আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৫ ● ১-১৫ চৈত্র, ১৪৩১
প্রবন্ধ
মেকং নদীর দেশের গল্প
মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির চতুর্থ বর্ষের কচি কচি দাড়ি গজানো ছাত্র ও শাড়ি পরা অতি স্বল্পসংখ্যক ছাত্রীদের নিয়ে প্লেসমেন্ট অফিসার যথা নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান ভবনের তিন তলায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন -
"চাকুরিদাতা যদি তোমাকে প্রশ্ন করে এই শতকে মানব সভ্যতার সবচাইতে চমকপ্রদ ঘটনা কী, তবে উত্তরে বলো না যেন 'ভিয়েতনামের যুদ্ধ'। যদিও শর ও বাঁশ নিয়ে বন্দুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিতে যাওয়া এই শতকের অন্যতম অভূতপূর্ব ঘটনা। বলতে হবে, চাঁদে মানুষের পায়ের ছাপ রেখে যাওয়াই এই শতকের শ্রেষ্ঠ ঘটনা যা মানব ইতিহাসে চিরকালীন হয়ে থাকবে।"
সে ছিল ১৯৮৪ সাল। এক দশকও হয়নি ভিয়েতনামের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কলকাতার দেওয়ালে আবছা হয়ে রয়ে গেছে সেই স্লোগান -
‘তোমার নাম আমার নাম ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম।’
অবশ্য ২০২৫-এর জমকালো হো চি মিন শহরের থেকে '৭০-এর দশকের সায়গনের দূরত্ব কয়েক আলোকবর্ষ।
বিভিন্ন বৃহৎ শক্তির দ্বারা হাজার বছর ধরে ভিয়েতনাম অবদমিত। প্রাচীন যুগে চীনা রাজবংশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামিরা শত শত সংগ্রাম করেছেন। আবার সেই সব ভিন্ন দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সংশ্লেষও হয়েছে। প্রথম সহস্রাব্দের শেষের দিকে চীনা রাজবংশের প্রভাবে শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, শিল্প এবং আইনের বিকাশ ঘটে। এই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল ‘নোম’ লিপির প্রবর্তন, যা চীনা ‘হান’ লিপির সংস্কার এবং ভিয়েতনামিকরণের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। তাই আজ আর তাদের নিজস্ব কোনো লিপি নেই, আগে ছিল চীনা ‘নোম’ লিপি, ফরাসিরা এসে তা পাল্টে চালু করেছে রোমান হরফ। সারা ভিয়েতনামে সর্বত্র দেখতে পাবেন রোমান হরফে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভিয়েতনামি ভাষায় লেখা দোকানের নাম।
আপনি পড়তে পারবেন, বুঝতে পারবেন না।
খ্রিস্টীয় ২য় শতাব্দী থেকে আজকের মধ্য এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের উপকূল জুড়ে যে অঞ্চলটি আছে তার নাম ছিল নগরচম্প বা চম্পা। আর তার লোকেদের এখনও বলা হয় চাম। এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল কম্বোডিয়ারও একটা অংশ। প্রাচীন ভারতবর্ষের সঙ্গে বানিজ্য বহু শতাব্দী ধরে এই চম্পা রাজ্যের শিল্প ও সংস্কৃতিকে রূপ দিয়েছিল। একসময়ে এই অঞ্চলে হিন্দু ধর্মের কিছু প্রভাব ছিল। আজ অবশ্য এই দেশের অধিকাংশ মানুষ হয় ধর্মহীন বা ফ্রি থিঙ্কার, বা বৌদ্ধ ও ক্যাথলিক। ক্যাথলিক ধর্মের প্রসার হয়েছে ফরাসি মিশনারিদের সংস্পর্শে এসে।
বোঝাই যায় আজকের ভিয়েতনামের সৃষ্টি ইতিহাসের বহু টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে হয়েছে।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে, মিশনারি কাজকর্ম এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে ফরাসিরা ভিয়েতনামে আধিপত্য বিস্তার করে দেশটিকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করে দেয় এবং অঞ্চলগুলিকে কম্বোডিয়া ও লাওসের সঙ্গে যুক্ত করে ফরাসি ইন্দোচীন উপনিবেশ গঠন করে। তারপরে ১৯৩০ সালে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, উপনিবেশ-বিরোধীদের নিয়ে হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েতনামের জনগণের ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ১৯৫৪ সালে ‘দিয়েন বিয়েন ফু’-তে ফরাসি সেনাদের পরাজয় - এসব আমাদের জানা ইতিহাস। সেই সময়ে উত্তর ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও পরবর্তী ২০ বছর ধরে দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বিরোধীদের বিরুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনামের নেতৃত্বে ভিয়েতনাম একত্রীকরণের লড়াই, দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দেওয়া ও সশস্ত্র বাহিনী প্রেরণ - এসবও আমরা জানি। নাপাম বোমায় বিক্ষত উলঙ্গ সেই বালিকার ছবি আমাদের স্মৃতি থেকে তো মুছবে না।
তবে পড়ে জানা আর চোখে দেখে জানার মধ্যে কিছু তফাৎ তো থেকেই যায়।
হো চি মিন শহর থেকে ঘন্টা দেড়েকের পথ ‘কু চি টানেল’। যুদ্ধের সময় ‘ভিয়েত কং’ (দক্ষিণ ভিয়েতনামের স্বাধীনতাকামী বাহিনী) সৈন্যরা এই সুড়ঙ্গগুলি গোপন স্থান হিসেবে ব্যবহার করত৷ পাশাপাশি হাসপাতাল এবং অসংখ্য উত্তর ভিয়েতনামী যোদ্ধার থাকার জায়গা হিসেবেও এই টানেল কাজ করত। অবশ্য আজকে প্যালেস্টাইনে হামাসের তৈরি করা টানেল দেখে ‘কু চি টানেল’-র চেহারা ঠিক উপলব্ধি করা যাবে না। এখানে ছিল না কোনো আধুনিক ব্যবস্থা। তবুও মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভিয়েত কংয়ের কাছে এই সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুড়ঙ্গে জীবনযাপন করা ছিল কঠিন ও কষ্টকর। ভরসা ছিল হাতের কাছে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে তৈরি অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এবং অনুকূল সময়ে শত্রুর উপরে আক্রমণে - টানেলে ছিল বুবি ট্র্যাপ, বাঁশের তৈরি ফাঁদ, বায়ু চলাচলের শ্যাফ্ট, শোয়ার জন্য ছিল দোলনা সদৃশ হ্যামক। উপরে যুদ্ধ চলছে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে আর টানেলে বিষাক্ত কেন্নো, সাপ, ইঁদুরের সঙ্গে ছিল টিকে থাকার লড়াই। বেশিরভাগ সময় সৈন্যরা সুড়ঙ্গে দিন কাটাতেন৷ কেবল রাতেই সরবরাহের জন্য, কাছের গ্রামে ফসলের যত্ন নিতে বা শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে বেরিয়ে আসতেন। মার্কিন কর্মকর্তারা ‘কু চি’-এর সুড়ঙ্গগুলি ধ্বংস করার জন্য বেশ কয়েকটি বড় সামরিক অভিযান করে। অবশ্য এই সব অভিযান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বয়ে আনেনি। যুদ্ধের সময়, ‘কু চি’ এবং তার আশেপাশের সুড়ঙ্গগুলি সাইগন-এ মার্কিন সেনাবাহিনীর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আমি অবশ্য ‘কু চি টানেল’-এ ঢোকবার চেষ্টা করেও বিশেষ সফল হলাম না। মাথা নিচু করে সামান্য পথ গিয়েই হাঁটুতে টান লাগে, দমবন্ধ হয়ে আসে। টানেল থেকে বেরিয়ে এসে ফিরে গেলাম সেই ১৯৮৪ সালে - শেষ পর্যন্ত প্যাটন ট্যাঙ্ক-এর সঙ্গে বাঁশের লড়াইয়ে বাঁশেরই জয় হল।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালের ভয়ানক দারিদ্র্য আজকের ভিয়েতনাম কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে। দারিদ্র্যের হার ৩০ বছর আগের ৬৩ শতাংশ থেকে কমে এখন ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে (দিন প্রতি ৩.৬৫ মার্কিন ডলার)। উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে স্বল্প সময়ের ভ্রমণে তীব্র দারিদ্র কোথাও দেখলাম না। রাস্তাঘাট সর্বত্র পরিষ্কার। অধিকাংশ মানুষই থাকেন ছোটো নিজস্ব বাড়িতে। বাড়ির সামনে আছে ফুলের বাগান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মূত্রত্যাগ করতে দেখিনি, সিগারেট খাবার স্থান ক্রমসংকুচিত। পুরুষের গড় আয়ুষ্কাল ৭১ বছর আর নারীদের ৭৯ বছর। ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী ভারতের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা গড়ে ৬৮।
আজকে ভিয়েতনাম শীর্ষস্থানীয় কৃষি রপ্তানিকারি দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। ২০২৩ সালে, ভিয়েতনাম ভারতের চেয়ে বেশি বিদেশী বিনিয়োগ পেয়েছে। এর একটা কারণ, ভিয়েতনামের পরিকাঠামো ভারতের চেয়ে ভালো। ভারত থেকে গিয়ে ভিয়েতনামকে অনেক বেশি আধুনিক মনে হয়। ভিয়েতনামের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক সংস্কার এবং পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ দেশের আধুনিক রূপ তৈরিতে বিরাট অবদান রেখেছে, অন্যদিকে ভারতের আঞ্চলিক বৈষম্য উন্নয়নের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
এখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠেছে। তবে নিজস্ব ভারি শিল্পোদ্যোগের খোঁজ পেলাম না, স্বনির্ভরতার জন্য যা একান্ত জরুরি। স্মর্তব্য, ভারতের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দেশে দ্রুত ভারি শিল্প গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। ভিয়েতনামের বাজারঘাটে ভারতীয় টাকা চলে। ভিয়েতনামি ডং খুবই দুর্বল মুদ্রা। হ্যানয় এবং হো চি মিন সিটির রাস্তা থেকে শুরু করে ‘হালং’ উপসাগরের পাশে শান্ত গ্রাম, প্রাচীন শহর হোই আন বা বানা পাহাড় - সর্বত্র ভারতীয় পর্যটকরা টাকার বিনিময়ে হামলে পরে কেনাকাটা করেন।
হো চি মিন শহরের ভিয়েতনাম ওয়ার মিউজিয়াম আমার কাছে ছিল অবশ্য দ্রষ্টব্য। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের নারী পুরুষ প্রায় নিঃশব্দে সেই মর্মান্তিক ও কলঙ্কজনক সময়কালের ইতিহাস ছবিতে দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। মার্কিন সেনার বন্দুকে ভিয়েতনামির মাথা গেঁথে উচ্ছাস প্রকাশের ছবি দেখে এক ভারতীয় বললেন, এরা কি মানুষ? এরা আসলে রোবোট, রাষ্ট্র নির্দেশিত পথে ভিন দেশে ভিন পরিবেশে যুদ্ধে এসে ভিয়েতনামি কৃষক-সেনাকেই তার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কে জানে, সেই শ্বেতকায় সবচাইতে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের সৈন্যটি কোনো কৃষকের সন্তান কিনা!
সকালে মাই লাই গ্রামবাসীরা জলখাবার খেতে বসেছে। গ্রামে কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়েও তিন ঘণ্টায় মার্কিন সৈন্যরা ৫০৪ জন ভিয়েতনামি নাগরিককে হত্যা করে। ড্রেনের খাদে সারিবদ্ধ করে রেখে অনেককে গুলিবিদ্ধ করা হয়। মৃত বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে ৩ বা তার কম বয়সী ৫০ জন, ৪ থেকে ৭-এর মধ্যে ৬৯ জন এবং ৭০ বা ৮০-র মধ্যে ২৭ জন ছিলেন। একজন সৈনিক পরে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলে, "আমি তাদের গলা কেটেছি, তাদের হাত কেটেছি, তাদের জিভ কেটেছি, তাদের খুঁচিয়েছি। আমি এটা করেছি কারণ অনেকেই এটা করছিল এবং আমি অনুসরণ করেছি। আমি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।" মাই লাই গ্রামের সেই পৃথিবী কাঁপানো বিভীষিকাময় সকালের ছবি দেখে মনে হল কবে শেষ হবে মানুষের এই আত্মঘাতী যুদ্ধ! অবশ্য এই ছবির পাশেই আছে আমেরিকাতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল মানুষের ছবি। গায়ে আগুন দিয়ে এক মার্কিন নারী ভিয়েতনাম জনগণের জন্য আত্মোৎসর্গ করছেন - এমন ছবিও দেখলাম।
ভিয়েতনাম ভারতকে, বিশেষকরে, কলকাতাকে মনে রেখেছে। মিউজিয়ামে দেখলাম ‘৬০-এর দশকের শেষে ভিয়েতনামের পক্ষে কলকাতার জনরোষের মিছিল। দক্ষিণ এশিয়ার এই একটি শহরের ছবি দেখে সামান্য গর্ব তো হলই। পাশেই আছে কলকাতা শহরে সেই সময়ের এক পোস্টারের ছবি। দক্ষিণ এশিয়ার এটিই একমাত্র রাজনৈতিক দলের পোস্টার। ছবিটি প্রকাশ করেছিল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসিস্ট)। গাইড বললেন, এই সময়ে সিপিআই(এম) তাদের দেশকে (ধরে নিচ্ছি ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টিকে) নিয়মিত অর্থ সাহায্য করেছে।
এই তথ্য জানতাম না। আজকের সিপিআই(এম) নিশ্চয়ই গর্বিত তাদের এই ইতিহাস নিয়ে। তবে বর্তমান নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গর্বিত হতে পারবে কিনা তা ঠিক করবে এই পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব ও কর্মীবৃন্দ।
এশিয়াতে ভিয়েতনাম আধুনিক পর্যটন শিল্পের একেবারে উপরের দিকে আছে - এটি ভিয়েতনামের অর্থনীতির একটি বড়ো উপাদান। ২০২৪ সালে ভিয়েতনাম বিশ্বে ১৫তম পর্যটন শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পর্যটন শিল্প এখানে আরও বিকশিত হবে। এই দেশের মায়াবী প্রকৃতি, সরল-শান্ত প্রকৃতির মানুষের নম্রতা, আধুনিক পর্যটন শিল্পের উপযোগী পরিকাঠামো দেশকে এগিয়ে দেবে।
ভিয়েতনামের একেবারে প্রথম দিকের পর্যটক আকর্ষক স্থান হল ‘হা লং বে’। চারিদিকে চুনাপাথরের দ্বীপ, সবুজ পান্নার মতো জল। চুনাপাথরগুলো দীর্ঘ ক্ষয়ের ফলে পিরামিড-আকৃতির মিনার তৈরি হয়েছে যা উত্তর ভিয়েতনামের এই উপসাগরটিকে তার অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছে। এখানে একটা পুরো দিন ক্রুজ করে বিভিন্ন দ্বীপ ও চুনাপাথরের গুহা দেখে কাটালাম।
আবার দক্ষিণে মেকং নদীতেও সারা দিন কাটিয়েছি তাদের লম্বা বোটে - গেছি ভাসমান গ্রামে। সেখানে আছে ইস্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কেনাকাটার দোকান। মেকং নদীতে সাম্পান করে ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ে যায় কলেজ জীবনে গাওয়া সেই গান -
"চারটি নদীর গল্প শোনো
দেখছে পৃথিবীর লক্ষ নয়ন
ভারতের গঙ্গা, চীনের ইয়াংসি
মিসিসিপি, ভিয়েতনামের মেকং।"
মধ্য ভিয়েতনামে ‘হোই আন’ এক প্রাচীন শহর। তাকে যথাসম্ভব সেই মতো রেখে দেওয়া হয়েছে। এই শহরে আছে হাজারের বেশি কাঠের বাড়ি - রয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ, খোলা বাজার, ফেরি ঘাট, প্যাগোডা এবং পারিবারিক ধর্মীয় ভবন। তবে আশ্চর্য হয়ে গেছি এখানকার ফিউশন সংস্কৃতি দেখে। পাশের থু বন নদী উৎসর্গ করা হয়েছে থু বন দেবীকে। ভুলে গেলে চলবে না, এই অঞ্চলেই ছিল প্রাচীন চম্পা নগরীর বন্দর। সেখানে পাল নামাতো ভারতীয় বণিকরা। আবার নদীর পাশেই চলছে রাতের পরিপূর্ণ জীবন। সেখানে দেশি মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা, আসে ভিনদেশি তরুণ প্রজন্ম। চলছে সারা রাতব্যাপী মজা - একটু নেশা, একটু আড্ডা।
হ্যানয় শহরে আছে হো চি মিন-এর মুসোলিয়াম। মনে হচ্ছে তিনি যেন ঘুমিয়ে আছেন। চাচার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অজান্তেই হাত মুঠো হয়ে কপালে ঠেকলো। চারপাশে তাকিয়ে দেখি আরও কিছু মানুষের হাত কপালে ঠেকেছে। মুসোলিয়ামের পাশেই আছে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হো চি মিন-এর থাকার বাড়ি। অনেকটা চট্টগ্রামের বান্দরবানে দেখা একটু উঁচুতে তোলা বাড়ির মতো। ১২ ফুট বাই ১৫ ফুটের মতো মাপের ৩টি ঘরের এক তলা পাকা বাড়ি। আছে কিছু বই ও একান্ত অপরিহার্য আসবাব। পাশে বড়ো পুকুর। পুকুরে তিনি মাছ পালতেন। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চাইতেন - পুকুরের পাড় দিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেন। পাশে এখনও ফল দিয়ে যাচ্ছে তাঁর প্রিয় আম গাছ।
হো চি মিন বেঁচে আছেন, মানুষের মধ্যে। হারিয়ে গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন।