আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩১
প্রবন্ধ
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকট
নিখিলরঞ্জন গুহ
বাংলাদেশে এখন একটা জবরদখলের সরকার চলছে। কিছু উপদেষ্টাদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বতী সরকারের হাতে এখন সেই দেশের ভবিষ্যৎ। এটাকে 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' হিসেবে দাবি করলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এটা সে দেশে একটা অন্ধকার যুগের সূচনা যার ভিত্তি হল মৌলবাদী শক্তির অভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতার আন্দোলন আসলে ছিল একটা মুখোশ। সেখানে মুখোশের আড়ালে ভূ-রাজনীতিতে আধিত্যবাদী রাষ্ট্রশক্তির প্ররোচনা যেমন বর্তমান ছিল তেমনই ছিল মৌলবাদীদের তৎপরতা। তবে তাতে বিভ্রান্ত সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল না, একথা বললে ভুল হবে। সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রশাসন তার দায় এড়াতে পারে না।
মনে রাখতে হবে যত বড়ো সাফল্যই সে হোক, তা সরকার বা দলের স্বৈরতন্ত্রকে মান্যতা দিতে পারে না। বাংলাদেশের ঘটনা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দলীয় স্বার্থে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করার উদ্দেশ্যে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধন বাকশাল (Bangladesh Krishak Sramik Awami League -BaKSAL) [Bangladesh Worker-Peasant's People's League] আইন পাশ (২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫) জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমনের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করেছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্য রাজনৈতিক দল ভেঙে দিয়ে 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) নামে জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই দলের চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু নিজে এবং সম্পাদক হন এম. মনসুর আলী।
কাগজে কলমে তা থেকে সরে এলেও হাসিনাকেও দেখা গিয়েছে সেই পথেই হাঁটতে। বিরোধীশূন্য শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক সহ সাধারণ মানুষও বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। প্রহসনের নির্বাচনে বিপুল সমর্থন নিয়েও তাই এখন তাঁকে ভারতের আশ্রয়ে থাকতে হচ্ছে। তাঁর প্রশ্রয়প্রাপ্ত দুর্নীতিগ্রস্থ প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা দুষ্টচক্রও তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি। রাষ্ট্রের চরিত্র ঠিক করে দেয় রাজনৈতিক দল; তাই রাজনৈতিক দলের চরিত্রের উপর রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ভর করে। দলীয় গণতন্ত্রের বিলোপ ঘটলে 'এক ব্যক্তি এক দল' চরিত্র বিশিষ্ট দলের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্রও নিজেকে বদলে ফেলে। এরকম ক্ষেত্রে গুটিকয়েক চাটুকারদের বলয়ের মধ্যে সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠা নেতৃত্বের হাতে থাকা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিপুল ক্ষমতা ও তার যথেচ্ছ ব্যবহার। রাষ্ট্র তখন সাধারণ মানুষের উপর উৎপীড়নের কারণ হয়ে দেখা দিয়ে থাকে। আধুনিক গণতন্ত্রের সংকট এখানেই নিহিত। দলগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দল যখন স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাসী হয় তখন তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে লড়াই করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও গণতন্ত্রের মোড়কে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়। কারণ সে ক্ষেত্রে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপাদানগুলিকে ব্যবহার করার সুযোগ থাকে।
শেখ হাসিনা সেই সুযোগ নিয়ে সরকার এবং দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সেখানে রাষ্ট্রের উপরে স্থান নিয়েছিল শাসকদল। তার দল আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বিলোপের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিল।
দি স্পিরিট অফ ল'স (The Spirit of Laws) গ্রন্থে ফরাসী দার্শনিক ব্যারন ডি মনটেস্ক্যু (Baron de Montesquieu) আদর্শ গণতন্ত্রের কাঠামো কী হওয়া উচিত তার ব্যাখ্যায় বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন এবং আইনসভাকে স্বতন্ত্র সত্তা বিশিষ্ট সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার কথা বললেও রাজনৈতিক দলগুলি তার প্রয়োগ নিয়ে একে অপরকে আক্রমণ করলেও ক্ষমতা দখলের পর তা তারা স্বীকার করতে রাজি থাকে না। দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন শক্তি এই ক্ষেত্রে শুধু কোণঠাসা হয়ে পড়ে তাই নয় প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে রাষ্ট্রশক্তির প্রয়োগ হতেও দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব জার্মানিতে এমনই ঘটেছিল। ফলে বহুদলীয় ব্যবস্থার বিপরীতে শুধু একদলীয় শাসনব্যবস্থাই গড়ে ওঠে না সেখানে তা একব্যক্তির শাসনে পরিণত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। অন্যভাবে বলা যায় স্বৈরতন্ত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
বাংলাদেশে মৌলবাদীদের উত্থানের উর্বর ক্ষেত্র রচনায় মানুষের গণতান্ত্রিক বোধের উপর নেমে আসা রাষ্ট্রের হিংস্রতা একটা বড়ো কারণ। আপাতভাবে অনেকের পক্ষেই এই সত্য স্বীকার করতে অসুবিধা হলেও মনে রাখতে হবে বর্তমান বিশ্বে বৃহত্তম জনসমষ্টির দেশ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির দুর্বলতাও সে দেশে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। বিপরীতে স্বাভাবিক নিয়মেই বাংলাদেশের মৌলবাদীরা পুষ্টি লাভ করেছে। তবে সেটাকেই শুধু কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না৷ সে দেশের সরকারি অনুগ্রহপ্রাপ্ত সুশীলসমাজের একটা বড়ো অংশই সরকারের নির্লজ্জ তোষামোদের কাজে নিজেদের বিবেককে বন্ধক রাখায় দলগতভাবে আওয়ামী লীগ নিজেকে যেমন সংশোধন করার সুযোগ পায়নি তেমনি তা সরকারকেও বেপরোয়া হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। যে সব দেশে রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্র বিদ্যমান সে সব দেশে দেখা যায় এই সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণ হিসেবে গ্রেট ব্রিটেন-র প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর পার্টির ত্রিশ বছরের ইতিহাসে সব থেকে সফল নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃত বরিস জনসনকে ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ খোয়াতে হয়েছিল। তবে তাতে সরকারের পতন ঘটেনি। দলের গণতন্ত্রই তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল (২০২২)। দলের মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী দল ও আইনের ঊর্ধ্বে নিজেকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে ব্যক্তিগত ঝোঁক বর্তমান থাকায় দল তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করেনি। এমনকী তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্বেও পার্লামেন্ট তাঁকে রেয়াত করতে রাজি ছিল না। একাধিক কারণ থাকলেও গুরুতর যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল কোভিড-১৯-এর সময় তাঁর আইন ভাঙার ঘটনা (Partygate Scandal) যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আকছার ঘটতে দেখা যায়।
একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর এই আচরণ তাঁর দল এবং পার্লামেন্ট মেনে নিতে পারেনি। বর্তমান ভূরাজনীতিতে এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল তাদের উপনিবেশ। এখন বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতার দায়ে অভিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনের গাঁটছড়া বাঁধা নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে; তবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে দল এবং দলের গণতন্ত্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। এখানে উল্লেখ করা দরকার গ্রেট ব্রিটেন-এর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবদন্তী নেতা জর্জ ওয়াশিংটনকে যখন তৃতীয়বারের জন্য (১৭৯৯) রাষ্ট্রপতির প্রস্তাব দেওয়া হয় তিনি দেশের সেই প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রধান পুরোহিত হয়েও জাতির জনক মুজিবুর রহমান নিজেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারেননি - তার কারণগুলিকেও ফেলে দেওয়া যায় না।