আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৫ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
রাজনীতিমেঁ পলিটিক্স
সোমেশ্বর ভৌমিক
শোনা কথা, ভারতীয় রাজনীতির বর্ণময় কোনো চরিত্র নাকি একবার বলেছিলেন, রাজনীতিমেঁ বহোত পলিটিক্স হ্যায়। সত্যি মিথ্যে জানিনা, প্রমাণ চাইলে দিতে পারব না। তা, আজকাল কে আর পাথুরে প্রমাণের ধার ধারছে? খবরের কাগজে, টেলিভিশনের পর্দায় অহরহ ভেসে ওঠে, ‘এই খবরের (বা ছবির বা ভিডিয়োর) সত্যতা যাচাই করা হয়নি।’ আশ্চর্য কথা! পাওয়া খবর ছবি বা ভিডিয়োর যাথার্থ-সত্যাসত্য যাচাই করে নিয়ে প্রকাশ করা বা না-করাই তো দায়িত্ববান সংবাদিক-প্রতিবেদক-সম্পাদকের কাজ। আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজিন্স-এর কল্যাণে এখন সত্যাসত্য যাচাই সহজ হয়ে গেছে। সেই দায়িত্বটুকু মিডিয়াওয়ালারা পালন না করলে গুজব বা অর্ধসত্য-ই খবরের ছদ্মবেশে ঢুকে পড়বে আমাদের মগজে। গুজব বা অর্ধসত্যকে প্রতিহত করবে এই আশা নিয়েই তো আমরা মিডিয়ার কাছে যাই। কিন্তু আস্তে আস্তে আস্তে সে-আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে মিলিয়ে যেতে বসেছে।
তারই হাতে-গরম প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে, কাশ্মীরের হত্যালীলার পরিপ্রেক্ষিতে। কয়েকজন জঙ্গী বিনা বাধায় নৃসংশভাবে কয়েকজন পর্যটককে হত্যা করেছে - শুধু এইটুকু খবর পরিবেশন করা এখন আর যথেষ্ট নয়। যথেষ্ট নয় এই ঘটনার নিরপেক্ষ পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে পরিবেশন করা - যেটা সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে বলে জানি আমরা। মিডিয়ার সেই তদন্তে নিশ্চয়ই প্রকাশ পেত যে উগ্রপন্থী ঘাতকেরা, কোনো বিশেষ, খুব সম্ভব রাজনৈতিক, উদ্দেশ্য নিয়ে এই হত্যালীলার পরিকল্পনা করেছে। হতেই পারে সেই উদ্দেশ্যের পেছনে আছে বিদেশি হাত আর উসকানি। নিশ্চয়ই জানা যেত, এই পরিকল্পনার মুখ যারা ধর্ম-পরিচয়ে তারা মুসলমান। নিশ্চয়ই জানা যেত, এই হামলায় নিহত অধিকাংশ মানুষ ধর্ম-পরিচয়ে অ-মুসলমান। কিন্তু না, শুধু এইভাবে খবর পরিবেশন করলে জনমানসে বিশেষ চাঞ্চল্য তৈরি করা যাবে না বলেই বিশ্বাস করেন মিডিয়ার বর্তমান কর্ণধারেরা। আর জনমানসে চাঞ্চল্যই যদি তৈরি না হয় তাহলে সেটা আর ‘খবর’ হল কি? অন্তত আজকের ভারতে? তবে এই ব্যাপারে দায়টা মিডিয়ার বর্তমান কর্ণধারদের হলেও দোষটা বোধহয় পুরোপুরি তাঁদের নয়।
এটাই আজকের ভারত, বলা ভালো এটাই আজকের রাজনৈতিক ভারত। যে-রাজনৈতিক ভারতের নিশ্বাস-প্রশ্বাস - জলহাওয়ায় এখন ‘আমরা’-‘ওরা’-র বিষ। যে-রাজনৈতিক ভারত এখন আর বহুত্ব এবং বৈচিত্র্যে আস্থা রাখতে পারছে না। প্রাণপণ ভুলতে চাইছে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-র তত্ত্ব। দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রণয়ন এবং প্রচার করে ভারত ভাগ করেছেন বলে আজও গাল দেওয়া হয় ঔপনিবেশিক ভারতের পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিকদের। তাঁদের সেই তত্ত্বকেই সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতির আঙিনায় ফিরিয়ে এনে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে চলেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতিবিদ। হাতেনাতে ফলও পাচ্ছেন তাঁরা। ভোটের বাজারে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ হাসিল করছেন এঁরা - যদিও সংসদে আসনসংখ্যার নিরিখে হোক অথবা প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হিসেবেই হোক, প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁরা নন। অন্যদিকে আদতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও একতার অভাবে ‘বিরোধীপক্ষ’ তকমা নিয়ে বসে আছেন যাঁরা, তাঁরাও দেখছি পা দিচ্ছেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’-দের ফাঁদে। সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু ‘সমস্যা’-র বাইরে তো আরও অনেক সমস্যা আছে দেশে - শিক্ষার সমস্যা, স্বাস্থ্যের সমস্যা, অর্থনীতির সমস্যা, জাতপাতের সমস্যা, বৈষম্যের সমস্যা ইত্যাদি। কিন্তু এখনকার রাজনীতির গল্পগুলো শুনলে মনে হয় এগুলো সব অলীক। এখন শুধুই রাজনীতিমেঁ পলিটিক্স - বিভাজনের, বিভাজনের, আরও বিভাজনের।
আপনার মোবাইলে এখন রোজই দুরভিসন্ধি নিয়ে ফোন করে জামতাড়া অথবা অন্য কোনো গ্যাং। ব্যক্তিমানুষের কথা ছেড়ে দিন, প্রবল প্রতাপশালী ধর্মসংঘের সাধুকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় দুষ্কৃতীদের দল।এইসব সাইবার আক্রমণ, ডিপ ফেক, ডার্ক ওয়েব-এর ঠেলায় বা খেলায় নাগরিকরা বিভ্রান্ত, তাঁদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, সম্পত্তি বিপন্ন। এসবও কি একধরনের জঙ্গীপনা নয়? যতটুকু বুঝি, এই জঙ্গীপনা সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিচার করে না। দেশের অখণ্ডতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য আছে সামরিক বাহিনী। কিন্তু নাগরিকদের সামনে দানব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই যে ডিজিটাল বিপদ, তার বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা কই? গণমাধ্যমে আমরা শুধু শুনি-দেখি নিজের সুরক্ষা নিজে নিশ্চিত করুন এই সাবধানবাণী। এ-ব্যাপারে কোনো দাবি নেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে জাহির করা রাজনীতিকদের মুখে৷ তাঁরা অম্লানবদনে খেলে চলেছেন সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু তাস, আর আঁচ পোয়াচ্ছেন বিভেদের রাজনীতির। বোড়ের ভূমিকায় আমরা, সাধারণ নাগরিকের দল।
অন্তত একবার কি এই ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না আমরা? কাশ্মীরে যা হল তা নিন্দনীয়। এটাও মেনে নিতে অসুবিধা নেই, এর গভীরে আছে পাকিস্তান আর ভারতের কূটনৈতিক বিবাদ। কিন্তু সেটা দুই রাষ্ট্রের মধ্যেকার কূটনীতির ব্যাপার। এবং ইতিমধ্যেই এ-ব্যাপারে দুই রাষ্ট্র নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী কিছু কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। এইসব ব্যবস্থার কথা প্রচার করে সরকার একদিকে নিজের শক্তি জাহির করছে, অন্যদিকে মানুষের রক্ত গরম করতে চাইছে। আমরা, সাধারণ নাগরিকরা, কেন খেয়াল রাখব না যে বিষয়টা সরকার এবং তাঁবেদার মিডিয়া যেমন বলছে সেই পাকিস্তান বনাম ভারতের বকলমে মুসলমান বনাম হিন্দুর নয়?
উগ্রপন্থী যে-সংগঠন এই হত্যালীলার দায় নিয়েছে তার সদস্যরা ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান। তাদের সমর্থন করছে পাকিস্তান। পাশাপাশি এটাও সত্যি স্থানীয় গাড়ির চালক, ঘোড়াওয়ালা বা চা-বিক্রেতারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে পর্যটকদের রক্ষা করতে চেয়েছেন বা আশ্রয় দিয়েছেন তাঁরাও ধর্মপরিচয়ে তা-ই। হত্যালীলার প্রতিবাদে কাশ্মীর উপত্যকায় মুখর হয়েছেন সাধারণ মানুষ। তাঁরা পারলেন। কিন্তু আমরা? সাম্প্রতিককালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাশ্মীরী ছাত্রদের ওপর নির্যাতন হলে মুখ খুলি? ধর্মপরিচয়ে মুসলমান বলেই সাধারণ কত মানুষকে পাকিস্তানে গিয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, তখন প্রতিবাদ করি? মুসলমান মানেই জঙ্গী বা ভারতে বাস করার যোগ্য নয়, অন্তত এই বিপজ্জনক চিন্তা বা রটনাগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় কি আসেনি?
রাজনীতির খেলা রাজনীতিকরা খেলুন। রাষ্ট্রের ভাষ্য রাষ্ট্র তৈরি করুক কূটনীতির কথা মাথায় রেখে। কিন্তু নাগরিকদেরও স্বাধীনতা থাকুক, অধিকার থাকুক, নির্ভয়ে নিজের নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুযায়ী ব্যক্তিগত ভাষ্য তৈরি করার। সংবিধানে থাকা এই অধিকার এখন প্রতিদিন আক্রান্ত আর সংকুচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রিক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য বা অন্য কোনো মতলবে বারবার সাধারণ নাগরিকদেরও রাজনীতিমেঁ পলিটিক্স-এর খেলায় জড়িয়ে নেবার, রাষ্ট্রের স্বরকেই আপামর নাগরিকের স্বর বলে চালিয়ে দেবার অপচেষ্টা বন্ধ হোক। বিপর্যয় বা দুর্ঘটনার সময় ‘সুরক্ষার স্বার্থে’ সরকারি বয়ান বা রাষ্ট্রের স্বরকেই বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে হবে নাগরিকদের, রাষ্ট্রের এই গা-জোয়ারি বন্ধ হোক। মগজে কার্ফিউ জারি বন্ধ হলে রাজনীতিমেঁ পলিটিক্সটা একটু যদি কমে।