আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৫ ● ১৬-২৯ ফাল্গুন, ১৪৩১

প্রবন্ধ

দেবো না, দেবো না, দেবো না রে

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী


আগে থেকে সব ঠিক করাই ছিল। মনের মতো বাজার হল, অনলাইনে। যা চেয়েছিলাম, পেয়ে গেলাম বিলকুল। মন বলল, ওয়াও, কুল! দিল খুশ। এবারে বিল মেটানোর পালা।

এই পর্যন্ত ঠিকঠাক থাকে সবারই। অধিকাংশ বিপত্তির শুরু এর পরে। কী কী কিনলাম তার তালিকা ও ডিসকাউন্ট দেওয়া দামের শেষে কোথা থেকে যেন জুড়ে যায় একটি লাইন। ‘ডেলিভারি চার্জ ৩০ টাকা।’ এটা উদাহরণমাত্র। বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চার্জ হতে পারে ৩০, ৪০, ৫০ কিংবা আরও বেশি। মোট বাজারমূল্যের পরিমাণের উপরে অথবা অ্যাপের রকমফেরে ডেলিভারি চার্জও বদলে যায়। তবে এরই সঙ্গে লেগে থাকে আরও একটি অপশন। ‘আর এত টাকার শপিং করে ফেললেই আপনি পেয়ে যাবেন ফ্রি ডেলিভারি।’ আমরা বাধ্য হয়ে বাজার করতে, বন্দি হই ফের। আঙুল ছোঁয়াই যে আইকনে, তার নাম ‘কন্টিনিউ শপিং’। প্রথমবার যে উৎসাহ নিয়ে একের পর এক জিনিস ভর্তি করেছিলাম কার্ট-এ, কেনাকাটার দ্বিতীয় ইনিংসে সেই উৎসাহে ভাটা পড়ে বেশ।

অনলাইন খুচরো বিপণির অন্য কোনও অ্যাপ আবার প্রথম প্রোডাক্টটি কার্টে যোগ করা মাত্র চালু করে দেয় ফ্রি ডেলিভারির কাউন্টডাউন। ধরা যাক, সবার প্রথমে কিনলাম এক প্যাকেট নুন। দাম কুড়ি টাকা। ফ্রি ডেলিভারির সুবিধা পেতে গেলে, উদাহরণস্বরূপ, ৯০০ টাকার বাজার করতেই হবে আমাকে। অবাক হয়ে দেখি, নুনটিকে সিলেক্ট করার পরেই স্ক্রিনের তলায়, টেলিভিশন চ্যানেলে স্ক্রল করে যাওয়া খবরের মতো ফুটে ওঠে, ‘আর ৮৮০ টাকার বাজার করলেই বিনাপয়সায় ডেলিভারি।’ পরের দ্রব্যটি যোগ করলে তার দাম অনুযায়ী ওই কাউন্টডাউনও কমতে থাকে।

অনলাইন বাজারে আমাদের এই কার্যকলাপ দেখে বিপণন দুনিয়ার আমির-ওমরা, হোমরা-চোমরা মানুষরা হাসেন। শুধু হাসেন বললে কম বলা হয়। হেসে গড়িয়ে পড়েন। হয়তো উদাত্ত গলায় গেয়ে ওঠেন, ‘কি চাল চেলেছে দ্যাখো শপিং কোম্পানি।’ বিভিন্ন সময়ে করা হরেক সমীক্ষা বাজার করার সময় মানবমনের অন্দরে ঘটে চলা আজব সমীকরণ নিয়ে জানার চেষ্টা করেছে। যতটুকু জানতে পারা গিয়েছে, তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। কনজিউমার বিহেবিয়ারের দশ ভাগের ন’ভাগই আজও লুকিয়ে আছে অজানার গভীরে, সারা শরীরে রহস্য মেখে। মুখ উঁচিয়ে থাকা় সামান্য একভাগ গিয়েই পরীক্ষা নিরীক্ষা সমীক্ষা চলছে, বিশ্বজুড়ে।

মার্কেটিং দুনিয়ার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এক ধাক্কায় পাঁচশ টাকার বাজার করে ফেলার পরেও চূড়ান্ত বিলে ফুটে ওঠা ডেলিভারি চার্জ আমাদের মনে যে জিনিসটির উদ্রেক করে, তা হল নিখাদ বিরক্তি। মনে পড়ে অনলাইন খুচরো বিপণি সংস্থাগুলোর গুটি গুটি পা ফেলার সময়ের কথা। মনে হয়, এই তো সেদিন। তখন ডেলিভারি চার্জ বিষয়টি ছিল বাজার করার সংবিধানের বাইরে। বাড়ি বসেই অর্ডার দিতাম, মূলত কম্পিউটারে। প্রতিটি সংস্থার বাহারি অ্যাপ তখনও আসেনি সেভাবে। ক্রয় করা সামগ্রী চলে আসত দোরগোড়ায়, সুদৃশ্য প্যাকেজিংয়ে। মনের মধ্যে বয়ে যেত আনন্দ হিল্লোল। আনন্দর কারণ ছিল বেশ কয়েকটি। বাজার করার সময় বাঁচত, এক দোকানে জিনিস না পেয়ে অন্য দোকানে ঢুঁ মারার ঝামেলা থাকত না, সামগ্রী কেনার পরে তা বাড়ি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে আসার ঝক্কি নেই, বাজারে যাওয়া আসার জন্য যাতায়াত ভাড়া নেই! অনলাইন বাজারের প্রথম আলোর চরণধ্বনি শোনার সঙ্গে এতগুলো সুবিধা পাওয়ার ইচ্ছে সমার্থক হয়ে উঠেছিল। একের পর এক অনলাইন খুচরো বিপণি বিদেশের বাজার জয় করার পরে এদেশে পা রেখেছে। তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দেশজ সংস্থাও। অধিকাংশ সংস্থাই শুরুর দিনে বিনা পয়সায় ডেলিভারিতে মজিয়েছে আমাদের। আর ক্রমাগত এই সুবিধা পাওয়ার ফলে তা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে। অভ্যাসের এই চ্যুতিই এখন গোল বাধাচ্ছে।

ডেলিভারি চার্জ বহন করে শুধুমাত্র প্রয়োজনের জিনিসটুকুই আনাবো নাকি তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আরও কিছুটা অতিরিক্ত বাজার করব, তা নিয়ে যে কোনো ক্রেতার মনের মধ্যেই দ্বন্দ্ব চলে। এই দ্বন্দ্বের কোনও ব্যাকরণ নেই! সম্প্রতি এক আত্মীয়র বাড়িতে গিয়ে দেখি একটি ঘরের বিছানার উপরে স্তুপের মতো শোভা পাচ্ছে চিপসের প্যাকেট। কম করে গোটা পঞ্চাশ প্যাকেট ছিল সেখানে। সেদিকে আমার চোখ পড়তেই উত্তর উড়ে এলো - “আর বোলো না ভাই। সবই তো এখন অনলাইনে। এক্সট্রা অর্ডার না করলেই তো ডেলিভারি চার্জ জুড়ে দেয়। খেটে রোজগার করা পয়সা কি খোলামকুচি নাকি?” আমি পাল্টা বললাম, “এগুলো কিনেও তো কষ্টের উপার্জন ধ্বংস করছেন প্রতি মাসে।” উনি আমার মুখের সামনে হাতের মুদ্রায় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীকচিহ্ন দেখিয়ে ঝটিতি থামিয়ে দিলেন। বললেন, “ডেলিভারি চার্জটা বাঁচিয়েছি ভাই। কিনতে বাধ্য হয়েছি বাড়তি জিনিস। টাকাটা উবে যায়নি। জিনিস তো এসেছে।” আরও জানতে পারলাম, বরাবর জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলা, ঘন্টাখানেক মর্নিংওয়াক করা, শরীর সচেতন পঞ্চাশোর্ধ্ব ভদ্রলোক এখন প্রতিদিন দু’ তিন প্যাকেট চিপসের সদগতি করেন, সপরিবারে। কয়েক মাস ধরে এই রুটিন চলছে। তিন জনের পরিবারের মধ্যে নিজের ওজন বাড়িয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তবে ওঁরই কথায়, “সে যাক গে। কুছ পরোয়া নেই। ডেলিভারি চার্জটা তো বেঁচেছে।”

যে কোনও সার্ভিস চার্জের সঙ্গে আমাদের চোখ কুঁচকানো কৌতুহল জুড়ে থাকে। ধরা যাক, হাতঘড়ি খারাপ হওয়ার পরে পাড়ার মোড়ের দোকানে দেওয়া হয়েছে সারাতে। মেকানিকবাবু চোখে আতসকাঁচ ফিট করে, ঘড়ির ব্যাক কভার খুলে, স্প্রিং-নাড়ি-নক্ষত্র পরখ করে বললেন, “পার্টস লাগবে আড়াইশো আর সার্ভিস চার্জ একশো। সব মিলিয়ে সাড়ে তিনশো দেবেন।” আমাদের যাবতীয় দরাদরি শুরু হয়ে যায় ওই সার্ভিস চার্জটুকু নিয়ে। যন্ত্রাংশের দাম কমানোর ক্ষমতা আমাদের আয়ত্তের বাইরে! তাই বলে লাভ নেই বলে সেই প্রসঙ্গে আমরা নীরব থাকি। আর সার্ভিস চার্জ কম করতে বললে দোকানি ফোঁস করে বলেন, “আমার মজুরিটা দেবেন না?” আমরা ক্রমাগত লড়ে যাই। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, উত্তর কলকাতায় আমার পরিচিত এক ঘড়ি সারাইয়ের দোকানদার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক অভিনব পন্থা নিয়েছেন। সার্ভিস চার্জ নিয়ে কোনও খরিদ্দার দরাদরি করলেই উনি বলে উঠছেন, “তা হলে একটা নতুন দেওয়াল ঘড়ি নিন। হাতঘড়ি সারানোর জন্য সার্ভিস চার্জ মকুব।” উনি বলছিলেন, “অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছি ভাই। দশজনের মধ্যে সাতজনই এই প্রস্তাব গিলে নিচ্ছেন। মোটের উপর আমার লাভ বেড়েছে অনেক। পাবলিক কিন্তু হেব্বি বোকা।”

মজার কথা হল, মূল বাজার করার সময় জিনিসপত্রের দাম নিয়ে আমরা যতটা সতর্ক থাকি, বাজারের শ্রেষ্ঠতম ডিলটি পাওয়ার জন্য এক অ্যাপ থেকে অন্য অ্যাপে যেভাবে ভ্রমণ করি নিমেষে, ক্রমাগত তুলনা করি এবং রচনা করি আমাদের নিজস্ব ‘বেনিফিট অমনিবাস’-এর প্রতিটি পাতা, কার্ট ভর্তি করার জন্য ডেলিভারি চার্জহীন অতিরিক্ত বাজার করার সময়ে আমাদের সেই ঐকান্তিক চেষ্টায় ভাটা পড়ে খুব। বিহেবিয়ারাল ইকনমিক্সের কয়েকটি তত্ত্বর কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। ক্রেতাদের মনের সিটি স্ক্যান রিপোর্টেরই তো খবর দেয় এমন সব দেশি-বিদেশি তত্ত্ব। জানতে পারলাম, সেরা ডিল পাওয়া সত্ত্বেও, সাতশ টাকার বাজার করে অফার বাবদ দেড়শ টাকা বাঁচানোর সুখ পাওয়ার পরেও ডেলিভারি ফি-র সামান্য সেই অঙ্ক আমাদের কাছে ‘লোকসান’-এর মতো মনে হয়। ডিসকাউন্ট পাওয়ার আনন্দকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় খোয়ানোর ভয়। একদিকে পাওয়া এবং অন্যদিকে না পাওয়া ঝুলিয়ে দেওয়া দাড়িপাল্লার কাঁটা হঠাৎ কাঁপতে থাকে প্রবল। আমাদের মনের গহীনে বেশ কয়েকটি চিত্রনাট্য লেখা হতে থাকে একইসঙ্গে। যা কিনছি, তার মূল্যের থেকে যদি বেশি হয়ে যায় ডেলিভারি চার্জ, তাহলে আমরা মত বদল করি। অন্য অ্যাপে খোঁজ নিই। কিংবা সশরীরে দোকানে গিয়ে কেনার কথা ভাবি। এখানে মূল্য বলতে ঠিক মুদ্রিত মূল্য বোঝায় না। যা বোঝায় তাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা চলে, পারসিভ্ড ভ্যালু। ছ’শো টাকা দিয়ে একটি খুব পছন্দের বই কিংবা পারফিউম কেনার জন্য ডেলিভারি চার্জ গুণতে মনের মধ্যে যে ডেসিবেলে বেজে চলে দুঃখী তারসানাই, দ্রব্যটি বই, পারফিউমের বদলে ২৬ কেজি চালের বস্তা হলে ওই দুঃখ-ডেসিবেলের মাত্রা কয়েকগুণ বেশি হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস এবং শখ মেটানোর উপকরণের ক্ষেত্রে কি এভাবেই বদলে যায় আমাদের মনের জটিল সমীকরণ? দেড়শো টাকা দিয়ে অ্যাপ-মারফৎ মাত্র এক প্লেট বিরিয়ানি অর্ডার করার জন্য আমরা ডেলিভারি ফি গুণতে রাজি থাকি। কিন্তু দেড়শো টাকা দিয়ে তিন প্যাকেট মারি বিস্কিট কেনার সময় বাড়তি পয়সা খরচ করতে কষ্ট হয়। এক অর্থনীতিবিদকে এ প্রসঙ্গে বলতে শুনেছিলাম, “শপিং কার্ট বড় মায়াময় এক ব্যাগ। পেটে ক্ষিদে নিয়ে এই ব্যাগ দেখতে একরকম, ভরা পেটে অন্যরকম। মাসের শুরুতে একরকম। মাসের শেষে আবার অন্য রূপ। খাবার ভরা ব্যাগের এক অবতার। আবার শখ ভরা ব্যাগের অন্য অবতার। গবেষণা বাড়ে। তবে কনফিউশন কমে না।”

অনলাইন খুচরো বিপণি সংস্থাগুলোরও অবশ্য চিন্তার শেষ নেই। এই বাইনারি দৌড়ে প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ। তাঁদের শীর্ষকর্তারা বুঝতে পেরেছেন, এযুগের ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি যা ভাবাচ্ছে তা হল ডেলিভারি ফি। তাঁরা পড়েছেন মহা জাঁতাকলে! ডেলিভারি চার্জ না নিয়েও উপায় নেই, আবার নিয়ে ফেললেও বিপদ। চালু হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন মেম্বারশিপ প্ল্যান। বছরে হাজারখানেক টাকা খরচা করলেই মিলবে প্রায়োরিটি ডেলিভারি ও বিশেষ দাম। ডেলিভারি ফি মুক্ত জীবন পাওয়ার জন্য ন্যূনতম কার্ট ভ্যালু অন্যদের জন্য ৯৯৯ হলে মেম্বারদের জন্য মাত্র ৩৯৯। অনেকক্ষেত্রে তা পুরোপুরিও মকুব করে দেওয়া হচ্ছে।

ত্বকে ঢুকছে আঠা মেশানো সূচ। আর সিরিঞ্জে প্রলোভন।

এই মেম্বারশিপ নিয়ে দিনের শেষে জিতল কে? কতটা?

তা আবার অন্য অঙ্ক।