আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৬ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

এ জগতে হায়, সেই বেশি চায়!

রঞ্জন রায়


গত শতাব্দীর শেষের দুই দশক। গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রৈকার অভিঘাতে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল বিশাল শক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার অনুগামী সমাজতান্ত্রিক শিবির। ভেঙে পড়ল বার্লিনের বিভাজিকা প্রাচীর। কিন্তু এর ফল হল সুদূরপ্রসারী। বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য বদলে গেল। দাঁড়িপাল্লা একদিকে হেলে পড়ল। দুই মেরুর বদলে এক মেরু। তার আগে, সত্তরের দশকের শেষে আমেরিকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো উত্তমর্ণ (ঋণদাতা) থেকে হয়ে গেল অধমর্ণ (খাতক) দেশ। মুখ্য কারণ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভিয়েতনাম-কাম্বোডিয়া-লাওসে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে দেশের আর্থিক শক্তির হ্রাস। গৌণ কারণ, মোটরকার থেকে বিভিন্ন উপভোক্তা পণ্যের নির্মাণে জাপানের অগ্রগতি এবং আমেরিকার বাজারে তাদের অনুপ্রবেশ।

ব্রিটিশ নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের নোবেল প্রাইজ গ্রহণের অভিভাষণটি মনে করুন। ৭৫ বছর বয়সি পিন্টার স্বাস্থ্যের কারণে নিজে স্টকহোম যেতে পারেননি। কিন্তু ৭ ডিসেম্বর, ২০০৫-এ তাঁর হুইল চেয়ারে বসে টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকার এবং 'আর্ট, ট্রুথ অ্যান্ড পলিটিকস্‌' নামে ভাষণটির ভিডিও টেপ বহু প্রচারিত।

এতে উনি আমেরিকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিদেশ নীতির হাঁড়ি ফাটিয়েছেন। ঘটনা ধরে ধরে দেখিয়েছেন কী ভাবে আমেরিকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ, প্রায়োজিত অভ্যুত্থান এবং গুপ্তহত্যার মাধ্যমে নিজেদের একচেটিয়া ক্ষমতা ধরে রেখেছে। অথচ গোটা ব্যাপারটাকেই প্রচার করেছে যেন এসব করা হচ্ছে বিশ্বশান্তি ও কল্যাণের জন্য!

নাট্যকার পিন্টার বলেছিলেন - মানতেই হবে আমেরিকার নির্লজ্জ বর্বর আগ্রাসী অমানবিক নীতি আজকের বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বড়ো সফল নাটক। আমেরিকার নীতির মূলে রয়েছে আত্মপ্রীতি এবং বিশ্বজুড়ে একচ্ছত্র ক্ষমতাকে কব্জা করে রাখার স্বপ্ন। আমেরিকা সফল সেলসম্যান। দুনিয়াকে নিজের নগ্ন লোভ ও ক্ষমতার লালসাকে নানান মুখোশ পরিয়ে বিক্রি করে।

আমরা দেখলাম সোভিয়েত ও সমাজতান্ত্রিক শিবির ভেঙে যাওয়ায় আমেরিকা নতুন করে অক্সিজেন পেল। এর আগে চিলি, নিকারাগুয়া, ভিয়েতনামে ইচ্ছেমত সরকার বদলে দেয়ার খেলায় যে দাপট দেখিয়েছিল তা যেন আবার ফিরে এল। এবারের ক্ষমতার লড়াই মধ্যপ্রাচ্যে ও লাতিন আমেরিকায়।

লক্ষ্য তেলের একচেটিয়া অধিকার।

প্রথমে দুই বুশের সময় দুটো ইরাক যুদ্ধ। দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের সময় অজুহাত হিসেবে একটা জলজ্যান্ত মিথ্যে কথা প্রচার করা হল। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের কাছে নাকি 'Weapons of Mass Destruction' অর্থাৎ ব্যাপক জনসংহারের বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার মজুত আছে। বিশ্বশান্তির জন্যে বিপজ্জনক বটে! গল্পটার টোপ অনেকেই খেল, বিশেষ করে ন্যাটো দেশগুলো। কানাডা, ব্রিটেন, ফ্রান্স সবাই সৈন্য পাঠাল ইরাকে। যেভাবে একটা দেশের রাষ্ট্রপতিকে খুঁজে ধরে এনে বিচারের প্রহসন করে ফাঁসিতে ঝোলানো হল তা গোটা দুনিয়া চুপ করে দেখল।

কোথাও একটা হিসেবে ভুল ছিল। এতদিন আমেরিকা সমস্ত যুদ্ধ লড়েছে বিদেশের মাটিতে - দুটো বিশ্বযুদ্ধ হোক, বা ভিয়েতনাম, চিলি, নিকারাগুয়া, আফগানিস্থান ও ইরাক। আমেরিকার জনজীবনে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঁচ পড়েনি।

সেই কুনাট্য আবার এত বছর পরে অভিনীত হচ্ছে।

বর্তমান প্রেসিডন্ট ট্রাম্প সরেস। রোজ সকালে এক কথা বলেন, বিকেলে অন্য। অনায়াসে উড়িয়ে দেন নিজের দেশের এবং আন্তর্জাতিক আইন।

ভেনেজুয়েলায় অনুষ্ঠিত হল ব্ল্যাক কমেডি। ওই দেশ থেকে আমেরিকার বর্ডার দিয়ে চোরাপথে ড্রাগ ঢুকছে এই অভিযোগের ধুয়ো তুলে একরাতে আমেরিকার প্যারাশুটবাহিনী প্রেসিডেন্টের প্যালেসে নেমে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে সস্ত্রীক আমেরিকায় তুলে এনে জেলে পুরল।

এবারও সারা বিশ্ব চুপচাপ দেখল, কেউ রা' কাড়ল না। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প-এর আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। উনি কানাডাকে আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের টোপ দিয়ে বললেন - কানাডার উচিত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ তম রাজ্য হয়ে যাওয়া - তবেই মুক্তি! কথাটা উনি বললেন একবার নয়, দু'বার নয়, বেশ কয়েকবার।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও বিরোধী কনজার্ভেটিভ নেতা পিয়েরে পলিভার বললেন - কানাডা কখনই বিক্রয়যোগ্য পণ্য হবে না।

উনি ডেনমার্ককে বললেন - গ্রিনল্যান্ড দাও। এ 'তো একেবারে 'বাবু কহিলেন বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে' কেস!

তবে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমেরিকার লোভ নতুন নয়, বরং দেড় শতাব্দী পুরনো। ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার থেকে আলাস্কা কিনে নেবার পর, ঐ বছরই আমেরিকা গ্রিনল্যান্ড কিনতে আগ্রহ দেখায়। কিন্তু ডেনমার্ক উৎসাহ দেখায় নি। এর পরে ১৯১০ সালে আবার আমেরিকা কেনার আগ্রহ দেখায়, কিন্তু তাতেও বিশেষ সারা পায় না। ১৯১৬ সালে ডেনমার্ক-এর সঙ্গে ইউএসএ-র একটা চুক্তি হয় যা 'Treaty of the Danish West Indies' নামে পরিচিত; তাতে গ্রিনল্যান্ড এর ওপর ডেনমার্ক-এর দখল আমেরিকা মেনে নেয়, তার বদলে ভার্জিন আইল্যান্ড (ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডগুলোর মধ্যে একটা) ডেনমার্ক-এর থেকে নিয়ে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ড-এ আমেরিকার মিলিটারি ঘাঁটি ছিল। যুদ্ধের ঠিক পরে পরেই ১৯৪৬ সালে আমেরিকা ডেনমার্ককে একটা গোপন অফার দেয় গ্রিনল্যান্ড দিয়ে দেবার জন্য যা ডেনমার্ক প্রত্যাখ্যান করে। এদিকে গ্রিনল্যান্ড-এ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরানো হয়নি। ডেনমার্ক কয়েকবার বলেছিল, কিন্তু সরাচ্ছে না দেখে ওরাও যুদ্ধের বাজারে তখনকার মতন হাল ছেড়ে দেয়। আমেরিকা ১৯৪৮ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড-এ সামরিক ঘাঁটি রেখে দেয়। এরপর ১৯৪৯ সালে NATO তৈরি হল - আমেরিকা ও এবং ডেনমার্ক দুই দেশই সদস্য। ১৯৫১-তে একটা চুক্তি হয় তাতে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ড-এ আমেরিকাকে সামরিক ঘাঁটি চালু রাখার অনুমতি দেয়, যদিও শেষ পর্যন্ত একটা রেখে বাকি সব গুটিয়ে নেয়া হয়।

দীর্ঘদিন বাদে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম প্রেসিডেন্সির সময়, ২০১৯ সালে, আবার গ্রিনল্যান্ড কিনে নেবার প্রস্তাব তুললে ডেনমার্ক-এর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফেডেরিকসন সেই প্রস্তাবকে absurd বলে উড়িয়ে দেন।

২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি হয়ে আবার একই সুর তোলেন ট্রাম্প - তবে এবার আর কিনে নেওয়া নয়, ছিনিয়ে নেবার ইঙ্গিত দিতে থাকেন। কিন্তু ডেনমার্ক এবং ন্যাটো দেশগুলোর একরোখা ভাব দেখে ট্রাম্প বলছেন, গাজোয়ারি করে নয়, ন্যাটো-র সঙ্গে কথার মারপ্যাঁচ (যাকে বলছে আলোচনার Framework) করে নাকি নিয়ে নেবেন।

তো, এই হল মোটামুটি গ্রিনল্যান্ড-ইউএসএ-ডেনমার্ক এর গপ্পো। এখন গপ্পো কোনো দিকে যায় দেখা যাক।

তবে ট্রাম্প বড্ড ছটফটে।

এবার নতুন দাবি - কিউবা চাই।

প্রকারান্তরে কিউবার জ্বালানি তেলের সাপ্লাই বন্ধ করে ৩০ লক্ষ কিউবানকে দিনের পর দিন অন্ধকারে থাকতে বাধ্য করা হল। ওদের তেলের জোগান আসত ভেনেজুয়েলা এবং মেক্সিকো থেকে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরোকে কিডন্যাপ করা, আমেরিকার নৌবহরের বেড়াজাল এবং চোখরাঙানির ফলে সব বন্ধ। কিউবার শক্তি মন্ত্রী জানিয়েছেন 'আমাদের একফোঁটা তেল ও ডিজেল নেই। সমস্ত মজুত ভাণ্ডার খালি'। ফলে বিপর্যস্ত আলো, জলের সাপ্লাই ও জঞ্জাল সরানোর ব্যবস্থা। কিউবা যে কোনো দেশ থেকে তেল কিনতে রাজি, কিন্তু তেল যাবে কী করে! ডিসেম্বরের পর মাত্র একটি রাশিয়ান তৈলবাহী জাহাজ হাভানা পৌঁছেছে।

অসহায় জনতা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে থালাবাসন বাজিয়ে। বলছে - আরে, অন্ততঃ তিন ঘন্টার জন্যে তো আলো দাও। রাষ্ট্রসংঘ নিন্দা প্রস্তাব পাশ করেছে - আমেরিকার এই পদক্ষেপে কিউবার নাগরিকদের সম্মানজনক ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার পদদলিত।

ট্রাম্প পেয়ে গেছেন ভেনেজুয়েলার তেলের ভাণ্ডার। তাই ভারতকে ফতোয়া দিলেন, ইরান এবং রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ কর। তোমরা ভেনেজুয়েলা থেকে তেল নেবে। অর্থাৎ আমেরিকার মাধ্যমে। এছাড়া ভারতকে ৫০০ বিলিয়ন আমেরিকান পণ্য (নিঃশুল্ক) আমদানি করতে হবে। তাহলে আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের রপ্তানির উপর শাস্তিমূলক অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করবে এবং বর্তমান ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করবে।

আবার, এতদিন যে ভারত আমেরিকা থেকে কৃষিপণ্যের আমদানির উপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছিল এবং কিছু আমেরিকান গাড়ির উপর প্রায় ১০০ শতাংশ, সেসব তুলে নিতে হবে। তাহলে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতের বিশাল বাজার মার্কিন পণ্যের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে।

ট্রাম্প খোলাখুলি বলেন - উনি আমেরিকার স্বার্থ দেখছেন। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে আমেরিকার বাণিজ্যিক ঘাটতি হত, উনি সেটা শোধরাতে চান। এর আগে উনি হাজার খানেক 'বেআইনি' ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে প্লেনে চড়িয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন।

তাঁর মতে 'বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির মধ্যে ভারতই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সর্বোচ্চ শুল্ক লাগিয়েছে'।

মানবাধিকারের খেলা

একদিকে আমেরিকা ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া ও কিউবার মতো কিছু সরকারের বিরুদ্ধে তাদের দেশে নাগরিকদের মানবাধিকার হননের দিকে আঙুল তোলে। অন্যদিকে এল সালভাদোর, ইকুয়েদর এবং পেরুর মতো অনুগত দেশের সরকারের কাজকর্মের দিকে চোখ বুঁজে থাকে। এমনকি পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও জনজাতিদের দমনের প্রশ্নে আমেরিকা নিরুত্তর।

আবার আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) প্রস্তাব করেছে, ভারত এবং আরও ৫৩টি দেশের পণ্যের আমদানির উপর আমেরিকা অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করবে। অপরাধ? সেই সব দেশে শ্রমিকদের জবরদস্তি খাটতে বাধ্য করা হচ্ছে!

হাসব না কাঁদব?

তবে আমাদের মন্ত্রী পীযুষ গোয়েল আশ্বস্ত করেছেন - এত দুশ্চিন্তার কারণ নেই। আমরা দেশের স্বার্থ রক্ষায় দরাদরি করে এসব সামলে দেব। বেশ, আপাততঃ তাঁর কথায় আস্থা রাখা যাক।

ইজরায়েল-ইরান পর্ব

নেদারল্যান্ডস-এ অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট ইজরায়েল-এর প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে গাজা গণহত্যার জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করে তার নামে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করেছে। কিন্তু তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-এর অতি ঘনিষ্ঠ। তাই গাজায় একটি অসম যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইজরায়েল নিয়মিত সেখানে আরবদের উৎখাত ও হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু নিউ ইয়র্কে, ট্রাম্প-এর শত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে মেয়র নির্বাচিত হলেন জোহরান মামদানি। রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সমাজবাদী। ঘোষণা করলেন - গণহত্যার অপরাধী নেতানিয়াহু যদি নিউ ইয়র্কে পা রাখেন তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মেনে তাঁকে গ্রেফতার করা হবে।

নেতানিয়াহুর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চাই দুটো কারণে।

তাঁর দীর্ঘকালীন লক্ষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের জমি, ঘরবাড়ি ছিনিয়ে আরব রাষ্ট্রগুলোকে ধ্বংস করে জায়নিস্ট সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা। তাই লেবাননের ভেতরে ঢুকে ইজরায়েল-এর পদাতিক বাহিনী এলাকা দখল করছে।

অল্পকালীন লক্ষ্য, নিজের দেশে গ্রেফতারি এবং শাস্তি এড়ানো। তিনি আবার নিজের দেশে আর্থিক অপরাধে আদালতে অভিযুক্ত। যুদ্ধ থামলেই আদালতে শুনানি হবে। তেল আভিভ-এর কোর্ট ছাড় দেবে না জানিয়ে দিয়েছে।

গতবছর থেকেই আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরান-এর উপর সংযুক্ত হামলা শুরু হয়েছিল। গল্পটা সেই পুরনো ধাঁচের - ইরান নাকি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করছে! ইরান অস্বীকার করছে? বেশ, তাহলে ওদের ইউরেনিয়ামের স্টক আমেরিকার হাতে তুলে দিক। যখন সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়ে তৃতীয় দেশে দু'পক্ষ আলোচনায় বসেছে সেইসময় বলা নেই কওয়া নেই এ'বছর ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরান-এর একটি শহরের স্কুলে ড্রোন ও মিসাইল হামলা হল। প্রায় একশ' স্কুলের ছাত্রী মারা গেল। তারপর গুপ্ত হামলায় ইরান-এর সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনেই এবং পঞ্চাশজন আর্মি, নেভি ও গুপ্তচর বিভাগের প্রমুখ নিহত হলেন।

ট্রাম্প ঘোষণা করলেন - ইরান শেষ হয়ে গেছে। ওদের সামরিক শক্তি এবং সরকার ধ্বংস হয়েছে। জনতা বিদ্রোহ করে নতুন সরকার গঠন করুক। কোনো সাময়িক যুদ্ধ বিরতি হবে না। ইরানকে পরাজয় স্বীকার করে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে। তারপর না হয় আমেরিকা ইরানকে আর্থিক সাহায্য দেবে।

ভদ্রলোকের লোভ ও আত্মমুগ্ধতা দেখার মত।

৪ মার্চ, ২০২৬। ভারতের বিশাখাপত্তনম বন্দরে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে ইরান-এর 'নিরস্ত্র' যুদ্ধজাহাজ IRIS Dena-কে ভারত মহাসাগরে শ্রীলংকার উপকুলের কাছে মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দেওয়া হল।

ইরান আত্মসমর্পণ করল না। বরং গুপ্ত হত্যাকাণ্ড এবং বাচ্চাদের স্কুলে হামলার ঘটনায় জনতা ইরান-এর বর্তমান সরকারের পাশে দাঁড়ালো।

দেখা গেল, ইরান-এর ভূগর্ভে রাখা মিসাইল জাতীয় অস্ত্রসম্ভার এবং ইউরেনিয়ামের গোপন ভাণ্ডার সম্বন্ধে ইজরায়েল ও আমেরিকার কোনো ধারণা ছিল না। ইরান-এর পালটা হামলায় একাধিক মার্কিন রণতরী ও বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হল। কিছু মার্কিন সৈন্য মারা পড়ল। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে - বাহরিন, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান ইত্যাদিতে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি আক্রান্ত হল এবং আংশিক ধ্বংস হল।

দু'মাস কেটে গেল, ইরান আত্মসমর্পণ না করে পালটা হামলা চালিয়ে গেল। ট্রাম্প পড়লেন বেকায়দায়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হেগসেথ ২ এপ্রিল তারিখে আচমকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জকে বরখাস্ত করলেন।

কুনাট্যের প্রহসন পর্ব শুরু

হেগসেথ আবার এপ্রিল ২০ ও ২২ তারিখে বরখাস্ত করলেন মার্কিন নৌসেনার 'চিফ অফ স্টাফ' জন হ্যারিসন ও নৌসেনা সচিব জন ফেলানকে। জনতা বুঝল আমেরিকার সামরিক বাহিনী অপরাজেয় নয়, এবং ইরান যুদ্ধে বড়ো ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।

জনতা রাস্তায় নামল। যুদ্ধ বন্ধ করার দাবিতে লক্ষ লক্ষ লোক মিছিল করে সমবেত হল নিউ ইয়র্কের টাইম স্কোয়ারে, লস এঞ্জেলস এর সিটি হলে এবং ওয়াশিংটন ডিসির রাষ্ট্রপতির হোয়াইট হাউসের সামনে। ইহুদিদের শান্তিকামী সংগঠন, প্রৌঢ়দের যুদ্ধবিরোধী সংগঠন, সবাই ধর্ণায় বসল। তাঁদের দাবি - ইজরায়েল-এ লাগাতার অস্ত্রের জোগান দেওয়া বন্ধ হোক!

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল ডজন খানেক শহরে। শ্লোগান, জনগণের অর্থ ব্যয় হোক নাগরিকদের জন্যে, বোমা ও অস্ত্র নির্মাণে নয়। লাগাতার বিভিন্ন অজুহাতে অন্য দেশের সরকার উলটে দেয়ার খেলা দেখে জনতা বীতশ্রদ্ধ।

চাপের মুখে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি।

একী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে

এতদিন যে দেশগুলো ন্যাটোর সামরিক চুক্তির সদস্য হিসেবে সবসময় মার্কিনি সানাইয়ের পোঁ ধরে রাখত তারাই হঠাৎ ইরান যুদ্ধে সাহায্য করতে অস্বীকার করল! সবার আগে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী আঙুল তুলে বললেন - ইজরায়েল ও আমেরিকার ইরানকে আক্রমণ অনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্থুল লঙ্ঘন! তারপরে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি এবং ব্রিটেন - কেউ নিজেদের সামরিক বিমানবন্দরকে ইরান-এর হামলার জন্যে ব্যবহৃত হতে দেবে না! কানাডাকে তো ট্রাম্প-এর অহংকার আগেই চটিয়ে দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ আরব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জাল বিছানো। কিন্তু ইরাক এবং ন্যাটোর সদস্য তুর্কিয়ে ইরান-এ বিমান হামলার জন্যে নিজেদের বিমান বন্দর ব্যবহার করতে দেবে না - বলে দিল। ট্রাম্প রেগে আগুন, তেলে বেগুন! ন্যাটোকে ধমকালেন - আর্থিক সাহা্য্য বন্ধ করে দিলে তোমাদের অস্তিত্ব থাকবে না, ইত্যাদি। কিন্তু ভবি ভুলল না।

আবার মার্কিন সেনেট তার দুই স্তরেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-এর ইরান যুদ্ধের ব্যাপারে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং খরচা করার ক্ষমতাকে খর্ব করল। প্রকারান্তরে ট্রাম্পকে বলা হল ইরান ফ্রন্ট থেকে সৈন্য ফিরিয়ে আনতে।

হরমুজ খাঁড়িতে সামরিক পাহারা বসিয়ে তেলের ট্যাংকার আটকে ইরান গোটা বিশ্বকে মাথা নোয়াতে বাধ্য করেছে। কোনো দেশই হরমুজে জাহাজ চলাচলের পথ মুক্ত করতে মার্কিন সেনার সঙ্গে সংযুক্ত সামরিক অভিযানে শরিক হতে রাজি নয়।

এখন হাওয়া-মোরগের মুখ ঘুরে গেছে।

ট্রাম্প বারবার অনুরোধ করছেন ইরান যাতে তাঁর শান্তি চুক্তির প্রস্তাব মেনে নেয়। ইরান রেখেছে তার নিজস্ব শর্ত।

ঘরে বাইরে নাজেহাল হয়ে ট্রাম্প মেজাজ হারালেন।

পরিস্থিতি এমন যে ইরান আজ ইজরাইলে মিসাইল দেগেছে। কারণ ইজরায়েল যুদ্ধবিরতির চুক্তি অগ্রাহ্য করে লেবাননের উপর নিয়্যমিত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগই অসামরিক লক্ষ্য।

ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলছেন পালটা আক্রমণ না করতে, ধৈর্য ধরতে।

মনে হচ্ছে এই অশ্লীল কুনাট্যের যবনিকা পতন আসন্ন।


তথ্যসূত্রঃ

১। দ্য গার্ডিয়ান, ১৪ মে, ২০২৬।
২। ভারতে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেট দ্বারা জারি বুলেটিন, ১০/০২/২০২৬।
৩। হিউমান রাইটস্‌ ওয়াচ ৪/২/২৬।
৪। দি হিন্দু, ৩ জুন, ২০২৬।
৫। অল জাজিরা, ৮ জুন, ২০২৬।