আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৫ ● ১৬-২৯ ফাল্গুন, ১৪৩১

সমসাময়িক

স্বাস্থ্যের অস্বাস্থ্য


ধনধান্যে বৈঠক হল। বলা ভালো, সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হল। জুনিয়র ডাক্তার, পিজিটি ডাক্তার প্রমুখের বেতন বাড়ল। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের বেসরকারি কাজের পরিসীমা বৃদ্ধি পেল। ইত্যাদি প্রভৃতি। সংবাদমাধ্যমে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল।

রাজ্যের সমস্ত সরকারি হাসপাতালে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের কমবেশি আড়াই হাজার ডাক্তারকে ছুটির দিনে নয়, একেবারে সপ্তাহ শুরুর দিন ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫-এ কলকাতার ধনধান্যে প্রেক্ষাগৃহে আমন্ত্রণ জানিয়ে সরকারের তরফে মুখ্যমন্ত্রী ইত্যপ্রকার ঘোষণা করে জানিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নয়নের জন্য তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর। আমন্ত্রিত ডাক্তারদের কথা বলার কোনো সুযোগ ছিল না। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে যে সিদ্ধান্তসমূহ সরকারের নির্দেশনামা মারফত জানিয়ে দেওয়া যেত তার জন্যে এত ধুমধাম করে সরকারি বৈঠকের প্রয়োজন ছিল কি?

মুখ্যমন্ত্রী সরকারি বৈঠক থেকে বলেছেন জুনিয়র ডাক্তার, পিজিটি ডাক্তারদের বিভিন্ন স্তরে মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধি করা হবে। তাঁরা কেউ সরকারি কর্মী নন। তাঁদের দেওয়া হয় সাম্মানিক ভাতা বা স্টাইপেন্ড। সরকারি কর্মীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী তো বটেই মন্ত্রীসভাও নিতে পারে না। তার জন্য পৃথক পদ্ধতি রয়েছে, যা ভারত সরকার ও সমস্ত রাজ্য সরকারগুলি মেনে চলে। এমনটাই প্ৰচলিত রীতি।

বৈঠকে চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কর্মীদের অভিযোগ শোনা হয়েছিল কি? বৈঠকে জুনিয়র ডাক্তারদের সাসপেনশন তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের আট ঘন্টা সরকারি কাজের পরে কর্মস্থলের ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার অনুমতি দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এই দৃষ্টান্ত দেখিয়ে সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়া ইশকুলের শিক্ষক/শিক্ষিকারাও প্রাইভেট টিউশনির দাবি জানালে তা মেনে নেওয়া হবে কি?

রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা কিন্তু জানানো হয়নি। স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থাকে দুর্নীতি মুক্ত করার কোনো প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়নি। 'হুমকি সংস্কৃতি' বন্ধ করার সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি।

জুনিয়র ডাক্তার অথবা পিজিটি স্যালাইন ক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। হাসপাতালে মজুত ওষুধ প্রয়োগ করা ছাড়া তাঁদের পক্ষে চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। কাজেই ওই ওষুধের কারণে কোনো রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে বা মৃত্যু হলে তার দায় কোনো অবস্থাতেই জুনিয়র ডাক্তারদের উপর বর্তায় না এই বাস্তব যুক্তি বুঝতে পেরে পরিস্থিতির চাপে পড়ে তাঁদের উপর থেকে অন্যায়মূলক শাস্তির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে সরকার বাধ্য হয়েছে। তবুও মন্দের ভালো, দেরিতে হলেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বীকার করেছে।

ডাক্তার সহ স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থায় কর্মরত অন্যান্য কর্মীদের সরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়ে সরকারের প্রস্তাব হাসপাতালের পুরুষ কর্মীদের (ভাইয়ের মতো) মহিলা কর্মীদের (নিজের বোনের মতো) নিরাপত্তা দিতে হবে। কিন্তু হাসপাতালের আঙিনায় বহিরাগতদের আনাগোনা কে বন্ধ করবে? বহিরাগত দুষ্কৃতীদের আকস্মিক অথবা পরিকল্পিত হানাদারি কে আটকাবে?

নিহত ডাক্তারের নির্যাতন ও হত্যার যথাযথ তদন্ত হয়নি বলে নিয়মিত অভিযোগ করছেন অভয়ার মা-বাবা। অভিযোগ নিয়ে তাঁরা দিল্লি পর্যন্ত গেলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো উত্তর আসেনি। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে সময়াভাবের বার্তা আসায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও দেখা করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী সংস্থার প্রধান ধৈর্য ধরে অভিযোগ শুনে কোনো আশ্বাস দিয়েছেন কি?

অথচ সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে তদন্তকারী সংস্থার তরফে বন্ধ খামে অনেক তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়েছিল। সেই রিপোর্ট পড়ে প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর সহযোগী অন্য দুই বিচারপতি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা রাজ্য সরকারের পক্ষে মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া ক্রমশ দীর্ঘায়িত হয়ে চলেছে। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সচেষ্ট হয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার।

স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার খুঁত-ত্রুটি নিরাময়ের কোনো চেষ্টা গত চোদ্দো বছরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার করেছে কি? সকলেই জানেন যে, হয়েছে তার বিপরীত। দুর্বৃত্ত-দালাল-দুষ্কৃতিদের আখড়া হয়েছে রাজ্যের সরকারি হাসপাতাল। হুমকি সংস্কৃতির প্রবর্তন হয়েছে। সরাসরি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা একদল দুর্বৃত্ত লুটেপুটে খাচ্ছে। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নৃশংস ঘটনার দোষীদের বিরুদ্ধে রাজ্যের গ্রামে-গঞ্জে শহরে-শহরতলীতে যে দীর্ঘমেয়াদী গণবিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছিল তখনই স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি উন্মোচিত হয়। এইসব ত্রুটি অবিলম্বে সংশোধনের জন্য সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়। রাজ্য সরকার আদালতের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পালন করা হবে।

কিন্তু রাজ্য সরকার কথা রাখেনি। আগামী বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত হয়তো এভাবেই চলতে থাকবে। তার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত ধনধান্যে প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত অনুষ্ঠান। যে সিদ্ধান্তগুলি নির্দেশনামা জারি করে কার্যকর করা যেত তা না করে হাজার আড়াই ডাক্তারকে কাজের দিনে কলকাতায় ডেকে আনা হল। কলকাতা ও আশপাশের এলাকার হাসপাতালগুলিতে যাঁরা কর্মরত তাঁদের হয়তো একটি কর্মদিবস নষ্ট হল, কিন্তু যাঁদের বিভিন্ন জেলা থেকে আসতে হল তাঁদের তো যাতায়াতের জন্য কারও দু’ দিন কারো কারো তিন তিনটি কর্মদিবস নষ্ট হল। ব্যাহত হল ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবা। যাতায়াতের খরচও কম নয়। এত শ্রম-সময়-অর্থ অপচয়ের কোনো প্রয়োজন ছিল কি?

সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করার অনুমতির পরিসীমা বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসলে প্রকারান্তরে বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসাকে পুষ্ট করার উদ্যোগ হিসেবেই প্রতিপন্ন হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলির সঙ্গে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনার অনুমান অগ্রাহ্য করা যায় কি?

সবমিলিয়ে ধনধান্যে প্রেক্ষাগৃহে ঢাকঢোল বাজিয়ে হইচই ফেলে দিয়ে সরকারের এই তথাকথিত বৈঠক বাস্তবে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার জন্য একটি অসুস্থ তথা অশুভ প্রচেষ্টাকেই অব্যাহত রেখেছে।