন জেলযাত্রা বাঁচাতে। ফলে বিভিন্ন মডেলের রক্ষাকবচ তৈরি হচ্ছে রাজ্য রাজনীতিতে এমন অবৈধ আয়ের উৎস রক্ষা করতে।

সাম্প্রতিক তারাতলা বিপর্যযয়ে আবারও উঠে এসেছে নির্মাণক্ষেত্রে বহুস্তরীয় গাফিলতি। বিশেষত পৌরসভার প্ল্যান অনুমোদন করার পর কার্যক্ষেত্রে সেই নির্মাণ , আইন অনুযায়ী হচ্ছে কিনা সেটাও পর্যায়ক্রমে তদারকি করা পুর প্রশাসনের এক্তিয়ারে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভায় নিয়োগ বন্ধ থাকায় সেই তদারকির ক্ষেত্রে লোকবলের ভয়ংকর ঘাটতি রয়েছে কলকাতা থেকে জেলার বিভিন্ন পৌরসভাতেই। মনে রাখতে হবে যে দ্রুততায় এখন নগরায়ন ঘটে চলেছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সেক্ষেত্রে নির্মাণক্ষেত্রের উপর পুর নজরদারি বাড়াতে গেলে প্রয়োজন প্রচুর সংখ্যার স্থায়ী , দক্ষ কর্মী নিয়োগ। বর্তমান তারাতলা বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বিগত আমলে অনুমোদিত বিভিন্ন নির্মাণ নকশা 'অডিটের' কথা ঘোষণা করেছেন বৈধ এবং অবৈধ নির্মাণকে চিহ্নিত করতে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ নির্মাণ নকশার 'অডিট' রাজ্যজুড়ে করতে গেলে যে পরিমাণ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার কিংবা কর্মীর প্রয়োজন সেটা নেই সরকারের ভাঁড়ারে। ফলে সরকার চাইলেও এমন জরুরি 'অডিট' শেষমেষ অসম্পূর্ণ থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

মনে রাখতে হবে নির্মাণ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে নির্মাণ নকশা ত্রুটিমুক্ত হওয়া যেমন জরুরী তেমনি জরুরী নির্মাণ সামগ্রীর মান, নির্মাণ পদ্ধতি এবং নির্মাণ ক্ষেত্রে তদারকির ভূমিকা। এর কোন একটির অভাব ঘটলে সামগ্রিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তারাতলায় নির্মাণ কাঠামো ছিল ইস্পাতের তৈরি তিন তলা গুদাম ঘর। ফলে এমন ইস্পাতের কাঠামো দিয়ে কাজ করার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে কিনা নির্মাণকারী সংস্থার, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন পুর প্রশাসনের তরফে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, নির্মাণ প্রকল্পের খরচ কমাতে আর নির্মাণের মানের সাথে আপোস করতে বহু ক্ষেত্রেই অদক্ষ, অনভিজ্ঞ এবং অসৎ নির্মাণকারী সংস্থা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বহু প্রকল্পে। পাশাপাশি নির্মাণ ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট বাহিনীর দাপট প্রবল হলে নির্মাণ সামগ্রীর মানের সাথে আপোষ হয় সর্বাধিক। বন্দর এলাকায় কেবল বর্তমানের বিতর্কিত গুদামের কাঠামো নয় বরং বহু নির্মাণ কাঠামো ঘিরেই স্থানীয় মানুষের অভিযোগ জমা পড়েছিল রাজ্য প্রশাসন থেকে বন্দর প্রশাসনের কাছে। কিন্তু তাতে আখেরে কাজের কাজ যে কিছু হয়নি সেটা আরো একবার স্পষ্ট হলো এই নির্মাণ বিপর্যয়ের সাথে।

নির্মাণ অবৈধ হলে সেই কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে প্রযুক্তিনির্ভর উপায়ে (structural retrofitting) মেরামতির উদ্যোগ নেওয়া উচিত নির্মাণকারীর থেকে ধার্য জরিমানার অর্থের বিনিময়ে। অন্যথায় যথাযথ আইনি নোটিশ দিয়ে এগুলি ভাঙার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশের চালু প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাঝেই গড়ে ওঠা এমন অবৈধ নির্মাণ কাঠামো তৈরি হচ্ছে , হাত বদল হচ্ছে কিংবা বিক্রি হচ্ছে যখন পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় তখন এমন অবৈধ কারবারের প্রতারিত মানুষদের রাতারাতি ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে বাড়ি ভেঙে ফেলাটাও চটজলদি কোন সমাধান নয়। বরং অবৈধ নির্মাতাদের থেকে বাজেয়াপ্ত জরিমানার অর্থ ব্যবহার করে সরকার কিংবা পুরসভা সেই প্রতারিত বাসিন্দাদের বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। বুলডোজার দিয়ে প্রতীকী দু-চারটে বাড়ি ভেঙে অবৈধ নির্মাণের কারবারিদের ভয় দেখানো যাবে না যদি না এই ব্যবস্থার গভীরে থাকা দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা যায়। বেলাগাম অপরিকল্পিত নগরায়নের সাথে অবৈধ নির্মাণ আজ হাত ধরাধরি করে চলছে দেশজুড়েই। ফলে আজ প্রয়োজন পুর প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে বেআইনি নির্মাণ রুখতে জনসাধারণের মতামতকে সম্যক গুরুত্ব দেওয়ার এক স্বচ্ছ প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করা।