আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩১

সমসাময়িক

আমরা সবাই রাজা


ইন্ডিয়া জোটে সকলেই রাজা। সকলেই ক্ষমতার সমান দাবীদার, সকলেই চান জোটের নেতৃত্ব দিতে। তবে কিনা শক্তিশালী জোট গঠনের জন্য কিছু নীতি নিয়ে চলতে হয়। কোন নীতির পক্ষে থাকার জন্য জোট তৈরি হয়েছে আগে তা নির্ধারণ করতে হয়। সেই নীতি নিয়ে চলতে গিয়ে যথাসম্ভব একত্রিত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তার জন্য মাঝে মধ্যে একত্রে আলোচনা করতে হয়।

এই জোটের অধিকাংশ দল হল আঞ্চলিক, আর আছে কিছু ছোটো জাতীয় দল। আঞ্চলিক দলগুলি নিজস্ব স্বতন্ত্রতা রেখে চলতে চাইবে, ছোটো দলগুলি সন্ত্রস্ত থাকবে যেন বড়ো দল তাদের খেয়ে না ফেলে - এই বাস্তবতা আছে। তাই বিভিন্ন স্থানীয় উদ্দেশ্য নিয়ে চলা দলগুলির জোটে টানাপোড়েন চলবে। তবে এই টানাপোড়েন হতে হবে আদর্শগত, সেই সহজাত আকর্ষণ-বিকর্ষণ নিয়েই জোটকে কার্যকর করতে হবে৷ আর তার জন্য উপযোগী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। অবশ্য জোটের মধ্যে আদর্শগত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের বাইরে সংকীর্ণ এজেন্ডা নিয়ে দলগুলি চলতে পারে - তখনই তা চলে যখন তারা মনে করে শেষ দৌড়ে আমিই হব রাজা।

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৪০টি আসন পায়। সরকার গঠনের জন্য তাদের এনডিএ-র অন্যান্য সহযোগী ছোটো দলের উপরে ভরসা করতে হয়েছে। এটা ছিল তাদের ফোলা বুকে এক বিরাট ঘুসি। ফলে নির্বাচনোত্তরকালে তাদের ৫৬ ইঞ্চি বুক সামান্য তুবড়ে গেছিল। কিছুদিন মন্দ চলছিল না। বিজেপি নেতৃত্বের জনমানুষের দাবির প্রতি সহানুভূতিহীনতা, বিরোধীদের প্রতি তীব্র কটু কথা, সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি ক্রমাগত রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সামান্য হলেও কমেছিল। কল্পকাহিনীকে লিখিত ইতিহাস বলে চালানোর প্রচেষ্টাও যেন কিছুদিন থমকে ছিল।

বিগত লোকসভা নির্বাচনের পরে দেশের এক বিশাল অংশের মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। এবারে বোধহয় বিরোধীরা একত্রিত হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করবে। দেশ জোড়া একটা দৃঢ় জোট গড়ে উঠবে। এই জোট সংসদের মধ্যে ও সংসদের বাইরে একত্রিত আন্দোলন বজায় রেখে চাপে রাখবে জনবিরোধী সরকারি নীতিকে। কিন্তু তা হবার নয়। ইন্ডিয়া জোটের কিছু দলের নেতৃত্বের অবিমৃষ্যকারিতা ও আত্মম্ভরিতা নিজেদের তো বটেই সামগ্রিকভাবে বিরোধী জোটকে একটা সম্ভাবনাময় পরিস্থিতি থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

অরবিন্দ কেজরিয়াল আশা করেছিলেন, জেলবাসের পরেও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে না। তবে দুর্নীতির অভিযোগে দলের নেতৃত্বের একটা অংশ কারাবন্দি থাকলে সমান্তরাল রাজনীতির কথা বলা যায় না। মানুষ ভেবে নিয়েছেন, তার দল দেশের আর পাঁচটা দলের মতোই কম-বেশি দুর্নীতিপরায়ণ একটি দল। হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের নীতিনিষ্ঠতাও প্রশ্নের সম্মুখীন। আর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ৯৯টি আসন পেয়ে ভেবেছিল তারা সাধারণ স্বীকৃত জোট সর্দার। জোটের অন্যদের নিয়ে চলতে গেলে যে ধৈর্য ও বিচক্ষণতা থাকা দরকার তা তারা দেখতে পারেনি। মনে রাখতে হবে, ২০২৪-এ হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনেও আপ-কংগ্রেস জোট কার্যকর হতে পারেনি। কোন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আপ-এর জেদ ছিল অন্যতম প্রধাণ কারণ জোট ভেঙে যাওয়ার। এবারে দিল্লিতে আপ-এর হারের পরে কংগ্রেস কর্মীদের আনন্দ-তামাশা দেখে সন্দেহ হয় তারাও বোঝেন তো দেশের কাছে বিজেপি ও আরএসএস-এর বিপদ!

দিল্লি সরকারের আমলাতন্ত্রর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে (লেফট্যান্যান্ট গভর্নর না রাজ্য সরকার) - এই সংক্রান্ত একটি মামলায় নির্বাচিত সরকারের উপরেই তা ন্যস্ত বলে সুপ্রিম কোর্টের রায় দিয়েছিল। সেই রায়কে নস্যাৎ করতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। পরে সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হয় - The Government of National Capital Territory of Delhi (Amendment) Act 2023 বা GNCTD Act। এই আইনের বলে রাজ্য সরকারের উপর খবরদারি করার জন্য দিল্লির লেফট্যান্যান্ট গভর্নরকে (এলজি) যথেচ্ছ ক্ষমতা দেওয়া হয়। আইন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক গুজরাতের বিজেপি নেতা বিনয় কুমার সাক্সেনাকে এলজি পদে নিয়োগ করে। দায়িত্ব নিয়ে নতুন এলজি রাজ্য সরকারের প্রায় সমস্ত কাজকর্মের উপর তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সুচতুরভাবে জনপ্রিয় মহল্লা ক্লিনিকের উপরে তাঁর আক্রমণ নামিয়ে আনেন। সরকারি ইশকুলের শিক্ষার মান যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল তার অবনমন ঘটতে থাকে। দিল্লির জন-পরিবহণ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ অটো রিকশার ভাড়া পরিবর্তনের প্রস্তাব সংক্রান্ত ফাইল কোন ঠাণ্ডাঘরে ঠাঁই পেয়েছে বলা মুশকিল।

এমনকী দিল্লির পুরসভাকেও এই আইনের অধীনে এনে নাগরিক পরিষেবা থেকে জরুরি কাজকর্ম সব কিছুকে ধীরে ধীরে শ্লথ করে দেওয়া শুরু হয়। রাজ্যের প্রায় সমস্ত কাজকর্ম স্তব্ধ হয়ে যায়। এই স্তব্ধতা আসলে ছিল দিল্লিবাসীর মাথায় বন্দুক ধরে এই বার্তাটিই দেওয়া যে, আপ’কে তাড়াও না হলে সব নরক গুলজার করে দেব।

বলাই বাহুল্য, GNCTD আইন আমাদের দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করার প্রথম প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ। আশ্চর্যের বিষয় হল, GNCTD আইন নিয়ে ইন্ডিয়া জোট তো দূর অস্ত, কোনো বিরোধী দলও সোচ্চার হয়নি। যেন, এটা আপ-এর বিষয়; কাজেই তাদেরকেই বুঝে নিতে হবে।

তার উপর একে একে শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে দীর্ঘদিন জেলবন্দী করে রাখা সরকার ও দলের পক্ষে প্রভূত ক্ষতিকারক হয়েছে। শীর্ষ আদালতও বহুবার এ ব্যাপারে তদন্ত এজেন্সিগুলোকে ভর্ৎসনা করেছে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় বাজেটে ১২ লাখ টাকা অবধি করমুক্তি ও বিহার প্যাকেজ, অষ্টম বেতন কমিশনের ঘোষণা, নানারকম সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প (যেগুলোকে বিজেপি এতদিন ‘রেউড়ি’ বলে কটাক্ষ করেছে) মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা বড়ো অংশ ও পূর্বাঞ্চলীয় মানুষজনকে (মূলত বিহারী) প্রভাবিত করেছে। ফলে, ভোটের শতকরা হিসেবে ২০২০ সালে আপ-এর প্রাপ্ত ভোট এবারে ১০ শতাংশ নেমে গেছে; যদিও এত কাণ্ডের পরেও শেষাবধি বিজেপি ও আপ-এর ভোটের ফারাক দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ শতাংশে।

আজকে প্রশ্নটা শুধু দিল্লি বিধানসভা জেতা হারাতে আটকে থাকে না, সাধারণভাবে দিল্লির নির্বাচনে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলির বিপরীতমুখী লড়াই সারা দেশের মানুষের মনে ভরসা জোগাতে পারল না। ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব নিয়ে কলহ দেশের প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে জনমানুষের মনে কলতলার ঝগড়ার চেহারা নিয়েছে। দেশের মানুষের স্মরণে আছে ১৯৭৭ ও ১৯৮৯ সালের বিরোধী দলগুলির একত্রিত সরকার এবং পরবর্তী সময়ে কলকাতার বাড়ি ও ব্রিজের মতো বিরোধী ঐক্যের হুড়মুড়িয়ে ভেঙে যাবার চিত্র। দেশের মানুষকে ভরসা জোগানোর কোনো প্রচেষ্টা বিরোধী নেতৃত্ব একত্রিত হয়ে নেবেন? নাকি চলবে এই পারস্পরিক 'আঁচড় কামড়'?

অবশ্য নিজেদের চুলোচুলির শেষ হলে সকলের জন্যই প্রাপ্তির ভাঁড়ার হবে শূন্য।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা অবশ্য থেকে যায়, ইন্ডিয়া জোটের সকলেই সমমনা তো? সকলেই আরএসএস-এর সাম্প্রদায়িক নীতির বিরোধী তো?