আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩১
প্রবন্ধ
৩২ নম্বর ধানমন্ডি
গৌতম লাহিড়ী
একটি ভবন - ৩২ নম্বর ধানমন্ডি। এক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল - বাংলাদেশ। গত ৬ ফেব্রুয়ারি এক উন্মত্ত 'জনতা' ভবনটি বুলডোজার শাবল দিয়ে গুঁড়িয়ে দিল। এরা কারা? যে ধানমন্ডি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার আঁতুড়ঘর তাকেই বিনষ্ট করল বিপরীত দর্শনে বিশ্বাসী নৈরাজ্যবাদীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের অনির্বাচিত প্রধান ধ্বংসলীলার নিন্দা না করে যুক্তি দিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত থেকে লাগাতার ভাষণ ‘ছাত্র জনতা’-কে উত্তেজিত করে দেয়। এই ‘ছাত্র জনতা’ ধানমন্ডির ছাদে সন্ত্রাসবাদী ইসলামিক স্টেট পতাকা উড়িয়ে জেহাদ ঘোষণা করল - যে বাড়ির ছাদে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ১৯৭১ প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ছিলেন। ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে গৃহবন্দি বঙ্গবন্ধু পরিবার প্রথম স্বাধীন দেশের পতাকা উড়িয়ে দেন।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনা ধানমন্ডি ঘিরে রাখলেও ধ্বংস করেনি। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ঢাকা এলেন। তারপর এখানেই বাস করতেন সপরিবারে। ১৯৭৫ সালে একদল সেনাবাহিনীর হাতে এই ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু সহ পরিবারের সকল সদস্য নিহত হন।
তার পর বাংলাদেশে সেনা শাসন চলে ১৯৯১ পর্যন্ত।
১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট এই বাড়িতেই ছিলেন শেখ হাসিনা। তখন তাঁর উপর একদল সশস্ত্র হামলাকারী হত্যার চেষ্টা করে। এরা ছিল 'বাংলাদেশ ফ্রিডম পার্টি'র সদস্য। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা হল বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরিকল্পনাকারী সায়েদ ফারুক আর রহমান, খন্দকার আব্দুর রশিদ ও বজলুল হুদা। এদের অভিযোগ ছিল বঙ্গবন্ধু স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালাচ্ছেন। আজ যেমন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ২০১৭ সালে এই দলের ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দি করেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ ‘অভ্যুত্থানের’ পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে আসতে বাধ্য হন। তারপর বেশিরভাগ জেলের দরজা খুলে বা ভেঙে এইসব জঙ্গিরা মুক্ত হয়। এরা এতদিন পর ধানমন্ডি ভেঙে প্রতিশোধ নিলেন। ধানমন্ডি যখন ভাঙ্গা হয় তখন গুটিকয় লুটেরা ছাড়া এরাই দখল করেছিল।
সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হল ‘চল ধানমন্ডি।’ বুলডোজার মার্চ। সব জেনেও নীরব রইল ইউনূস প্রশাসন। ধানমন্ডি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লা (জামায়েত ছাত্র শিবির) গর্বের সঙ্গে ফেসবুক পোস্ট দিল, "আজ রাতে ফ্যাসিবাদের তীর্থক্ষেত্র থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ।"
ভারত থেকে গর্জে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা। ফেসবুক লাইভ-এর মাধ্যমে তিনি বলেন, "কয়েকটা বুলডোজার দিয়ে দেশের স্বাধীনতা মুছে ফেলা যায় না। একটা ভবন ধ্বংস করতে পারে - ইতিহাস মোছা যাবে না।"
বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার আগে শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকায় কোনো নিজস্ব বাসভবন ছিল না। ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। অনেক সময় বাড়ি ভাড়া পেতে সমস্যা হতো। পাকিস্তানি শাসকদের চাপে বাড়িওয়ালা ভাড়া দিতে চাইত না। শেষে বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব ঢাকায় এক টুকরো জমির জন্য আবেদন করেন। ১৯৫৭ সালে পূর্ত বিভাগ থেকে ৬ হাজার টাকা মূল্যে এক বিঘা জমি কেনেন। প্রথমে ২ হাজার টাকা দেন। বাকি ৪ হাজার টাকা কিস্তিতে দিতে হবে। ১৯৬০ সালে বঙ্গবন্ধু আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ৩ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। সেই টাকায় বাড়ি তৈরি শুরু করেন। ১৯৬১ সালে এই বাড়িতে উঠে আসেন। তারপর ধানমন্ডির বাড়িতে ইতিহাস তৈরি হল।
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু এই বাড়ি।
১৯৬২ সালে পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শিক্ষানীতি প্রবর্তনের জন্য কমিশন গঠন করেন। কমিশনের চেয়ারম্যান হন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এস. এম. শরীফ। শরীফ কমিশন সুপারিশ করল পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ইংরেজি বাধ্যতামূলক।
ঢাকা কলেজের ছাত্ররা গর্জে উঠল। পাকিস্তান সরকার হুসাইন সুরাবর্দিকে গ্রেপ্তার করল, ইনি শেখ মুজিবের নেতা ছিলেন। এবার গোটা আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন মুজিবুর। ধানমন্ডি হল আন্দোলনের কেন্দ্র। বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে শুরু হল আন্দোলন।
১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর রাশিয়ার তাসখন্দে চুক্তি হল প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মধ্যে - যুদ্ধবিরতি চুক্তি। ৪ ফেব্রুয়ারি মুজিবুর রহমান লাহোরে গেলেন ছয় দফা প্রস্তাব নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার ও বাংলা ভাষার মর্যাদা। এই প্রস্তাবকে 'বিছিন্নবাদী' আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান খারিজ করে। ধানমন্ডির বৈঠকের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের কর্মসমিতির বৈঠকে গৃহীত হয়।
১৯৭০ সালের পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির নির্বাচন পরিকল্পনা হল ধানমন্ডিতে। তাতে শেখ মুজিবের 'আওয়ামী লীগ' নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পশ্চিম পাকিস্তান তা মানলো না। এবার শুরু 'স্বাধীনতা সংগ্রাম' - মুক্তির সংগ্রাম।
বাংলা স্বাধীন হল ধানমন্ডির বাড়ি থেকে। সেই ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। সন্ত্রাসবাদীদের জয় সাময়িক। চিরস্থায়ী নয়।