আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৫ ● ১৬-২৯ ফাল্গুন, ১৪৩১
সমসাময়িক
দেউচা পাঁচামি কয়লাখনি
সম্প্রতি রাজ্য রাজনীতিতে দেউচা-পাঁচামি কয়লাখনি প্রকল্প আরও একবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে চলেছে। বিগত দুই বছর, প্রকল্প ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই এর বিরুদ্ধে স্থানীয় আদিবাসী সমাজের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ তৈরী হয়। তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কয়লাখনি প্রকল্পের বিরোধিতায় নামেন। এরপর সরকার একাধিকবার সেখানে আইনি বেআইনী উভয় পদ্ধতিতেই আন্দোলনকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়, যা তৃণমূল সরকারের মজ্জাগত। পুলিশি দমনপীড়ন থেকে সরকার আশ্রিত দুষ্কৃতীদের দাপাদাপি সবই আন্দোলনকারীরা দেখেছেন। এমনকি আদালতে জনস্বার্থ মামলা অবধি দায়ের হয়। মামলায় এই কথা উঠে আসে যে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক ত্রুটি গোটা প্রক্রিয়ার শুরু থেকে হয়ে এসেছে। প্রথমত সরকার জমি অধিগ্রহণ নিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরী করে। প্রথমে দাবি করা হয় সরকার ইচ্ছুক জমিদাতাদের থেকে জমি কিনছে। পরে যখন জমিদাতাদের পুলিশের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতে থাকে তখন বলা হয় যে এখানে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এরপর একথাও সামনে আসে যে সরকারের তরফ থেকে পরিবেশগত এবং জনজীবনে প্রকল্পের প্রভাব সম্পর্কে কোনো সমীক্ষা না করেই জমি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়া হয়। এখনও এই সব প্রশ্নই অমীমাংসিত। এরই মাঝে 'বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন' থেকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করে দেন যে দেউচাতে কয়লা উত্তোলন ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয়ে যাবে। আবারও একরাশ মিথ্যাচার মাননীয়া ও তার প্রশাসন শুরু করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে দেউচা পাঁচামি কয়লাখনি প্রকল্পে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে। এখানে ১ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। রাজ্য প্রশাসন এই প্রকল্পকেই 'বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন'-এর অন্যতম সাফল্য বলে প্রচার করতে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন এটি হবে এশিয়ার বৃহত্তম কয়লাখনি। বরাবরের মতো এবারেও তিনি বলেছেন এই কয়লাখনি হলে রাজ্যের সমস্ত বিদ্যুৎ সমস্যা মিটে যাবে এক লহমায়। সরকার বলেছে ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের ৩৪০০ একর জায়গায় প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করার জন্য গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হয়েছে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রকল্প যে তৃণমূলের কাছে রাজ্যের শিল্পায়নের অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন তা বোঝাই যাচ্ছে। নেই রাজ্যে কয়লাখনি দেখিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা শাসকদলের লক্ষ্য হয়েই থাকতে পারে, কিন্তু মিথ্যাচারের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য কি পূর্ণ হবে?
মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য সরকারের এই ঘোষণার বাস্তব তথ্যটি আসলে কি? আদৌ কি প্রাথমিক প্রকল্পের দরপত্রে কোনো বড় সংস্থা আগ্রহ দেখিয়েছে? রাজ্য সরকার আদানি গোষ্ঠীকে এই বরাত দিতে চলেছে এমন জনশ্রুতি। কিন্তু এই বরাত মোটেই কয়লাখনি উত্তোলনের জন্য নয়। এটা অজানা নয় যে দেউচা পাঁচামি কয়লাখনি অঞ্চলে কয়লার স্তর রয়েছে ১০০ থেকে ৩৫০ মিটার পুরু কালো পাথর বা ব্যসল্ট স্তরের তলায়। ফলে এই বরাত আদতে কয়লা নয়, এই ব্যসল্ট পাথর উত্তোলনের। যা আন্দোলনকারীরা প্রথম থেকেই বলে এসেছেন। কয়লা নয়, পাথরের স্তরই যে আদতে পণ্য তা বিচক্ষণ মানুষমাত্রই জানেন। যে কারণেই কোনো সরকারি কয়লা উত্তোলন সংস্থা এই প্রকল্পে গোড়া থেকে আগ্রহ দেখায়নি। প্রশ্ন হল এই পাথরের স্তর উত্তোলনের জন্য কী কী ঘটবে? সরকার থেকেই জানা যাচ্ছে, প্রাথমিকভাবে কেবলমাত্র ১২ একর জমিতে কাজ শুরু হবে। এই জমি সরকারের হাতেই আছে। ফলে এই জমির জন্য কোনো অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চালাতে হবে না। অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট এলাকা ৩৪০০ একর আর সরকারের প্রস্তাবিত প্রাথমিক প্রকল্পের এলাকা ৩৭৬ একর। ফলে বাস্তব এবং ঘোষণার ভেতর অনেক ফারাক। উপরন্তু এই ১২ একর জমিতে পাথর উত্তোলনের জন্য সমস্ত গাছ ও বনাঞ্চল নাকি স্থানান্তরিত করা হবে। যা এক প্রকার প্রলাপ। ফলে সরকারি ঘোষণা বাস্তবায়িত হলেও তাতে না হবে বৃহৎ কর্মসংস্থান, পরিবেশের ক্ষতি তো উপরি।
স্থানীয় মানুষও কি এই ঘোষণায় উদ্বেলিত? খবরে প্রকাশ বিগত ৭ই ফেব্রুয়ারি জেলাশাসক সহ সরকারি দল এই প্রকল্পের উদ্বোধন করতে গেলে স্থানীয় মানুষদের বিক্ষোভের মুখে তারা পড়েন। জমিদাতারা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করেন। অর্থাৎ স্থানীয় মানুষের মধ্যেও সরকারের ঘোষণার প্রতি অনাস্থা রয়েছে। প্রশ্ন হল, কেন একটি নির্বাচিত সরকারকে এভাবে মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নিতে হচ্ছে একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে গিয়ে। যদি সরকারি দাবি ঠিক হয় যে, এই প্রকল্প এই এলাকার এবং সমগ্র রাজ্যের শিল্প মানচিত্রের চেহারা পাল্টে দেবে তাহলে এত বিরোধ কেন? আসলে বিগত দুই দশকের বেশি সময়ে তৃণমূল সরকার মানুষের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণভাবেই হারিয়েছে। কোন গঠনমূলক কাজ, জনহিতকর কাজ যে এই সরকার করতে পারে এ বিশ্বাস রাজ্যের মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই হারিয়েছেন। আর মিথ্যাচার যে এই সরকার তথা তার নেত্রীদের মজ্জাগত তাও মানুষ আজ বুঝেছেন। এই চিত্র পাল্টাতে পারত যদি তৃণমূল দলটি সত্যিই নিজেদের উদ্দেশ্য পাল্টাতে চায়। এই কয়লাখনি প্রকল্পের নামে তারা তাদের পুরোনো মিথ্যাচার করেই চলেছে। এই অঞ্চলে পাথর উত্তোলন, শিল্পের আঞ্চলিক অর্থনীতিকে নষ্ট করে বদলে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তৃণমূল নেতৃত্ব চান। এতেই তাদের সুবিধা। প্রথমত, তাদের একটি শিল্পবান্ধব ছবি তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা মানে একে ঘিরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির কেন্দ্রীকরণ যার সরাসরি উপভোক্তা হবে তৃণমূল দলটি, সরকারে থাকার সুবাদে। ফলে রাজ্যের ভাঁড়ে আবারও ভবানী, এবার তার উপরে পাওনা পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতির অন্তর্জলি যাত্রা।