আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৫ ● ১-১৫ চৈত্র, ১৪৩১

প্রবন্ধ

মোবাইল ও ইন্টারনেট বিপ্লবের অন্তরায়

অশোক সরকার


ভারতে মোবাইলের ব্যবহার যে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারি নীতির প্রশংসা করতেই হয়, মোবাইল যন্ত্রের দাম আর পরিষেবা দুটোই আমাদের দেশে সস্তা, ফলে বহু মানুষের হাতে আজ ফোন। কিন্তু তার পরিধি কতটা? আর মোবাইলের ব্যবহার বলতেই বা কী বোঝায়? প্রত্যেকের কাছে নিজস্ব মোবাইল আছে? স্মার্ট ফোন কত মানুষের কাছে আছে? মোবাইলে ইন্টারনেট কতজনের আছে? মহিলারা এ ব্যাপারে পুরুষদের তুলনায় কতটা পিছিয়ে?

এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে ২০২২-২৩ সালে একটা বড়ো সার্ভে হয়েছিল। করেছিল এনএসএসও - সার্ভেটার নাম ছিল 'Comprehensive Annual Modular Survey'। সার্ভেটা শুধু মোবাইল ব্যবহার নিয়ে নয়, অন্য কিছু বিষয়ও ছিল, আমরা এখানে শুধু মোবাইল ব্যবহার সংক্রান্ত যা তথ্য উঠে এসেছে তা নিয়ে কথা বলব। সার্ভে থেকে আমরা বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য পাচ্ছি, এবং বাস্তবকেও তা বুঝতে সাহায্য করছে। যেমন ভারতে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৮১টি মোবাইল কনেকশন আছে। চীনে এই সংখ্যা ১২৫ ভিয়েতনামে ১৪০, বাংলাদেশে ১০৫। অর্থাৎ চিন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশে জনসংখ্যার চেয়ে মোবাইলের সংখ্যা বেশি। তার চেয়ে বড়ো কথা মোবাইল কনেকশন ভারতে গত দু' তিন বছরে আর বাড়েনি।সংখ্যার হিসেবে ধরলে ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে ১০০ কোটির মোবাইল কনেকশন আছে। যাদের মোবাইল আছে, জিজ্ঞেস করাতে সেই ১০০ কোটির মধ্যে ৮৫ কোটি মানুষ বলেছেন তারা গত তিন মাসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছেন কিন্তু ১৫ কোটি মানুষ বলেছেন তারা ব্যবহার করে নি। এঁদের মধ্যে মহিলা, নিরক্ষর ও বৃদ্ধ মানুষই বেশি।

আয়ের ভিত্তিতে যদি মোবাইল ব্যবহারকারীদের পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয় তাহলে সবচেয়ে নিচের ভাগে যারা আছেন তাঁদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ আর ৬৭ ভাগ মহিলা মোবাইল ব্যবহার করছেন, আর সবচেয়ে উপরের ভাগে যারা আছেন তাঁদের মধ্যে ৯৭ ভাগ পুরুষ আর ৯০ ভাগ মহিলা মোবাইল ব্যবহার করছেন। তবে চমকপ্রদ তথ্য হল মহিলাদের মধ্যে মাত্র ২৭ ভাগের কনেকশন একেবারেই নিজস্ব, ৫২ ভাগের কনেকশন একাধিক মানুষের ব্যবহারের জন্য, আর ২৭ ভাগ মহিলা মোবাইল ব্যবহারই করেন না। তুলনায় পুরুষদের বেলায় ৪৮ ভাগের কনেকশন একেবারেই নিজস্ব, ৪৪ ভাগ একাধিক মানুষের ব্যবহারের জন্য, আর মাত্র ৯ ভাগ পুরুষ মোবাইল ব্যবহার করেন না।

ইন্টারনেটের বেলাতেও অবস্থা বদলেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে ৯০ কোটি মোবাইল ব্রডব্যান্ড কনেকশন যোগ হয়েছে ভারতে, এটা কম কথা নয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ৩ কোটি কেবল ইন্টারনেট। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যাছে ৫৭.৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন যে তাঁরা গত তিন মাসে ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। চীনে এই সংখ্যা ৭৭ শতাংশ৷ বাংলাদেশ অবশ্য আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে - ৪৪ শতাংশ। এখানেও পুরুষ নারীর মধ্যে, আর শিক্ষার ক্ষেত্রে ফারাক দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমন নিরক্ষরদের মধ্যে মাত্র ১৩ ভাগ পুরুষ আর ৯ ভাগ নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন, প্রাথমিক শিক্ষা আছে এমন পুরুষদের মধ্যে ৪৬ ভাগ আর মেয়েদের ৩৬ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন, কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত যারা পড়েছেন তাদের মধ্যে ৭৯ ভাগ পুরুষ ও ৭৪ ভাগ মহিলারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে যে মহিলাদের মধ্যে মাত্র ৪৯ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, পুরুষদের মধ্যে সেই সংখ্যা ৬৫ ভাগ।

কিন্তু গ্রামে আর শহরে কিছু বিষয়ে বেশ ফারাক দেখা যাচ্ছে; তবে সব বিষয়ে নয়। যেমন ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে গ্রামে ও শহরে মোবাইল বা মোবাইল ব্রডব্যান্ড ব্যবহারে ২-৩ ভাগের ফারাক কিন্তু তার উপরের বয়সীদের মধ্যে ফারাকটা মোবাইলের ক্ষেত্রে প্রায় ১৩ শতাংশ আর ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ শতাংশ। একইভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ব্যাঙ্কিং করা, মেসেজ পাঠানো, ই-মেল পাঠানোতেও গ্রামে আর শহরের মধ্যে বিস্তর ফারাক হচ্ছে। ওই একই সার্ভেতে একটা তথ্য বোধহয় সবচেয়ে চমকপ্রদ - মাত্র ৪ ভাগ গ্রামীণ পরিবারে আর ২১ ভাগ শহুরে পরিবারে কম্পিউটার আছে (ল্যাপটপ বা ডেক্সটপ বা প্যাড), যদিও মোবাইল ফোন আছে গ্রামে ৯৪ ভাগ আর শহরে ৯৭ ভাগ পরিবারে। আগেই বলেছি ৮১ ভাগ ব্যক্তির মোবাইল আছে, কিন্তু যেহেতু অনেক পরিবারেই মোবাইলটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং পারিবারিক সম্পত্তি, তাই পরিবার হিসেবে ধরলে সংখ্যাটা বেশি দেখায়।

এইসব তথ্য কী ধরনের বাস্তবকে তুলে ধরে? সেই আলোচনা ওই সার্ভেতে নেই, তবে কয়েকটা কথা তো বলাই যায়।

• প্রথমত বলতে হয় ব্যক্তিপ্রতি মোবাইল কনেকশন প্রায় চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে বলে মনে হচ্ছে। যেখানে অনেক দেশেই জনসংখ্যার চেয়ে মোবাইল কনেকশন বেশি, সেখানে ভারতে প্রতি ১০০ জনে ৮১-৮২টি মোবাইল কনেকশনে আটকে যাওয়াটা চিন্তার বিষয়। আটকে যাওয়ার দুটি কারণ হতে পারে - শিক্ষার অভাব বা আর্থিক অভাব। শিক্ষার অভাবটা বোধহয় বয়স্কদের জন্য প্রযোজ্য, আর্থিক অভাবটা বয়স বা লিঙ্গ নির্বিশেষে হয়।

• দ্বিতীয়ত, আর্থিক অভাবের জন্যই পরিবারে একটা মোবাইল, শেয়ার করা হয় এমন মোবাইলের সংখ্যা মহিলাদের ক্ষেত্রে ৫২ ভাগ পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪৪ ভাগ।

• তৃতীয়ত, মেয়েরা মোবাইল কনেকশন আর ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে। এবং এ ব্যাপারে বয়সও একটা বড়ো কারণ। সব বয়সের পুরুষ ও মেয়েদের মধ্যেই এই তফাত দেখা যাচ্ছে বিশেষত ৩০ বছরের বেশি মহিলাদের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় তফাতটা সবচেয়ে বেশি। কিশোর বা যুবা বয়সে বাড়ির শাসনে মেয়েরা নিজস্ব মোবাইল পায় না, আর বিবাহিত জীবনে যেহেতু মেয়েরা বেশিরভাগই পারিবারিক চাষবাস বা ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাই তাঁরা মোবাইল শেয়ার করতে বাধ্য হন, নিজস্ব মোবাইল পান না।

• চতুর্থত মোবাইল বিশেষত স্মার্ট ফোনের বিস্তৃত ব্যবহার মানুষের জীবনকে স্পর্শ করেছে৷ সেখানেও দেখা যাচ্ছে কিশোর বা যুবা বয়সীদের তুলনায় বয়স্ক ব্যক্তিরা অনেক পিছিয়ে। ই-মেল করা, এসএমএস করা, ব্যাঙ্কিং করা, বিভিন্ন সাইট খুলে কিছু খোঁজা - এই সব প্রায় দৈনন্দিন কাজের বেলায় কিশোর যুবাদের মধ্যে যেখানে ৭০-৭২ ভাগ এই সব কাজ করতে পারছে সেখানে ৩০ বছরের উপরের মানুষের ক্ষেত্রে তা ৫০ ভাগ মানুষও পারছে না। এখানেও মহিলারা পুরুষদের থেকে পিছিয়ে। এটা অবশ্য একই সঙ্গে প্রয়োজন ও শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। এসএমএস পাঠানো হয়ত সবার প্রয়োজন হয়, কিন্তু মোবাইল ব্যবহার করে ই-মেল করা বা ব্যাঙ্কিং করা সবার প্রয়োজন নাও হতে পারে। শিক্ষার দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার খুবই পরিচিত দু’জনের কথা বলি। তাঁদের স্মার্ট ফোন আছে, তাঁরা দুটি জিনিস পারেন, ফোন করতে আর ইউটিউব খুলে খবর বা গান শুনতে। কিন্তু গুগল ম্যাপ দেখতে পারেন না। ইউপিআই দিয়ে পেমেন্ট করতে বা টাকা নিতে পারেন না। এসএমএসও করতে পারেন না, কারণ কি-বোর্ড দেখে টাইপ করতে পারেন না। দুজনের একজন চার ক্লাস পর্যন্ত আরেকজন পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছেন।এঁদের একজনের স্ত্রী নয় ক্লাস পর্যন্ত পড়েছেন, তিনি মোবাইলে প্রায় সবকিছু পারেন।

শেষ কথা বলার আগে সার্ভে নিয়ে দুটি মন্তব্য করা দরকার। প্রথমত তথ্য সংগ্রহ হয়েছে কিন্তু রিপোর্টে নেই কত মানুষের হাতে সাধারণ ফোন আর কতজনের আছে স্মার্ট ফোন। দ্বিতীয়ত কতজনের প্রিপেড আর কতজনের পোস্টপেড কনেকশন এই তথ্য সংগৃহীত হয়নি। হওয়া দরকার ছিল।

মোট কথা অশিক্ষা, গরিবী, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ইত্যাদি সামাজিক উন্নয়নের পরিচিত অন্তরায়গুলি মোবাইল ও ইন্টারনেট বিপ্লবকেও আমাদের দেশে ঠেকিয়ে রাখছে এবং দুধের সাধ ঘোলে মিটিয়েই খুশি থাকতে হচ্ছে আমাদের। পরিত্রাণের রাস্তা খুব সোজা - স্কুলশিক্ষায় আরও অনেক বেশি নজর দরকার, আর মেয়েদের নিজস্ব রোজগার ও কাজ পাওয়া দরকার।