আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৫ ● ১৬-২৯ ফাল্গুন, ১৪৩১
প্রবন্ধ
বইমেলা ও বইপোকারা
সোনাঝুরি মৈত্র
বাঙালি হয়ে জন্মেছি আর বইমেলায় যাবো না, এহেন গুরুতর অপরাধ করার মতো দুঃসাহস এখনও হয়ে ওঠেনি। বন্ধুদের সাথে বইমেলার প্ল্যান বানানোর সময় খানআটেক বার "বইমেলা আর বইমেলা কোথায়, খাদ্যমেলা হয়ে গেছে..." ইত্যাদি দার্শনিক মতামত বাতলেছি বৈকি, তবে শেষমেশ না গিয়ে আর থাকতে পারিনি। আমার আবার বন্ধুসংখ্যা বইমেলার স্টলের থেকেও বেশি। তাই এই দল ওই দল করে এবার প্রায় সাড়ে-সাত বার মতো বইমেলা যাওয়া হয়েছে এবং এই ক-বারে প্রায় সাড়ে-সাতশো প্রকার বইপ্রেমী দেখে ফেলেছি। এই যেমন এক শনিবার একপেট ভাত সাঁটিয়ে, দিবানিদ্রাটিকে গুডবাই জানিয়ে, তিন চারজন বান্ধবীকে একেবারে পাকড়াও করে দুপুরবেলা বইমেলা গেছি। গিয়ে দেখি বইমেলায় এবার নতুন ফিচার - জামাকাপড়ের দোকানের মতো ম্যানেকুইন লাগিয়েছে। দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। সেই মূর্তির হাতে আবার একখান বই - কাফকার "দি লেটারস টু মিলেনা"। আমার বন্ধু অঞ্জলির বেশ ব্যবসায়িক মানসিকতা। ঠিক ওর চোখে পড়েছে। বললো "কী জম্পেশ মার্কেটিং স্কিম বলতো? বইটাকে কি সুন্দর ম্যানেকুইনের হাতে দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। লোকে স্টলের বাইরেও বই উল্টে দেখার সুযোগ পাবে। চল যাই।" যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। গিয়ে ম্যানেকুইনের হাতের বইটায় মেরেছি এক টান। ম্যানেকুইন চমকে বলে উঠলো, "আরে করেন কি, করেন কি? ছবি তুলছি দেখতে পাচ্ছেন না? বই ধরে টান মারছেন কেন?" আমরা তো জিভ-টিভ কেটে লজ্জায় একসা। অঞ্জলির দিকে কটমট করে তাকাতে সে কাঁচুমাঁচু মুখে বললো, "আমার দোষ কি ভাই? অতক্ষণ ধরে বই হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, তাই ভাবলাম ম্যানেকুইনই হবে।"
আরেকদিন গেছি আমার কলেজের একেবারে ডানপিটে দলটার সঙ্গে। এদের বইয়ের সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই কিন্তু বইমেলা যাওয়ার উৎসাহ ষোলো আনা। শীতের শেষে বেশ পিকনিক পিকনিক একটা ভাব নিয়ে এরা দলবেঁধে বইমেলা অভিযানে এসেছে। যথারীতি স্টলে ঢুকে এই বই ওই বই টেনে তাক থেকে নামাচ্ছে, তারপর "ধুর ছবি নেই" বলে আবার রেখে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে এরই একজন মনের ভুলে হাতে একটা বই নিয়ে স্টল থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারপর হঠাৎ নিজের হাতে বই দেখে নিজেই চমকে উঠেছে। কোন স্টলের বই কিছুতেই মনে করা যাচ্ছে না। অগত্যা সেই বই তাকে বাড়ি নিয়ে যেতেই হল। কিন্তু সে বেচারা ভারী অপরাধবোধে ভুগছিল। দাম ছাড়া বই নিয়ে এসেছে, সে তো একপ্রকার চুরিই বটে। আর চুরি করা ঘোর পাপ। পরে শুনেছিলাম সেই পাপ ধুতে সে মহাকুম্ভে গেছিল।
আমার ঠাকুরদা বই পড়তে বড্ডো ভালোবাসেন। সুযোগ পেলেই টুকটাক বই কেনেন, সবরকম লেখকের বই পড়েন। এইবারের বইমেলায় তাকে সবরকম লেখকের বই পড়ানোটা হালকা হাতের বাইরে চলে যায়। ঠাকুরদাকে নিয়ে রবির বিকেলে বইমেলা গেছি। প্রতিটি স্টলের বাইরে দুর্গাষ্টমীর লাইন। বয়েস হয়েছে, অত ভিড়ে ঠাকুরদা পারবেন না। তাই তাকে নিয়ে তুলনায় কম ভিড় কিন্তু বেশ ঝকঝকে অন্য একটা বাংলা বইয়ের স্টলে এসেছি। বই-টই পড়ার ব্যাপারে আমি এক্কেবারে আনকোরা, তাই বেশ মোটা দেখে একটা কবিতার বই তুলে দেওয়া হল ঠাকুরদার হাতে। দু-এক পাতা উল্টে দেখে ঠাকুরদা এমন ভিড়মি খেলেন যে আমার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। তারপর সেই জল, হাতপাখা, মাথায় ফুঁ। কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হতে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি বই পড়ে ভিড়মি খেলে যে বড়?" ঠাকুরদা বললেন, "না না এই বুড়ো বয়সে আর এত ধকল সয় না। বই পড়ে ভিড়মি খাবো কেন! ভদ্রমহিলা তো বেশ ভালোই কাব্য করেন। পরে একদিন এসে নিয়ে যাবো, আজ রবিবার হলেও বাড়ি ফেরাই মঙ্গল।"
বইমেলার নাকি আবার ম্যাপও পাওয়া যায়। আগে জানতাম না। দুই ফিরিঙ্গিকে দেখলাম হাতে ম্যাপ নিয়ে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমায় দেখে একগাল হেসে জিজ্ঞেস করল, "হোয়ার ইজ দি ফুড কোর্ট?" ভেবেছিলাম ভালোমানুষি করে ওনাদের বোঝাব যে ওনারা যেটাকে "ফুড কোর্ট" ভাবছেন সেটা আদতে তা নয়। কিন্তু কিছুতেই এতটা কথা ইংরেজিতে সাজিয়ে উঠতে পারলাম না। তাই আঙুলের ইশারায় সারি দেওয়া খাবারের একচালাগুলোকেই দেখিয়ে দিলাম। পশ্চিমী হাল ফ্যাশনের মলের ফুড কোর্ট সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাহেবদের এমন খাবার-চালা দেখে উৎসাহ ঠিক কোথায় এসে ঠেকল তা জানার একটা ইচ্ছে ছিল বটে। কিন্তু পাছে চেনা মুখ দেখে ইংরেজিতে আরও কয়েকটা প্রশ্ন করে ফেলে, এই ভয়ে আর তাদের পিছু ধাওয়া করলাম না।
তবে এই শীত-বসন্তের সন্ধিক্ষণে বইমেলায় আসতে কিন্তু বেশ লাগে। সে বই কিনি ছাই না কিনি। কলেজ স্ট্রিটে হয়তো এই বইগুলোই অর্ধেক দামে পাওয়া যাবে, অনলাইনেও থাকবে প্রচুর ছাড়। তবুও যেন বইমেলার একটা মায়া আছে। স্রেফ বইয়ের মেলা তো নয়, আরও কতরকম জিনিস দেখা যায় বলুন তো! একদল বাচ্চা ছেলেমেয়ে পথনাটিকায় মগ্ন, গান হচ্ছে, নাচ হচ্ছে, বক্তব্যসভা বসছে, হয়তো বা কেউ মেলার মাঝেই ক্যানভাসে ছবি আঁকছে। কেমন যেন শহর কলকাতার পাঁচমেশালি শিল্পসত্তাগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সেক্টর ফাইভের নটা-পাঁচটার চাকরি করা মানুষগুলো হাতের কাছেই পেয়ে গেছে একটুকরো মুক্তি। খেতে আসার নাম করে প্রায়দিনই ঘুরে যাচ্ছে বইমেলায়। ম্যানেজারবাবু বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করছেন। এইটুকু মানবিকতা বোধহয় কলকাতা শহরের আকাশমুখীগুলোর কাঠখোট্টা সিমেন্টের বাঁধুনির মাঝে এখনও হারিয়ে যায়নি।
বইমেলায় গিয়ে একটা জিনিস আবার নতুন করে উপলব্ধি করলাম - বাঙালিরা কিন্তু এখনও বই পড়াটাকে খুব কদর করে। যারা বই পড়ে বা বই লেখে, তাদের বেশ সমীহ করে চলে। বাঙালি মায়েরা এখনও জোর করে ছেলেমেয়েদের হাত থেকে মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে গল্পের বই তুলে দিতে চায়। এই জোর করে বইয়ের নেশা ধরানোটা যতটা না সন্তানের মানসিক বিকাশের প্রতি উদ্বিগ্নতা, তার থেকে বেশি বোধহয় বাঙালি লোকসমাজে কিছুটা এগিয়ে থাকার আকুল চেষ্টা। ঢিলেঢালা আলখাল্লা পরা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ আর একমুখ দাড়িগোঁফওয়ালাদের আমরা "আঁতেল" বলে যতই ব্যঙ্গ করি না কেন, মনে মনে এই আঁতেলদের ঈর্ষা করি বৈকি। এদের মতো হওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা সব মধ্যবিত্ত বাঙালির মধ্যেই কম বেশি আছে। তাই সুযোগ পেলেই একটু সাবেকি পোশাকে, হাতে একটা বই নিয়ে, দু-তিনটে ক্যান্ডিড ছবি তুলে, পেছনে চন্দ্রবিন্দুর "বইমেলা ধূলো/ গার্গী, শ্রেয়সী/ চেনা মুখগুলো/ পরিচিত হাসি" গানটা লাগিয়ে ইনস্টাগ্রামে ডজনখানেক ছবি পোস্ট করার লোভটা সামলানো যায় না। নাই বা পড়লাম হাতের বইগুলো। অন্তত খান বিশেক মানুষ তো ভাবলো আমি পড়ি। তাতে আমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা তো কিছুটা হলেও বাড়ল। শ্রদ্ধা বাড়বেই কারণ আমরা বাঙালি। বইটা বাঙালিদের কাছে অনেকটা মাছ-ভাতের মতো। মাছ-ভাত বহু বাঙালিরই না-পসন্দ। তার থেকে বরং আলু, ফুলকপি, সর্ষের তেল দিয়ে চাউমিনের চচ্চড়ি বেশি মুখে লাগে। কিন্তু ওই যে, মাছে-ভাতে বাঙালি। লোকসমাজে "মাছ খাই না" বললে এখনো বেশ হেনস্থা হতে হয়। বইয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম। বই না পড়লেও বই পড়ছি বলতে হয়। আমরা তাই মাছে-ভাতে-বইয়ে বাঙালি।
তবে একদল বাঙালি আছে যারা বইমেলার ঘোর বিরোধী। না, তারা বই পড়তে ভালোবাসে না এমনটা নয়। তাদের মূল উৎকণ্ঠার কারণ হল বইমেলায় এই লাখ লাখ বই বিক্রির জন্য কত গাছ কাটতে হচ্ছে! তাদের এক কথা - তোমরা বাপু এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে পিডিএফ না পড়ে বই পড়বে কেন? তাদের কথায় আপত্তিও করতে পারি না। বই ছাপাতে গাছ কাটা হচ্ছে। তাতে অক্সিজেনের গুরুসংকট দেখা দিচ্ছে। কি জানি বাবা হয়তো তাই জন্যেই লোকে নতুন বই পেলেই আগে গন্ধ শোঁকে। বই নির্মাণের হারানো অক্সিজেনটা হয়তো বইয়ের পাতা থেকেই আবার ফুসফুসে ভরে নেয়।
কিন্তু একটা গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেল যে! বইমেলার এই গিজগিজে বইপোকার ভিড়ে কী করে বুঝব কে আসল কে নকল? কী করে বুঝব কে সত্যিই বইপ্রেমী আর কে ঘর সাজাতে বই কেনে? তবে এই নিয়ে সত্যিই এতো মাথাব্যথা করে লাভ আছে কি? যে যার মতো কিনুক না বই। কারো তো ক্ষতি হচ্ছে না। বরং লেখক এবং প্রকাশকদের বেশ রমরমাই চলে এই ক’দিন। তবে আমি কিন্তু একজন আসল বইপোকার সন্ধান পেয়েছি। একটা একচিলতে স্টলে অনেকগুলো সেকেন্ড হ্যান্ড বই রাখা। নিরানব্বুই টাকায় বেশ গুরুগম্ভীর বইদের কিনে ফেলা যাচ্ছে। একটু নেড়েচেড়ে দেখছিলাম আর কি। একটা ধুলোপড়া বই বেশ মনে ধরলো। পাতা উল্টোতে গিয়ে দেখলাম একটা ছোট্ট পোকা আপনমনে কুটকুট করে পাতার কোণাটা চিবিয়ে খাচ্ছে। দেখে বুঝলাম - প্রকৃত বইপোকাই বটে!