আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৬ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

নজরে নিকোবর


ভারত মহাসাগরের বুকে একটি ছোট্ট দ্বীপ - গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অনেক দ্বীপের একটি। আয়তন মাত্র ৯২১ বর্গ কিলোমিটার। ক্রান্তীয় অরণ্য এই দ্বীপের সম্পদ। এখানকার গাছগুলোর বয়স কত কেউ জানে না। কারণ নানারকমের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় এদের বয়স আন্দাজ করা যায়নি। তবে এই গাছগুলির কান্ডের পরিধি গড়ে আড়াই মিটার। এগারোশোর বেশি প্রজাতির প্রাণীর এখানে বসবাস। এমন বহু প্রজাতির প্রাণী এখানে রয়েছে যাদের পৃথিবীর অন্যত্র পাওয়া যায় না। শম্পেন নামের এক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর এখানে বসবাস, যাদের জনসংখ্যা আড়াই শো'রও কম, যারা আজও বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। বিরল প্রজাতির লেদারব্যাক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র এই দ্বীপ। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে এরা বিভিন্ন মহাসাগর থেকে এখানে প্রজননের জন্যেই পৌঁছে যায়। দ্বীপের চারপাশে মহাসাগরের জলে রয়েছে প্রবাল প্রাচীর। সর্বোপরি এই ভূখন্ড ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ছোটবড়ো ভূমিকম্প এই দ্বীপে নিত্যকার ঘটনা।

আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এক অতি সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। 'ইউনেস্কো' স্বীকৃত 'বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ'-কে হঠাৎ করেই বিকশিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ভারত সরকারের 'থিঙ্ক ট্যাঙ্ক' হিসেবে প্রচারিত সংস্থা নীতি আয়োগ (National Institute for Transforming India) ২০২১-এ এই দ্বীপের বিকাশ সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা শুরু করে। 'হলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট অফ গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড অ্যাট আন্দামান অ্যান্ড নিকোবর আইল্যান্ডস্' নামের একটি প্রকল্প প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নীতি আয়োগকে সাহায্য করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় AECOM India নামের এক সংস্থাকে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও পরিকল্পনা তৈরিতে এই বেসরকারি সংস্থাটি যুক্ত ছিল। সরকারি প্রকল্পের রূপরেখা তৈরির জন্য বেসরকারি বিশেষজ্ঞ সংস্থা নিয়োগের ঘটনা অতীতে কখনও ঘটেছে কি? প্রসঙ্গত, প্রকল্পের সম্পূর্ণ নথি যথাযথ ভাবে প্রকাশিত হয়েছে কিনা কেউ জানে না। অন্তত সরকারি ওয়েবসাইটে দেখা যায়নি।

গ্রেট নিকোবর প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে গড়ে উঠবে একটি বিশাল সমুদ্র বন্দর। এর সঙ্গে থাকবে আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নতুন শহর বা টাউনশিপ। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সড়ক ও প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো, পর্যটন ও রিয়েল এস্টেট। প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পে বাইরে থেকে আসা কয়েক লক্ষ মানুষের বসতি গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

হঠাৎ গ্রেট নিকোবর-এর বিকাশের জন্য এত মাতামাতি কেন? সরকারি বয়ানে বলা হচ্ছে যে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি - এটি ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মালাক্কা প্রণালীর কাছে কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগানো যাবে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পরিকাঠামো তৈরি হলে কর্মসংস্থান হবে।

জোর কদমে কাজ এগিয়ে চলেছে। পরিবেশ মন্ত্রক ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে। বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ১০ জুন, ২০২৬ অনুমোদন দিয়েছে। আর ৭ লক্ষ ১১ হাজার প্রাচীন বৃক্ষ ছেদনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে হরিয়ানার রুক্ষ-শুষ্ক এলাকায় প্রায় ৩৫ লক্ষ (আইন মোতাবেক কাটা যাওয়া গাছের পাঁচ গুণ) চারাগাছ রোপন করার বন্দোবস্ত হয়েছে। ১ মে, ২০২৬ সরকারের তরফে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে দ্বীপের মাত্র ১৮ শতাংশ জমি এই প্রকল্পের আওতায় আনার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সাদামাটা এই বিবৃতিতে অবশ্যই বলা হয়নি এর ফলে কত ধরনের এবং কত সংখ্যার বিরল প্রজাতির পশু-পাখি সহ অন্যান্য প্রাণী এই দ্বীপ থেকে শুধু নয় পৃথিবী থেকেই হারিয়ে যাবে। প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য বাস্তুতন্ত্র বিঘ্নিত হলে হাজার হাজার কিলোমিটার সাঁতরিয়ে লেদারব্যাক কচ্ছপ এখানে আসবে তো? বলা হয়নি বিঘ্নিত বাস্তুতন্ত্র প্রবাল প্রাচীর রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা পালন করবে? সমুদ্রের ভেতরে তৈরি হওয়া তীব্র জল-কম্পন প্রতিহত করার জন্য প্রবাল প্রাচীর যে ভূমিকা পালন করে সে সম্পর্কে সরকারি বিবৃতিতে কোনও শব্দ উচ্চারিত হয়নি। সর্বোপরি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় স্থাপিত পরিকাঠামো কতটা টেকসই হবে। সরকারি অর্থে বিকাশের দাপটে প্রকৃতির বিনাশ হলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে পারে। ২০০৪-এর সুনামি-র অভিজ্ঞতা বোধ হয় প্রকল্প প্রণয়নের সময় খেয়াল ছিল না। হিমালয়ের উপর রাস্তাঘাট, স্থাপত্য, বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রভৃতি নির্মাণের সময় প্রতিনিয়ত যে সব অঘটন-দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায় তার থেকেও কি কোনো শিক্ষা লাভ হয়নি?

ভূতত্ব, সমুদ্র বিজ্ঞান, পরিবেশ বিদ্যা, প্রাণীতত্ব, নৃবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা না করে অথবা উপেক্ষা করে বাস্তুতন্ত্র পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করা মোটেও সুবিবেচনার পরিচায়ক নয়। অবিশ্যি যে শাসক শুধুমাত্র সাংসদদের সংখ্যায় বিশ্বাসী তাদের কাছে জ্ঞান-অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই মূল্যহীন। সংখ্যাধিক্যের মতই শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়।

ভূপ্রকৃতিগত ভাবে সংবেদনশীল, ভূমিকম্পপ্রবণ এক দ্বীপপুঞ্জে যে কোনও ভারী নির্মাণকাজই বিপদস্বরূপ, সেখানে একযোগে এত কিছুর পরিকল্পনাই বা কেন? সংসদে এর আগেও বিপন্ন শম্পেন জনজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরেই দেখা যাচ্ছে, কী ভাবে জনজাতি গোষ্ঠীর জমি কেড়ে বড়ো শিল্পপতিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। খাতায় কলমে বলা হচ্ছে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। অবশ্য, যে বৃহত্তর ক্ষতির মুখে বিরল জনজাতি ইতিমধ্যেই দাঁড়িয়ে, সেই ক্ষতির পূরণ টাকার অঙ্কে অসম্ভব। শম্পেনরা সুনামির ধাক্কায় এক বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফের তাঁদের উৎখাত হতে হলে হয়তো শীঘ্রই তাঁরা নিশ্চিহ্ন হবেন। দুর্ভাগ্য, সর্বগ্রাসী দক্ষিণপন্থী রাজনীতির চোখে তাঁদের অস্তিত্বের মূল্য কানাকড়িও নয়। সর্বগ্রাসী এই প্রকল্পের পক্ষে বিবৃতি দেওয়ার সময় জনৈক প্রবক্তা তো সরাসরি বলেই দিলেন যে ১৫০ কোটি মানুষের দেশে আড়াইশো মানুষ নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।

গণতন্ত্রে শাসক যদি অন্যের অধিকার হরণে উদ্যোগী হয়, দেশের জমি, জঙ্গল, পাহাড়, জল, হাওয়াকে অন্যায় ভাবে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কাজে লাগায়, তবে বিরোধী রাজনীতির দায়িত্ব সংগঠিত প্রতিবাদ জানানো, এবং জনমতকে নিজেদের সমর্থনে টেনে আনা। শুধুমাত্র মুখে অভিযোগ জানানো নয়, দরকার হলে পথে নামাও প্রয়োজন। এ দেশের বিরোধী শক্তি সেই পথে হাঁটছে কি? আরাবল্লী, নিকোবর, সরিস্কা, উত্তরাখণ্ড, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ - শুধুমাত্র পর্যটনকেন্দ্র নয়, দেশের সার্বিক কল্যাণের জন্যই এদের পরিবেশ বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। ক্ষমতাবান যদি তার পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা দলগত কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়, তবে তাকে ঠিক পথে চলতে বাধ্য করাই প্রকৃত বিরোধী রাজনীতির কাজ। সাময়িক, বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ তার বিকল্প হতে পারে না। সম্মিলিত মানুষের ধারাবাহিক প্রতিবাদ পরিবেশ ও বাস্ততন্ত্র ধ্বংস করার প্রবণতাকে রুখতে পারে।