আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩১

প্রবন্ধ

জাতের নামে বজ্জাতি সব

অম্বিকেশ মহাপাত্র


"জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছে জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান,
তাই তো বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশো-খান!"

ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষ

না চাইলেও এবং দুর্ভাগ্যজনক হলেও ইহাই সত্যি, ঐতিহাসিক সত্যি। দেশের ১৯০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তি ঘটেছে দেশভাগ, ফলশ্রুতিতে দাঙ্গা এবং বহু সংখ্যক হতাহতের মধ্য দিয়ে। একদিকে দুই ভূখণ্ড (পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান; মধ্যিখানে ভারত ভূখণ্ড, দূরত্ব প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার) মিলে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান; অপরদিকে মধ্যিখানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতবর্ষের আত্মপ্রকাশ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং হিন্দু মহাসভা ভারতবর্ষকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে চাইলেও আপামর দেশবাসীর চাহিদাকে মর্যাদা দিয়ে ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই প্রয়োজন অনুসারে, বহু আলোচনা এবং মতামতের ভিত্তিতে রচিত এবং গৃহীত হয় 'ভারতীয় সংবিধান'। “নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান,/ বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান” এবং তার সাথে “হাতে হাত রেখে মিলি একসাথে,/ আমরা আনিব নতুন ভোর”কে রূপায়নে সংকল্পবদ্ধ ভারতবর্ষের সংবিধানের ‘প্রস্তাবনা’-র প্রথম বাক্যে সেকারণেই লেখা হল - “We, THE PEOPLE OF INDIA, having solemnly resolved to constitute India into a SOVEREIGN SOCIALIST SECULAR DEMOCRATIC REPUBLIC and to secure to all its citizens: JUSTICE, Social, Economic and Political; LIBERTY of thought, expression, belief, faith and worship; EQUALITY of status...”। সংবিধান রচয়িতা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ড. ভীমরাও রামজী আম্বেদকর। সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রস্তাবক ছিলেন জওহরলাল নেহেরু। আরএসএস গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের 'সংবিধান'-রচয়িতাদের বিরুদ্ধাচরণে ড. ভীমরাও রামজী আম্বেদকর এবং জওহরলাল নেহেরুর কুশপুতুল পুড়িয়েছিল।

১৯২৫ সালে পরাধীন ভারতে গঠিত হয়েছিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠন 'আরএসএস'। ‘মুসলিম লীগ’-এর নেতা মহম্মদ আলি জিন্নার প্রচেষ্টায় দেশভাগের মধ্য দিয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠিত হলেও, আরএসএস-এর প্রচেষ্টায় ভারতবর্ষকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানো যায় নি। আরএসএস-এর সমস্ত রোষ গিয়ে পড়ে মূলত কংগ্রেসের উপর। প্রধানতঃ দাঙ্গার প্রতিবাদে সোচ্চার এবং প্রতিরোধে সক্রিয় কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধীর উপর। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের প্রায় সাড়ে ৫ মাসের মধ্যে, সদ্য-স্বাধীন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে, আরএসএস কর্মী নাথুরাম গডসের তিনটি গুলিতে নিহত হন রবি ঠাকুরের ‘মহাত্মা’। স্বাধীন ভারতবর্ষে সেই আরএসএস তার বহু শাখা-প্রশাখা (বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল, জনসঙ্ঘ, দুর্গা বাহিনী, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ,... ইত্যাদি) বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সেই প্রয়াসে সংসদীয় রাজনীতির প্রয়োজনে ১৯৮০ সালে আরএসএস-এর রাজনৈতিক দল 'ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)' আত্মপ্রকাশ করে।

আক্রান্ত ধর্মনিরপেক্ষতা

বিজেপি প্রথম নির্বাচনে ৫৪৩ আসনের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় মাত্র ২টি আসনে জয়লাভ করলেও, পরবর্তী সময়কালে লালকৃষ্ণ আদবানীর নেতৃত্বে রামের নামে হিন্দু্ত্বের রথযাত্রা, পরিকল্পনামাফিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা, মুসলিম বিরোধী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, পারস্পরিক ঘৃণা ও বিভেদের রাজনীতি, সংঘটিত গুজরাট গণহত্যা, কর্পোরেট পুঁজির এবং কর্পোরেট মিডিয়ার ব্যবহারে ২০১৪ সাল থেকে গুজরাট গণহত্যার সময়ের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ দেশের সরকারে আসীন হয়। ২০১৪ সাল থেকে লোকসভায় বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা ও বালাকোর্ট ঘটনার ফসল তোলে বিজেপি, এককভাবে ৩০৩ আসনে জয়লাভ করে। নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বে বিগত ১০ বছর দেশব্যাপী হিংসা, বিভেদ-বিভাজনের রাজনীতি অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বহু মানুষকে কারান্তরালে নিক্ষেপ করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে জনবিরোধী, কৃষক বিরোধী, শ্রমিক বিরোধী, শিক্ষা বিরোধী, সেনা বিরোধী, নাগরিক অধিকার বিরোধী তথা সংবিধান বিরোধী,... বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে। এই সকল অবস্থার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘মোদি কা পরিবার’, ‘মোদি কা গ্যারান্টি’, ‘আব কি বার মোদি সরকার’, ‘আব কি বার ৪০০ পার’, রামের নামে ভোট, সংবিধান বদলে হিন্দু রাষ্ট্র,... ইত্যাদি স্লোগান সামনে আসে। আর্থিক এবং সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত দেশবাসীর সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়, নির্বাচনের পর 'ভারতীয় সংবিধান' অপরিবর্তিত থাকবে কিনা? না হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষিত হবে? সেকারণে দেশের স্বাধীনতালাভের ৭৫ বছর পর 'আজাদী কা অমৃত মহোৎসব' উত্তরকালে অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনে প্রধান স্লোগান হিসেবে সামনে উপস্থিত হয় 'হিংসা ও বিভেদ-বিভাজন নয়'। তার সঙ্গে ‘মোদি হটাও, দেশ বাঁচাও, সংবিধান বাঁচাও’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা কর'।

ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায়

এই প্রেক্ষিতে, এই সময়কালে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আদ্যোপান্ত ধর্মনিরপেক্ষ কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে দুখু মিঁয়া। যিনি আজ থেকে ১২৫ বছর আগে পরাধীন ভারতের বঙ্গ প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে গরীব মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শুরুতে যাঁর কবিতার একটি স্তবক উদ্ধৃত করেছি। শুধু একটি কবিতা নয়, আরও বহু কবিতা এবং গানের মধ্য দিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের ধর্মনিরপেক্ষ এবং বিদ্রোহী সত্তা প্রকাশিত হয়েছে। যে কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নজরুলের নাম ‘রবীন্দ্র-নজরুল’ একসাথে উচ্চারিত হয়ে আসছে। তারই সঙ্গে এই বাংলা ‘রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলা’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আজকের ভারতবর্ষের এই সঙ্কটকালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলকে জানা এবং তাঁর মানবিকতার পক্ষে আহ্বান নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত জরুরি।


কৈশোরে নজরুল ইসলাম।

ব্রিটিশ শাসনাধীন পরাধীন ভারতে, ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ), দুখু মিঁয়া অধুনা পশ্চিম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের এক বাঙালি মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া ব্লকে। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান দুখু মিঁয়া। মাত্র ন’বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে নজরুলের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। মাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে হয়েছিল। সেই সময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে হাজি পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন (আজান দাতা) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকর্মকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনিই বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার চর্চা শুরু করেছিলেন।

মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজ নজরুল বেশিদিন করেন নি। বালক বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল) দলে যোগ দেন। এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, অভিনয় শিখতেন এবং নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। নিজ কর্ম এবং অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলা এবং সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করেন। একইসাথে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ পুরাণসমূহ অধ্যয়ন করতে থাকেন। সেই অল্প বয়সেই তাঁর নাট্যদলের জন্য বেশকিছু লোকসঙ্গীত রচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং মেঘনাদ বধ কাব্য। একদিকে মক্তব, মসজিদ ও মাজার জীবন, অপরদিকে লেটো দলের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নজরুলের সাহিত্যিক জীবনে অনেক উপাদান সরবরাহ করেছে। নজরুল দেবী কালী-কে নিয়ে প্রচুর শ্যামাসঙ্গীতও রচনা করেছেন। নজরুল তাঁর শেষ ভাষণে উল্লেখ করেন - “কেউ বলেন আমার বাণী যবন কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনওটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।”


ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর 'বেঙ্গল রেজিমেন্ট'-এর পোশাকে নজরুল (১৯১৭)।

স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সৈনিক জীবন ত্যাগ করে নজরুল 'বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি'র অফিসে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সাথে বাস করতেন। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ছিলেন এদেশে সমাজতান্ত্রিক তথা কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা। এখান থেকেই নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ শুরু হয়। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সাথে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও বক্তৃতায় অংশ নিতেন। সেই সময় থেকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সাথে পরিচিত হন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাঁকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর-ই পরিচালিত ‘লাঙ্গল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকায় তিনি প্রকাশ করেছেন, ‘সাম্যবাদী ও সর্বহারা’ বিষয়ক কবিতাগুচ্ছ। এরই সাথে 'কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল' গান প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। পরবর্তীতে মোহিত বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত গানটি ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। মোহিত বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত গানটি নিম্নরূপ -

“জাগো, জাগো, জাগো সর্বহারা
অনশন বন্দী ক্রীতদাস,
শ্রমিক দিয়াছে আজ সাড়া
উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস
সনাতন জীর্ণ কু-আচার
চূর্ণ করি জাগো জনগণ
ঘুচাও এ দৈন্য হাহাকার
জীবন মরণ করি পণ।
শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেড
এসো মোরা মিলি একসাথ,
গাও ইন্টারন্যাশনাল
মিলাবে মানবজাত।।”

মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং শৈশবে ইসলামী শিক্ষায় দীক্ষিত এবং প্রথাগত উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তিনি বড় হয়েছিলেন একটি 'ধর্মনিরপেক্ষ' সত্তা নিয়ে। একই সঙ্গে তাঁর মধ্যে বিকশিত হয়েছিল একটি 'বিদ্রোহী' সত্তাও। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাজদ্রোহিতার অপরাধে কারাবন্দী করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন অবিভক্ত ভারতের বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রধান বাঙালি কবি ও সঙ্গীতকার নজরুল-ই। মাত্র ২৩ বছরের তাঁর সাহিত্যিক জীবনে সৃষ্টির যে প্রাচুর্য, তা তুলনারহিত। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কবি। বিংশ শতাব্দীর বাঙালির মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁর কবিতা ও গানের জনপ্রিয়তা বাংলাভাষী পাঠকের মধ্যে তুঙ্গস্পর্শী। তাঁর মানবিকতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধতাবোধ এবং নারী-পুরুষের সমতার বন্দনা গত প্রায় একশত বছর যাবৎ বাঙালির মানসপীঠ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে। এখানেই আজকের সময়কালে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক নজরুলের কবিতা/গানের বিভিন্ন অংশ।

“মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।।
এক সে আকাশ মায়ের কোলে
যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।।
এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,
এক সে মায়ের বক্ষে ফলাই একই ফুল ও ফল।
এক সে দেশের মাটিতে পাই
কেউ গোরে কেউ শ্মাশানে ঠাঁই
এক ভাষাতে মা’কে ডাকি, এক সুরে গাই গান।।”

আবার কখনও

“মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি আমি সেই দিন হব শান্ত!”


চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডন সফরকালে নজরুল ইসলাম।

নজরুল সুগঠিত দেহ, অপরিমেয় স্বাস্থ্য ও প্রাণখোলা হাসির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। কিন্তু ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল আকস্মিক মারাত্মকভাবে স্নায়বিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে তাঁর সকল সক্রিয়তার অবসান ঘটে যায়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু অবধি সুদীর্ঘ ৩৪ বছর তাঁকে সাহিত্যকর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছিল। পৃথিবীর মানচিত্রে ১৯৭১ সালে স্বাধীন এবং নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশের পর, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার সপরিবারে কবিকে কলকাতা থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করে। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। ২৯শে আগস্ট ১৯৭৬, বাংলাদেশেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পরাধীন ভারতে জন্ম, শিশুকাল থেকে ইসলাম ধর্ম এবং পরিবেশের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, প্রথাগত শিক্ষার চাক্যচিক্য রহিত সাহিত্যিক, কবি, সঙ্গীতকার, বিদ্রোহী কবি, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু স্মরণ নয়, তাঁর ভাবনাকে গ্রহণ এবং বিস্তার জরুরি। বিদ্রোহী কবির জন্মের ১২৫ বছর পর আমার অন্তরের শ্রদ্ধা এবং রক্তিম অভিবাদন।