আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৬ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

টাচডাউনের দেশে বিশ্বফুটবল

মৌসুমী দত্তরায়


আমেরিকা বিশ্বকাপ আয়োজন করছে (১১ জুন - ১৯ জুলাই, ২০২৬)। অথচ খোদ আমেরিকাই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, এই বিশাল যজ্ঞ নিয়ে তারা ঠিক কী করবে!

ব্যাপারটার মধ্যে একটা বিচিত্র কমেডি আছে। ফিফা বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) আয়োজক এবার সেই আমেরিকা-মার্কিনরা হাত দিয়ে 'ফুটবল' খেলে, আর বাকি পৃথিবীর ফুটবলকে ডাকে 'সকার' (Soccer) বলে; আবার 'সকার' শুনলেই ফুটবল-দুনিয়ার বাকি অংশের মানুষ বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকায়।

তবুও এটাই বাস্তব: ২০২৬ সালের জুন মাসে এই গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটির প্রধান ঠিকানা হতে চলেছে নিউ জার্সির মেটলাইফ (MetLife), ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি (AT&T), সান্তা ক্লারার লিভাইজ (Levi's) স্টেডিয়ামসহ আরও এগারোটি ভেন্যু। খেলা ছড়িয়ে থাকবে এমন এক বিশাল দেশ জুড়ে, যার ভেতরে অনায়াসে গোটা তিনটে ভারতবর্ষ ঢুকে যেতে পারে! ফলে, মেক্সিকো সিটির উদ্বোধনী ম্যাচ দেখে একজন ফুটবলপ্রেমীকে যদি নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের ফাইনালে পৌঁছাতে হয়, তবে তাকে কার্যত একটা আস্ত মহাদেশ পাড়ি দিতে হবে।

মাঠের লড়াইয়ের মতোই এই মুহূর্তে রাজনীতিটা বেশ টানটান। অর্থনীতি মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো, দর্শকদের পরিসংখ্যানও অনেক নতুন গল্প বলছে। আর লজিস্টিকস (ব্যবস্থাপনা)? আহ, সে এক এলাহী কাণ্ড! যা সামাল দিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা সমন্বয়কারীদেরও মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। চলুন, একটু খতিয়ে দেখা যাক পর্দার আড়ালে ঠিক কী ঘটছে।

এক. বিশ্বকাপের রাজনীতি

প্রথমেই সহজ প্রশ্ন: আমেরিকা এই বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পেল কীভাবে? উত্তরটা চেনা ছকে - জোরদার লবিং, ফিফার রাজকীয় রাজস্বের খিদে, আমেরিকার ঝকঝকে পরিকাঠামো, ১১টি বিশ্বমানের স্টেডিয়াম এবং বিশাল টেলিভিশন ও বিজ্ঞাপনের বাজার, যাকে উপেক্ষা করা কোনো বাণিজ্যিক সংস্থার পক্ষেই সম্ভব নয়।

আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সম্পর্কটা - হালকাভাবে বললে - বেশ 'উষ্ণ'। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে প্রথম 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' দেন। এই ঘটনায় স্বভাবতই নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছিল, অনেকেই বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন - বিশেষ করে ফিফার নিজস্ব নৈতিকতার ইতিহাসের সঙ্গে যাদের অল্পবিস্তর পরিচয় আছে। এর পরপরই 'ফিফা' নিউ ইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে একটি আস্ত অফিস খোলার সুযোগ পেয়ে যায়। এসব কোনো বানানো গল্প নয়; বরং বাস্তবটাই এখানে এত পরাবাস্তব যে বানিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে রাজনৈতিক মাথাব্যথাগুলো একেবারেই বাস্তব। ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও কড়া অভিবাসন নীতি অনেক দেশের সমর্থকদের মনেই গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপের বেশ কিছু সংসদ সদস্য ও সমর্থক গোষ্ঠী বয়কটের ডাক দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা 'গর্জন বেশি, বর্ষণ কম'-এই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবে ইরান দলের ভাগ্য বেশ অনিশ্চিত। লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলে যাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলার কথা, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক আবহের কারণে তারা বেশ চাপে আছে। আল জাজিরা-র (২৯ মে, ২০২৬) খবর অনুযায়ী, মেক্সিকোয় নিযুক্ত তেহরানের দূত জানিয়েছেন, ইরানি ফুটবল দল এখনো মার্কিন ভিসা পায়নি, ফলে তারা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিন দেশের যৌথ আয়োজনের ব্যবস্থাটিও কম নাটকীয় নয়। টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক 'এস্তাদিও আজটেকা' স্টেডিয়ামে - ফুটবলের এক মহাকাব্যিক মঞ্চ, যেখানে দুটো বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়েছে, পেলে খেলেছেন, আর মারাদোনার সেই বিখ্যাত 'ঈশ্বরের হাত' (Hand of God) গর্জে উঠেছিল। অথচ এই মেক্সিকোর সঙ্গেই ট্রাম্প সারা বছর ধরে শুল্কযুদ্ধ চালিয়েছেন! মার্কিন-মেক্সিকো-কানাডার এই পারস্পরিক উত্তেজনা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিলেন, 'ওদের একটু বেশি টাকা দিতে হবে।' কূটনীতি আর কাকে বলে!

দুই. অর্থনীতি: পনেরো বিলিয়ন ডলারের আখ্যান

এখানেই খেলাটা সত্যিকারের চমকপ্রদ হয়ে ওঠে। ফিফা এই বিশ্বকাপ চক্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করার পথে হাঁটছে - যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড। এমনকি এটি খোদ সংগঠনের নিজস্ব বাজেট করা ১১ বিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে। শুধু প্রাইজমানি বা পুরস্কার তহবিলের অঙ্কটাই ছুঁয়েছে ৮৭১ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি!

একটা তুলনা করা যাক। আমেরিকার নিজস্ব 'পবিত্র ধর্মানুষ্ঠান' হল সুপার বোল (আমেরিকান ফুটবল)। একটি সুপার বোল কোনো আয়োজক শহরে সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সরাসরি আর্থিক প্রভাব ফেলে। আর এই বিশ্বকাপ? ১৬টি ভেন্যু আর ৪টি টাইম জোন জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই টুর্নামেন্ট যে আর্থিক জোয়ার আনবে, তা সুপার বোলের চেয়ে বহুগুণ বেশি। শুধু নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সি অঞ্চলই এই আসর থেকে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা আশা করছে।

ফিফার রাজস্ব আদায়ের কলকব্জা বরাবরই নিখুঁত ও দক্ষ। টেলিভিশন স্বত্ব, স্পনসরশিপ আর হসপিটালিটি প্যাকেজ থেকেই আসে সিংহভাগ আয়। টিকিটের রাজস্ব এখানে একটা অংশমাত্র। তবে সেই অংশটিকেও উশুল করতে ফিফা এবার 'ডায়নামিক প্রাইসিং' বা গতিশীল মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির মাধ্যমে আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে।

তিন. টিকিট: গতিশীল যন্ত্রণার পাঠ

টিকিটের গল্পটা আলাদাভাবে বলা দরকার, কারণ এটা এক যুগান্তকারী বদল। ফিফা যখন ঘোষণা করল যে ২০২৬ টুর্নামেন্টে বিমানের টিকিটের মতো চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম ওঠানামা করার 'ডায়নামিক প্রাইসিং' নীতি চলবে, তখন বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া মোটেও ইতিবাচক ছিল না।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন টিকিট বিক্রি শুরু হয়, তখন 'ক্যাটাগরি ১' টিকিটের নূন্যতম দাম ছিল প্রায় ৬০০ ডলার। ২০২৬-এর মে মাসের শুরুতে সেই টিকিট ১০০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে। মেক্সিকো সিটির উদ্বোধনী ম্যাচের সবচেয়ে সস্তা 'ক্যাটাগরি ৩' টিকিটের দামও হাজার ডলারের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। আর মেটলাইফে ফাইনাল ম্যাচের 'ক্যাটাগরি ১' টিকিটের দাম মে মাসের শুরুতে ঠেকেছিল আকাশছোঁয়া ৩২,০০০ ডলারে!

খোদ ট্রাম্প - যিনি নিজে একজন বিলিয়নেয়ার এবং ফিফা সভাপতির পরম বন্ধু - তিনিও প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন যে এই দামে তিনি টিকিট কিনবেন না। একজন শতকোটিপতিও যখন টিকিটের দামকে চড়া বলেন, তখন ফিফার হয়তো একটু ভেবে দেখার অবকাশ ছিল।

অবশ্য ছোটো দেশগুলোর গ্রুপ পর্বের কিছু ম্যাচের টিকিট এখনো ৬০ ডলারে পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবস্থাটি সত্যিই তার নাম অনুযায়ী 'গতিশীল'। এর অর্থ হল - যে সমর্থক সমীকরণ বুঝে আগেভাগে টিকিট কেটে রেখেছেন, তিনি লাভবান হয়েছেন। আর যিনি স্রেফ খেলাটাকে ভালোবেসে শেষ মুহূর্তে টিকিট কাটতে গেছেন, তাকে নিজের এক মাসের ঘরভাড়ার চেয়েও বেশি টাকা খসানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।

চার. দর্শকাসন: জনমিতির চালচিত্র

আমেরিকান সকারের সবচেয়ে বড়ো পরিহাস হল: পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ফুটবলপ্রেমী জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও এই দেশ দশকের পর দশক ধরে খেলাটিকে একটি 'নিশ' (Niche) বা প্রান্তিক আগ্রহ হিসেবে দেখে এসেছে - যেন এটা বড়োজোর অভিবাসীদের, বাচ্চাদের কিংবা মেয়েদের খেলা। তবে এবার সেই ধারণার মোড় ঘোরার পালা।

সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৮ কোটি ৭০ লক্ষ আমেরিকান এই বিশ্বকাপ নিয়ে কম-বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। দেশটির সাধারণ জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ খেলা দেখার পরিকল্পনা করছেন - যা সুপার বোলের (৬৯ শতাংশ) তুলনায় কম হলেও সংখ্যার বিচারে বিশাল।

আমেরিকায় সকারের মূল চালিকাশক্তি বা ইঞ্জিন হল হিস্প্যানিক নাগরিকেরা। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্ম মিলিয়ে প্রতি দুজন মার্কিন হিস্প্যানিকের একজন নিজেকে খাঁটি ফুটবল ভক্ত মনে করেন। 'নিলসেন'-এর গবেষণা জানাচ্ছে, সাধারণ দর্শকদের চেয়ে হিস্প্যানিক ভক্তদের ম্যাচ দেখার সম্ভাবনা ৮৭ শতাংশ বেশি। সব মার্কিন লাতিনোর ৪৪ শতাংশ সক্রিয়ভাবে এই টুর্নামেন্ট অনুসরণ করার পরিকল্পনা করছেন; অনেকের কাছেই এই বিশ্বকাপ একটি জাতীয় উৎসবের সমতুল্য।

এরপরই দ্বিতীয় সক্রিয় গোষ্ঠী হল এশীয় আমেরিকানরা, যাদের ৫১ শতাংশ খেলা দেখার পরিকল্পনা করছেন। তবে জেনারেশনাল লিডার হল 'জেন জি' (৪০ শতাংশ) এবং 'মিলেনিয়ালরা' (৩৯শতাংশ)। মার্কিন ফুটবল ভক্তদের ৭৬ শতাংশ-ই এই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রধান লক্ষ্যও এই গ্রুপটি, কারণ এরা সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় এবং ডিজিটালি সক্রিয়। বর্তমান ও ভবিষ্যতের খদ্দের হিসেবে ব্র্যান্ডগুলোর কাছে এই বয়সীরাই সবচেয়ে লাভজনক।

পাঁচ. লজিস্টিকস: মহাদেশ জোড়া রোড ট্রিপ

২০২৬ বিশ্বকাপ তিনটি দেশ, চারটি টাইম জোন এবং ষোলটি ভেন্যু জুড়ে বিস্তৃত। শুধু আমেরিকাতেই বোস্টন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি থেকে সিয়াটল, কিংবা ডালাস থেকে কানসাস সিটি পর্যন্ত ভেন্যু ছড়ানো। এটা কেবল একটা টুর্নামেন্ট নয়, ৪৮টি জাতীয় দলকে নিয়ে এক অবিশ্বাস্য মহাদেশীয় 'রোড ট্রিপ'!

মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে আমেরিকায় হবে ৭৮টি, আর কানাডা ও মেক্সিকোতে ১৩টি করে। বিভিন্ন শহরে গিয়ে প্রিয় দলের একাধিক ম্যাচ দেখতে চাওয়া আন্তর্জাতিক ভক্তদের জন্য বিমান ভাড়া আর হোটেলের আকাশছোঁয়া খরচ সামলানো এক দুঃস্বপ্ন। ইউরোপের মতো উন্নত রেল যোগাযোগ এখানে নেই। এমনকি আয়োজক শহরগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাও বেশ জটিল - ডালাসের সাবার্বান আর্লিংটন কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসের গণপরিবহন ব্যবস্থার জটিলতা তো কুখ্যাত।

ছয়. ফাইনাল: নিউ জার্সির মহাক্ষণ

আগামী ১৯ জুলাই ২০২৬, বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। খাতায়-কলমে এটি নিউ জার্সিতে হলেও, সাংস্কৃতিকভাবে এটি নিউ ইয়র্ক সিটিরই একটি উপগ্রহ। তাই বলা যায় ছকটি বেশ উপযুক্ত; নিউ ইয়র্ক বরাবরই নিউ জার্সিকে দিয়ে সেই কাজগুলো করিয়ে নেয়, যা নিজের চত্বরে করা সম্ভব বা স্বস্তিদায়ক নয়।

৮২,৫০০ আসন বিশিষ্ট মেটলাইফ দেশের অন্যতম সেরা স্টেডিয়াম। এখানে সুপার বোল, এনএইচএল (NHL) আউটডোর গেম থেকে শুরু করে টেলর সুইফট, বিয়ন্সে বা রোলিং স্টোনসের মেগা কনসার্ট নিয়মিত হয়। ফুটবলের এই মেগা ফাইনাল যে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক বিশাল জোয়ার আনবে, তা নিশ্চিত।

উত্তেজনা ও প্রস্তুতি চলছে সব স্তরেই। কড়া অভিবাসন নীতির আবহেও নিউ জার্সির প্রাক্তন গভর্নর ফিল মারফি অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছেন যে তাদের রাজ্য সবাইকে 'স্বাগত' জানাতে প্রস্তুত। তবে আন্তর্জাতিক ভক্তদের আগেভাগেই ভিসা আবেদন সেরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সাত. উৎসবের মহোৎসব

বিশ্বকাপ মানে তো স্রেফ মাঠের ৯০ মিনিটের খেলা নয়। প্রতিটি আয়োজক শহরে বসছে 'ফিফা ফ্যান ফেস্টিভাল' - যেখানে থাকবে বিশাল পাবলিক স্ক্রিন, লাইভ কনসার্ট, হরেক রকমের খাবারের স্টল আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এই উৎসবের বাজারে বাজিমাত করছে ফিলাডেলফিয়া। ইস্ট ফেয়ারমাউন্ট পার্কের লেমন হিলে টুর্নামেন্টের পুরো ৩৯ দিন ধরেই চলবে তাদের ফ্যান ফেস্টিভাল। ফিলাডেলফিয়াই আমেরিকার একমাত্র শহর, যেখানে গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে এই উৎসব চালু থাকবে। তার ওপর ৪ জুলাই আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস; আর কাকতালীয়ভাবে সেদিন সেখানে একটি ম্যাচও রয়েছে। লিবার্টি বেলের শহরে স্বাধীনতা ও ফুটবলের এক অপূর্ব যুগলবন্দি দেখার অপেক্ষায় সবাই।

অন্যদিকে, হিউস্টনের ইস্ট ডাউনটাউনেও ৩৯ দিন ধরে বিনামূল্যে ফ্যান ফেস্টিভাল উপভোগ করা যাবে। ডালাসের ফেয়ার পার্কে প্রায় ৩৫,০০০ ফুটবলপ্রেমী একসঙ্গে উৎসবে মাতবেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের মেমোরিয়াল কলিজিয়ামসহ একাধিক ভেন্যুতে তৈরি হচ্ছে ফ্যান জোন; যেখানে প্রবেশমূল্য সাধারণের জন্য ১০ ডলার হলেও ১২ বছরের কম বয়সীদের জন্য এন্ট্রি একদম ফ্রি। এভাবেই আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত মেতে উঠছে ফুটবল-উন্মাদনায়।

আট. সোজা সাপটা হিসাব-নিকাশ

এটা ধ্রুব সত্য যে, ২০২৬ বিশ্বকাপ অর্থনৈতিক দিক থেকে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁতে চলেছে। ফিফা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পকেটে পুরবে, স্পনসররা তাদের ব্র্যান্ডিং ছড়াবে, আর টেলিভিশনের রেকর্ড টিআরপি মার্কিন সম্প্রচারকারীদের বাধ্য করবে ফুটবলে চিরতরে লগ্নি করতে।

কিন্তু এটাও সমান সত্য যে - বগোতা, লাগোস, সিউল কিংবা কলকাতার সাধারণ ঘরে বসে যে দর্শকটি ফুটবল দেখতে দেখতে বড়ো হয়েছে, করপোরেট দুনিয়ার 'অ্যাক্টিভেশন' শব্দটা জন্ম নেওয়ার বহু আগে থেকেই যে এই খেলাটাকে মন-প্রাণ সঁপে ভালোবেসেছে, এই বিশ্বকাপ তাকে পুরোপুরি আপন করে নিতে পারল না।

টিকিটের যে আকাশছোঁয়া দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, ভৌগোলিক দূরত্ব যেভাবে বাড়ানো হয়েছে আর রাজনৈতিক জটিলতা যেভাবে চেপে বসেছে - তাতে কি সাধারণের পক্ষে এই বিশ্ব-উৎসবে মন খুলে শামিল হওয়া সম্ভব? এই অমোঘ প্রশ্নটা আজ বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। 'ডায়নামিক প্রাইসিং' গ্যালারির আসনগুলোকে কেবল বিত্তশালীদের একচেটিয়া অধিকার বানিয়ে ছেড়েছে। অভিবাসনের কড়াকড়ি অনেক সাধারণ ভক্তকে স্টেডিয়াম থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলের সেই চিরকালীন আপ্তবাক্য - 'ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন' - যেখানে সবাইকে আপন করে নেওয়ার সুর ছিল, তা যেন এই আমেরিকান করপোরেট সংস্কৃতির জাঁতাকলে পড়ে কোথাও হারিয়ে গেছে।

যে ফুটবল পৃথিবীর ধুলোমাখা রাস্তার খেলা, ফাভেলার খেলা, পাড়ার চুন-সুরকি মাখা মাঠের খেলা - তা আজ আমেরিকায় এসেছে এনএফএল (NFL)-এর জমকালো মোড়কে। জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আর ডোনাল্ড ট্রাম্প একমঞ্চে দাঁড়িয়ে একে 'মহোৎসব' ঘোষণা করেছেন। কিন্তু খেলাটা নিজে - সেই আসল ফুটবল, যখন একটা সাধারণ বল গোলপোস্টের ক্রসবারের নিচে চুমু খেয়ে জালে জড়িয়ে যায় - সে কিন্তু এই জাগতিক আড়ম্বর আর ডলারের হিসাবের প্রতি চিরকালই উদাসীন। সেই খাঁটি অনুভূতিটুকুকে ভালোবেসে আজও বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটি মানুষ টিকিটের আবেদন করেছেন। এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়ামগুলো ভরিয়ে তুলবে।

আমেরিকা এই বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। এই অছিলায় আমেরিকা হয়তো নতুন করে আবিষ্কার করবে - বা প্রথমবারের মতো ভান করবে যে - 'সকার' সত্যিই দেখার মতো এক খেলা!

মেক্সিকো সিটির উদ্বোধনী বাঁশি থেকে নিউ জার্সির ফাইনালের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত, সবুজ ঘাসের মাঠ সম্ভবত বরাবরের মতোই কিছু জাদুকরি স্মৃতি উপহার দেবে। মাঠের খেলায় পায়ে পায়ে জন্ম নেবে নতুন চমক, অনেক হিসেব উল্টে দিয়ে তৈরি হবে নতুন রূপকথা। আর এই সুদূর কলকাতার খেলা-পাগল মানুষগুলো? তারা যথারীতি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় ভাগ হয়ে গোটা বিশ্বটাকেই টেনে নামাবে পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে। আর বাতাসে ভাসবে সেই চিরপরিচিত চেনা সুর - 'সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল...'