আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৫ ● ১৬-২৯ ফাল্গুন, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
আমরা শহরের তলায় মরি
কল্লোলিনী তিলোত্তমা কলকাতার তলায় থাকে কে? উৎপল দত্তের বিখ্যাত নাটক ‘টিনের তলোয়ার’-এর প্রারম্ভিক দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই জনৈক মেথরকে, যিনি ম্যানহোলের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলেন যে, ‘আমি কলকাতার তলায় থাকি’। ‘টিনের তলোয়ার’-এর বিখ্যাত নট বেণিবাবুকে সেই মেথর প্রশ্ন করে ওইসব যুবরাজ ছেড়ে আমাকে নিয়ে নাটক বাঁধতে পারবে?
এই জটিল প্রশ্নটি একটু অন্যরকমভাবে ছুঁড়ে দেওয়া যেতে পারে আমাদের শহর তথা রাজ্য তথা দেশের সরকার, রাজনীতিবিদ এবং বিদ্বজ্জনদের প্রতি। শহরের তলায় যারা নিত্যনৈমিত্তিকভাবে আমাদের ময়লা পরিষ্কার করে পয়ঃপ্রণালীগুলিকে সচল রাখে তাদের নিয়ে কি কারো কোনো চিন্তা আছে? তাদের নিয়ে নাটক লেখা দূরস্থান, কেউ কি আদৌ তাদের জীবনের বিভীষিকার কথা জানে?
প্রশ্নগুলি কোনো সাহিত্যচর্চা করার জন্য অথবা নতুন করে ‘টিনের তলোয়ার’-এর মতন নাটক লেখার জন্য তোলা হচ্ছে না। বরং এই প্রশ্নগুলি যে প্রতিনিয়ত উঠছে না তা প্রমাণ করে যে আসলে আমাদের মধ্যবিত্ত জনপরিসরে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কোনো জায়গা নেই।
বিগত ফেব্রুয়ারি মাসের দুই তারিখ কলকাতায় আর পাঁচটা দিনের মতই একটি সাধারণ দিন ছিল। কিন্তু তিনজন মানুষের জন্য দিনটি স্বাভাবিক ছিল না। এই তিনজন বানতলা অঞ্চলে একটি ম্যানহোলের নিচে প্রবাহমান নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য সেই ভয়াবহ নোংরায় নেমে আর উঠতে পারেননি। নিকটবর্তী লেদার কমপ্লেক্সের বর্জ্য সেই নর্দমার জলে মিশে বিষাক্ত গ্যাসের জন্ম দেয়, যার ফলে প্রাণ হারান ফারজেম শেখ, হাসি শেখ এবং সুমন সর্দার। তিনজনেই মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে আগত পরিযায়ী শ্রমিক। যথারীতি কিছু নিয়মরক্ষার কথা বলা হয়েছে, কলকাতার মেয়র তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কারো জানতে বাকি নেই যে তিনটি নিম্নবর্ণের গরীব মানুষের জন্য ক্ষমতাবানরা তদন্ত করে কাউকে কোনো শাস্তি দেবে না। যাদের স্মরণশক্তি সাধারণের থেকে বেশি তাদের হয়ত মনে থাকবে যে কলকাতা শহরে নর্দমায় নেমে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা এটি প্রথম নয়। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারিখে কলকাতার কুঁদঘাট অঞ্চলে একইভাবে নর্দমায় নেমে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হয় চার শ্রমিকের। এই ঘটনার পরে আদৌ কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কে বা কারা দোষী সাব্যস্ত হল, তাদের কী শাস্তি হল এই প্রশ্নের উত্তর অনেক খুঁজলেও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনযাপনে কখনও আমরা কল্পনাও করতে পারি না যে আমাদের আত্মীয়পরিজনকে এই ধরনের বিপজ্জনক এবং অস্বাস্থ্যকর কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ২৫ বছর কেটে যাওয়ার পরেও আমাদের সহ-নাগরিকদের পেটের তাড়নায় এই ভয়াবহ কাজ করতে হচ্ছে। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চন্দ্রযান, জেনেটিক্স, রোবোটিক্স ইত্যাদি প্রযুক্তি নিয়ে জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ পড়ছি, লিখছি, আশা করছি যে প্রযুক্তির হাত ধরে মানুষ হয়ত একদিন অমর হবে, অথবা মঙ্গলগ্রহে গিয়ে বসতি তৈরি করবে। কিন্তু আমাদের শহরে কিছু মানুষকে এখনও দৈনিক কালো অন্ধকার পূতিগন্ধময় নর্দমায় নামতে হচ্ছে জীবিকা নির্বাহের জন্য, তা আমাদের মনে আদৌ কোনো রেখাপাত করে না। কারণ আমাদের বর্ণ ও শ্রেণিগত অবস্থানের জন্য আমরা জানি যে আমাদের প্রার্থনা মেনে ‘আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’ যদি সত্যি নাও হয়, তবু আমার সন্ততিকে কখনও নর্দমায় নামতে হবে না।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ম্যানহোল অথবা সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে নেমে মৃত্যু হয়েছে ৪০০ জন শ্রমিকের। এদের প্রত্যেকের নাম বা পদবি দেখলে একটি কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে এদের অধিকাংশই দলিত অথবা অন্যকোনো পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষ। এই নিম্নপ্রকৃতির কাজ করার জন্য সহস্র বছর ধরে চলে আসা জাতিপ্রথার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। উচ্চবর্ণের হিন্দু নয়, মল-মূত্র পরিষ্কার করার কাজ যুগ যুগ ধরে করে চলেছে নিম্নবর্ণের মানুষেরা।
কিন্তু দেশে একটি সংবিধান আছে, যেখানে অস্পৃশ্যতাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষ মল-মূত্র পরিষ্কার করবে অথবা নোংরা নর্দমায় নামবে তার বিরুদ্ধে দেশে আইন রয়েছে। কিন্তু এখনও হাজার হাজার মানুষ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। যেহেতু তারা তথাকথিত নোংরা কাজ করে, তাই জাতিবিভক্ত ভারতীয় সমাজ তাদের দূরে ঠেলে রেখেছে সমাজের মূলস্রোত থেকে। তাই তাদের অবস্থার বিশেষ উন্নতি হচ্ছে না।
অথচ প্রযুক্তি রয়েছে যন্ত্রের সাহায্যে ম্যানহোল বা নর্দমা পরিষ্কার করার। কেরল রাজ্যে সরকার ২০২৩ সালে ঘোষণা করেছে যে রোবটের মাধ্যমে ম্যানহোল বা নর্দমা পরিষ্কার করা হবে, কোনো মানুষকে এই কাজ আর করতে হবে না। প্রযুক্তি রয়েছে, রোবট রয়েছে, শুধু অভাব থেকে যাচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার। আর তার শিকার হচ্ছেন গরীব মানুষ, যাদের আজও নামতে হচ্ছে ম্যানহোলে!
কলকাতায় যেদিন সেই তিন শ্রমিক প্রাণ হারালেন, তার ঠিক দিন কয়েক আগে, ২৯ জানুয়ারি ২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ জারি করেন যে দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই তথা হায়দ্রাবাদের মতন শহরে অবিলম্বে মানুষের মাধ্যমে ম্যানহোল পরিষ্কার করার প্রথা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশের পরেও কলকাতা শহরের বুকে এই ঘটনা ঘটল। বামপন্থীরা, যাদের শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে থাকার কথা, তারা কি এই বিষয় নিয়ে মুখর হবেন? তারা কি সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করবেন কলকাতা কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার, কারণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও কেন যন্ত্রের সাহায্য না নিয়ে শ্রমিকদের নামানো হল ম্যানহোলে?