আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৫ ● ১-১৫ চৈত্র, ১৪৩১
প্রবন্ধ
বাংলাদেশ - দেখা না-দেখায় মেশা বাস্তবতা
শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। এই কথাটা এখন জুলাইপন্থীদের অনেকেই মানেন। এই ভয়াবহতা আসলে ঠিক কী ধরনের এ নিয়ে ভারতে বিভ্রান্তি আছে। সম্ভবত এখানে সরকার বা তাদের পোঁ-ধরা সংবাদ মাধ্যম সচেতনভাবে এই বিভ্রান্তি ছড়ায়। বাংলাদেশের প্রাক্তন শাসকদের পক্ষের একটি অংশেরও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে ভারত-প্রিয় আখ্যানে পরিবেশন করার একটা প্রবণতা রয়েছে। আসলে বাংলাদেশে যা ঘটছে ক্ষিপ্রগতিতে, তা ভারতেও ঘটছে। কোথাও ধীরে সন্তর্পণে, কোথাও উচ্চকিতস্বরে দ্রুততার সাথে। রঙটা আলাদা, বিষয়টা এক। সেটার একদিক বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কিত, আরেকটি ঘরোয়া রাজনীতির বিষয়। দু’টি দেশেই মার্কিন শিবিরভুক্ত সংখ্যাগুরুবাদী ধর্মান্ধ চরম ডানপন্থী শক্তির উত্থান সুনিশ্চিত হচ্ছে। আমাদের মধ্যে যাদের বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই, তাদের অধিকাংশ ভারতে ঘটে চলা পরিবর্তন নিয়ে উদাসীন। কেউ কেউ হয়ত পরিবর্তনটা চানও।
বাংলাদেশে যা ঘটছে তা কি অপ্রত্যাশিত ছিল? ভারত ও বাংলাদেশের বামপন্থীদের একাংশ যারা বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সোৎসাহী সমর্থক বা অংশগ্রহণকারী ছিলেন, তারা দৃশ্যত এক বিমর্ষতার ভান করে বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থান এখন বেহাত হয়ে গেছে। যেন এই আন্দোলন কখনও তাদের হাতে ছিল। এটা ভান ছাড়া কিছুই নয়। কারণ তারাও জানেন, জুলাই আন্দোলনের চালিকাশক্তি তারা নিজেরা কোনো পর্যায়েই ছিলেন না। তারা ছিলেন আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে মূল চালিকাশক্তিগুলির সাথে প্রতিটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ করা’ সঙ্গী। দৃশ্যমানতার বাইরে অন্তরালে থাকা যে শক্তির নেতৃত্বে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, তার পরিণতি যে মার্কিনঘনিষ্ঠ সংখ্যাগুরু মৌলবাদের শক্তির সরকারে আসীন হয়েই হবে, এটা পূর্বানুমান না করতে পারাটা, রাজনৈতিক অজ্ঞতা। কারো ক্ষেত্রে হয়ত একটা ভান। হয়ত তারাও এই পরিণতির সাথে সহমত ছিলেন। এটা বিস্ময়কর নয়, সারা বিশ্বজুড়েই বামপন্থীদের একটি অংশ উত্তর আধুনিকতাবাদ ও উত্তর মার্কসবাদে মোহিত হয়ে চরম ডানপন্থার বন্ধু হয়ে গেছে। কেউ ভাবগতভাবে, কেউ প্রত্যক্ষ সহযোগী হয়ে।
প্রকৃতপক্ষে জুলাই আন্দোলনের ছিল দু’টি দিক। একটি সংগঠিত, আরেকটি স্বতঃস্ফূর্ত। শুরু থেকে ১৫ জুলাই অবধি এবং ৫ আগস্টের দুপুরের পর থেকে এই দু’টি পর্বে এই আন্দোলনের নামে যা যা হয়েছে তার সবটাই মুহাম্মদ ইউনূস কথিত ‘মেটিকিউলাস ডিজাইন’। কোটা বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিবেকহীন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা মন্তব্য এবং ছাত্রলীগ ও সরকারি বাহিনীর নিষ্ঠুর দমনপীড়ন ও নির্বিচার হত্যার প্রতিক্রিয়ায় সারা দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। বহু আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যরাও এই পর্বে পথে নেমে আসেন। মানুষের পথে নেমে আসা যত ব্যাপক হয়েছে, সরকারের দমনপীড়ন ও হত্যালীলার মাত্রা হয়েছে আরো নিষ্ঠুরতর ও বেপরোয়া। কেউ কেউ বলেন, সব হত্যা ছাত্রলীগ বা পুলিশের গুলিতে হয়নি। জনরোষকে দ্বিগুণ করতে ভেতর থেকেও ছাত্র ও সাধারণ নাগরিকদের হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, সরকার যে এতটা নিষ্ঠুর দমন পীড়নের পথে গেল তাতে সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সরকার-বিরোধী শক্তির ঘুমন্ত সেলের ভূমিকা রয়েছে। এই ধারণাগুলি সত্য কিনা ভবিষ্যতে অবশ্যই তা উদঘাটিত হবে। তবে এই মুহূর্তের পর্যবেক্ষণে বলা যায় নিষ্ঠুর দমন পীড়ন ও নির্বিচার হত্যার এই পর্বে এই আন্দোলন একটি স্বতঃস্ফূর্ত চেহারা ধারণ করে।
৫ আগস্ট হাসিনার পতনের পর আবার ‘মেটিকিউলাস ডিজাইন’-এর পুনরাবির্ভাব ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকারীদের মোহভঙ্গের শুরু। অনেকেই বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের মুহূর্তটি একটি অর্থবহ পর্বান্তরকে সূচিত করে। আমার মতে সেটা নয়। পর্বান্তর অর্থবহ হয়ে মূর্ত হয়েছে সেদিন বিকেল ৩টায় সেনাপ্রধান ওয়াকারুজ্জমানের সাংবাদিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতার দ্বিতীয় বাক্যে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের কথা সরকারিভাবে জানিয়ে দেওয়ার পরই দ্বিতীয় বাক্যে জেনারেল ওয়াকার বলেন, পরবর্তী ব্যবস্থাবলী কী হবে সে সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর আমীর সহ আরও নানা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর বিগত ৫৩ বছরে আর কোনও সেনাপ্রধান জনসমক্ষে দেওয়া ভাষণে জামায়াতে ইসলামী ও তার প্রধানের উল্লেখ এতটা সম্মান ও মর্যাদার সাথে কখনও করেনি। নতুন যুগের সূচনা ওই মুহূর্তেই। ওই বক্তৃতাতেই বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যাবর্তন এবং শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে কার্যত নিষিদ্ধ করার দিকে পদক্ষেপ। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অন্তর্জলি যাত্রারও শুরু তখনই।
আবার প্রশ্নটিতে ফিরি এসব কি অপ্রত্যাশিত ছিল? জুলাই বিরোধীরা সোৎসাহে লাফিয়ে বলবেন, এসব ঘটবে আমরা জানতাম। এবার আসব ওই প্রশ্নেরই আরেকটু গভীরে। জুলাই আন্দোলনের মত একটি গণবিস্ফোরন কি অবশ্যম্ভাবী ছিল না বাংলাদেশে? বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে এই মুহূর্তে প্রধানত দু’টি মত এবং দু’টিই চরম বিপরীত। একদল মনে করে, সব ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও আগেই ভালো ছিল। আরেকদলের মত, যতই ত্রুটিবিচ্যুতি থাক এখনকার সময়ই ভালো। বাংলাদেশের রাজনীতির বিগত সময়কে যারা গভীরভাবে অনুসরণ করেছেন তারা প্রতেকেই জানেন যে বাংলাদেশ ক্রমাগত অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছিল বিগত ১৫ বছরে। একদিকে সীমাহীন দুর্নীতি, একের পর এক প্রহসনের নির্বাচন, সম্পদ পাচার, গুমখুন, অপহরণ, বেকারত্ব, অন্যদিকে গ্রামে মফস্বলে মৌলবাদী শক্তির প্রবল উত্থান, ওয়াজ মহফিলের নামে নারী বিরোধী, অপর ধর্মবিরোধী, আধুনিকতা, যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী প্রচারের প্লাবন গ্রামাঞ্চলে ও সামাজিক মাধ্যমে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের অভ্যন্তরে ধর্মান্ধতার ব্যাপক বিস্তার, জামায়াতে ইসলামী এবং তার চেয়েও বেশি উগ্র জঙ্গীবাদীদের তৎপরতা, মৌলবাদের সাথে সরকারের একের পর এক আপোষ, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক বিরোধিতার সম্পূর্ণ সংকোচন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক বিরোধী রাজনীতির পরিসর নির্মূল করে দেওয়া - এ সবের ফলে একটি গণবিস্ফোরণ হওয়াটা অপ্রত্যাশিত বা অনভিপ্রেতও ছিল না। আবার জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া এই ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে দেশী বিদেশী শক্তির পক্ষে সামরিক অভ্যুত্থান বা কালার রিভলিউশন চাগিয়ে দেওয়াটাও অসম্ভব নয় এমন বাস্তবতায়। এই পরিস্থিতির জন্যে প্রকৃতপক্ষে অন্য কেউ নয়, একমাত্র শেখ হাসিনার আওয়ামী শাসনই দায়ী। আওয়ামী লীগ দলেও নেতৃত্ব থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মানুষদের সরিয়ে দিয়ে সন্দেহজনক পরিচয়ের ধান্দাবাজ ব্যবসায়ী, ধর্মান্ধ ও দুর্নীতিবাজদের নিয়ে আসা হয়েছিল। সরকারি নিয়োগ কমিশনের অধ্যক্ষের গাড়িচালকের দু’হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পলায়নের খবরের প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন যে, তাঁকে কেউ একজন বলেছে তাঁর পিয়নও নাকি কয়েকশ কোটি টাকার মালিক এবং হেলিকপ্টার ছাড়া চলাফেরা করে না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অবনমন ও অবক্ষয়ের জন্যেও শুধুমাত্র জিয়ার সামরিক শাসন বা বিএনপি বা এরশাদের শাসনকে দায়ী করাও অর্ধসত্য। বঙ্গবন্ধুর সময়ে রক্ষী বাহিনীর অত্যাচার থেকে একদলীয় বাকশালী শাসন প্রতিষ্ঠা দিয়ে শুরু করে শেখ হাসিনার সময়ে পাঠ্যপুস্তকের সংশোধন থেকে খারিজী মাদ্রাসার রক্ষণশীল পাঠক্রমের স্বীকৃতি, মডেল মসজিদ প্রতিষ্ঠা সহ হেফাজতকে ঢালাও সুযোগ-সুবিধা প্রদান এসবের ভূমিকা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দলীয়করণ এবং সব সমালোচনা ও বিরোধিতাকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা হিসেবে আখ্যায়িত করার অগণতন্ত্রকে তরুণ প্রজন্ম মেনে নিতে পারেনি। ফলে বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের শাসনের নিরিখে বাংলাদেশের এই রূপান্তর মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। অবাধ নির্বাচন হলে হয়ত আওয়ামী লীগ হারতো, তবে আবার নিজেকে সংশোধন করে নির্বাচনের মাধ্যমেই ফিরে আসার সুযোগ পেত, যেমনটা ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যাবর্তন হয়েছিল ১৯৮০ সালে। যদিও ভুল অনুমানে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচন ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু তাতে শাপে বর হয়েছিল। ইন্দিরার প্রত্যাবর্তন হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র বেঁচে গিয়েছিল ভারতে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যা চলছে, শুধুমাত্র তার জেরেই শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ঘটবে এমনটা যারা ভাবেন তারা অপরিণত রাজনৈতিক বুদ্ধির। বর্তমান সরকারের ব্যর্থতায় তৈরি অরাজক অবস্থার ফলাফলে বরং বাংলাদেশ আরও বেশি কট্টরশক্তির খপ্পরে চলে যেতে পারে। অভিজ্ঞতা বলে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে বিজয়ের পর তৃতীয় বিশ্বের যে দেশেই জয়ী জাতীয়তাবাদী শক্তি স্বৈরাচারের পথ নিয়েছে সেখানেই শেষ পর্যন্ত চরম ডানপন্থার অভিষেক ঘটেছে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা শব্দকে ঘিরে বিতর্ক তোলা হচ্ছে। কিছু কিছু বিতর্ক কাম্য, আবার কিছু কিছু বিতর্ক শুনলেই বোঝা যায় এর উদ্দেশ্য ও বিধেয় একেবারেই সম্পর্কহীন। নজর ঘোরানোর অভিপ্রায় মাত্র। জুলাই আন্দোলনের সময় প্রথমে দাবি ছিল কোটার বিলোপ, তারপর আরেকটু বড়ো করে বিষয়টা হল বৈষম্যের বিলোপ হিসেবে, সবশেষে এল ‘দফা এক দাবি এক, হাসিনার পদত্যাগ’। এই গোটা পর্বে কেউই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, শেখ মুজিব নিয়ে, সংবিধান নিয়ে, সাতচল্লিশ নিয়ে, শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে, নারীর পরিধেয় বা চলাফেরা নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। শ্লোগানে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করেই তারা আন্দোলন করেছে।
৫ আগস্টের পর থেকেই নতুন কথা শোনা শুরু হল। জুলাই আন্দোলন চলাকালীন এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে সমালোচনা ছিল যে এর পেছনে জামায়াতে এবং অন্যান্য জঙ্গী গোষ্ঠীর ভূমিকা আছে। আন্দোলনকারীরা আগাগোড়াই দাবি করেছে যে এর সাথে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। এই আন্দোলন মূলত ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে এবং এর নেতৃত্বও গড়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রক্রিয়ায়। বিএনপি ও বামপন্থীদের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন একে সমর্থন জানালেও নেতৃত্বে এরা কেউই নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে রাষ্ট্রপতি বাইডেনের সামনে প্রথম হাঁড়িটি ফাটালেন মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই। বললেন, আন্দোলনটি একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো হয়েছে। মঞ্চেই তিনি মাহফুজ আলমকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, এই হচ্ছে আসল ‘মাস্টার মাইন্ড’।
৫ আগস্টের পর মেঘনা পদ্মা যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। এখন জুলাই আন্দোলনে যে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন প্রত্যক্ষ ভূমিকায় ছিল এবং তাদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই যে তারা নিরাপদ আশ্রয় থেকে শুরু করে সরকারি দমনপীড়ন ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পরিস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে সমর্থ হয়েছিল, এটা স্বীকার করছে। এমন একটি আন্দোলনে জামায়াতেকে নেওয়া কেন দোষের হবে - এই বলে নতুন তর্ক হাজির করে, তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা ছিল তার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ঘোষিত বামপন্থীদের একাংশও মনে করে জামায়াতের বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে এবং একাত্তরে তাদের ভূমিকার কথা মনে রেখে অবস্থান নেওয়াটি এখন অর্থহীন। ইতিমধ্যে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা নতুন দল তৈরি করেছে। নির্বাচন সামনে। তারা বলেছে তাদের দল বাম নয়, ডানও নয়, মধ্যপন্থী। দল তৈরিতে তাদের আদর্শ হচ্ছে তুরস্কের এরদোয়ান, পাকিস্তানের ইমরান খান এবং ভারতের কেজরিওয়াল। এই তিনটি নামের নির্বাচন যে আকস্মিক নয়, বরং সুচিন্তিত সেটা পরে দেখব।
সাতচল্লিশ ও একাত্তর নিয়ে কয়েকটি কথা না বললে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বিতর্কগুলি তোলার চেষ্টা চলছে তাকে বোঝা যাবে না। সাতচল্লিশে মুসলিম লিগের দ্বিজাতি তত্ত্ব অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়েই দেশভাগ ও উপমহাদেশের ব্রিটিশ শাসনের অবসান।মুসলিম লিগের এই ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বয়ানের উল্টোদিকে যে অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়েছিল, সেখানেও ধর্মের ছোঁয়া ছিল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের যে অংশটি হিন্দু পুনরুত্থানবাদে বিশ্বাস করত তাদের মধ্য থেকেই ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের প্রস্তাব জিন্নার দাবি উত্থাপনের অন্তত কয়েক দশক আগেই একাধিকবার উত্থাপিত হয়েছে।
বিপরীতে হিন্দু মুসলিম সমন্বয়ের আদর্শকে ভিত্তি করে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের যে বয়ানটি জওহরলাল ও মৌলানা আজাদেরা তুলে ধরেছিলেন, সেখানেও সমস্যা ছিল। তাঁদের ধারণায় ভারতবর্ষ ছিল এক অখণ্ড ভারতীয় জাতির দেশ। প্রকৃতপক্ষে তখনকার অখণ্ড ভারত এবং বর্তমান সময়ের তার বিভাজিত প্রতিটি ভূখণ্ডই বহুভাষিক, ফলে বহুজাতিক। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হতেই দ্বিখণ্ডিত দু’টি দেশের সংবিধান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে যে বিতর্ক দেখা দেয় তা ছিল একজাতিত্ব বনাম বহুজাতিত্বের লড়াই। পাকিস্তানে এই লড়াইয়ে একইসাথে নিহিত ছিল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের লড়াইও।
পাকিস্তানী আমলে পূর্ব বাংলায় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ অবধি যে আদর্শকে সামনে রেখে সংগ্রাম বিকশিত হয় তার মর্মবস্তু ছিল অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্ব। এতে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার প্রত্যাখান ছিল, কিন্তু বহুজাতিত্বের প্রতিষ্ঠা ছিল না। এর প্রতিফলন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ উত্তর বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলিকে বাঙালি হয়ে যেতে শেখ মুজিবের পরামর্শ দানের মধ্যে। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান গৃহীত হয় তার ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সেখানে বাংলাদেশের সমাজকে অসাম্প্রদায়িক এবং রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মত ধর্মহীনতার আদর্শ নয়, তা মূলত সকল ধর্মের সমতার অঙ্গীকার। সমাজের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে অসাম্প্রদায়িক আদর্শের কথা বলাটা অর্থবহ। সেখানে ধর্মহীনতার বার্তা নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মধ্যে আরও একটি শক্তি ছিল যারা পাকিস্তানের রাজনৈতিক অধীনতা থেকে মুক্তি চাইলেও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের পাকিস্তানী আদর্শ থেকে মুক্তি চায়নি। একদিকে একদলীয় বাকশালী ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা অন্যদিকে দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি এবং অরাজকতার ফলে মানুষের মধ্যে জন্ম নেওয়া ক্ষোভকে ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীলনকশায় সেনা অভ্যুত্থানে সপরিবারে শেখ মুজিবের হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী আদর্শে বিশ্বাসী এই শক্তিই ক্ষমতায় আসে। শপথ গ্রহণ করেই বাংলাদেশের সরকারি শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ এবং বেতারের নাম ‘বাংলাদেশ বেতার’ পরিবর্তিত করে পাকিস্তানের ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ও ‘রেডিও পাকিস্তান’-এর আদলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ও ‘রেডিও বাংলাদেশ’ করা হয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ এর সময়পর্বে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ (পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে) যুক্ত করে অসাম্প্রদায়িক ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ থেকে আবার ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা হয়।
১৯৯৬ সাল থেকে মাঝের একটি পর্ব ছাড়া ২০২৪ অবধি টানা আওয়ামী লীগের শাসনে সংবিধান সংশোধন করে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের চিহ্ন মোছা হয়নি, বরং পদে পদে মৌলবাদী শক্তির সাথে সমঝোতা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি বা আওয়ামী শাসন পর্বের রাজনীতি, কোনোটিই বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতির বাইরে অবস্থান করছে না। ন'য়ের দশক থেকে শুরু হওয়া নয়া উদারবাদী রাজনীতির সময়পর্বে সারা পৃথিবী জুড়েই লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রতিনিধিত্বকারী ডানপন্থী দলগুলি নিজেদের উদারনৈতিক রাজনীতি বিসর্জন দিয়ে চরম ডানপন্থার নীতির সাথে যে সমঝোতা করে তার সুবাদেই দেশে দেশে চরম ডানপন্থার উত্থান। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে চরম ডানপন্থার দায়ও আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে নানা ধারার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ইসলামী দলগুলি। ছাত্রদের তৈরি নতুন দল যে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ভারতের যে তিনটি দলকে আদর্শ মান্য করছে তাদের সকলেরই তথাকথিত মধ্যপন্থার আড়ালে রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। এরদোয়ান যেভাবে ন্যায়বিচারের নামে শতাব্দী প্রাচীন কামাল আতার্তুকের ধর্মনিরপেক্ষতার বিলুপ্তি ঘটানোয় উদ্যোগী, ঠিক তেমনি ছাত্রদের রাজনৈতিক দলও সেকেন্ড রিপাবলিকের প্রশ্ন তুলে বাহাত্তরের সংবিধানের বাঙালি জাতীয়তাবাদের বদলের বহুত্বের আদর্শ নিয়ে আসার নামে আসলে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পাকিস্তানী আদর্শে প্রত্যাবর্তন চাইছে। এদের কাছে মুজিববাদ বিসর্জন মানে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের প্রত্যাখান। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্তি মানে রবীন্দ্রনাথ, বসন্ত উৎসব, নববর্ষ বিসর্জন।
একটি বিষয় জরুরি নজর দাবি করে। বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশের প্রতিটি দেশেই ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশেও এই প্রশ্ন থাকলেও এখানে একটি বাড়তি রাজনৈতিক মাত্রা আছে। মোদীর ভারত সরকারের তার প্রিয় শিল্পপতির স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যে হস্তক্ষেপ করে তার বিরোধিতা একটি ন্যায়সঙ্গত বিদ্রোহ। কিন্তু বাংলাদেশে এই বিদ্রোহকে সর্বাত্মক ভারত বিরোধিতার রাজনীতির রূপ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলিকেও আক্রমণ করা হয়, যা আসলে মৌলবাদের কর্মসূচি। একইভাবে মৌলবাদীরা পশ্চিমী সংস্কৃতি পরিত্যাগ করার অছিলায় নারীর স্বাধীনতা হরণ করতে চায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আওয়ামী লীগের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই, কোনো ধরনের ভূমিকা রাখারও অবকাশ নেই। কবে সে অবকাশ মিলবে বা আদৌ মিলবে কিনা সবটাই অনিশ্চয়তার গর্ভে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আস্থাশীল বিএনপি প্রবলভাবে দৃশ্যমানতা ব্যক্ত করলেও তাদের রাজনীতিও লিবারেল ডেমোক্রেসি ও চরম ডানপন্থার এক অদ্ভুত মিশেল। জামায়াতে, হেফাজত, হিজবুত সহ সমস্ত ইসলামী দল ও সংগঠন অবাধে নানা মাত্রার মৌলবাদী কার্যকলাপে সক্রিয়। ছাত্রদের তৈরি রাজনৈতিক দলটিও শেষ পর্যন্ত একটি ইসলামপন্থী দল। এই সব ইসলামী দল আবার ইসলামের মাজারকেন্দ্রিক সুফিবাদকে ধর্মনিরপেক্ষতা বা বামপন্থার মতই ঘৃণা করে। যদিও ভাসানী, আবুল হাসেম, রবুবিয়ত, পালনবাদ ইত্যাদির ঘনঘন উচ্চারণে ধর্মীয় রাজনীতিতে একটি সমাজতন্ত্রের আদর্শের ছোঁয়া দেওয়ার ভ্রম। শাপলা - শাহবাগ বাইনারি ভাঙার নামে প্রকৃতপক্ষে এক ভুয়ো বয়ান তৈরি করে চরম ডানপন্থী ধর্মীয় রাজনীতির সাথে লিবারেল ডেমোক্রেসির করমর্দন ঘটানোর চেষ্টা চলছে। শাহবাগ আন্দোলন হয়েছিল দু’টি দাবিকে ঘিরে। এক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অবসান। এই আন্দোলনে ধর্ম বর্জনের বা ধর্মগুরুদের অবমাননার ডাক কেউ দেয়নি। উল্টোদিকে, শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ হয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রশ্রয়ে জামায়াতের বাইরে বিকল্প ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে সামনে এনে এক ঢিলে জামায়াতে ও শাহবাগ আন্দোলনকে পরাভূত করতে। শাপলা চত্বরের সমাবেশে ছিল চরম ডানপন্থার আস্ফালন। শাহবাগকে নাস্তিকতা ও শাপলাকে ধর্মীয় স্বাধীনতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রত্যাবর্তনের একটি কৌশল। ইউরোপে যেমন একশ্রেণির বামপন্থীরা মতাদর্শ ও কার্যক্রম দু’দিক থেকেই চরম ডানপন্থার সঙ্গী হয়েছে, বাংলাদেশের চিত্রও একই। এখানেও বামপন্থীদের একটি অংশ ধর্মীয় রাজনীতির সাথে বামপন্থাকে মেশাতে চায়। কিংস পার্টির নেতাদের শাহবাগ বিরোধিতা যে আসলে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের বিরোধিতা সেটা বুঝতে এরা অক্ষম। পোস্ট মডার্নিজম ও পোস্ট মার্ক্সিজমের মিশেলে তৈরি এদের বামপন্থায় ধর্ম এখন আর ‘নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস’ নয়, বিপ্লবের হাতিয়ার।
বামপন্থী রাজনীতির অন্য যে ধারা তারাও বিভক্ত। ওয়ার্কার্স পার্টি সহ বামপন্থীদের একটি অংশ হাসিনা সরকারের জোটের সঙ্গী হয়ে এখন আওয়ামী লীগের মতই রাজনীতির ত্যজ্যপুত্র। হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, স্বৈরাচার, দমনপীড়নের দায় এদেরকেও বহন করতে হচ্ছে। সিপিবির নেতৃত্বে অন্য অংশটি বিগত ও বর্তমান দু’টি শাসকপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েও নিজেদের স্বাধীন পরিসর তৈরি করা থেকে অনেক দূরে বিরাজ করছে। সিপিবি জুলাই অভ্যুত্থানের প্রশ্নে নিজেদের মধ্যেই দু’ভাগে বিভক্ত। তাদের ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভাজন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের বিকাশে বামপন্থার দলীয় রাজনীতির বাইরে সাংস্কৃতিক বামপন্থার একটি বড়ো ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে ভারতে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ ও তাদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশে নতুন জমানায় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণের ঘটনা বিরাট আকারে বৃদ্ধি পায়নি যেমনটা ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। সবচেয়ে বেশি আক্রমণের মুখে রয়েছে বিগত ৭৮ বছরে নির্মিত হওয়া বাংলাদেশের নিজস্ব বাঙালিত্ব যেখানে ধর্ম কখনোই সমন্বয়ের সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে ওঠেনি। গোদের ওপর বিষফোড়ার মত মাথার ওপর খাঁড়ার মত ঝুলছে ভূ-রাজনীতির বিভিন্ন খেলোয়াড়দের খেলা।
বাংলাদেশের গভীর গভীরতর অসুখ এখন। আওয়ামী বা জুলাই কারোরই সাধ্য নেই এর চিকিৎসা করার যেমনটা ভাবছে অন্দরে দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশের সমাজের দু’টি অংশ।