আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩১
সমসাময়িক
মণিপুর কোন পথে?
৬-৪-১। সত্যি সত্যিই ৬৪১ দিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ মণিপুরের প্রশাসনে একটা নতুন পরিস্থিতির সূচনা হল। বিধানসভায় শাসকদলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচিত সরকার বাতিল। মুখ্যমন্ত্রী অবিশ্যি দিন চারেক আগেই পদত্যাগ করেছেন। বলা ভালো, পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে, দেশে প্রথমবারের মতো কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েম করতে হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ব্যর্থতার জন্য রাজ্যে সাংবিধানিক সঙ্কট দেখা দেয়। ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ না নিলে এবং সেদিনই বিধানসভার অধিবেশন না বসলে সংবিধানের ১৭৪(১) ধারা মতে বিধানসভা ভেঙে যেত। কারণ, সর্বশেষ বিধানসভার অন্তিম অধিবেশনের দিন থেকে ছয়মাসের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন শুরু করতেই হয়। সেই হিসাবে ১২ ফেব্রুয়ারি ছিল চূড়ান্ত সময়সীমা। শাসকদলের দিল্লির নেতারা একথা জানতেন না, এমন নয়। কাজেই ইচ্ছাকৃতভাবেই চূড়ান্ত সময়সীমা পেরিয়ে যেতে দেওয়া হয়। স্বাভাবিক কারণেই সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হয়। রাজ্যে সাংবিধানিক সঙ্কট কাটাতে বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা ঘোষণা করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সংবিধানের ৩৫৬ ধারা জারি করা হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে জারি করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, 'মণিপুরের রাজ্যপালের রিপোর্ট ও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে মণিপুরে সরকার চালানোর মতো অবস্থা নেই। তাই সংবিধানের ৩৫৬ ধারা জারি করা হয়েছে।’ অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মাধ্যমে স্বীকার করে নেওয়া হল যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও মণিপুরে সরকার চালাতে শাসকদল ব্যর্থ। কেন্দ্র ও রাজ্য দুই নেতৃত্বকেই এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করতে হবে। তথাকথিত ডাবল ইঞ্জিনের একটি বিকল হলেও আশঙ্কা করা অমূলক নয় যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে জম্মু কাশ্মীরকে যেভাবে টুকরো টুকরো করে রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, মণিপুরেও কি একই পদ্ধতির প্রয়োগ করা হবে?
মণিপুর হাইকোর্টের অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত রায় ঘোষণার অব্যবহিত পরেই রাজ্যের দুই প্রধান জনগোষ্ঠীর বিভাজন প্রকট হয়ে ওঠে। ২০২৩-এর মার্চ মাসে হাইকোর্ট তপশিলি জাতি (এসসি) বলে স্বীকৃত মেইতেই জনগোষ্ঠীকে তপশিলি উপজাতির (এসটি) মর্যাদা দেয়। তপশিলি উপজাতির কুকি-জো সম্প্রদায়ের মানুষ এই রায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকে। কারণ, এই রায় ঘোষণার সঙ্গে তাদের অস্তিত্বের সঙ্কট দেখা দেয়। ২০২৩-এর মে মাসের তৃতীয় দিনে শুরু হয় দুই জনগোষ্ঠীর সরাসরি সংঘাত। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শুরু হয়ে যায় দুই জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগ্রাম। দু’ পক্ষই নিজের এলাকার নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেয়। রাজ্য পুলিশ পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রচুর সংখ্যায় কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, অস্ত্রাগার লুণ্ঠন থেকে শুরু করে সামগ্রিক নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। ফলাফল, সরকারি মতে শ’ তিনেক প্রাণহানি, অজস্র বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, কয়েক হাজার আহত এবং ষাট-সত্তর হাজার মানুষ গৃহহারা।
মণিপুর হাইকোর্টে স্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ার পর সেই বিতর্কিত রায় প্রত্যাহার করা হলেও সশস্ত্র সংঘাত কমেনি। কারণ ততদিনে রাজ্যের সাম্প্রদায়িক বিভাজন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। টানা ২১ মাস ধরে জ্বলছে মণিপুর। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির চক্রান্তে ছারখার হয়ে গেছে গোটা রাজ্য। (মেইতেই প্রধানত হিন্দু; পক্ষান্তরে কুকি-জো মূলত খ্রিষ্টান ও প্রকৃতি-পূজারী) প্রতিদিন প্রকাশ্যে খুন, ধর্ষণ, অপহরণের ঘটনা ঘটে চলেছে। দাঙ্গার আগুন থেকে রেহাই পায়নি শিশু থেকে মহিলা। রাস্তার ধারে বেড়ায় ঝুলে ছিল কাটা মুণ্ডু। গাছে পেরেক দিয়ে গাঁথা ছিল কাটা হাত-পা। সমাধি থেকে তুলে টুকরো টুকরো করা হয়েছে মৃতদেহ। মহিলাদের নগ্ন করে গ্রামে হাঁটিয়ে ধর্ষণ কাণ্ডের মতো বর্বরোচিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। গা শিউরে ওঠার মতো এসব ঘটনায় স্তম্ভিত হয়েছে গোটা বিশ্ব। মণিপুর নিয়ে দেশের মাথা হেঁট হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মণিপুর নিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা, অগ্নিগর্ভ রাজ্যটির দিকে ফিরেও তাকাননি। মণিপুর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ খুলতে বিরোধীরা সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। সেদিন তিনি টানা দেড় ঘণ্টার ভাষণে মণিপুর নিয়ে মাত্র দু'মিনিট বলেন। নংথোমবাম বীরেন সিংকে মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণের দাবি তুলেছিলেন বিরোধীরা। এই দাবিকে নস্যাৎ করে সংসদে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সগর্বে বলেছিলেন, "মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সহযোগিতা করছেন। তাঁকে অপসারণের প্রশ্নই ওঠে না"। মুখ্যমন্ত্রী অপসারণের বদলে রাজ্যে বহু বিতর্কিত কালা কানুন 'আফস্পা' জারি করে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করতে শুরু হয় দমনপীড়ন। এদিকে, কুকি-মেইতেই জাতি-সংঘর্ষ শুরুর পর রাজ্যে একটানা কারফিউ চলেছে। বন্ধ হয়েছে ইন্টারনেট। বিভিন্ন সংগঠনের ডাকে মাসের পর মাস চলেছে বন্ধ, পথ অবরোধ। একদিকে খুনোখুনি, আরেকদিকে কারফিউ-আফস্পা-বন্ধ। এর ফলে রাজ্যবাসীর দমবন্ধকর অবস্থা। কাজ-খাদ্যের তীব্র সঙ্কট। নতুন করে দেখা দেয় অনাহার অর্ধাহার। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে শুরু করে। তবুও টনক নড়েনি। শেষপর্যন্ত শাসকদলের বিধায়কদের একটি অংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বদলের জন্য ঘুঁটি সাজানো শুরু করেন। ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বাজেট অধিবেশনে বিরোধীপক্ষকে দিয়ে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। বিদ্রোহী বিধায়কদের বাগে আনার সবরকম চেষ্টা করেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সফল হতে পারেননি। দলের ভেতর তাঁর কৌশল ব্যর্থ হয়ে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিধানসভা অধিবেশনের আগের দিন বীরেন সিংকে ইস্তফা দিতে নির্দেশ দেন তিনি। বীরেন সিংয়ের ইস্তফার পর অচলাবস্থা শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী পদ নিয়ে শুরু হয় দড়ি টানাটানি। অবশেষে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করল কেন্দ্র।
রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি নিয়ে গর্জে উঠেছে খোদ শাসকদলের ছোটো শরিকদল। শাসকদলেরই কুকি-জো সম্প্রদায়ের বিধায়করা মেইতেই নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। তাঁদের দাবি কুকি-জো সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক স্বশাসিত প্রশাসন চাই। সেই দাবিতে ইন্ধন জুগিয়েছেন মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী। প্রসঙ্গত, মিজোরামও মূলত কুকি-জো অধ্যুষিত রাজ্য। মণিপুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায় নাগা-রাও এই দাবির বিরোধিতা করেনি। প্রথমত নাগা-রাও ধর্মগতভাবে খ্রিস্টান। দ্বিতীয়ত পৃথক কুকি-জো স্বশাসিত প্রশাসন স্বীকৃতি পেলেই নাগাদের দীর্ঘদিনের দাবি (বৃহত্তর নাগালিম) নিয়ে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে।
এই পরিস্থিতিতে এখন একটাই প্রশ্ন গুরুত্ব পাচ্ছে। মণিপুর নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কী ভাবছে? কোন পথে মণিপুরে শান্তি ফিরিয়ে আনা হবে? এর উত্তর জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে যে বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তা হল, - এই দীর্ঘস্থায়ী নৈরাজ্যের ফলে বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অশুভ প্রয়াস অবশ্যই সাফল্য অর্জন করেছে।