আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩১

সমসাময়িক

প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকা সফর


প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমেরিকায় গিয়েছেন তাঁর ‘পুরোনো বন্ধু’ এবং পুনর্নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করতে। এর আগেও এই দুই রাষ্ট্রনেতা সাক্ষাৎ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় গিয়ে সমস্ত ঐতিহাসিক নজির ভেঙে ট্রাম্পকে নির্বাচনে জয়ী করতে আহ্বান জানিয়ে এসেছিলেন। তার পাল্টা রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প এদেশে এসে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে পুনর্নিবাচিত করতে উৎসাহ দেন। কূটনৈতিক সীমা ও পরম্পরা লঙ্ঘন করে দুই নেতাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার দায় তাদের নেই। মসনদকে তারা ব্যক্তিগত সাফল্যের রূপক হিসাবেই দেখেন। ফলে তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েও নরেন্দ্র মোদী তাঁর ব্যক্তিগত দায় মেটাতেই বদ্ধপরিকর। দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, হিংসা, জাতি বিরোধ মেটানোর থেকেও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষক, আদানি-আম্বানি সহ অতিবৃহত ভারতীয় পুঁজিপতিদের মুনাফা নিশ্চিত করা। তাই পারলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরেও তাদের একচেটিয়া দখলের অধিকার দিতে তিনি মরিয়া। সংসদে একের পর এক আইনে সংশোধন আনা হয়েছে সেই লক্ষ্যে। তাই আমেরিকান সাংবাদিক আদানীর দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করলে, মোদী তা 'ব্যক্তিগত বিষয়' বলে দাগিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে।

একইভাবে তাঁর মিত্র, ডোনাল্ড ট্রাম্প মসনদে এসেছেন আমেরিকার ধনকুবের, যাদের একজন তিনি নিজেও, এবং বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষা করতে। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ এই ঢক্কানিনাদের পিছনে আসল উদ্দেশ্য হল, আমেরিকার বাইরের বাজারে আমেরিকান পণ্যের প্রভাব বাড়ানো। ফলে গদিতে বসেই তিনি শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেছেন, যা আমেরিকার সাধারণ মানুষের ভালোর চেয়ে বেশী ক্ষতিই করবে। আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে আমেরিকার ভিতর নিজস্ব পণ্যের বাজার বাড়ানোর অর্থ, সেদেশের সাধারণ মানুষকে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করা। ফলে আমেরিকা আবার মহান হবে মানে যে আমেরিকায় বৃহৎ পুঁজির পৌষমাস, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু আমরা, আদার ব্যাপারী, আমেরিকার চেয়ে এদেশের কপালে কি জুটল, তাই বরং খতিয়ে দেখা যাক।

এ দফায় নরেন্দ্র মোদীর ট্রাম্প সাক্ষাতের প্রেক্ষিতটি ছিল বিতর্কিত। রাষ্ট্রপতি হয়েই ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, আমেরিকা থেকে সব অবৈধ অভিবাসীদের তিনি তাড়িয়ে ছাড়বেন। ফলে তিন দফায় তারা ৪৬৭ জন চিহ্নিত অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীদের ফেরত পাঠাবেন। প্রথম দফায় তারা ২০৭ জনকে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে, দস্তুরমতো একটি দৃশ্য নির্মাণ করে, সেনাবাহিনীর মালবাহী বিমানে করে ফেরত পাঠিয়েছে। যে দৃশ্য গোটা দেশেই আলোড়ন ফেলেছে। সংসদে বিরোধীরা সোচ্চার হয়েছেন। মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে, বস্তুত অবাঞ্ছিত অপরাধীর মতো ভারতীয়দের ফেরত পাঠানো যে একটি কূটনৈতিক বার্তা তা সবাই বোঝেন। কিন্তু সমস্যা হল, ভারতের বর্তমান ছাপ্পান্ন ইঞ্চির সরকারের এই কিল হজম করা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। ফলে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে মোদী যতই বলুন, ‘মেক ইন্ডিয়া গ্রেট এগেইন’ হবে, আসলে তিনি যে আমেরিকার চরণতলে করজোড়ে বসতে গেছেন, তা তিনি নিজেও জানেন। শুধু তাই নয়, এই নিয়ে মোদী ও তাঁর দলও যে একই ভাবনার সামিল সেটা ভোলেন কিভাবে। এ দেশেও তার রাজনীতি তো মুসলমানদের অবৈধ দখলদার ঘোষণা করেই চলছে। ফলে মোদী ও ট্রাম্প, একই নৌকার সওয়ারী।

অবশ্য ভারতীয় জনতা পার্টির প্রচার মাধ্যম ঘাড় নেড়ে বলছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ কি করেই বা মেনে নেওয়া যায়। এ তো বেআইনী। ফলে যা ঘটেছে তাতে ভুল কিছু নেই। প্রশ্ন কেবল হাতে শিকল পরানো, বা অপরাধীর মত গণ্য করায় নয়। এদেশের আম জনতার একটি অংশ, যারা বৈধ প্রক্রিয়ায় আমেরিকা বা অন্য দেশে যান, উন্নততর জীবিকার জন্য, তারাও এভাবেই ভাবেন। অথচ কেউ কি এই প্রশ্নটি করেছেন, যে মানুষগুলো অবৈধভাবে গেছেন, বা এদেশে আসছেন, তারা কিভাবে আসছেন। এরা প্রত্যেকেই বিপুল অর্থ খরচ করে, অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে, এমনকি প্রাণ সংশয় ঘটিয়ে এই পথে যান। এ কি কেবল কিছু বেশী টাকার লোভে? নাকি এই অভিবাসনের পিছনে দায়ী এই উৎপাদন ব্যবস্থার ভ্রান্ত নীতি, যা সাধারণ মানুষকে বাধ্য করে পরিযায়ী হতে।

নয়া উদারবাদী অর্থনীতি বা মুক্ত বাজার অর্থনীতি কার্যকরী হওয়া থেকেই গোটা দুনিয়া জুড়ে বাড়তে থাকে আয়ের বৈষম্য। তৃতীয় বিশ্ব তথা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই বিভাজন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সমাজের একটা ছোট্ট অংশের হাতে দ্রুত জমা হতে থাকে সম্পদ, আর বাকি অংশ তলিয়ে যেতে থাকে দারিদ্রে। সেই ধারা আজও বহমান। ফলে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আয়ের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। বিগত পাঁচ দশকে কোনো সরকারই এই সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। ফলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষ বরাবরই চেষ্টা করে গেছেন কোনওভাবে বাড়তি আয়ের জন্য। স্বদেশে সে সুযোগ না ঘটলে তারা এই আশায় বিদেশে গেছেন বেশী মজুরির আশায়। ভারতে যেখানে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম আয় দৈনিক ১৭৮ টাকা, সেখানে আমেরিকায় সেই হার ঘন্টায় ৬৫০ টাকার মতো। ফলে এদেশের পরিযায়ী শ্রমিক যে আমেরিকায় যেতে চাইবে তা বলাই বাহুল্য। তারা হয়ত এই হারের থেকে কম হারেই কাজ পাবেন, কিন্তু যা পাবেন তাও অনেক বেশী। ফলে একজন প্রযুক্তিবিদ যে কারণে বিদেশ যান, একজন অশিক্ষিত পরিযায়ী শ্রমিকও ঠিক সেই আশাতেই বিদেশ যেতে চান। কিন্তু বৈধ পথে যাওয়ার প্রশ্নে সরকারি নিয়ম বড্ড কড়া। কোনো দেশই তার অভ্যন্তরীণ শ্রম বাজারকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করতে রাজি নয়। ফলে আইন মেনে অতি অল্প সংখ্যক, মূলত খুব বিশেষ দক্ষতাসম্পন্নদেরই সেই সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে, বাকি অংশের কাছে বেআইনি পথ ভিন্ন অন্য কোনো রাস্তা পড়ে থাকে কি? অন্যদিকে উন্মুক্ত বাজার, পুঁজির চলাচলে কোনো বাধা রাখেনি। ফলে প্রথম বিশ্বের রপ্তানি করা সংকট যখন তৃতীয় বিশ্বকে শুকিয়ে দেয়, তখন মরিয়া হয়ে বাঁচতে চাওয়াকে কি বেআইনি অভিবাসন বলা চলে?

এমনকি আজ উন্নত দেশগুলোতেও এই বৈষম্য বাড়ছে। ফলে আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে, 'আমেরিকা প্রথম' নীতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। তবে তার মানে এই নয় যে আমেরিকাতে ট্রাম্প সাধারণ মানুষের জীবিকার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর এখন লক্ষ্য তাঁর নিজস্ব নির্বাচকমন্ডলীকে খুশি করতে তাঁর নীতির কিছু দৃশ্য সাফল্য তৈরী করা। সেই জন্যই অবৈধ অভিবাসীদের হাতকড়া পরিয়ে সেনাবাহিনীর বিমানে তোলা হয়েছে। অথচ আজ থেকে দুই দশক আগেও ট্রাম্প ও তাঁর বন্ধু শিল্পপতিরা এইসব অভিবাসীদের সস্তার শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে আজকে তাঁর 'আমেরিকা প্রথম' ঘোষণা আসলে তাঁদের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে বেরোনোর এক উপায় হিসাবেই দেখা উচিত। ট্রাম্প-মোদির যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী, ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য সমানে সমানে হবে। তার শর্ত হিসাবে ভারতকে আমেরিকা বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র এবং খনিজ তেল বিক্রি করবে। এমনকি, ভারতীয় বাজারে আমেরিকার পণ্য যাতে কম শুল্কে বেচা হয় তাও ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু এর ফলেই কি ভারত শুল্ক যুদ্ধ থেকে রেহাই পাবে, বা বেআইনি ভারতীয় অভিবাসীদের সাথে নরম আচরণ করা হবে? এমন কোনো বার্তা আজ অবধি মেলেনি।

বরং যা আশঙ্কা করা যায় তা হল, এই বিপুল দায় মেটাতে ভারতীয় কোষাগারে চাপ পড়বে। ফলে জনমুখী প্রকল্পে বরাদ্দ কমবে। যা এদেশে আয়ের বৈষম্যকে আরও প্রকট করবে। একই সাথে, ভারতীয় পণ্যের ওপর চড়া হারে শুল্ক লাগু হলে, ভারতীয় রপ্তানি কমবে। যার প্রভাব এদেশের উৎপাদন ক্ষেত্রে সরাসরি পড়বে। বেকারি বাড়বে। আরও বেশী মানুষ গরীব থেকে গরীবতর হবেন। ফলে বেআইনি অভিবাসন আরও বাড়বে। কিন্তু মোদি সরকার কি এই সংকট বুঝতে পারছেন না? বিলক্ষণ তারা বুঝছেন। কিন্তু স্বখাত সলিলে যাওয়া এই সরকারের কিছু করার নেই। নিজের দেশের বাজারের সঙ্কটকে তারা অস্বীকার করে গেছেন বিগত ১০ বছর ধরে। শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য থেকে ক্রমে হাত গুটিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রকে পঙ্গু করে ছেড়েছে মোদি সরকার। ফলে প্রযুক্তির উদ্ভাবন নেই। স্বাস্থ্য থেকে প্রতিরক্ষা প্রতি ক্ষেত্রেই ভারত আজ পরনির্ভরশীল। অন্যদিকে অতিমারী পরবর্তী সময়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে না পারা, জীবিকার সংস্থান করতে না পারা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রায় স্থিতাবস্থায় এনে ফেলেছে বিজেপি সরকার। ফলে রপ্তানি বাণিজ্য এখন এদেশের বৃহৎ পুঁজির কাছে একমাত্র বাঁচার উপায়। এই দুইয়ে মিলে যে প্রাণান্তকর অবস্থায় বিজেপি সরকার দেশকে এনে ফেলেছে, সেখানে কিল খেয়ে কিল হজম করা ছাড়া আর গতি নেই। ফলে আগামীদিনে যে ভারতের বিদেশনীতি থেকে বাণিজ্যনীতি সবই ট্রাম্প নির্ধারিত হবে তা বলাই বাহুল্য। বিরোধী রাজনীতি যদি সদর্থক ভূমিকা নিতে না পারে তাহলে ভারতীয়দের হাতে শিকল পরিয়ে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে।