আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৫ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
বিশ্বায়ন - কিছু প্রশ্ন কিছু সংশয়
গৌতম সরকার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফের ঘোষণায় তথাকথিত বিশ্বায়ন-এর অবলুপ্তির সিঁদুরে মেঘ দেখছেন অর্থনীতিবিদ থেকে সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনেতাগণ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার ইতিমধ্যেই বিশ্বায়নের পরিসমাপ্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই নতুন শুল্কনীতি, যেটি তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-এর ব্রহ্মাস্ত্র, যেটা নাকি আমেরিকাকে আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত করবে, গোটা বিশ্বে চূড়ান্ত বাণিজ্যিক অস্থিরতা ডেকে এনেছে। ট্রাম্পের মুহুর্মুহু শুল্কনীতির পরিবর্তনে সমস্যা বেড়ে চতুর্গুণ হচ্ছে। শুরুতে গত ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ায় তাঁর নিশানায় ছিল মূলত তিনটি দেশ - চিন, মেক্সিকো ও কানাডা। এরপর চিনের ব্যাপারে নরম না হলেও মেক্সিকো ও কানাডার উপর চাপানো ২৫ শতাংশ শুল্কে আপাত ছাড় দিয়েছিলেন। শেষের দুই দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, চিন থেকে বেআইনি ওষুধ এবং শরণার্থী মেক্সিকো ও কানাডা হয়ে চোরাপথে আমেরিকায় ঢোকে৷ কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন টুডো এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম সীমান্ত পাহারায় যথেষ্ট যত্ন নেওয়ার শর্তে ট্রাম্প আপাত নরমপন্থী নীতি গ্রহণ করেছিলেন৷ এরপর চিনের সাথে শুল্ক-প্রতিশুল্কের জমজমাট রাজনৈতিক পাশাখেলার মধ্যে গত ২রা এপ্রিল বিভিন্ন দেশের পণ্যের উপর শুল্ক ধার্যের চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। সেখানে ভারতীয় পণ্যের উপর ২৬ শতাংশ শুল্ক ধার্যের কথা শোনান। এদিকে চিনজাত পণ্যে আগের ২০ শতাংশের সাথে আরও ৩৪ শতাংশ বাড়িয়ে হয় ৫৪ শতাংশ। চিন পাল্টা শুল্ক চাপালে ট্রাম্প এক ধাক্কায় আরও ৫০ শতাংশ চাপানোয় শেষমেষ চিনের দ্রব্যের উপর শুল্কের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪ শতাংশে। অন্যদিকে ভারত সমেত অন্যান্য দেশের উপর নয়া শুল্কের প্রয়োগ আরও তিনমাস পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই 'দেখে নেওয়া' ও অনিশ্চিত শুল্কযুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা ডেকে এনে বিশ্বায়ন ও খোলা অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নাই। বিশ্বায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে তাতে যে কেউ লাভবান হবেনা, এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকাও নয়, সেটি এই উদ্ধত ও দাম্ভিক প্রবীণ রাজনীতিবিদ বুঝতে চাইছেন না। এখানে যে প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটি হল মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই শুল্ক নীতি প্রয়োগে সত্যিই কি বিশ্বায়নের বিপরীত রাস্তায় দুনিয়ার পথ চলা শুরু হল? বিষয়টি সম্যক বিবেচনার আগে বিশ্বায়ন বা উদারীকরণ নিয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণা জরুরি।
বিশ্বায়ন কী?
সহজ ভাষায় বিশ্বায়নের অর্থ এক সীমানাহীন বিশ্ব, যেখানে দেশে দেশে সমস্ত বিধিনিষেধ উঠে গিয়ে আন্তর্জাতিক বানিজ্য ক্রমশ অবাধ হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বায়ন হল এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেটি একদিকে বহুপাক্ষিক সংযোগের বৃদ্ধি ঘটায়, অন্যদিকে পারস্পরিক লেনদেন সুগম করে অর্থনৈতিক একত্রীকরণ ঘটাতে উৎসাহিত করে। আজ যাকে বিশ্বায়ন বলা হচ্ছে, সেটি আমরা ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।মার্ক্সবাদীরা ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁদের মতে বিশ্বায়নের সূত্রপাত ঘটেছে ষোড়শ শতাব্দীর ‘কমার্শিয়াল রেভোলিউশন’-এর মধ্যে দিয়ে। এই বিপ্লব আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বিনিময় এবং বাণিজ্যে এক উল্লেখযোগ্য দিকপরিবর্তন ঘটিয়েছিল এবং ব্যাঙ্কিং থেকে শুরু করে বীমা এবং সমুদ্রপোতের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক লেনদেনকে অনেক সহজ করে তুলেছিল। আধুনিককালে এম্মানুয়েল ওয়ালারস্টাইন এবং ফার্নান্ড ব্রান্ডেল-এর মতো বিশিষ্ট গবেষকরা এই তত্ত্ব সমর্থন করেছেন। আরেক দলের মতে বিশ্বায়ন বিষয়টি আরও প্রাচীন। তাঁদের মতে বিশ্বায়নের অর্থ যদি ব্যবসা বাণিজ্যের মধ্যে দিয়ে দেশে দেশে যোগাযোগ বৃদ্ধিকে বোঝায় তাহলে প্রাচীনকালে রাজরাজরাদের সপ্তডিঙা সাজিয়ে একদেশ থেকে অন্য দেশে জিনিসপত্র নিয়ে বাণিজ্য করাটা ছিল বিশ্বায়নেরই নামান্তর। আধুনিক দুনিয়ায় অবশ্যম্ভাবীভাবেই বিশ্বায়নের অর্থ ধারে ও ভারে বদলেছে, আর এই বদলানোর সবচেয়ে উল্লেখোগ্য দিকটি হল 'গতি', অর্থাৎ যে গতিতে গোটা বিশ্ব হাতের তালুর মধ্যে চলে আসছে। এককথায় এই 'গ্লোবাল ভিলেজ' অর্থাৎ 'বিশ্ব গ্রাম' শব্দবন্ধটি এই আধুনিককালে সঠিক অর্থে প্রতীয়মান হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বাড়বাড়ন্তের কারণে।
প্রাচীন মতবাদ ছেড়ে আধুনিককালের দিকে চোখ ফেরালে বিশ্বায়নের উৎপত্তিকাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালেরই ইঙ্গিত দেয়। এই যুদ্ধ শেষে আধুনিক বিশ্ব একাধারে মার্কিনী অর্থনীতির ধনতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার লাভ করে। সময়ের সঙ্গে এই দুই বিরুদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সংঘাত বাধল এবং ১৯৮০ সাল নাগাদ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমাজতন্ত্রকে পিছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে গেল। অবশেষে ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং ১৯৯১-এর ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের মধ্যে দিয়ে সমাজতন্ত্রের সলিলসমাধি ঘটল।
শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বিশ্বায়ন শব্দটির প্রয়োগ ঘটেছে গত শতাব্দীর তিরিশ দশক থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর থিওডোর লেভিট ১৯৮৩ সালে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ে, ‘দ্য গ্লোবালাইজেশন অফ মার্কেটস’ শীর্ষক প্রবন্ধে বিশ্বায়নকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, "এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেটি সামাজিক আচরণের বিবর্তন এবং তৎসহ প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়ে একই দ্রব্যকে একই সাথে বিভিন্ন দেশে বিক্রির সুবিধা করে দেয়।" সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত সংরক্ষণ নীতির অ্যাজেন্ডাগুলি হল - বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা, মানব কল্যাণে বিভিন্ন সংস্থাকে প্রতিশ্রুত অনুদান কমিয়ে দেওয়া বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া, এবং পড়শি দেশগুলির উপর যথেচ্ছ হারে করের বোঝা চাপানো। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ শরিক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কর্ণধারের এমত পালটা শুল্কনীতি তামাম বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলাই বাহুল্য। আমেরিকা যদি অবস্থান না বদলায়, বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলি বাধ্য হয়ে নিজেদের বাঁচাতে একইভাবে শুল্কের দেওয়াল তুলবে, এবং তামাম বিশ্ব আবার প্রাক-বিশ্বায়ন যুগে ফিরে যাবে। এখন প্রশ্ন হল বিশ্বায়ন ইতিহাসের গর্ভে বিলীন হলে দেশে দেশে শ্রমিকেরা তাঁদের হারানো চাকরি ফিরে পাবে তো? বহুজাতিক সংস্থাগুলো অন্যান্য দেশে ব্যবসা গুটিয়ে ভালো ছেলের মতো ঘরে ফিরে দেশের মাটিতে লগ্নি বাড়াবে? দেশে দেশে আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প গড়ে উঠবে? বিশ্বায়নের বিলুপ্তিতে বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি কমবে? প্রশ্ন অনেক, বিশ্বের অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদরা এ ব্যাপারে কী বলছেন?
অর্থনীতি শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান বলেছেন, এটি ট্রাম্পের একটি আধিপত্য প্রদর্শনের খেলা, ভ্রান্ত অর্থনৈতিক মুনাফার লক্ষ্য অর্জনের নেশায় তিনি মানুষকে হতবাক ও ভীত করে তুলে মানসিকভাবে দুমড়ে মুচড়ে দিতে চাইছেন। ট্রাম্পের এই কাজকর্মকে 'চূড়ান্ত বোকামি' আখ্যা দিয়ে ক্রুগম্যান জানিয়েছেন, এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে পড়বে।
'ক্যাপিটাল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি' বইয়ের লেখক টমাস পিকেটির মতে, ট্রাম্পিজম হল রেগানবাদের ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া। সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান ১৯৮০-র দশকে উদারীকরণের ডাক দিয়েছিলেন। এই বামপন্থী ফরাসী অর্থনীতিবিদ সেই দেশের বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা এ.এফ.পি.-কে জানান, "এখন রিপাবলিকানরা বুঝতে পারছেন অর্থনৈতিক উদারনীতি ও বিশ্বায়ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের উপকার করতে পারেনি, তাই এখন তারা অবশিষ্ট বিশ্বকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ক্ষতি পূরণ করতে চাইছে।" এরপর তিনি আরও যোগ করেছেন, "ট্রাম্পের এই ককটেল নীতি আমেরিকার কোনো উপকার করতে পারবে না, অন্যথায় মুদ্রাস্ফীতি আর আয়বৈষম্য বাড়িয়ে তুলবে এবং অবশিষ্ট বিশ্বেও তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।" এই অর্থনীতিবিদ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলিকে শক্তি ও পরিবহন, শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত বিনিয়োগ ঘটিয়ে আসন্ন বিশ্বব্যাপী মন্দার জন্য প্রস্তুত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন।
লেবাননের প্রাক্তন শিল্প ও অর্থমন্ত্রী অর্থনীতিবিদ নাসের সাইদি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক 'ভূমিকম্পসম ধাক্কা' বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, লেবানন, জর্ডন, ইজিপ্টের মত দেশগুলির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার ধাক্কা খাবে এবং বিদেশী বিনিয়োগের বাজার হারাবে। এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদ আক্ষেপ জানিয়ে বলেছেন, "এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বেরোতে অবিলম্বে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।"
অর্থনীতিবিদ ও টোগোর সাবেক মন্ত্রী কাকো নুবুকপো সতর্কবার্তা দিয়েছেন, ট্রাম্পের রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ নীতি আফ্রিকার বিশেষ করে রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত দেশগুলোর জন্যে সমূহ বিপদ ডেকে আনবে। তাঁর মতে, সংরক্ষণ নীতি হল দুর্বলের হাতিয়ার, আর আমেরিকা এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চিনের তুলনায় দিন দিন দূর্বল হয়ে পড়ছে। এটি তারই প্রতিক্রিয়া। তাঁর পরামর্শ ট্রাম্পের পাগলামির হাত থেকে রক্ষা পেতে আফ্রিকার দেশগুলিকে একজোট হয়ে নিজেদের জাতীয় ও আঞ্চলিক 'মূল্য শৃঙ্খলগুলি' আরও সুদৃঢ় করে তুলতে হবে। মূল্য শৃঙ্খল বলতে কোনও অঞ্চলের পণ্যের উৎপাদন, বিতরণ এবং বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়াকে বোঝায়। সাম্প্রতিক শুল্ক যুদ্ধ নিয়ে নুবুকপোর বিশ্লেষণ, “এটি একধরণের নব্য বাণিজ্যবাদ, যেখানে ধরে নেওয়া হয় আন্তর্জাতিক বানিজ্য একটি 'জিরো-সাম গেম' বা 'শূন্য সমষ্টির খেলা'। এই খেলায় এক পক্ষের লাভের অর্থ অন্য পক্ষের সমপরিমাণ ক্ষতি, অর্থাৎ এক পক্ষের লাভের অঙ্ক থেকে প্রতিপক্ষের ক্ষতি বাদ দিলে উত্তর দাঁড়াবে শূন্য।" নুবুকপোর মতে, এই তত্ত্ব যুদ্ধবাজ কূটনৈতিকদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে নিলে যায়, আর সেই বিশ্বাসটিই আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আমেরিকাবাসীদের মনের ভেতর গেঁথে দিতে চাইছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নয়া শুল্কনীতির প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী 'বিশ্বায়নের মৃত্যু ঘটতে চলেছে' বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে, পুরোনো ধারণাগুলোর উপর আর ভরসা রাখা যাচ্ছে না। গত ২রা এপ্রিল ট্রাম্পের ঘোষণার পর শেয়ার বাজারে ধস নামা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প যতই দেশবাসীর কাছে এটাকে অর্থনৈতিক বিপ্লবের রঙে রাঙাতে চাক, স্টার্মার বিশ্বাস করেন বাণিজ্য যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়না, ট্রাম্পের এই নীতি আমেরিকা সমেত গোটা বিশ্বের জন্য অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনবে। যদিও ব্রিটিশ দ্রব্যের উপর ধার্য শুল্ক এখনও পর্যন্ত সর্বনিম্ন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইংরেজ ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তবেই তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে রাজি হবেন। স্বাধীন ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বায়নের অন্তিম লগ্ন কি আসন্ন?
বিশ্বায়ন শব্দটির ব্যাপ্তি অনেক বেশি, আর এই শব্দের আঁকে-বাঁকে অলিতে-গলিতে এমন অনেক কিছু আছে যেগুলো অস্পষ্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন। বিশ্বায়ন মানে এটা কখনোই নয় যে পারস্পরিক সুবিধার স্বার্থে দুনিয়ার দেশগুলি একমত পোষণ করে সর্বহিতকর এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। বরঞ্চ বিশ্বায়ন বলতে উন্নত ক্ষমতাবান দেশগুলির সাথে তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাহীন দেশগুলির অসম সম্পর্কের রাসায়নিক সমীকরণকে বোঝায়। ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রদর্শন হল সাম্রাজ্যবাদের লক্ষণ। তাই ক্ষমতার দম্ভে নিষেধাজ্ঞা আরোপ যদি সাম্রাজ্যবাদের লক্ষণ হয় তাহলে অবশ্যই বিশ্বায়ন হল আন্তর্জাতিক পুঁজিপতিদের পুঁজির আস্ফালন। সেই অর্থে গ্লোবালাইজেশন বলুন কিংবা ডি-গ্লোবালাইজেশন সবটাই একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। আজ গোটা বিশ্ব ট্রাম্পের রেসিপ্রোক্যাল শুল্ক নীতির ঘোষণা শুনে চমকে উঠছে, কতগুলো দেশে কত শতাংশ হারে শুল্ক চাপলো তার হিসেব কষছে, কিন্তু বাস্তবটা হল এক-দেড় দশক আগে যখন বিশ্বায়ন পূর্ণগতিতে চলছে বলে দুনিয়াজুড়ে দাবি করা হয়েছিল তখনও নিষেধাজ্ঞা কবলিত দেশের সংখ্যা পঞ্চাশের কম ছিল না। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যে দেশগুলি বিদেশী উপনিবেশের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে স্বাধীন হয়েছিল এবং পুঁজিবাদ বিকাশের পথ বেছে নিয়েছিল, বিশ্বায়নের বৃহত্তর ছাতার নীচে তৃতীয় বিশ্বের সেই সমস্ত অ-সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি পুঁজি ও প্রযুক্তি ব্যবসার আড়ালে নিজেদের স্বাধীনতা পুনর্বার হারিয়েছে সে খোঁজ কেউ রাখে কি! আন্তর্জাতিক পুঁজি প্রবাহ তার বিরুদ্ধ স্বার্থের হস্তক্ষেপ অনুমোদন করেনা, আর ট্রাম্প সেই কাজটাই করে বসেছেন। তাই আগামীদিনে বিশ্বায়ন টিকবে নাকি ধূলিসাৎ হবে সব কিছুই ঠিক করবে পাশ্চাত্য উন্নত রাষ্ট্রগুলি, আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি তাদের দাবাখেলার বোড়ে হয়ে সাদা-কালো ঘরের মধ্যে এক্কাদোক্কা খেলবো।